

পরিচালক হজেমস ওয়ান'এর ২০১০ সালের বিখ্যাত হরর মুভি 'ইনসিডিয়াস' (Insidious)-এ দেখানো হয়, ডাল্টন নামের এক শিশু ঘুমের মধ্যে নিজের অজান্তেই শরীর থেকে চেতনা আলাদা করে "দ্য ফার্দার" নামক এক অন্ধকার অবচেতন জগতে হারিয়ে যায়। তার শরীরটি বিছানায় খালি পড়ে থাকে। আর সেই খালি শরীরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ওত পেতে থাকা এক লাল মুখের শয়তান ও কিছু অশুভ আত্মা ডাল্টনের মগজ ও চেতনার দরজায় হানা দেয়। এখানে ভূত কোনো বাড়িকে নয়, মানুষের শরীর আর অবচেতন মনকে হন্ট করে।
আজকের ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে এই হরর সিনেমার স্ক্রিপ্টটাই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।
বামপন্থী মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা এই সিনেমার রূপকগুলোকে আজকের কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদ এবং কেন্দ্রে থাকা RSS পরিচালিত বিজেপি NDA জোটের দিকে তাকাই, তবে সমীকরণটা একদম মিলে যায়:
১. 'দ্য ফার্দার' (The Further) ও পুঁজিবাদের তৈরি মোহভঙ্গ:
সিনেমায় 'দ্য ফার্দার' হলো একটা কুয়াশাচ্ছন্ন, অন্ধকার অবচেতন জগত, যেখানে মানুষ দিকভ্রান্ত হয়ে যায়। আজকের দিনের লাগামহীন পুঁজিবাদ এবং কর্পোরেট থাবা মানুষের বাস্তব জীবনকে ঠিক এইরকম একটা অন্ধকার নরকে পরিণত করেছে। বেকারত্ব, চরম আর্থিক বৈষম্য, মূল্যবৃদ্ধি আর জীবনযাপনের অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষকে এক ধরণের গভীর অবসাদ ও মানসিক শূন্যতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। মানুষের আসল সামাজিক ও শ্রেণী চেতনা (Class Consciousness) যখন এই পুঁজিবাদের গোলকধাঁধায় দিশেহারা হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, তখনই শুরু হয় আসল হরর।
২. মানুষের মৌলিক অধিকারে একের পর এক আঘাত:
'ইনসিডিয়াস'-এর অশুভ শক্তি যেমন মানুষের জীবনীশক্তি শুষে নেয়, ঠিক তেমনি আজকের fascist-কর্পোরেট আঁতাত মানুষের জীবনধারণের মূল ভিত্তিগুলোর ওপর লাগাতার বুলডোজার চালাচ্ছে:
* শিক্ষায় আঘাত: জাতীয় শিক্ষানীতির নামে শিক্ষার গৈরিকীকরণ আর বাণিজ্যিকীকরণ করা হচ্ছে। সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
* স্বাস্থ্যসেবায় আঘাত: সরকারি হাসপাতালগুলোকে ধ্বংস করে চিকিৎসাব্যবস্থাকে পুরোপুরি বড় বড় কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে টাকা না থাকলে চিকিৎসা পাওয়া অসম্ভব।
* চাকরি ও কর্মসংস্থানে কোপ: স্থায়ী চাকরি সম্পূর্ণ অবলুপ্ত। রেল, বিএসএনএল-এর মতো বড় বড় সরকারি ক্ষেত্র বেসরকারীকরণ করে যুবসমাজকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
* 'আনস্কিলড লেবার' তৈরির কারখানা: যুবসমাজকে ভালো শিক্ষা বা টেকনিক্যাল স্কিল দেওয়ার বদলে, তাদের সস্তা এবং 'আনস্কিলড লেবার' বা চুক্তিভিত্তিক মজুরে পরিণত করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—কর্পোরেট মালিকদের জন্য সস্তায় শ্রমের জোগান দেওয়া।
৩. জল-জমি-জঙ্গল কর্পোরেটের হাতে বিক্রি:
যে আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জল, জমি ও জঙ্গল রক্ষা করে আসছে, কর্পোরেট বন্ধুদের স্বার্থে আইন সংশোধন করে তাদের সেই ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। কয়লা খনি থেকে শুরু করে আদিবাসীদের পবিত্র জঙ্গল, সব তুলে দেওয়া হচ্ছে পুঁজিপতিদের পকেটে।
৪. দৃষ্টি ঘোরানোর মোক্ষম অস্ত্র: ধর্মীয় সমীকরণ
এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চাকরি হারিয়ে, নিজের জল-জমি-জঙ্গল হারিয়েও দেশের মানুষ কেন বিদ্রোহ করছে না? এখানেই কাজ করছে 'ইনসিডিয়াস'-এর সেই লাল মুখের শয়তানের মগজ ধোলাইয়ের খেলা।
মানুষ যাতে নিজের এই চরম দুর্দশা, ক্ষোভ আর অধিকার হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে প্রশ্ন করতে না পারে, তাই তাদের মগজে দিনরাত ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্মীয় উন্মাদনা। মন্দির-মসজিদ বিতর্ক, ধর্মীয় বিভাজন আর উগ্র জাতীয়তাবাদের দেওয়াল তুলে মানুষের দৃষ্টি সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি আর গোদি মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের অবচেতন মনে এমন এক কৃত্রিম ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তারা নিজের চাকরি বা সন্তানের শিক্ষার চেয়ে "ধর্ম বিপন্ন" এই ভুয়ো তত্ত্বে বেশি বুঁদ হয়ে থাকছে। মানুষের আসল ক্ষোভকে সুকৌশলে চ্যানেলাইজ (channelize) করা হচ্ছে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষে।
৫. এই 'পজেশন' থেকে মুক্তির উপায় কী?
সিনেমায় ডাল্টনকে ফিরিয়ে আনতে তার বাবাকে নিজের চেতনা নিয়ে সেই অন্ধকারের সাথে লড়াই করতে হয়েছিল। আজকের ভারতবর্ষেও এই ফ্যাসিবাদের 'ডেমোনিক পজেশন' বা মনের ঘোর থেকে মুক্ত হতে গেলে আমাদের অবচেতন থেকে আবার সজ্ঞান বাস্তবতায় ফিরতে হবে।
ধর্ম আর বিদ্বেষের যে কৃত্রিম ঘুমপাড়ানি গান দিয়ে আমাদের মগজকে হাইজ্যাক করা হয়েছে, তাকে ভাঙতে পারে একমাত্র তীব্র শ্রেণী চেতনা (Class Consciousness)। পুঁজিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার এই যৌথ শয়তানকে হারাতে গেলে মানুষকে বুঝতে হবে, তার আসল শত্রু অন্য ধর্মের প্রতিবেশী নয়, তার আসল শত্রু সেই কর্পোরেট-ফ্যাসিস্ট আঁতাত, যা তার মাথার ভেতর দিনরাত ঘৃণার চাষ করে নিজের আখের গোছাচ্ছে।
মগজের এই দখলদারি রুখতে না পারলে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও 'ইনসিডিয়াস'-এর মতোই এক অন্তহীন অন্ধকারে বন্দি হয়ে যাবে।
*মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন