জ্যোতি বসু’র রচনাসংগ্রহ - দেখতে দেখতে দু’দশক হতে চললো

রচনাবলীর কাজে যুক্ত থাকার সুযোগ পেয়ে মনে হয়েছিল, বাংলার রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে নতুন করে জানার সুযোগ। তার অনেকটাই জানা যাবে বসু’র বয়ান থেকে। বাংলা তথা দেশের রাজনীতিতে যিনি কিংবদন্তীতুল্য।
জ্যোতি বসু’র রচনাসংগ্রহ - দেখতে দেখতে দু’দশক হতে চললো
নিজস্ব চিত্র

ন্যাশনাল বুক এজেন্সি’র উদ্যোগে জ্যোতি বসু’র পাঁচ খন্ডের রচনাসংগ্রহের প্রথম খন্ডটি প্রকাশিত হয় ২০০২ সালের জানুয়ারিতে। যতদূর মনে পড়ছে, দশ-বারো মাসের প্রস্তুতি ছিল। সেদিক থেকে ২০০১ সালেই কাজ শুরু হয়। দেখতে দেখতে এতগুলো বছর কেটে গেল। প্রায় দু’দশক। সময় বড় দ্রুত পার হয়ে যায়।

বসুর রচনাসংগ্রহের প্রকাশনা ন্যাশনাল বুক এজেন্সি’র গৌরবজনক ইতিহাসে অন্যতম একটি মাইল ফলক। পাঁচ খন্ডের যে-কোন বইয়ের প্রস্তুতিই বেশ শক্ত কাজ। আবার তা যদি হয় জ্যোতি বসু’র মতো প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বের রচনাসংগ্রহ তা-হলে কাজ আরও শক্ত হয়ে যায়। রচনাসংগ্রহ নিয়ে পাঠকদের আগ্রহও ছিল চোখে পড়ার মতো। আগাম গ্রাহক সংগ্রহ করা হয়। বেশ কয়েক হাজার মানুষ গ্রাহক হয়েছিলেন। এত পাঠকের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা তো করতে হবে!

সিপিআই(এম) রাজ্য কমিটির তৎকালীন সম্পাদক অনিল বিশ্বাস এবং পার্টির রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীর অন্যতম সদস্য শ্যামল চক্রবর্তী যখন এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে বলে জানালেন তখন খুবই ভালো লেগেছিল। তার আগেও আমার একটা বইয়ের জন্য শ্রদ্ধেয় জ্যোতি বসু’র সাক্ষাৎকার নেবার সুযোগ হয়েছিল। সাক্ষাৎকার মানেই নতুন কিছু জানা। ভীষণ আন্তরিকভাবে ও মনোযোগ সহকারে কথা বলতেন। এত ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু কথা বলার সময় কখনো মনে হতো না।

রচনাবলীর কাজে যুক্ত থাকার সুযোগ পেয়ে প্রথমেই মনে হয়েছিল, বাংলার রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে নতুন করে জানার সুযোগ। এবং তার অনেকটাই জানা যাবে বসু’র বয়ান থেকে। বাংলা তথা দেশের রাজনীতিতে যিনি কিংবদন্তীতুল্য। রাজনৈতিক মতামত নির্বিশেষে পরম শ্রদ্ধার পাত্র।

রচনাসংগ্রহের জন্য এনবিএ-র তরফে একটি সম্পাদকমন্ডলী গঠন করা হয়। সভাপতি শ্যামল চক্রবর্তীর নেতৃত্বে আমরা- সোমনাথ ভট্টাচার্য, দিলীপ ব্যানার্জি, মুরারী মিত্র ও অঞ্জন বেরা। সম্পাদনা সহযোগী সান্ত্বন চট্টোপাধ্যায় ও মৌলিশ্রী চট্টোপাধ্যায়। সঙ্গে আরও অনেক মানুষের সাহায্য। খুবই উৎসাহ এবং আগ্রহের সঙ্গে আমরা সবাই মিলে কাজ করেছি। প্রায় পাঁচ বছর ধরে। ২০০১ থেকে ২০০৫।

সম্পাদকমন্ডলী প্রথমেই ঠিক করে, রচনাসংগ্রহে বসু’র লেখা প্রবন্ধ শুধু নয়, তাঁর ভাষণ, এমনকি সাক্ষাৎকারও সংকলিত হবে; এবং তা হবে কালানুযায়ী। সেইসঙ্গে থাকবে ফটোগ্রাফ। যাতে করে বইটি সামগ্রিকভাবে জ্যোতি বসু’র রাজনৈতিক জীবনের একটি আকর গ্রন্থ হয়ে উঠে। আর জ্যোতি বসুর রাজনৈতিক জীবন মানে দেশের, বিশেষত বাংলার, ছয়-সাড়ে ছয় দশকের রাজনীতির ইতিহাস।

বসু’র সবচেয়ে পুরোনো যে লেখা রচনাসংগ্রহে সংকলিত (অর্থাৎ প্রথম খন্ডের প্রথম লেখা) হয়েছে তা হলো, পাক্ষিক ‘জনযুদ্ধ’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় (১৫ এপ্রিল ১৯৪২) প্রকাশিত প্রবন্ধ --- ‘এ পি আর সংগঠন ও দেশকর্ম্মীদের কর্তব্য’। ‘জনযুদ্ধ’ প্রথম দু’টি সংখ্যা পাক্ষিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৯৪২-র ১ মে থেকে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক হিসেবে। তার আগে কি বসু কোনো লেখা লেখেননি? লেখেননি বলা শক্ত। যতদূর মনে পড়ে, বসু নিজে আমাদের বলেছিলেন, লন্ডনে থাকাকালীন তাঁর অন্তত একটি লেখা সম্ভবত প্রকাশিত হয়। কিন্তু কোন পত্রিকায় বা ঠিক কবে তা তাঁর স্মরণে ছিল না। তাঁর কথার ভিত্তিতে লেখাটি খুঁজে বার করার চেষ্টাও হয়েছিল পরিচিতদের মাধ্যমে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া যায় নি। বসু’র সর্বশেষ যে লেখা/ ভাষণ রচনাসংগ্রহে (অর্থাৎ পঞ্চম খন্ডে) স্থান পেয়েছে তা হলো ২০০৫ সালের ৬ এপ্রিল দিল্লিতে সিপিআই(এম)-র অষ্টাদশ কংগ্রেসে প্রদত্ত ভাষণের পূর্ণ বয়ান (শিরোনাম-‘পার্টিকে বাড়াতে হবে’)।

রচনা সংগ্রহের কাজ চলাকালীন অনেক বার বসু’র সল্টলেকের বাসভবনে যেতে হয়েছে সম্পাদকমন্ডলীর সদস্যদের। তাঁর নিজের মুখ থেকে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কিছু কিছু শোনার মূল্যবান স্মৃতি আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে। প্রতিটি খন্ডের ক্ষেত্রেই সূচীপত্রের একটা খসড়া আমরা তাঁর কাছে নিয়ে যেতাম। উনি কখনও কখনো বলেননি। আমরাই নিয়ে যেতাম। কী লেখা বইয়ে যাবে, কী যাবে না এব্যাপারে কখনও নিজে থেকে মতামত দিতে শুনিনি। কথা প্রসঙ্গে এক-দু’বার হয়তো বলেছেন, এই লেখাটি তোমরা দেখতে পারো। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল তুলনাহীন। মনে পড়ে, ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার কথা তিনিই আমাদের জানিয়েছিলেন। সঠিক কোন সালে তা তাঁর মনে ছিল না। পত্রিকার ফাইল ঘেঁটে আমরা বার করেছিলাম। লেখাটি বেরোয় ১৯৫৪-তে – ‘পশ্চিমবঙ্গ আইনসভা’। প্রসঙ্গত, প্রতিটি খন্ডের মুখবন্ধ লেখার জন্য আমরা বসু’কে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি লিখে দিতেন। প্রথম খন্ডের ভূমিকা লেখেন অনিল বিশ্বাস।

স্বভাবতই এত বড় বইকে সামলানো সহজ কাজ ছিল না। সম্পাদকমন্ডলীর সদস্যরা তো বটেই আরও অনেক মানুষের আন্তরিক সাহায্য ছাড়া কাজ শেষ করা সম্ভব হতো না। আমার বিশেষ করে মনে আছে প্রবীণ সিপিআই(এম) নেতা সমর মুখার্জি’র কথা। বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখা, নথি তিনি দিয়েছিলেন। এত যত্ন করে সেগুলি তিনি রক্ষা করেছিলেন! বসু’র বিধানসভায় প্রদত্ত ভাষণগুলি সংগ্রহে দিলীপ ব্যানার্জির বিশেষ ভূমিকাও ভোলার নয়। দিলীপদা এখন জীবিত নেই। প্রয়াত হয়েছেন। ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে জরুরী কিছু নথি দিয়েছিলেন মুরারী মিত্র। ‘যুবমানস’ পত্রিকার সম্পাদক সৌমিত্র লাহিড়ী বেশ কয়েকটি লেখা সংগ্রহ করে দেন। অধ্যাপক সুস্নাত দাশ’ও কিছু লেখার হদিশ দিয়েছিলেন। লেখা সংগ্রহ থেকে সম্পাদনার অনেক খুঁটিনাটি সমস্যা সামলানোতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন সোমনাথ ভট্টাচার্য। এক কথায় প্রচ্ছদ পরিকল্পনা ও রূপায়নের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী রবীন দত্ত।

লেখা সংগ্রহের জন্য ‘গণশক্তি’ দপ্তরে অবস্থিত মুজফফর আহমদ পাঠাগার প্রত্যাশিতভাবেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রদোষ বাগচি, রামদাস বিশ্বাস প্রভূত সাহায্য করেছেন। প্রদোষ বাগচি পাঁচ খন্ডের নির্ঘন্ট তৈরি করে দেন। নির্বাচিত রচনাসংগ্রহে মূল্যবান সংযোজন।

রচনা সংগ্রহের পাঁচটি খন্ডেরই মূল্য বাড়িয়েছে মূল্যবান ফটোগ্রাফগুলি। বসু সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় সবচেয়ে মূল্যবান ফটোর সংকলন রচনাসংগ্রহেই রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ফটো পেয়েছিলাম টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র প্রবীণ ফটোগ্রাফার মোনা চৌধুরীর কাছ থেকে। বেশ কয়েকটি পুরোনো ফটো দিয়েছিলেন অলোক গুহ। এছাড়াও ফটো পেয়েছি রাহুল চট্টোপাধ্যায়, মলয় ঘোষ, ‘গণশক্তি’র ফটোগ্রাফার শ্যামল বসু, অমিত কর, অচ্যুত রায়, ন্যাশনাল বুক এজেন্সির অশোককমল বসু’র কাছ থেকে। শ্রীমতি সুপ্রিয়া আচার্য দিয়েছিলেন বেশ কয়েকটি মুল্যবান ফটো।

যেসব পত্রপত্রিকা থেকে বসু’র লেখা এবং সাক্ষাৎকার সংগৃহীত হয় তার মধ্যে রয়েছে ‘জনযুদ্ধ’, ‘স্বাধীনতা’,‘গণশক্তি’ ‘পরিচয়’, ‘নন্দন’, ‘দেশহিতৈষী’, ‘পিপলস ডেমোক্র্যাসি’, ‘শ্রমিক আন্দোলন’, ‘দেশ’, ফ্রন্টলাইন, ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ ইত্যাদি। ‘গণশক্তি’ এবং ‘দেশহিতৈষী’ থেকেই সবচেয়ে বেশি।

বসুর বেশ কিছু ভাষণ ও লেখা ইংরাজী থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে হয়। প্রসঙ্গত, বিধানসভায় মোটামুটিভাবে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত বসু ভাষণ দিতেন ইংরাজীতেই। দ্বিতীয় বিধানসভা থেকে ভাষণ দিতেন মূলত বাংলায়। ফলে অনুবাদ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে সাহায্য করেন। অনুবাদের কাজে যুক্ত ছিলেন কাবেরী বসু, সান্ত্বন চট্টোপাধ্যায়, মৌলিশ্রী চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত দাশগুপ্ত, সুবোধ বসু প্রমুখ। প্রসঙ্গত, বিধানসভায় প্রদত্ত বসু’র ভাষণের এক মূল্যবান সংগ্রহ পাঁচ খন্ডে পাঠক পাবেন।

জ্যোতি বসু রচনা সংগ্রহের প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় ২০০২ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে। ২০০৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত হয় পঞ্চম এবং শেষ খন্ড। প্রথম খন্ডের সময়সীমা ১৯৪২ থেকে ১৯৬৬ সাল। মোট ৩৩টি লেখা প্রথম খন্ডে সংকলিত হয়। দ্বিতীয় খন্ডের সময়সীমা ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭৭ সালের নির্বাচন পর্যন্ত। ৩৬টি লেখা দ্বিতীয় খন্ডে সংকলিত হয়। ১৯৭৭ সালে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার দায়িত্বভার নেবার পর থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সময়সীমা কভার করা হয়েছে তৃতীয় খন্ডে। এই সময়পর্বে সংকলিত হয়েছে ৪০টি লেখা। চতুর্থ খন্ডের সময়সীমা ১৯৮৫ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত। মোট ৪৩টি লেখা এই খন্ডে সংকলিত হয়েছে। পঞ্চম এবং শেষ খন্ডের সময়সীমা ১৯৯৩ থেকে ২০০৫। এই খন্ডে রয়েছে বসুর ৪৪টি লেখা। ১৯৪২ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত তেষট্টি বছর সময়সীমায় মোট ১৯৬টি লেখা/ ভাষণ। বছরে গড়ে ৩.১টি লেখা/ ভাষণ। সত্যি কথা বলতে কি, বসু’র মতো ব্যক্তিত্বের জীবন ও ভাবনার পূর্ণ প্রতিফলনের জন্য পাঁচ খন্ডও যথেষ্ট নয়। এতে আংশিক প্রতিফলন হতে পারে।

তবে প্রায় কুড়ি বছর পরও, একথা বোধহয় বলা যায়, বসু’র রাজনৈতিক জীবন এবং বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে চর্চায় রচনাসংগ্রহের পাঁচ খন্ড অপরিহার্য।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in