

আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনের জন্য প্রার্থিতালিকা ঘোষণা করে দিল তৃণমূল। প্রার্থিতালিকায় একাধিক চমক রয়েছে। তালিকায় প্রাক্তন পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে বিশিষ্ট আইনজীবী, টলিউড অভিনেত্রীর নাম রয়েছে। সদ্য প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমারকে রাজ্যসভায় তৃণমূলের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। রাজ্যসভায় প্রার্থী করা হয়েছে অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিককে। রাজ্যের বর্তমান মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়কে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীকে প্রার্থী করেছে তৃণমূল।
আগামী ১৬ মার্চ রাজ্যসভা নির্বাচন। দেশের ১০টি রাজ্যের মোট ৩৭টি রাজ্যসভা আসনে ভোট হবে। তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি আসনও রয়েছে। বিধায়কদের সংখ্যার নিরিখে চারটি আসনে তৃণমূল এবং একটিতে বিজেপির জয় নিশ্চিত।
প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে তৃণমূলের অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডেল থেকে জানানো হয়েছে, এই ব্যক্তিরা তৃণমূলের স্থিতিস্থাপকতার স্থায়ী উত্তরাধিকার এবং প্রতিটি ভারতীয়ের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার জন্য তৃণমূল যে অটল অঙ্গীকার করেছে, তা এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক চার ঘোষিত প্রার্থী সম্পর্কে কিছু কথা –
রাজীব কুমার
সদ্য রাজ্য পুলিশের ডিজি পদ থেকে অবসর নিয়েছেন রাজীব কুমার। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ রাজীব কুমার। কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি যখন সারদা ও রোজভ্যালি চিটফান্ড কাণ্ডের তদন্ত করছিল, সেইসময় যেভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজীব কুমারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে তা নজিরবিহীন।
২০১৯ সালে সারদা কাণ্ডের তদন্তের সময় কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের লাউডন স্ট্রিটের বাসভবনে হানা দিয়েছিল সিবিআই। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর প্রতিবাদ জানিয়ে সেই রাতেই মেট্রো চ্যানেলে ধর্নায় বসেন। দু’দিন ধর্না দেন তিনি। তিনি রাজীব কুমারকে ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা অফিসার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
তিনি সিবিআই আধিকারিকদের এই পদক্ষেপকে ফেডারেল কাঠামোর ওপর আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরেন। এমনকি কলকাতা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সিবিআই আধিকারিকদের আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।
সিবিআই-এর পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রাজীব কুমার যখন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন, তখন রাজ্য সরকার তাঁর আইনি লড়াইয়েও পাশে দাঁড়িয়েছিল।
লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁকে রাজ্য পুলিশের ডিজিপি (DGP) পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিলেন রাজীব কুমার। তখনই জল্পনা শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক মহলে যে রাজীব কুমারকে রাজ্যসভায় নিয়ে যাওয়া হবে। কারণ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করতে গেলে নেপথ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জোর প্রয়োজন হয়। সেই জল্পনাই সত্যি হল।
বাবুল সুপ্রিয়
কয়েকদিন ধরেই রাজ্য-রাজনীতিতে বাবুল সুপ্রিয়র ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা জল্পনা শোনা যাচ্ছিল। কোন কেন্দ্র থেকে তিনি এবার প্রার্থী হবেন, সেই নিয়েই মূলত জল্পনা। কারণ তিনি যে এবার বালিগঞ্জ থেকে দাঁড়াচ্ছেন না, তা একপ্রকার স্পষ্টই ছিল। সূত্রের খবর, বাবুলকে আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতে তিনি আপত্তি জানান। এরপরই তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তৃণমূল বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর আসানসোলের প্রাক্তন সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় উপনির্বাচনে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন। এরপর তাঁকে মন্ত্রী করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মেনকা গুরুস্বামী
তৃণমূলের প্রার্থীতালিকার অন্যতম চর্চিত নাম মেনকা গুরুস্বামী। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী তিনি। তবে তাঁর অন্য এক পরিচিতিও আছে। তিনি এলজিবিটিকিউ প্লাস (LGBTQ+) সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এক পরিচিত মুখ। তিনি নিজেও সমকামী। আসন্ন রাজ্যসভা নির্বাচনে জয়ী হলে তিনিই হবেন ভারতীয় সংসদের ইতিহাসে প্রথম সমকামী সাংসদ।
মেনকা গুরুস্বামীর বাবা মোহন গুরুস্বামী সক্রিয় আরএসএস কর্মী ছিলেন। BJP-র প্রাক্তন স্ট্র্যাটেজিস্টও ছিলেন। অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহার বিশেষ উপদেষ্টা ছিলেন মোহন গুরুস্বামী। এই পারিবারিক রাজনৈতিক পটভূমিতেই বড় হয়েছেন মেনকা। ‘ন্যাশনাল ল স্কুল’, ‘হার্ভার্ড’ এবং ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়’-এর মতো বিশ্বের প্রথম সারির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করেছেন তিনি।
মেনকা ঘোষিত সমকামী। তাঁর দীর্ঘদিনের ‘পার্টনার’ অরুন্ধতি কাটজু-ও আইনজীবী। ২০১৬ সালে সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে (৩৭৭ ধারা বাতিল) সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন তাঁরা। ২০১৮ সালে ৩৭৭ ধারা বাতিল করে ঐতিহাসিক রায় দেয় শীর্ষ আদালত। এরপর ২০১৯ সালে সংবাদমাধ্যম CNN-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেনকা এবং অরুন্ধতি নিজেদের ‘কাপল’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
LGBTQ+ অধিকার রক্ষার নিরন্তর লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে ‘টাইম’ (TIME) ম্যাগাজিনের ১০০ জন সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পান মেনকা।
সম্প্রতি তৃণমূল এবং রাজ্য সরকারের হয়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তাঁকে সওয়াল করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আইপ্যাক মামলা, এসআইআর মামলা এবং আরজি কর মামলা।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য মামলাগুলির একটি হল - ছত্তিশগড়ে মাওবাদী দমনে তৈরি বিতর্কিত বাহিনী ‘সলওয়া জুড়ুম’-এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই। এছাড়া মণিপুরে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে ‘অ্যামিকাস কিউরি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
কোয়েল মল্লিক
কয়েকদিন আগেই প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের বাড়িতে গিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য-রাজনীতিতে এই বৈঠক ঘিরে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। এবার তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় রঞ্জিত মল্লিকের মেয়ে তথা অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের নাম দেখে অনেকটাই অনুমান করা যাচ্ছে সেই বৈঠকের কারণ। তবে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাংসদ-বিধায়ক করা তৃণমূলের কাছে নতুন নয়। এর আগে জুন মালিয়া, রচনা ব্যানার্জি, সায়নী ঘোষ, মিমি চক্রবর্তী, দেব, নুসরত জাহানের মতো একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রীদের লোকসভায় পাঠিয়েছে তৃণমূল। সেই তালিকায় নতুন সংযোজন কোয়েল মল্লিক।
উল্লেখ্য, এই চারটি আসনে তৃণমূলের সাংসদ ছিলেন সুব্রত বক্সী, মৌসম বেনজির নূর, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাকেত গোখলে। এর মধ্যে মৌসম বেনজির নূর কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভায় প্রার্থী করতে পারে তৃণমূল বলে সূত্রের খবর। সুব্রত বক্সী বয়সজনিত কারণে আর রাজ্যসভায় যেতে চান না বলে জানা গেছে। সাকেত গোখলেকে নিয়ে দলের কী পরিকল্পনা আছে তা এখনও জানা যায়নি।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন