

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘নাকি’ কংগ্রেসে ফিরবেন। তাঁকে এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘নাকি’ কংগ্রেসে যোগ দেবার এবং পদ দেবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। যদিও এক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত কংগ্রেসের তরফে বা তৃণমূলের তরফে কিছু জানানো হয়নি। সবটুকুই ‘সূত্র’ ‘বিশেষ সূত্র’-র সৌজন্যে ভাসিয়ে দেওয়া খবর। তাই এই স্কুপের সত্যতা কতটা তা নিয়ে সংশয় আছে। ঠিক যেমন সংশয় আছে এই প্রস্তাবের বাস্তবতা নিয়েও। যদি সত্যিই কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই ধরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় একটা কথা বলাই যায় যে, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, বাস্তব পরিস্থিতি বোঝেন না।
রাজ্যের শেষ বিধানসভা নির্বাচনে ৮০ আসন, আড়াই কোটির বেশি ভোট পেয়েও মাত্র একমাসের মধ্যে তৃণমূল ভেঙে তিন টুকরো হয়ে গেছে। শুধু বিধানসভার পরিষদীয় দলেই নয়, তৃণমূলের ভাঙন ছড়িয়েছে সংসদীয় দলেও। কার্যত বিধায়ক, সাংসদ, কাউন্সিলর, কর্মী - কারোর ওপরেই আর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রতিটি প্রশাসনিক বৈঠকে হাতে মাইক নিয়ে দলীয় নেতা কর্মী থেকে আমলাদের ধমকাতে দেখা যেত সেই তাঁকেই দিন কয়েক আগে আদালতে গিয়ে 'চোর চোর' শুনতে হয়েছে। নির্বাচনী ফল প্রকাশের পর রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় যখন তৃণমূলের নেতা কর্মীরা আক্রান্ত হয়েছেন তখন তাঁর অতীতের সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, প্রতিবাদী ভাবমূর্তি দেখতে পায়নি রাজ্যের জনগণ। তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি যে অনেকটাই সরে গেছে তা এইসব ঘটনাতেই স্পষ্ট। তৃণমূলের আরও ভাঙন যে শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা তা ক্রমশ ক্রমশ বোঝা যাচ্ছে।
অথচ তৃণমূলের হাতে ৮০ জন বিধায়ক, রাজ্যসভা লোকসভা মিলিয়ে ৪১ জন সাংসদ ছিল। দলের ওপর সত্যিই যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণ থাকতো তাহলে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এই সংখ্যা যথেষ্ট ছিল। কিন্তু যেভাবে দলের বড়ো অংশই প্রকাশ্যে তাঁর এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরেই ক্ষোভ উগরে দিতে শুরু করেছিলেন তাতেই স্পষ্ট হয়েছিল দলের ওপর, দলের কর্মী, নেতাদের ওপর আর তাঁর নিয়ন্ত্রণ নেই। ঠিক এই কথাটাই এ রাজ্যের বাম নেতৃত্ব বহুদিন থেকে বলে এসেছেন যে ক্ষমতা থেকে সরলে তৃণমূল তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে। বাস্তবে কিন্তু ঠিক সেটাই হল।
প্রথমেই ভাঙলো বিধানসভার পরিষদীয় দল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্তে বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক দলের প্রায় ৬০ জন বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিরোধী দলনেতা হবার দাবি পেশ করলেন এবং তা মান্যতা পেল। এরপর ১৩ জন রাজ্যসভা সাংসদের মধ্যে ৪ জন পদত্যাগ করলেন। সেখানেও সেই ভাঙন রোধ করতে ব্যর্থ হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরও পরে লোকসভার ২৯ জন (একজনের মৃত্যুতে এখন ২৮ জন) সাংসদের মধ্যে প্রায় ২০ জন বিদ্রোহ করলেন। এই লেখার দিনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বস্ত সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন এবং দিল্লিতে বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করছেন বলেই খবর। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও দলের রাশ সম্পূর্ণ তাঁর হাতের বাইরে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে এই মুহূর্তে কুণাল ঘোষ, মদন মিত্র, ডেরেক ও ব্রায়েন, দোলা সেনদের মত যে কয়েকজন আছেন তাঁরাও আগামীদিনে তাঁর সঙ্গেই থাকবেন সে নিশ্চয়তা কোথায়? তাঁর হাতে থাকা অংশের আগামীদিনে তাই অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।
পশ্চিমবঙ্গের বাইরের রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহলে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবল বিজেপি বিরোধী শক্তি। এমনকি রাজ্যের বাইরের বিভিন্ন বাম দলের নেতৃত্বের একটা অংশও তাঁকে প্রবল বিজেপি বিরোধী নেত্রী হিসেবেই এখনও মনে করেন। এই অংশের মতে, তিনি দীর্ঘদিন রাজ্যে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রবল লড়াই করেছেন। যদিও তাঁরা আরএসএস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সখ্যকে কোনদিনই বিশেষ গুরুত্ব দেননি। বিগত পনেরো বছর রাজ্যে থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকাল প্রত্যক্ষ করেননি। তাই রাজ্যের বাইরে তাঁর এই ভাবমূর্তি থাকলেও এই ধারণার অসাড়তা বুঝতে রাজ্যের একটু ভেতরে যেতে হবে। এই রাজ্যে এখনও কংগ্রেসের যে কর্মী সমর্থকরা আছেন তাদের মনোভাব বুঝতে হবে। ওপর ওপর এই বিষয়ের জটিলতা বোঝা সম্ভব নয়।
