Bangladesh: আইএমএফ'র ঋণসহায়তা পেতে শর্তের বেড়াজালে আটকা পড়ছে বাংলাদেশ

দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকে ডলার সংকট, প্রবাসী আয় কমা, নিম্নমুখী রিজার্ভ, ব্যাপক অর্থ পাচার, উধ্বমুখী ঋণ খেলাপি, রপ্তানি আয়ে ধস সহ নানা দিক থেকে চাপের মুখে বাংলাদেশের অর্থনীতি।
আইএমএফ
আইএমএফ ফাইল ছবি সংগৃহীত

চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছ থেকে মোট সাড়ে ৪ বিলিয়ন বা ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণসহায়তার আবেদন করেছে বাংলাদেশ। যা বাংলাদেশী মুদ্রায় ৪২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার মতো (প্রতি ডলার ৯৫ টাকা ধরে)। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকগুলোয় ডলার সংকট, প্রবাসী আয় কমে যাওয়া, নিম্নমুখী রিজার্ভ, ব্যাপক অর্থ পাচার, উধ্বমুখী ঋণ খেলাপি, রপ্তানি আয়ে ধস সহ নানা দিক থেকে চাপের মুখে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

এমন পরিস্থিতিতে ঋণ চেয়ে গত জুলাইয়ে আইএমএফের কাছে ঋণসহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। সেই ঋণসহায়তার বিষয়ে আলোচনা করতেই গত ২৬ অক্টোবর সংস্থাটির এশীয় ও প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বাধানী ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে। প্রতিনিধিদলটি গত ২৬ অক্টোবর থেকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করছে। যা চলবে আগামী ৯ নভেম্বর পর্যন্ত। ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিদ্যুৎ বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে বৈঠক করেছে তারা।

বাংলাদেশ এর আগে আইএমএফ থেকে মোটা চারবার ঋণসহায়তা নিয়েছিল। প্রথমবার ঋণ নেওয়া হয় ১৯৯০-৯১ সময়ে। এর পর ২০০৩-২০০৪, ২০১১-১২ এবং সর্বশেষ ২০২০-২১ সালে সংস্থাটি থেকে ঋণ নেয় বাংলাদেশ। তবে কোনোবারই ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটি ডলার ছাড়ায়নি। এবারই অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সাড়ে ৪ বিলিয়ন বা ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণসহায়তার আবেদন করেছে বাংলাদেশ।

সদস্য হিসেবে আইএমএফ থেকে বাংলাদেশ বছরে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ পাওয়ার যোগ্য। ফলে বর্ধিত ঋণ সহায়তা (ইসিএফ), বর্ধিত তহবিল সহায়তা (ইএফএফ) এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলার জন্য গঠিত সহনশীলতা ও টেকসই তহবিল (আরএসএফ)-আইএমএফের এই তিন কর্মসূচি থেকে আলাদা করে ঋণ চাওয়া হয়েছে। ইসিএফ থেকে নেওয়া ঋণে সুদ ও মাশুল দিতে হয় না। ১০ বছর মেয়াদি এ ঋণ পরিশোধে সাড়ে ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ডও রয়েছে। বাকি দুটি তহবিল থেকে দেওয়া ঋণের সুদহার ১ দশমিক ৫৪ থেকে ১ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ শুধু আইএমএফ নয়; বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানের সাহায্য সংস্থা জাইকার কাছ থেকেও বাজেট সহায়তার জন্য ঋণ নেবার আবেদন করেছে। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগসহ (ইআরডি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এডিবির সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের বাজেট–সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

'আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ পেলে অর্থনীতিতে স্বস্তি আসবে কি না' সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, 'আমার পকেটে ১০০ টাকা আছে, কেউ আরও ১০ টাকা দিলে কিছুটা ভালো লাগবে। তেমনি আইএমএফের ঋণেও কিছুটা সাময়িক স্বস্তি মিলবে।'

তবে গত জুলাইয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইএমএফের কাছে ঋণ সহায়তা চেয়ে চিঠি দিলেও প্রথমে সরকারের পক্ষ থেকে তা স্বীকার করা হয়নি। সেই সময় বাংলাদেশে সরকারের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আইএমএফ'সহ কোনো ধরনের বিদেশী সংস্থার কাছে ঋণ চাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেছিলেন, 'আইএমএফের কাছে কোনো ঋণ চায়নি বাংলাদেশ। তবে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব আসলে আমাদের প্রয়োজন থাকলে সেটি বিবেচনা করা হবে। কিন্তু আপাতত আমাদের ঋণের প্রয়োজন নেই।'

কিন্তু সপ্তাহ না ঘুরতেই অর্থমন্ত্রী নিজেই আইএমএফের কাছে ঋণ চাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছিলেন। যার ফলে শুরু থেকেই আইএমএফের কাছে ঋণসহায়তা চাওয়া নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সঠিক তথ্য নিয়ে লোকচুরির অভিযোগ রয়েছে।

আইএমএফের ঋণ সহায়তা পেতে বাংলাদেশকে মানতে হবে বেশ কিছু শর্ত এবং আর্থিক খাতে বেশ কিছু সংস্কারও আনতে হবে। এক দশক আগে আইএমএফ থেকে সাত কিস্তিতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার বর্ধিত ঋণসহায়তা (ইসিএফ) নিয়েছিল বাংলাদেশ। বিপরীতে অন্যতম শর্ত ছিল ভ্যাট আইন করা। সংস্থাটির কাছে এবার ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণের আবেদনের প্রেক্ষিতে বেশ কিছু নতুন শর্ত দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকে। এইসাথে আর্থিক খাতে বড় ধরনের কিছু সংস্কারের প্রস্তাবও দিয়েছে।

আইএমএফ'র সংস্কার প্রস্তাব ও শর্তগুলো বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান কতটা দিতে পারবে তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মাঝে আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছে চলমান অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণে আইএমএফ যেসব সংস্কার প্রস্তাব ও শর্ত দিচ্ছে সেগুলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতে চলমান নানা অনিয়ম বন্ধে সহায়ক হলেও বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব সংকটকে আরো ঘনীভূত করতে পারে।

আইএমএফ'র সংস্কার প্রস্তাব:

বাংলাদেশ সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঋণসহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে বর্তমানে দেশটির অর্থনৈতিক নীতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু সংস্কার আনার কথা বলছে। গত ২৬ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সাথে তিনটি আলাদা বৈঠক করেছে সফররত আইএমএফের প্রতিনিধিদল। সেসব বৈঠকেই বিভিন্ন খাতে দেওয়া বাংলাদেশ সরকারের ভর্তুকি কমানোসহ আইএমএফের চাওয়াগুলো উঠে এসেছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পক্ষ থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সংস্কার চেয়েছে। এই সংস্কারের মানে হচ্ছে ভর্তুকি কমানো। সংস্থাটি এ ব্যাপারে সরকারের কাছে সময়বদ্ধ পরিকল্পনা চেয়েছে। এ ছাড়া লোকসানি বড় বড় যেসব সংস্থাকে ভর্তুকি দিয়ে চালিয়ে রাখা হয়, সেগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে।

সফররত দলটি সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দ থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের প্রকৃত খরচের প্রবণতা জানতে চেয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলসহ বিদ্যুৎ, সার ও গ্যাসে দেওয়া ভর্তুকি এবং লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মোট ৮২ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রেখেছে সরকার। ভর্তুকির বেশির ভাগই জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের জন্য রাখা। ভর্তুকিকে ‘ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা’ বলে থাকে আইএমএফ। ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় নগদ ঋণ নামে একটি অধ্যায় রয়েছে, যা শেষ বিচারে ভর্তুকিই। এ ঋণ দেওয়া হয়ে থাকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ইত্যাদি সংস্থাকে। কিন্তু বিপিসি ও পিডিবি সরকারকে তা ফেরত দেয় না।

বৈঠকের একটি সূত্র জানায়, বেসরকারি খাত থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রি করার জন্য পিডিবিকে ঋণ দেয় সরকার। এ ঋণও ভর্তুকি। কারণ, সরকার তা ফেরত পায় না। আইএমএফের প্রতিনিধিদল এ ব্যাপারে সংস্কার আনার পরামর্শ দিয়েছে। এসব ঋণ আদায় করার কথা বলে আইএমএফ ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের ভর্তুকি কমাতে হলে দাম বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে গত আগস্টে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে ৪২ থেকে ৫২ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটার প্রতি ৮০ টাকা থেকে ১১৪ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই দাম বৃদ্ধির হার প্রায় ৪২ শতাংশ। লিটার প্রতি পেট্রলের দাম ৮৬ টাকা থেকে ১৩০ টাকা করা হয়েছে। অকটেনের দাম বেড়েছে ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা। অর্থাৎ পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে মূল্য বৃদ্ধির হার ৫০ শতাংশেরও বেশি।

অন্যদিকে ডলার সংকটের কারণে বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। গত ২৩ অক্টোবরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই ইলাহী চৌধুরী বলেছেন, 'বর্তমানে রিজার্ভে যে টান পড়েছে, তাতে বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানির অবস্থা নেই।'

জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে শিল্পোৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। গত কয়েক মাসে ২২টি শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ২৭টি রয়েছে বন্ধ হওয়ার পথে। ডলারের উচ্চ দাম ও সংকটের কারণে মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীরা চাপে রয়েছে। এতে খরচ বাড়ায় অনেক ব্যবসায়ী তাঁদের ব্যবসা সংকুচিত করে ফেলছেন। আবার চাহিদামতো আমদানি ঋণপত্রও খুলতে পারছেন না। ডলার নেই বলে অপারগতার কথা জানিয়ে দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। ঋণপত্র খুলতে না পেরে সংকটে পড়েছেন তাঁরা। ফলে শিল্পের মূলধনী যন্ত্র, কাঁচামাল, খাদ্যসহ অতিগুরুত্বপূর্ণ অনেক আমদানি কমে গেছে। শিল্পের মূলধনি যন্ত্র ও কাঁচামাল আমদানি কমে গেলে অর্থনীতির গতি কমে আসে।

এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বন্ধ করে দেয়া মানে জ্বালানিসহ গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। ফলে শিল্পোৎপাদন থেকে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়বে। 

অন্যদিকে, আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব মেনে সারের ভর্তুকি কমানো হলে বা বন্ধ করলে তার প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদনে। গত আগস্ট মাসে ইউরিয়া সারের দাম কেজি প্রতি ৬ টাকা বাড়িয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। যার ফলে চলতি আমন ও পরবর্তী বোরো মৌসুমে চাল উৎপাদনে কৃষকের এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা খরচ বেড়ে যায়। এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে চাল উৎপাদনে।

একদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অন্যদিকে সারসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যহত হওয়ার শঙ্কা করছে কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

১০টি সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের প্রস্তাব:

অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে টানা লোকসানের মুখে রয়েছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ১০টি প্রতিষ্ঠান।

বিদায়ী অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ১০টি প্রতিষ্ঠানের লোকসান পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড'র (পিডিবি) পাশাপাশি লোকসানি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি), বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থা (বিসিআইসি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিসি), বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি), বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)।

যথাযথ পরিচালনার অভাবে সরকারি এই প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছে আর তা মেটানো হচ্ছে জনগণের করের টাকায়। আইএমএফের প্রতিনিধিদল বলেছে, এ লোকসান কমিয়ে আনার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে এবং ধীরে ধীরে এদের কয়েকটিকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়াটাই ভালো হবে।

বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির ফলে বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের দরিদ্র পরিবারের মানুষ কষ্ট অনেক বেড়েছে। গত ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্ব খাদ্যবিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক জরিপভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ খাবার কিনতে হিমশিম খাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সারাদেশের নিম্ন আয়ের ২ কোটি পরিবারকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে নিত্য খাদ্য পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফের সংস্কার পরামর্শ মেনে টিসিবিতে সরকারি ভর্তুকি বন্ধ করে দিয়ে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে নিম্ন আয়ের ২ কোটি পরিবারের খাদ্য সরবরাহ হুমকির মুখে পরবে।

এছাড়াও রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়ন করা, রাজস্ব সংগ্রহ কার্যক্রমকে গতিশীল করা, কর সংগ্রহের হার বৃদ্ধি, সুদের হার বৃদ্ধি, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সাথে মুদ্রস্ফীতির গরমিল হিসাব সংশোধন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতি, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনাসহ বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।

সংকট মোকাবিলায় শর্ত মেনেই ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ:

চলমান নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় রিজার্ভ সংকট কাটাতে আইএমএফের শর্ত মেনেই ঋণ নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। যদিও ঋণ পাওয়ার বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। তবে ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহারের প্রতি জোর দিচ্ছে বিশ্লেষকরা।

এবিষয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সিরডাপের পরিচালক (গবেষণা) ড. মোহামম্মদ হেলাল উদ্দিন  বলেন, 'আইএমএফ যে শর্তই দিক না কেন ওই শর্তগুলো নিয়ে দর কষাকষির মতো অবস্থানে বাংলাদেশের অর্থনীতি নেই। তাই বাংলাদেশকে ঋণ নিতেই হচ্ছে।'

ড. হেলাল উদ্দিন আরো বলেন, 'অতীতে ঋণ এবং দেশীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার হয়নি বলেই তো এখন অর্থনীতির এই খারাপ অবস্থা। উন্নয়ন প্রকল্পসহ নানা খাতে প্রকৃত খরচের চেয়ে শতকরা ৩০ ভাগ বেশি খরচ করা হয়েছে। সেটা যদি না করা হতো তাহলে অর্থনীতির তো এই অবস্থা হতো না। সামনে মন্দা বা দুর্ভিক্ষের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সরকারের তো মানুষকে তার ফান্ড থেকে খাওয়ানোর সক্ষমতা নেই। তাই সরকারকে এবার ঋণ সঠিকভাবে খরচ করতে হবে। মিতব্যয়ী হতে হবে। দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।'

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সামেন) এর নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, 'আইএমএফের কাছ থেকে গত এক দশকে সরকার কোনো ঋণ নেয়নি। এবার কেন বড় ধরনের ঋণ নিতে হচ্ছে। কারণ অর্থনীতি চাপের মুখে আছে। রিজার্ভ সংকট কাটাতে এবং বাজেট সহায়তার জন্য এই ঋণ নিতেই হবে।”

ঋণের সঠিক ব্যবহার না হলে সংকট আরো বাড়বে উল্লেখ করে ড. সেলিম রায়হান বলেন, 'বাংলাদেশের বৈদেশি ঋণ বাড়ছে সত্য কিন্তু সংকটজনক জায়গায় যায়নি। তবে ২০২৬ সালের পর প্রতি বছর বাংলাদেশকে চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলার সুদ সহ ঋণ ফেরত দিতে হবে। তখন একটা চাপ সৃষ্টি হবে। তাই ঋণ যদি সঠিকভাবে ব্যবহার না হয় তাহলে সংকট হবে।'

- লেখক পিপলস রিপোর্টারের বাংলাদেশ প্রতিনিধি

আইএমএফ
IMF: ২০২৩-এ বিশ্বজুড়ে আরও ঘনীভূত হবে আর্থিক সঙ্কট? কী জানাচ্ছে আইএমএফ?

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in