

৪ শ্রমকোড বাতিল সহ ১১ দফা দাবিতে দেশ জুড়ে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের যৌথ মঞ্চের ডাকা ধর্মঘটে বড়ো সংখ্যায় শ্রমজীবী মানুষ অংশ নিলেন। এদিনের ধর্মঘটে শ্রমিকদের পাশাপাশি অংশ নিয়েছিলেন কৃষকরাও। বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের যৌথ মঞ্চ সংযুক্ত কিষাণ মোর্চাও এদিনের ধর্মঘটে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় এবং ভারত মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা করে।
বৃহস্পতিবারের ধর্মঘট সফল বলে জানিয়েছে সিপিআইএম পলিটব্যুরো। এক বিবৃতিতে সিপিআইএম-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজকের সর্বভারতীয় ধর্মঘট ঐতিহাসিক। বড় সংখ্যায় শ্রমজীবীরা এই ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ, পিকেটিং-এ বহু শ্রমজীবী মানুষ যোগ দিয়েছেন এবং সংহতি জানিয়েছেন। সংগঠিত এবং অসংগঠিত দুই ক্ষেত্রেই শ্রমিকরাই যোগ দিয়েছেন ধর্মঘটে। এদিন ধর্মঘটে যোগ দিয়েছেন কৃষক এবং খেতমজুররাও। পলিটব্যুরো আরও জানিয়েছে, শ্রম কোডের বিরোধিতার পাশাপাশি মনরেগা বাতিল করার প্রতিবাদেও এদিন শামিল হয়েছেন কৃষিজীবীরা।
বিবৃতিতে পলিটব্যুরো আরও জানিয়েছে, "সরকারের উচিত অবিলম্বে চারটি শ্রম কোডের বিজ্ঞপ্তি বাতিল করা এবং শ্রমিকদের কষ্টার্জিত অধিকার সুরক্ষিত ও নিশ্চিত করা। VB-GRAMG আইন বাতিল করা, বিদ্যুৎ বিতরণের বেসরকারীকরণের প্রস্তাব প্রত্যাহার করা এবং বীজ বিলও প্রত্যাহার করা। এছাড়াও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সাথে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) এবং বাণিজ্য চুক্তি থেকে তাদের সরে আসা উচিত, কারণ এগুলি ভারতীয় শ্রমিক, কৃষক এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর।"
ধর্মঘটের দিন এক বিবৃতিতে সিআইটিইউ সাধারণ সম্পাদক এলামারাম করিম জানিয়েছেন, ২০০০-এরও বেশি জায়গায়, হাজার হাজার শ্রমিক, কৃষক, কৃষি ও গ্রামীণ শ্রমিকরা বিশাল সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছে। যা এই ধর্মঘটকে ভারতের বৃহত্তম ধর্মঘটগুলির মধ্যে একটি হিসাবে চিহ্নিত করে। ধর্মঘটে অংশগ্রহণকারী জনগণের মনোভাবে স্পষ্টভাবে শ্রম আইন এবং অন্যান্য শ্রমিক-বিরোধী নীতি আরোপের বিরুদ্ধে "করো অথবা মরো" লড়াইয়ের জন্য তাদের দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করে। লজ্জাজনক ভারত-মার্কিন চুক্তির কারণে কৃষকরাও বড়ো অংশে ধর্মঘটে অংশ নিয়েছে। ভারতের জনগণ সাহস এবং শক্তির সাথে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলিকে পিছু হটতে বাধ্য করবে কেরালা, ওড়িশা, ত্রিপুরা এবং আরও কিছু রাজ্যে বনধের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
রাজ্যে রাজ্যে ধর্মঘট
বৃহস্পতিবার ধর্মঘট চলাকালীন ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা চার শ্রম আইনের প্রতিবাদে রাস্তায় নামে। ১০টি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নের যৌথ প্ল্যাটফর্মের ডাকা দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের অংশ হিসেবে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন কয়লা কোম্পানি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির গেটে বিক্ষোভ দেখান। ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (BOI) কর্মচারী ইউনিয়নের রাজ্য সহ-সাধারণ সম্পাদক উমেশ দাস জানিয়েছেন, ধর্মঘটের ফলে ব্যাঙ্কিং, বীমা এবং কয়লা ক্ষেত্রে ধর্মঘটের ভালো প্রভাব পড়েছে।
বৃহস্পতিবার ধর্মঘটের জেরে স্তব্ধ হয়ে যায় তেলেঙ্গানার বিভিন্ন শিল্প ক্ষেত্রে। প্রভাব পড়ে সিঙ্গারেনী কয়লাখনি অঞ্চলে। এছাড়াও ওড়িশা, কেরালা, তামিলনাড়ু, গোয়া, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ এবং পাঞ্জাবে ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে।
ওড়িশায় বিভিন্ন জায়গায় বন্ধ আছে জনপরিবহন। বহু জায়গাতেই বন্ধ দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জায়গায় জায়গায় ধর্মঘটের সমর্থকরা রাস্তায় ব্যারিকেড করেন। ভুবনেশ্বর, কটক, বালাসোর, বহরমপুর এবং সম্বলপুর সহ সমস্ত প্রধান শহরাঞ্চলে এই বন্ধের প্রভাব দেখা যায়। রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মঘটের সমর্থনে বিক্ষোভকারীরা রেল অবরোধ করে।
ছত্তিশগড়ে, কর্মচারীরা ধর্মঘটে যোগদান করায় বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বন্ধ ছিল। শ্রমিক ও কৃষকদের পাশাপাশি বীমা কোম্পানি, ডাকঘরের কর্মীরাও এই ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন খনি অঞ্চলেও ধর্মঘটের ফলে কাজ ব্যাহত হয়েছে।
তামিলনাড়ুতে বন্দরের কাজকর্ম ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। থুথুকুডি এবং চেন্নাই বন্দরে ধর্মঘট সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। শ্রীপেরুম্বুদুরের শিল্পকেন্দ্রেও উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ড দেখা যায়, কারণ বেশ কয়েকটি উৎপাদন ইউনিটের শ্রমিকরা ধর্মঘটের সাথে সংহতি প্রকাশ করে গেট মিটিং এবং বিক্ষোভ করে। রাজ্যের একাধিক জায়গায় ধর্মঘটের সমর্থনে রেল অবরোধ হয়।
কেরালায় রাস্তাঘাটে যানবাহন না থাকায় অফিসে উপস্থিতি কম। সরকারি অফিস ছাড়াও, দেশব্যাপী ২৪ ঘন্টার ধর্মঘটের কারণে দোকানপাট এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ আছে।
পাঞ্জাবে ক্ষমতাসীন আপ, দেশব্যাপী ধর্মঘটকে সমর্থন জানিয়েছে। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে পাঞ্জাব এবং দেশের বাকি অংশে তাদের কর্মীরা শ্রমিক ও কৃষকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই বন্ধে যোগ দেবে।
গোয়ায় ধর্মঘটের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রভাবিত হয়েছে ব্যাঙ্কিং কার্যক্রম। ব্যাংক এবং বীমা কোম্পানির অফিস বন্ধ রয়েছে। ধর্মঘটের মিশ্র প্রভাব পড়েছে বিহার, হরিয়ানাতেও।
মধ্যপ্রদেশ জুড়ে ছ’টি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৫,০০০ এরও বেশি বেসামরিক কর্মচারী বৃহস্পতিবার ধর্মঘটকে সমর্থন করে এক ঘন্টা দেরিতে কাজ শুরু করেছেন।
বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী বন্ধের প্রভাব আসামের গুয়াহাটিতে দেখা যায়। বিক্ষোভকারীরা খানাপাড়া এলাকায় বাণিজ্যিক যানবাহন থামিয়ে বিক্ষোভ দেখায়। বিজেপি শাসিত আসামের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী সহ ইঞ্জিনিয়াররাও তাঁদের কর্মক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখান। সেই সঙ্গে গুয়াহাটির ঠিকা শ্রমিকরা সহ লামডিংয়ের মিনারেল অয়েল শ্রমিকরাও ধর্মঘট পালন করেন।
কর্ণাটকের বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে ধর্মঘটের সমর্থনে মিছিল করায় শ্রমিক, কৃষকও ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ধর্মঘটের সমর্থনে এদিন বিবৃতি দিলেও কর্নাটকে কংগ্রেস সরকার অন্য ভূমিকা পালন করে। বস্তুত ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ এর আগে খাড়গেকে চিঠি দিয়ে দাবি করেন যাতে কর্নাটকে শ্রম কোড চালু না করে রাজ্যের কংগ্রেস সরকার।
ধর্মঘট প্রসঙ্গে কী জানালেন কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী?
ধর্মঘটের সমর্থনে বৃহস্পতিবার সকালে এক বিবৃতি দেন কংগ্রেস সাংসদ রাহুল গান্ধী। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স-এ ধর্মঘট প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, "আজ, সারা দেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক এবং কৃষক তাদের অধিকারের জন্য আওয়াজ তুলতে রাস্তায় নেমে এসেছেন। শ্রমিকরা আশঙ্কা করছেন যে চারটি শ্রম আইন তাদের অধিকারকে দুর্বল করে দেবে। কৃষকরা আশঙ্কা করছেন যে বাণিজ্য চুক্তি তাদের জীবিকা নির্বাহের উপর প্রভাব ফেলবে।" আর মনরেগাকে দুর্বল করা বা বাদ দেওয়া গ্রামগুলির শেষ ভরসার উৎসকেও কেড়ে নিতে পারে। যখন তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন তাদের দাবিকে উপেক্ষা করা হয়েছে।"
ওই বিবৃতিতেই লোকসভার বিরোধী দলনেতা আরও লেখেন, "মোদীজি কি এখন শুনবেন? নাকি তাঁর উপর কোনও "দখল" খুব শক্তভাবে আঁকড়ে আছে? আমি শ্রমিক ও কৃষকদের সমস্যা এবং সংগ্রামের সাথে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছি।"
আজকের ধর্মঘটে অংশ নিয়েছে সিআইটিইউ, এআইটিইউসি, আইএনটিইউসি, এইচ এম এস, ইউটিইউসি, এআইইউটিইউসি, এসইডব্লুএ, এআইসিসিটিইউ প্রভৃতি শ্রমিক সংগঠন। ধর্মঘট প্রসঙ্গে শ্রমিক সংগঠনের যৌথ মঞ্চের নেতৃত্ব জানিয়েছেন, আজ দেশজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি শ্রমিক কর্মচারী ধর্মঘটে অংশ নিয়েছেন।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন