

মায়ের ইচ্ছেকে মর্যাদা দিয়ে মৃত্যুর পর তাঁর চোখ দান করেছিলেন তাঁর বিজ্ঞানমনস্ক ছেলে। কিন্তু তাঁর মহৎ কাজের ফলে সপরিবারে তাঁকে গ্রেফতার করা হল। পুলিশের এই ভূমিকায় প্রবল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনবিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মীরা।
নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর ১ ব্লকের সেনপুর এলাকার বৃদ্ধা রাবেয়া বিবি রবিবার বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে প্রয়াত হন। মৃত্যুর পর তাঁর ইচ্ছানুসারে মরণোত্তর চক্ষুদানের প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত করেন তাঁর পুত্র প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক আমির চাঁদ শেখ। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও এতে অনুমতি ছিল। দু’বছর আগেই রাবেয়া বিবি ‘গণদর্পণ’-র মাধ্যমে মৃত্যুর পর চোখ ও অঙ্গদানের অঙ্গীকার করেছিলেন।
সেই মতো তাঁর মৃত্যুর পরপ্রয়োজনীয় সমস্ত নিয়ম মেনেই কর্নিয়া দানের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়। এবং কয়েকঘণ্টার মধ্যে সেগুলি বহরমপুর মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছে দেওয়া হয়।
সেই সময় রাবেয়া বিবির বাড়িতে এলাকার বহু মানুষ উপস্থিত থাকলেও এই মহৎ কাজ নির্বিঘ্নেই সুসম্পন্ন হয় বলে জানা গেছে। এরপর ধর্মীয় রীতি মেনে দেহ সমাধিস্থ করার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। তখন কিছু স্থানীয় বাসিন্দা কিছু অবান্তর প্রশ্ন তুলে অশান্তি সৃষ্টি করতে থাকে বলে অভিযোগ। উত্তেজনা বাড়তে থাকলে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।
পুলিশ এলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ সম্পূর্ণ পরিস্থিতি পুলিশের কাছে ব্যাখ্যা করে আমির চাঁদের পরিবার। অভিযোগ, সেইসময় পুলিশের সামনেই বিক্ষোভরত উচ্ছৃঙ্খল কয়েকজন আমির চাঁদের পরিবারের উপর চড়াও হয়, চলে ঘরবাড়ি ভাঙচুরও। পুলিশ দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে পরিবারকে রক্ষা করার দোহাই দিয়ে মৃতার ৫ সন্তান (৪ জন মহিলা) সহ ৮/১০ জনকে সঙ্গে করে কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি থানায় যায়। ময়নাতদন্তের দোহাই দিয়ে বার করে নিয়ে যাওয়া হয় মৃতার দেহও।
এরপর প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজপত্র নিয়ে পরিবারের অন্যান্যদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানকর্মীরা থানায় পৌঁছলে, পুলিশ নানা অছিলায় দীর্ঘসময় তাঁদের বসিয়ে রাখে বলে অভিযোগ। পরিবারের তরফে থানায় আটকদের সকলকে ছেড়ে দেওয়া, মৃতার দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া সহ, মারধর ও ঘর ভাঙচুরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিতে উদ্যোগী হলেও, পুলিশ ক্রমশ দেরী করতে থাকে। এইসময় বিশৃঙ্খল সৃষ্টিকারী গ্রামবাসীরা থানায় এসে আমির চাঁদ শেখ ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে মৃতার চক্ষু, কিডনি সহ নানা অঙ্গ চুরির অভিযোগ দায়ের করে।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত এফআইআর দায়ের করে পুলিশ। মধ্যরাতেই আমির চাঁদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়। সোমবার তাঁদের কৃষ্ণনগর কোতোয়ালি আদালতে তোলা হয়। ১২ তারিখ পর্যন্ত জেল হেফাজত হয় তাঁদের। মৃতার দেহও এখনও ছাড়া হয়নি। কলকাতায় ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।
পেশায় শিক্ষক আমির চাঁদ জনবিজ্ঞান ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী, কিশোর বাহিনীর সংগঠক, অঞ্জনা ও জলঙ্গি সহ নদী বাঁচাও কমিটির সংগঠক। রাজনৈতিক ভাবে কংগ্রেস করেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাঁর উপর স্থানীয় তৃণমূল ও মৌলবাদী শক্তির আক্রোশ ছিল।
গোটা ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের রাজ্য সম্পাদক সৌরভ চক্রবর্তী, গণদর্পণ-এর সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত সাহা রায়, বিজ্ঞানকর্মী কিরীটি সাহা প্রমুখ। তাঁদের মতে, মরণোত্তর চক্ষুদানের মত একটি মহৎ কর্মসূচিতে উদ্যোগী এক পরিবার চূড়ান্ত হেনস্তার সম্মুখীন হয়েছে। পুলিশের এই ভূমিকায় মরণোত্তর চক্ষুদান, দেহদান, অঙ্গদানের মতো কর্মসূচি আগামী দিনে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে চরম বাধাপ্রাপ্ত হবে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন