বড়দিনের আগে সোমবার মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরের শক্তিনগর অঞ্চলে খ্রিষ্টানদের এক প্রার্থনাসভায় হামলা চালালো কিছু মানুষ। হামলাকারীদের অভিযোগ, ওই প্রার্থনা সভায় ধর্মান্তরকরণ হচ্ছিল। যদিও অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এর আগে গত শনিবার একইভাবে এই শহরের গোরখপুরে খ্রিষ্টানদের এক অনুষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। যেখানে এক দৃষ্টিহীন মহিলাকে হেনস্থা করতে দেখা যায় এক বিজেপি নেত্রীকে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে (ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি পিপলস রিপোর্টার) বিজেপির শহর সহ সভাপতি অঞ্জু ভারগব এক দৃষ্টিহীন মহিলাকে হেনস্থা করছেন। পরপর এই দুই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দ্য ক্যাথলিক বিশপস’ কনফারেন্স অফ ইন্ডিয়া (CBCI)।
৫৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা গেছে বিজেপি নেত্রী অঞ্জু ওই দৃষ্টিহীন মহিলার মুখ চেপে ধরেছেন এবং হাত মোচড়াচ্ছেন। দৃষ্টিহীন মহিলাকে বলতে শোনা যায়, তাঁকে শারীরিক নিগ্রহের পরিবর্তে তাঁর সঙ্গে অঞ্জু যেন কথা বলেন। যদিও বিজেপি নেত্রী তাঁকে বলেন, পরের জন্মেও তাঁকে দৃষ্টিহীন হয়েই জন্মাতে হবে। এই ঘটনার সময় সেখানে এক পুলিশ কর্মীকে দেখা গেলেও তাঁকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি।
এই ঘটনার প্রতিবাদে সিবিসিআই এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে বিজেপি নেত্রী অঞ্জু ভারগবকে পদচ্যুত করার দাবি জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স অফ ইন্ডিয়া (সিবিসিআই) বড়দিনের মরসুমে আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিস্টানদের উপর হামলার উদ্বেগজনক বৃদ্ধিতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে এবং এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। এই লক্ষ্যবস্তু করে চালানো ঘটনাগুলো, বিশেষ করে শান্তিপূর্ণ ক্যারল গায়ক এবং গির্জায় প্রার্থনার জন্য সমবেত হওয়া মানুষের বিরুদ্ধে সংঘটিত হামলার ঘটনা, ভারতের সংবিধানের ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা এবং ভয় ছাড়াই জীবনযাপন ও উপাসনা করার অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে।”
ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “সিবিসিআই মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরের একটি ভাইরাল ভিডিও দেখে বিশেষভাবে মর্মাহত হয়েছে, যেখানে বড়দিনের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া একজন দৃষ্টিহীন প্রতিবন্ধী নারীকে বিজেপি নগর সহ-সভাপতি অঞ্জু ভার্গব প্রকাশ্যে গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে হেনস্থা করেছেন। এছাড়াও দেশবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা বড়দিনের অনুষ্ঠান ব্যাহত করার খবরও পাওয়া গেছে। এই ধরনের জঘন্য ও অমানবিক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে, সিবিসিআই ভারতীয় জনতা পার্টি থেকে অঞ্জু ভার্গবকে অবিলম্বে বরখাস্ত করার দাবি জানাচ্ছে। একইভাবে উদ্বেগজনক ছত্তিশগড়ে বিদ্বেষপূর্ণ ডিজিটাল পোস্টার প্রচার, যেখানে কথিত আছে যে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ২৪শে ডিসেম্বর বনধের ডাক দেওয়া হয়েছে, যা উত্তেজনা বাড়াতে এবং আরও হিংসা উস্কে দিতে পারে।”
বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এই ধরণের ঘটনায় ব্যবস্থা নেবার আবেদন জানিয়ে বলা হয়েছে, "সিবিসিআই এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার উভয়কেই ঘৃণা ও হিংসা ছড়ানো সমস্ত ব্যক্তি ও সংগঠনের বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে। সিবিসিআই মাননীয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী অমিত শাহজীর কাছে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করছে যে, তিনি যেন আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য সক্রিয় সুরক্ষা নিশ্চিত করেন, যাতে আমাদের প্রিয় দেশজুড়ে নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে বড়দিনের আনন্দময় উৎসব উদযাপিত হতে পারে।"
এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে এক বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন, "জবলপুরের ঘটনাটি, যেখানে একজন বিজেপি নেতা বড়দিনের এক অনুষ্ঠানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীদের গালিগালাজ ও লাঞ্ছিত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই ধরনের আচরণ নৈতিক, আইনি এবং সামাজিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে এক গুরুতর ব্যর্থতার প্রতিফলন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের হয়রানি করা এবং ধর্মীয় কারণে নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা আমাদের সাংবিধানিক চেতনার মূলে আঘাত হানে। দুঃখজনকভাবে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আরএসএস-বিজেপি বহু দশক ধরে যে ধারা অনুসরণ করে আসছে, তারই একটি অংশ। দিল্লিতে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই ধরনের কাজ নির্বিচারে করা হচ্ছে। আমি দাবি জানাচ্ছি যে সরকার এই বৈষম্যের অবসান ঘটাক এবং প্রত্যেক ভারতীয়কে সেই ন্যায্যতা, মর্যাদা ও সমতার সাথে বিবেচনা করুক, যা আমাদের প্রত্যেকের প্রাপ্য।"
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন