Bangladesh: বিজয়ের ৫০ বছরে বাংলাদেশ

ধর্মকে বর্ম করে দীর্ঘ ২৩ বছর পূর্ব-পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামাজিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।
Bangladesh: বিজয়ের ৫০ বছরে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বিজয় দিবসের প্যারেড ছবি অরিন্দম বাগচীর ট্যুইটার হ্যান্ডেলের সৌজন্যে

‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়।’ মানুষ জন্মগতই স্বাধীন। পরাধীনতার শৃঙ্খল পরিয়ে তাকে বেঁধে রাখা যায় না। বেঁধে রাখা যায়নি বাংলাদেশের বাঙালি জনগোষ্ঠীকেও। প্রায় দু’শ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তি হয় ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টে। জন্ম নেয় পাকিস্তান নামের একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। ধর্মকে ভিত্তি করে পাকিস্তানের শোষণ-শাসন চলতে থাকে পাকিস্তানের অপর অংশে তথা পূর্ব-পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ)। ধর্মকে বর্ম করে দীর্ঘ ২৩ বছর পূর্ব-পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামাজিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।

প্রথম আঘাত আসে বাঙালির ভাষার উপর। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের জন্য প্রাণ দেয় বাঙালি জনগোষ্ঠী। যে বাঙালি মুসলিম সমাজ এক সময় স্লোগান দিয়েছিল, ‘হাত মে বিড়ি মুখ মে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ তাদের মোহভঙ্গ হয়। ১৯৫৪ সালে কোনো ধরণের যৌক্তিক কারণ ছাড়াই পাকিস্তানের ঐক্য, সংহতি ও ইসলাম রক্ষার নামে যুক্ত ফ্রন্টের প্রাদেশিক মন্ত্রী পরিষদ ভেঙে কেন্দ্রের শাসন জারি করা হয়। স্বপ্নের পাকিস্তানে নিজেদের কোনো অধিকারই রক্ষিত নয় তা বাঙালি জনগোষ্ঠী আবারও বুঝতে পারে। প্রথমে ভাষার উপর আঘাত তারপর রাজনৈতিক অধিকার হরণ।

ধর্মকে বর্ম করে দীর্ঘ ২৩ বছর পূর্ব-পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, সামাজিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়।

ক্রমাগত আঘাতের চূড়ান্ত পরিণতি হয় ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসন। গোটা পাকিস্তানের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়। বাঙালি জনগোষ্ঠীর ভাষা, রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর আঘাতের পর শুরু হয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপরে আঘাত। সেটা আসে প্রথমে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের মধ্য দিয়ে এবং বাংলা বর্ণমালা পরিবর্তনের উদ্যোগের মাধ্যমে।

এরপর নিষিদ্ধ করা হয় রবীন্দ্র সংগীত, পাল্টে দেওয়া কবি নজরুলের কবিতায় ব্যবহৃত হিন্দি ও সংস্কৃত শব্দ। ‘সজীব করিব মহা-শশ্মান’ পাল্টে লেখা হয় ‘মহা গোরস্থান’। এসবের বিরুদ্ধে পূর্ব-বাংলা বাঙালি জনগোষ্ঠী নিজেদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্মুন্নত রাখার জন্য আবারও আন্দোলনের আশ্রয় নেয় তারা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬২ সালে হয় শিক্ষা আন্দোলন। ’৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্রদের তুমুল আন্দোলনের মুখে তৎকালীন আইয়ুব খানের সরকার শরিফ খান শিক্ষা কমিশন বাতিল করে এবং সাংস্কৃতিক নানাবিধ নিষেদ্ধাজ্ঞা ও বাংলা ভাষা সংস্কারের মতো উদ্যোগও ব্যর্থ হয় ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে।

নিষিদ্ধ করা হয় রবীন্দ্র সংগীত, পাল্টে দেওয়া কবি নজরুলের কবিতায় ব্যবহৃত হিন্দি ও সংস্কৃত শব্দ। ‘সজীব করিব মহা-শশ্মান’ পাল্টে লেখা হয় ‘মহা গোরস্থান’।

বাঙালির জাগরণের আরেক টার্নিং পয়েন্ট হচ্ছে ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক লাহোরে পূর্ব-পাকিস্তানসহ পাকিস্তানের অন্যান্য সকল প্রদেশগুলোর জন্য উত্থাপিত ৬ দফা দাবি। সেই ৬ দফাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরেক গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়। ৬ দফা হয়ে উঠে বাঙালির মুক্তির সনদ। ১৯৬৬ সাল থেকে চলে ছ’দফা বাস্তবায়নের আন্দোলন। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ‘ষড়যন্ত্র’ মামলা এবং জেলখানায় সেই মামলায় অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন দানা বাঁধে। শুরু হয় গণ-অভ্যুত্থান। আওয়ামী লীগের ৬ দফা দাবির সাথে ছাত্র সমাজের তথা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা ভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যে শুরু হয় ১৯৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান। বিদায় নিতে হয় আইয়ুব খানকে। ক্ষমতা গ্রহণ করেন ইয়াহিয়া খান। মুক্তি দেওয়া হয় জেলে বন্দি আগরতলা মামলাসহ অন্যান্য সকল রাজবন্দীদের। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে পূর্ব-পাকিস্তানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ। মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি নির্বাচনে অংশ নেয়নি।

আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। এককভাবে স্থগিত করা হয় ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি। পূর্ব-বাংলা মানুষের মাঝে শুরু হয় বিক্ষোভ। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ৭ মার্চের ভাষণের পর সেই আন্দোলন মোড় নিতে থাকে স্বাধীনতার দিকে। ২৫ মার্চ রাতে শুরু হয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর উপরে ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা। শুরু হয় বাঙালিদের সম্মিলিত প্রতিরোধ যুদ্ধ। প্রথমে বিদ্রোহ করে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের বাঙালি পুলিশ সদস্যগণ। চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে। এভাবে গাজীপুরে, যশোরেসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাঙালি সেনা সদস্যরা বিদ্রোহ করে। অপ্রস্তুত অবস্থায় পাকিস্তানিদের গণহত্যার মুখে বাঙালি জনগোষ্ঠীর এক কোটি লোক আশ্রয় নেয় পার্শবর্তী দেশ ভারতে। সরকার গঠন, পরিচালনা ও মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক কাজক্রমও পরিচালিত হয় ভারতে থেকে, ভারত সরকারের সহায়তায়। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। এককভাবে স্থগিত করা হয় ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি। পূর্ব-বাংলা মানুষের মাঝে শুরু হয় বিক্ষোভ। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন।

স্বাধীন দেশের সংবিধান তৈরি হয় ১৯৭২ সালে। একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর সেই সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়। স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই একটি সংবিধান তৈরির কাজ শেষ হয়। সেই সংবিধানে মূলনীতি করা হয় গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে। সংবিধানের এই মূলনীতি গ্রহণ করা হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকার যে ঘোষণাপত্র অনুযায়ী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে এবং ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তা ছিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান। সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার কতটা প্রতিষ্ঠা হয়েছে তাই হচ্ছে মূল প্রশ্ন।

বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ কোনো গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় নেই। গত দশ বছর ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত জনগণের ভোটাধিকার ও জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘনের দ্বায়ে বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিকভাবে সমালোচিত। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের যে সাম্যের কথা বলা হয়েছিল তা কেবলই স্বপ্ন। বিশ্বে অতি ধনী বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ সবার উপরে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে এখনও দেশে সরকারি হিসেবেই আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করছে। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক হলেও ১৯৭৭ সাল থেকে নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি মেনে দেশ পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৭৯ সালে সংবিধান থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমার সমাজতন্ত্রকে বাদ দেন। পরবর্তীতে ২০১১ সালে আবারও তা প্রতিস্থাপিত হলেও বাংলাদেশ কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশ নয়।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে এখনও দেশে সরকারি হিসেবেই আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করছে। সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক হলেও ১৯৭৭ সাল থেকে নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি মেনে দেশ পরিচালিত হচ্ছে।

এছাড়াও দেশের বিভিন্ন আদিবাসী, উপজাতি ও নৃ-গোষ্ঠীর মানুষজন তাদের বেঁচে থাকা, জীবিকা উপার্জন ও নিজেদের ভূমির অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করছে। তাদের জাতিসত্বার পরিচয় পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এক সময় যে গণতান্ত্রিক ও বহুদলীয় রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে জন্য এই দেশের মানুষ জীবন দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিল এখন সেই দেশেই গণতন্ত্র ও ভিন্নমত চর্চা এক রকম নিষিদ্ধ প্রায়। দেশে চলছে একদলীয় শাসন। স্বাধীনতার ৫০ বছরে অপ্রাপ্তির হিসেব ঢেড় বড়। প্রাপ্তিও অনেক রয়েছে। দারিদ্র নিরসন, ক্ষুধা মুক্তি, মাতৃ ও শিশু মৃত্যু, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষার হারসহ বেশ কিছু সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ঈর্ষণীয়।

এক সময় যে বাঙালি মুসলিমরা ‘হাত মে বিড়ি মুখ মে পান, লাড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগান দিয়ে ছিল এবং পাকিস্তান সৃষ্টিতে সবচে বেশি ভূমিকা রেখেছিল সেই বাঙালি জনগোষ্ঠীই মাত্র ২৩ বছরের মধ্যেই পাকিস্তানের শাসনের নাগপাশ ছিন্ন করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পর সুগম করে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে পর সেই পথ অনেক জরাজীর্ণতায় পরিণত হলেও সম্ভাবনার অবারিত প্রান্তর এখন পুরোটাই পড়ে আছে। নতুন প্রত্যয়ে নতুন করে শুরু করাই এখন কাজ।

বাংলাদেশ বিজয় দিবসের প্যারেড
Bangladesh: অরাজকতা সৃষ্টিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে সরকার - শেখ হাসিনা

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in