দীর্ঘ পনেরো বছরের রাজপাটে সবসময়েই তিনি যতটা না বিজেপি বিরোধিতা করেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বিরোধিতা করেছেন কংগ্রেসের, বামেদের। ২০১১-তে কংগ্রেসের হাত ধরে রাজ্যে ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে সেই কাজই তিনি ঠান্ডা মাথায় করে এসেছেন। তা যদি না হত তাহলে ক্ষমতাসীন হবার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কংগ্রেস, বামেদের ভাঙতে তৎপর হতেন না।
রাজনীতি যেহেতু সবসময়েই সম্ভাবনাময় শিল্প এবং এখানে যে কোনও কিছুই হতে পারে তাই আগামীতে হয়তো কংগ্রেস তৃণমূল মিশে যেতে পারে। কিন্তু অতীতে এই রাজ্যের যে যে দল কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে গেছে বলে বলা হচ্ছে তাদের সঙ্গে তৃণমূলকে এক আসনে বসাতে গেলে বড়ো ভুল হয়ে যাবে। জন্মলগ্ন থেকেই তৃণমূল তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই নিজের দলের, নিজের একাধিপত্য চেয়েছেন। সেখানে অন্য কোনও দলের অস্তিত্ব তিনি স্বীকারই করেননি।
ক্ষমতাসীন হবার আগে বেশ কিছু ছোটো দলের হাত ধরলেও পরবর্তী সময় তাদের ডানা ছেঁটে, গুরুত্বহীন করে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। এসইউসিআই-তার সবথেকে বড়ো উদাহরণ। যে দল পরিবর্তন কালে তৃণমূলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলেও পরবর্তী সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের আর পাত্তা দেননি। আর এই একাধিপত্য কায়েম করতে তিনি ঠিক কতবার বিজেপি আর কংগ্রেসের হাত ছেড়েছেন আর ধরেছেন তা হয়তো নিজেও মনে করতে পারবেন না। যখন যেখানে সুবিধা বুঝেছেন সেই নদীতে ঝাঁপ মেরেছেন নির্দ্বিধায়। অনেকটা ওই নীতিশ কুমারের মত। আড়ালে আবডালে অনেকেই যাকে নাকি ‘পাল্টুরাম’ বলে ডেকে থাকে।
কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল, তারপর বিজেপি, তারপর কংগ্রেস, তারপর আবার বিজেপি, তারপর আবার কংগ্রেস – সাল তারিখ সবই দেওয়া যেতে পারে। কারণ এই সব ঘটনাই রাজ্যবাসীর চোখের ওপর ঘটেছে। একসময় তিনি বলেছিলেন, ‘বিজেপিকে ফ্রন্টে এনে লড়বো’। তাও দেখেছে বাংলা। কংগ্রেসের হাত ধরে ২০১১ তে ক্ষমতায় ফেরার পরেই কীভাবে কংগ্রেসকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার চেষ্টা করেছেন, কংগ্রেস ভাঙিয়েছেন তাও সকলেই জানেই। কার্যত তৃণমূল দলটাই তৈরি হয়েছে কংগ্রেস ভেঙে এবং কংগ্রেস থেকে নেতা কর্মী বিধায়ক, সাংসদ ভাঙিয়ে। আজও তৃণমূলে এমন অনেক সাংসদ বিধায়ক নেতা কর্মী আছেন যাঁদের রাজনৈতিক জীবনের একটা বড়ো অংশ জুড়েই ছিলো কংগ্রেস। যারা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে কংগ্রেস ভেঙেই তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। শুরুর সেই দিন মনে থাকার কথা সকলেরই।
তাঁর অতীত থেকে এটা স্পষ্ট যে আজ বিপাকে পড়ে তিনি কংগ্রেসের হাত ধরার জন্য দৌত্য করতেই পারেন, দু’চারবার কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করতেই পারেন। কিন্তু সুযোগ পেলেই তিনি যে আবার কংগ্রেস ভাঙতে উদ্যোগী হবেন না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। অতীতে সে নজির তো তিনি নিজেই রেখেছেন। তাই রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকে বিচার করতে গেলে একটা বড়ো শূন্য ছাড়া আর কিছুই পাবেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাহলে পড়ে থাকলো কী? ঠিক কেন কংগ্রেস তৃণমূলের মত ডুবন্ত নৌকোর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে পারে? যেহেতু তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে ইতিমধ্যেই তিন টুকরো এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে থাকা টুকরো কার্যত অস্তিত্বহীন তাই সেদিকে কংগ্রেস হাত বাড়াবে বলেও মনে হয়না। কারণ না আছে সাংসদ, না আছে বিধায়ক। তাই এক্ষেত্রে কংগ্রেস নয়, হয়তো বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যেতে আগ্রহী।
এখন প্রশ্ন একটাই। গত পনেরো বছরে রাজ্যকে যে জায়গায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছে তৃণমূল, তাদের বিরুদ্ধে যে ভুরি ভুরি দুর্নীতির অভিযোগ, তাদের সঙ্গে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে নিজেদের যেটুকু জমি আছে তা কি নষ্ট করবে কংগ্রেস? কারণ একথা তো সত্যি, কংগ্রেসের বহু নেতা কর্মী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কংগ্রেস ভাঙানো এখনও ভোলেননি। তাঁরা ভালোবেসেই কংগ্রেসটা করেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বা তৃণমূলের প্রতি যাঁদের বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। সেক্ষেত্রে কংগ্রেস কি আদৌ তৃণমূলকে কংগ্রেসে ঢোকার সুযোগ করে দিয়ে রাজ্যের মাটিতে নিজেদের অবশিষ্ট জমিটুকুও হারাবে? যার একটাই উত্তর, সম্ভবত না।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন