পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন (West Bengal Assembly Election 2026) ঘোষণার পর ২৪ ঘণ্টা কাটলো না। তার মধ্যেই বড়ো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলেন ভাঙড়ের বিতর্কিত তৃণমূল নেতা আরাবুল ইসলাম (Arabul Islam)। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে ইস্তফা দেওয়ার কথা সোমবার নিজেই জানিয়েছেন তিনি। বিধানসভা ভোটের মুখে তাঁর এই পদক্ষেপে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে।
রবিবার নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণা করেছে। আগামী ২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট গ্রহণ হবে। সেই ঘোষণার এক দিনের মধ্যেই আরাবুল ইসলামের দলত্যাগ রাজনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমকে আরাবুল ইসলাম জানান, দলের প্রতি দীর্ঘদিনের অবদান সত্ত্বেও যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি বলেন, “তৃণমূল আরাবুল ইসলামকে চিনতে পারল না। আমি পাঁচ বার কেস খেয়েছি, তিন বার সাসপেন্ড হয়েছি। কীভাবে দল করেছি, সেটা কেউ বুঝল না। তাই মনের দুঃখে তৃণমূল থেকে ইস্তফা দিচ্ছি।”
তিনি আরও দাবি করেন, মমতা ব্যানার্জির (Mamata Banerjee) নেতৃত্বে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। আরাবুল বলেন, “সিঙ্গুরে রোজ ২–৩ গাড়ি করে লোক নিয়ে যেতাম। নন্দীগ্রামে প্রায় ২১ বার গিয়েছি পার্থ চ্যাটার্জির (Partha Chatterjee) সঙ্গে। দু’বার গুলি চলেছিল তাঁর গাড়ির উপর। সেই ভাবে দলটা করেছি।”
দীর্ঘদিন ধরেই ক্যানিং পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লা (Shaukat Molla)-র সঙ্গে আরাবুল ইসলামের দ্বন্দ্ব নিয়ে দলের অন্দরে চাপানউতোর চলছিল। দলবিরোধী কাজের অভিযোগে একাধিকবার তাঁকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় কর্মসূচি থেকেও তাঁকে দূরে থাকতে দেখা যায়। ফলে নির্বাচনের আগে তাঁর দলত্যাগ রাজনৈতিক মহলে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তৃণমূল ছাড়ার পর তিনি কোন দলে যোগ দেবেন, তা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তিনি হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir)-এর নেতৃত্বাধীন আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (AJUP)-তে যোগ দিতে পারেন।
অন্যদিকে অনেকের ধারণা, তিনি নওশাদ সিদ্দিকির (Naushad Siddiqui)-র নেতৃত্বাধীন আইএসএফ-এ যোগ দিতে পারেন।
তবে আরাবুল জানিয়েছেন, তিনি আগে ফুরফুরা শরিফে যাবেন, তারপর পরবর্তী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন।
নওশাদ সিদ্দিকির দাবি, আরাবুল এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূলেই রয়েছেন। যদিও দলের কিছু নেতা-কর্মীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আরাবুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। ২০২৪ সালে ISF-এর এক কর্মীকে খুনের অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। প্রায় সাত মাস জেলে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। এরপর থেকেই শওকত মোল্লার সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে।
তারও আগে আরাবুল ইসলাম প্রথম শিরোনামে আসেন ভাঙড় কলেজের এক অধ্যাপিকার দিকে জগ ছুঁড়ে। ২০১২ সালে ভাঙড় কলেজে ওয়েবকুটার প্রার্থী নির্বাচন ঘিরে দাপুটে নেতা তথা কলেজ পরিচালন সমিতির সভাপতি আরাবুল ইসলামের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন ভূগোলের অধ্যাপক দেবযানী দে। দু’তরফের মধ্যে বচসা চলাকালীন আচমকাই ওই শিক্ষিকাকে লক্ষ্য করে প্লাস্টিকের জগ ছুঁড়ে মারেন আরাবুল ইসলাম। থুতনিতে আঘাত পান অধ্যাপিকা।
এরপর ২০১৪ সালের মার্চ মাসে তিনি আবারও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের নারায়ণপুর হাইস্কুলে ঢুকে এক শিক্ষিকাকে পরীক্ষা চলাকালীন গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ।
রাজনৈতিক জগতে একসময় আরাবুল ইসলামের ত্রাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়। পার্থ চট্টোপাধ্যায়-ই একসময় আরাবুল ইসলামকে 'তাজা নেতা' বিশেষণে বিশেষিত করেছিলেন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভাঙড় কেন্দ্রটি তৃণমূলের হাতছাড়া হয়। সেখানে জয়ী হন ISF নেতা নওশাদ সিদ্দিকি। এবার সেই আসন পুনরুদ্ধার করাই শাসকদলের একমাত্র লক্ষ্য। এই অবস্থায় আরাবুল ইসলামের পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ কোন দিকে যায়, সেদিকেই এখন নজর রাজ্য রাজনীতির। আরাবুল ইসলাম নিজে আইএসএফ-এর দিকে ঝুঁকে আছে মনে করা হলেও অতীতে একাধিকবার আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়েছেন আরাবুল ইসলাম।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন