
"শুধু বাংলায় কথা বলার কারণে সরকার কাউকে বাংলাদেশি বলে ধরে নিতে পারে?" বাংলাভাষী এবং বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী মামলায় কেন্দ্রের সমালোচনা করে এই মন্তব্য করলো সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, দেশের নিরাপত্তার উপরে জোর দেওয়ার সঙ্গে কেবল ভাষার জন্য কাউকে বিদেশি বলার কোনও সম্পর্ক নেই, বিশেষত ভারতের মত বহু ভাষাভাষীর দেশে। এবিষয়ে কেন্দ্রের প্রতিক্রিয়া তলব করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে ভিনরাজ্যে কর্মরত বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের আটক করে পুশব্যাকের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ উঠছে গত কয়েক দিন ধরেই। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সম্প্রতি বীরভূমের আট মাসের এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলা এবং তাঁর পরিবারকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করে পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড। মামলার পক্ষ করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার-সহ অন্যদের।
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চে ছিল মামালার শুনানি। এদিন বিচারপতি বাগচী জানতে চান, একজন ব্যক্তি কোন ভাষায় কথা বলেন, সেটা দিয়ে তাঁর নাগরিকত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কিনা। কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহেতাকে তিনি বলেন, ‘‘আমরা চাই, আপনি পক্ষপাতদুষ্টের অভিযোগ স্পষ্ট করুন— একটি ভাষা দিয়ে কাউকে বিদেশি বলে অনুমান করা হচ্ছে।’’
এরপরেই পরিযায়ী শ্রমিক সংগঠনের আইনজীবি প্রশান্ত ভূষণ জানান, "পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের ভাষা বাংলা। পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলা বলার জন্য সন্দেহের বশে আটক করা হচ্ছে। কোনও পদ্ধতি মানা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক আইন ভাঙা হয়েছে। কাউকে এ ভাবে জোর করে আটক করা যায় না।’’
বীরভূমের ওই পরিবারের কথা উল্লেখ করে আইনজীবী ভূষণ বলেন, ‘‘ওই মহিলা সন্তানসম্ভবা। কোনও প্রমাণ ছাড়া তাঁকে বিদেশি বলে দাগিয়ে দিয়ে জোর করে দেশের বাইরে ঠেলা দেওয়া হয়েছে। কারণ, ওঁরা বাংলায় কথা বলেন। ধরে নেওয়া হচ্ছে, বাংলায় কথা বলেন মানেই বাংলাদেশি। এই ভাবে কী করে কর্তৃপক্ষ কাউকে বিদেশি ঘোষণা করতে পারেন?’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘অনেক সময় বিএসএফ কাউকে সন্দেহ করে ধরছে। বলা হচ্ছে, দৌড়ে ও পারে পালাও। না-হলে গুলি করব।’’
পাল্টা সলিসিটর জেনারেল প্রশ্ন করেন, "এমন কোনও ঘটনা ঘটে থাকলে কোনও ব্যক্তি কেন আদালতে আসছেন না? কেন সংগঠন এসে মামলা করছে? ব্যক্তিগত ভাবে কেউ বলুন। আর ভারত তো অনুপ্রবেশকারীদের রাজধানী হতে পারে না!’’
বিচারপতি বাগচী বলেন, "এখানে দুটি স্পর্শকাতর বিষয় আছে। এক, আমাদের দেশের নিরাপত্তা। সেটা নিয়ে কারও কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না। কিন্তু একই ভাবে মনে রাখতে হবে আমাদের বহু ভাষাভাষীর দেশ ভারত। আমরা সংবাদপত্রের রিপোর্ট ধরে কথা বলছি না। আমরা আবেদন করছি, আপনাদের (সরকার) অবস্থান স্পষ্ট করুক।’’
শুনানি শেষে শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, এফআইআর দায়ের হলে পদক্ষেপ করতে হবে। তবে বাংলার হাজার হাজার মানুষকে আটক করার যে অভিযোগ আসছে, সেই বিষয়ে সাতদিনের মধ্যে কেন্দ্র সরকারের প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। আগামী সেপ্টেম্বরে এই মামলার পরবর্তী শুনানি। এছাড়া ওই পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে করা হেবিয়াস কর্পাস মামলা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চকে শোনার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন