Jyoti Basu: জ্যোতি বসু - আন্দোলন-সংগ্রামের এক উজ্জ্বল অভিযাত্রী

১৯৪০-এ জ্যোতি বসু, ভূপেশ গুপ্তরা দেশে ফিরে এসে কমিউনিস্ট আন্দোলনের স্রোতধারায় নিজেদের মেলে ধরলেন, যেন বহতা নদীর উতল স্রোত সুবিশাল সমুদ্রের মোহনায় গিয়ে পড়ল।
জ্যোতি বসু
জ্যোতি বসুগ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

জ্যোতি বসু (১৯১৪-২০১০) নামটি উচ্চারণ করলে অবচেতন মনেই যেন পশ্চিমবঙ্গ,গণআন্দোলন, কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রসঙ্গ আন্দোলিত হয়ে ওঠে। তাঁর ছবির কথা ভাবলে আমাদের মানসপটে আঁকা হয়ে যায় রক্ত পতাকা উদ্ভাসিত ব্রিগেডের জন কল্লোল; শহরের রাজপথে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের দৃপ্ত মিছিল, গ্রামের বিস্তীর্ণ সবুজের সমারোহে খেতের আলপথ ধরে লালপতাকা উঁচিয়ে কৃষকের দিগন্ত বিস্তৃত সারি অথবা কলে-কারখানায় শোষণ আর শাসনের ভ্রূকুটিকে হার মানিয়ে মেশিন আর সাইরেনের শব্দ ছাপিয়ে অধিকার আদায়ের দাবিতে বুকে ক্ষোভের আগুন জ্বেলে শ্রমজীবীদের দুরন্ত স্লোগান। তাঁর কণ্ঠস্বরে যেন প্রতিধ্বনিত হয় মানুষেরই জীবন জয়ের বার্তা, দরিদ্র-প্রান্তিক অসহায় মানুষের মধ্যে যেন স্পন্দিত হয় গভীর আস্থা ও বেঁচে থাকার চিরন্তন আশ্বাস।

উত্তাল চল্লিশের দশক - আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের দানবীয় ঔদ্ধত্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ্রাসী উন্মত্ততা, জাতীয় প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ-মন্বন্তরের বীভৎসতা এবং ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা ইত্যাদির অভিঘাতে এক অস্থির সময়ে রাজনীতির আঙিনায় অভিষেক হয় জ্যোতি বসুর। অবশ্য তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক জীবন নির্মাণের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিশ্চিত হয়েছিল তিরিশের দশকে লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়তে যাবার সুবাদে। সেখানে তিনি সহপাঠী-বন্ধু ভূপেশ গুপ্ত, স্নেহাংশু আচার্য সহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে নিয়ে মেতে ওঠেন লন্ডন মজলিস নিয়ে। তিনিই হন তার প্রথম সম্পাদক। তার আগে কৃষ্ণ মেননের নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া লিগের সভায় গিয়ে দেশের স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গড়ে তোলার প্রয়াসের সূচনা। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তাঁরা সাক্ষাৎ করেন ব্রিটেন কমিউনিস্ট পার্টির হ্যারি পলিট, রজনী পাম দত্ত, বেন ব্রাডলে প্রমুখ বিখ্যাত নেতাদের সঙ্গে। সংযোগ গড়ে ওঠে পুনর্গঠিত বিটেনের ভারতীয় ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে। সব মিলিয়ে এক নতুন চিন্তার জগতে, এক নতুন রাজনৈতিক পরিবৃত্তে তিনি জড়িয়ে পড়লেন। তিনি সেই সময়কালের কথা ও তারই আবেশে নিজের অনুভবের কথা ব্যক্ত করে লিখেছেন :

" লন্ডন, কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ছাত্ররা কমিউনিস্ট গ্রুপ গড়ে তুললেন। ব্রিটিশ পার্টি নেতারা আমাদের জানালেন প্রকাশ্য সভা না করতে। কেননা ভারতে ইংরেজ রাজশক্তি তখন কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করেছে। আমরা মার্কসবাদী পাঠচক্রে যেতে শুরু করলাম। আমাদের পড়াতেন হ্যারি পলিট, রজনী পাম দত্ত,ক্লিমেন্স দত্ত এবং ব্র্যাডলের মতো নেতারা। গোটা বিশ্ব তখন তপ্ত থেকে তপ্ততর।স্পেনে শুরু হয়েছে গৃহযুদ্ধ। ফ্র্যাংকোর স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রীদের সংগ্রাম নজর কাড়ছে সমস্ত প্রগতিশীল মানুষের। ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে স্বাধীন চিন্তার এই যুদ্ধে শামিল হতে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক ব্রিগেড। র‍্যালফ ফকস্, ক্রিস্টোফার কডওয়েলের মতো বিখ্যাত কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবীরা স্পেনে যেতে শুরু করেছেন। আর্নস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস 'ফর হুম দি বেল টোলস' এই সংগ্রাম নিয়েই লেখা। আমি ভিতরে ভিতরে প্রবল আলোড়িত। মার্কসবাদী সাহিত্য পাঠ আর সম সাময়িক ঘটনা প্রবাহ আমাকে দ্রুত রাজনীতির মূল প্রবাহে টেনে নিচ্ছে।" ("যত দূর মনে পড়ে",পৃষ্ঠা ৮)

এই পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং সেই সময়ে মনের মধ্যে আলোড়িত চিন্তার প্রবাহ জ্যোতি বসুদের চালিত করে এক দৃঢ় সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে। তাঁরা কয়েকজন স্থির করলেন ভারতে ফিরে গিয়ে সর্বক্ষণের পার্টি কর্মী হিসেবে কাজ করবেন।

১৯৪০-এ জ্যোতি বসু, ভূপেশ গুপ্তরা দেশে ফিরে এসে কমিউনিস্ট আন্দোলনের স্রোতধারায় নিজেদের মেলে ধরলেন, যেন বহতা নদীর উতল স্রোত সুবিশাল সমুদ্রের মোহনায় গিয়ে পড়ল। লড়াই-আন্দোলনের প্রবহমানতায় রাজনীতির আঁকাবাঁকা দুর্গম পথে নির্ভীক অভিযাত্রী হিসেবে জ্যোতি বসুর যাত্রা শুরু হলো। তখন সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল আত্মগোপনকারী পার্টি কর্মী ও নেতাদের আশ্রয়ের স্থান ঠিক করা, পার্টির গোপন বৈঠকের জায়গা ঠিক করা এবং বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা ইত্যাদি। এছাড়াও তখন তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল পার্টির জন্য চাঁদা সংগ্রহ করা। তখন গোপন পার্টির নির্দেশে জ্যোতি বসু পার্টি ক্লাস নিয়েছেন এবং বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিয়েছেন।

এই সময়কালের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, ১৯৪১ সালের জুন মাসে হিটলারের নাৎসি বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। এই আক্রমণের ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এক গুণগত পরিবর্তন আসে। যুদ্ধের চরিত্রে পরিবর্তন আসে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনযুদ্ধে পরিণত হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই (৭ ডিসেম্বর, ১৯৪১) আমেরিকার পার্লহারবারে বোমা ফেলে জাপান। ১৯৪২ সালে শুরু হয় 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলন। সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টির সামনে এক ভয়ঙ্কর প্রতিকূল পরিস্থিতি। পার্টির উপর নেমে এসেছে নানা দমন-পীড়ন, আক্রান্ত পার্টি কর্মীরা। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও পার্টি কর্মীরা গ্রামে, গঞ্জে শহরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পার্টির নীতি-আদর্শের কথা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন।

এই পরই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে বাংলা। ১৯৪৩ সালের এই ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী মন্বন্তরের মোকাবিলায় পার্টির উদ্যোগে জনরক্ষা কমিটি গড়ে তোলা হয় এবং ত্রাণের কাজ সংগঠিত হয়। এ ছাড়াও পার্টির উদ্যোগেই তৈরি হয়েছিল 'বেঙ্গল রিলিফ কো-অর্ডিনেশন কমিটি'।

তখন শুধুমাত্র রাজনীতির অঙ্গনেই নয়, প্রগতি সংস্কৃতি আন্দোলনের গতিধারায় সংযুক্ত হয় ছাত্র-যুবদের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সংগঠন 'ইয়ুথ কালচারেল ইনস্টিটিউট' সংক্ষেপে ওয়াই সি আই। সোভিয়েত আক্রান্ত হবার পর 'সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি' ইত্যাদি। এই সমস্ত সংগঠনের বহুধা-বিস্তৃত কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিলেন জ্যোতি বসু।

ইতিমধ্যে বোম্বাই শহরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার আগে ভারত সভা হলে হয়েছে পার্টির বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির সম্মেলন ।

নানা ঘটনায় আলোড়িত সেই সময়কালের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ঢাকায় ফ্যাসিস্ট শক্তির সমর্থকদের দ্বারা নৃশংসভাবে খুন হন উদীয়মান লেখক ও কমিউনিস্ট কর্মী সোমেন চন্দ। এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন জ্যোতি বসু। ১৯৪২ এর ৮ মার্চ 'সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি'র আহ্বানে ঢাকার সূত্রাপুরে এক ফ্যাসিস্ট বিরোধী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। এই সম্মেলনে অংশ নিতে কলকাতা থেকে ঢাকা গিয়েছিলেন স্নেহাংশুকান্ত আচার্য, বঙ্কিম মুখার্জি এবং জ্যোতি বসু। রেল কর্মীদের একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে সেই সম্মেলনে আসার পথে ফ্যাসিবাদের একদল উন্মত্ত সমর্থকের আক্রমণে খুন হন বছর বাইশের তরুণ সম্ভবনাময় লেখক সোমেন চন্দ। এই মিছিলেই অন্যান্যদের সঙ্গে ছিলেন জ্যোতি বসু।

১৯৪৪ সাল থেকে জ্যোতি বসু পার্টির নির্দেশে শ্রমিক সংগঠনে কাজ শুরু করেন। প্রথমে বন্দর ও ডক শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে ও পরে বি এন রেলওয়ে শ্রমিকদের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ার কাজে যুক্ত হন।

এর পরই সংসদীয় রাজনীতির পরিবৃত্তে জ্যোতি বসুর দীর্ঘ অভিযাত্রা শুরু হয়। তিনি ১৯৪৬ সালে রেলওয়ে কেন্দ্রের প্রতিনিধি হিসেবে হুমায়ুন কবীরকে পরাজিত করে বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন সভায় নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯ দু'দফায় যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়কাল বাদ দিলে ১৯৪৬ থেকে ১৯৭২ -- তিনিই ছিলেন আইন সভায় অন্যতম বিরোধী কণ্ঠস্বর। এই '৪৬ সালেই ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা গোটা দেশে কলঙ্ক চিহ্ন এঁকে দেয়। পার্টির উদ্যোগে এই ভয়াবহ দাঙ্গা নিরসনে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জ্যোতি বসুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

এর পর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন, তেভাগা সহ কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক-কর্মচারী আন্দোলন, উদ্বাস্তুদের আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বহুমুখী গতিধারার সঙ্গে জ্যোতি বসুর জীবনপথও একাত্ম হয়ে যায়। সত্তরের নৈরাজ্য-সন্ত্রাসের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিন থেকে আলোয় উত্তরণের সংগ্রামে তিনি ছিলেন অন্যতম আলোর দিশারি। বাংলার এই সামগ্রিক লড়াই-আন্দোলনের প্রবহমানতাই জ্যোতি বসুকে কমিউনিস্ট নেতা-জননেতা রূপে নির্মাণ করেছে, তিনি প্রকৃত অর্থেই যেন হয়ে উঠেছিলেন বাংলার গরিব-শ্রমজীবী-নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত জনঅংশের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক। এই দীর্ঘ লড়াই-আন্দোলনের পথ বেয়েই ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে অন্ধকারের দুঃশাসনকাল পেরিয়ে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা হয় বামফ্রন্ট সরকারের। তারপর ক্রমান্বয়ে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনিই ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে যে নজির আজও নেই।

জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার জনমুখী কর্মকাণ্ডে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে রাজ্যে। গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দলমত নির্বিশেষে বন্দিদের মুক্তি, সরকারি কর্মচারিদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার প্রদান, ছাঁটাই কর্মীদের পুনর্বহাল, শিক্ষার প্রসার ও শিক্ষায় গণতন্ত্রীকরণ, শিক্ষকদের উপযুক্ত মর্যাদা দান ইত্যাদি সিদ্ধান্ত উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

এছাড়া ভূমি সংস্কার ও ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমিহীনদের জমি বণ্টন, বর্গাদারদের অধিকার সুরক্ষা, মহিলাদের জন্য যৌথ পাট্টা, গ্রামীণ মানুষের আর্থিক উন্নয়ন, পঞ্চায়েতের মাধ্যমে মানুষের রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষমতায়ন, ১৮ বছরের ভোটাধিকার, পঞ্চায়েত-পৌর সভায় নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন এবং যাবতীয় উন্নয়নমূলক কাজে মানুষকে যুক্ত করা, বিরোধীদের মতমতকে মর্যাদা দেওয়া ইত্যাদির মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রের বিকাশ, পঞ্চায়েত-পৌরসভায় মহিলাদের আসন সংরক্ষণ, তপশিলি-আদিবাসী-সংখ্যালঘু সহ অনগ্রসর শ্রেণির কল্যাণে প্রভূত উদ্যোগ গোটা দেশে নজির সৃষ্টি করেছে।

জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে পঞ্চায়েতের সাফল্য শুধু দেশে নয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রশংসিত হয়েছে। এই সময়েই কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে রাজ্যে, খাদ্যশস্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত রাজ্যে পরিণত, ক্ষুদ্র শিল্পে, মৎস্য উৎপাদনে, বন সৃজনে দেশের শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে পশ্চিমবঙ্গ। এরই পাশাপাশি হলদিয়া, বক্রেশ্বর, তথ্য প্রযুক্তি শিল্প সহ অসংখ্য শিল্প গড়ে উঠেছে রাজ্যে। কৃষির সাফল্যকে অটুট রেখে শিল্প সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় রাজ্যে। এই সমস্ত কিছুর মূল অভিমুখ থাকে বিকল্প পথে কর্মসংস্থান ও রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন।

জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যে সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন ও বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রেও অনন্য নজির রেখেছে। দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা,জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় জ্যোতি বসুর দৃঢ় ও নীতিনিষ্ঠ ভূমিকা দেশে এমনকী বর্হিবিশ্বেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। এমন অসংখ্য নজিরসৃষ্টিকারী সাফল্যের প্রধান রূপকার হওয়া সত্ত্বেও জ্যোতি বসুর কণ্ঠে কখনো শোনা যায়নি যে 'আমি করেছি' বা তাঁর ছবির সঙ্গে 'উন্নয়নের প্রতীক' লেখা ব্যানার, ফেস্টুন, ফ্লেক্স রাজ্যবাসী কখনো দেখেননি। তাঁর প্রতিটি বক্তৃতায়, লেখায়, এমনকী ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সবসময়ই প্রাধান্য পেয়েছে অপরূপ শব্দবন্ধ 'আমরা'। তিনি লিখেছেন:

"এ রাজ্যে যখন বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা হয় তখনই আমরা ঘোষণা করেছিলাম, আমাদের সরকার শুধু মহাকরণ থেকে চলবে না, প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। সেই মতো আমরা পঞ্চায়েত রাজ প্রতিষ্ঠা করেছি, অসংখ্য পৌরসভা গঠন করেছি এবং এগুলির হাতে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিয়েছি।.....রাজ্যের সীমাবদ্ধ ক্ষমতার মধ্যে থকেও আমরা মানুষকে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তা সব সময়ই বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। আমরা মানুষকে কখনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেইনি।" (দেশহিতৈষী, শারদ সংখ্যা, ২০০৯)।

জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সাফল্য রচনার পাশাপাশি নীতি-আদর্শের সঙ্গে সাযূজ্য রেখে জীবনকে চালিত করেছেন। তিনি মনেপ্রাণে যা বিশ্বাস করতেন, সেটাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করতেন। তিনি সময়ের আহ্বানে তাঁর যোগ্য উত্তরসূরির জন্য স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়েছেন। বর্তমানে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার কুৎসিত রাজনীতির আবহে এটাও এক আলোকিত দৃষ্টান্ত।

সাম্প্রদায়িকতা, বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে জ্যোতি বসুর নির্ভীক, দৃঢ় ভূমিকা ও পদক্ষেপ প্রত্যক্ষ করেছেন রাজ্য তথা দেশের মানুষ। তাই তো উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদীদের হাতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দিল্লি সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিংসার আগুন জ্বললেও পশ্চিমবঙ্গে তার কোনো রেশ আসতে পারেনি। বরং ভিন রাজ্যের আতঙ্কিত মানুষ অনেকেই তখন পরিত্রাণ পেতে 'জ্যোতি বসুর মুলুকে' আশ্রয় খুঁজে ছিলেন।

সুবিস্তীর্ণ সংগ্রামী অভিযাত্রায় জ্যোতি বসুর উপলব্ধিতে ছিল 'সভ্যতার সংকট'-এ বিধৃত রবীন্দ্রনাথের সেই চিরন্তন বাণী--"মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।" তাঁর বক্তব্যেও বার বার মানুষের সাথে সংলগ্ন থাকার কথাই উচ্চারিত হয়েছে। তাই তিনি লড়াই-সংগ্রামের অবিরত ধারার মধ্য দিয়েই অগণিত মানুষের জীবন সংগ্রামের বিশ্বস্ত সাথি, প্রিয় নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। তাঁর দৃঢ় কণ্ঠে বারে বারেই উচ্চারিত হয়েছে -

"মানুষের স্বার্থ ছাড়া কমিউনিস্টদের আর কোনো স্বার্থ নেই। মানুষ যেমন ভুল করে, আবার মানুষই ইতিহাস রচনা করে। তাই মানুষের কাছেই আমাদের বারে বারে যেতে হবে।"

রাজ্যের এই অনন্য সাফল্য এবং অর্জিত সম্মান আজ অন্ধকারের শাসনে নস্যাৎ হতে বসেছে। আজ রাজ্যে ও গোটা দেশে গণতন্ত্র, অর্জিত অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, সংহতি, সম্প্রীতি, সংবিধান, আইন, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ভূলুণ্ঠিত পতাকাকে তুলে ধরতে এবং দুর্নীতি - কলুষমুক্ত সমাজ নির্মাণে জনমানুষের সঙ্গে সুনিবিড় সখ্য গড়ে তুলে লড়াইয়ের প্রবাহে অগ্রসর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। আলোর অভিযাত্রী জ্যোতি বসুর সুদীর্ঘ সংগ্রামী জীবন আজ এই বার্তাই দিচ্ছে।

জ্যোতি বসু
জ্যোতি বসু’র রচনাসংগ্রহ - দেখতে দেখতে দু’দশক হতে চললো

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in