

এসআইআর পর্ব আপাতত শেষ। ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ হয়ে গেছে। ‘বিচারাধীন’ (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন) ভোটারদের মধ্যে থেকে ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ নাম বাদ গেছে। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরের হিসেব অনুসারে বাদ গেছিল ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জনের নাম। অর্থাৎ সব মিলিয়ে মোট ৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৪৫ লক্ষ ভোটারের নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। প্রশ্ন একটাই। এই বাদ যাওয়ার তালিকায় পড়ে যাওয়া বৈধ ভোটারদের কী হবে? এখনও পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের যা গতিপ্রকৃতি তাতে এবারের ভোটে এঁরা ভোট দিতে পারবেন না তা প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে। ট্রাইব্যুনাল কীভাবে কাজ করবে তাও স্পষ্ট বা স্বচ্ছ নয়। কিন্তু এভাবে বৈধ ভোটারদের তালিকার বাইরে রেখে ভোট প্রক্রিয়া আদৌ করা যায় কিনা প্রশ্ন তা নিয়েই। এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সোমবার।
এসআইআর পর্বের আগে রাজ্যে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯। যা এসআইআর প্রক্রিয়া শেষে দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৭৭ লক্ষ ২০ হাজার ৭২৮-এ। এর মধ্যে নতুন বৈধ ভোটার হিসেবে যুক্ত হয়েছে ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৭০৭টি নাম। জেলাভিত্তিক হিসেবে সবথেকে বেশি মানুষ বাদ গেছেন উত্তর ২৪ পরগণা জেলায়, মোট ১২ লক্ষ ৬০ হাজার ৯৬ জন। এরপরেই দক্ষিণ ২৪ পরগণা - মোট বাদ ১০ লক্ষ ৯১ হাজার ৯৮ জন। মুর্শিদাবাদে মোট ৭ লক্ষ ৪৮ হাজার ৯৫৯ জন; হাওড়ায় ৫ লক্ষ ৯৫ হাজার ৯১৬ জন; নদীয়ায় ৪ লক্ষ ৮৭ হাজার ৫৬৫ জন; মালদহে ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন; হুগলীতে ৪ লক্ষ ৬৮ হাজার ৯৩৯ জন; কলকাতা উত্তরে ৪ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৪১ জন এবং কলকাতা দক্ষিণে ২ লক্ষ ৪৯ হাজার ৬১৯ জন বাদ পড়েছে। এই হিসেব ৭ এপ্রিল পর্যন্ত।
শুধুমাত্র যদি ‘বিচারাধীন’ বা আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন তালিকা থেকে বাদের হিসেব ধরা হয় সেক্ষেত্রে সবথেকে বেশি নাম বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদে (৪,৫৫,১৩৭)। এরপর তালিকায় আছে উত্তর ২৪ পরগণা (৩,২৫,৬৬৬), মালদহ (২,৩৯,৩৭৫), দক্ষিণ ২৪ পরগণা (২,২২,৯২৯), পূর্ব বর্ধমান (২,০৯,৮০৫), নদীয়া (২,০৮,৬২৬), উত্তর দিনাজপুর (১,৭৬,৯৭২), হাওড়া (১,৩২,১৫১), হুগলী (১,২০,৮১৩), কোচবিহার (১,২০,৭২৫) এবং বীরভূমের (৮২,০৫৯) নাম। এছাড়াও রাজ্যের সব জেলা থেকেই বড়ো সংখ্যায় ভোটাররা বাদ পড়েছেন।
খসড়া ভোটার তালিকায় মৃত বা স্থানান্তরিত বা ডুপ্লিকেট ভোটারের যে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ গেছিল তা নিয়ে সেই অর্থে কোনও বিতর্ক নেই। যদিও সেই তালিকাতেও এমন কিছু নাম বাদ গেছে যারা বৈধ এবং যাদের কাছে কাগজপত্র আছে। যা তাঁরা শুনানির সময় জমাও দিয়েছিলেন এবং এদের একটা বড়ো অংশের কাছেই কিন্তু সেই নথি জমা দেবার কোনও রিসিট নেই। কারণ তাদের সেই রিসিট দেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ। বহু জায়গাতেই মানুষ না বুঝতে পেরে শুনানির চিঠিও জমা দিয়ে দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা ওই চিঠি ফেরত দেননি বলেও অভিযোগ।
এরপরেই প্রশ্ন ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ নিয়ে। কাজ তো করেছেন কমিশনের কর্মীরা। ব্যবহার করা হয়েছে সফটওয়্যার। সেইসব ক্ষেত্রে যদি কোনও ভুল হয়ে থাকে তার দায় ভোটারের ওপর বর্তায় কীভাবে? রাজ্যের তৃণমূল সরকারই বা এই বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রথম থেকে বিষয়টিতে নজর দেয়নি কেন? কীভাবে এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে বাদ দিয়ে ভোট প্রক্রিয়ায় যেতে পারে কমিশন? রাজ্য সরকার এই বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে কেন?
এসআইআর প্রক্রিয়ার আগে থেকেই বিজেপি নেতারা এই রাজ্যে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’, ‘ঘুসপেঠিয়া’ প্রভৃতি তত্ব আওড়েছিলেন। একই কথা তাঁরা বলেছিলেন বিহারের ক্ষেত্রেও। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত বছরের ৩ নভেম্বর এক সমাবেশে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: “মুঝে বাতাইয়ে, কেয়া বিহার কা ভবিষ্যত আপ তয় করেঙ্গে, কি ঘুসপেঠিয়া তয় করেগা?”। বিহারের এসআইআর-এর পরে কতজন ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’র সন্ধান পেয়েছে নির্বাচন কমিশন? নির্বাচন কমিশন শুধু যে এসআইআর প্রক্রিয়ার শেষে শনাক্ত হওয়া এমন কোনো পরিসংখ্যান দেয়নি, তা-ই নয়, বরং গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ৪৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাতিলের কারণও তারা প্রকাশ করেনি।
ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে যে ভাবে ধাপে ধাপে জটিল করে তুলেছে নির্বাচন কমিশন তাতে প্রশ্ন জেগেছে কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়েই। ঠিক কোন কারণে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারকে তালিকার বাইরে রেখে ভোট প্রক্রিয়ায় চলে যাওয়া হল তা এখনও স্পষ্ট নয়। কেন যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে এই কাজ না করে তড়িঘড়ি করা হল তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ‘একজন বৈধ ভোটারও তালিকার বাইরে থাকবে না’ বলা কমিশন এই গ্যারান্টি দিতে পারবে কি যে, বাদ যাওয়াদের মধ্যে একজনও বৈধ ভোটার নেই? না, এরকম কোনও নিশ্চয়তা কমিশনের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। আর এখানেই স্পষ্ট রাজ্যের ভোটার তালিকা নিয়ে কমিশনের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণ। যে আচরণে আজ চরম বিপদে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিক। যারা ছুটে বেড়াচ্ছেন এ দরজা থেকে ও দরজায়। ঠিক কী করলে তাদের নাম ভোটার তালিকায় উঠবে তাও স্পষ্ট নয়। বেশ কিছু জায়গায় নাম তুলে দেবার অজুহাতে দালাল চক্র তৈরি হয়েছে বলেও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সবকিছুর শেষেও রাজ্যের সাধারণ মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলার এই কাজ নির্বাচন কমিশনই করেছে এটা বুঝে নিতে হবে। ভারতীয় সংবিধানের ধারা ৩২৬ তো এখনও বিলোপ করে দেওয়া হয়নি! তাহলে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর কি দেবে জ্ঞানেশ কুমার ও তাঁর দলবল?
* মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন