

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
রাত পোহালেই বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন। বাংলাদেশের সময় সকাল সাড়ে সাতটা থেকে শুরু ভোটগ্রহণ। চলবে বিকেল সাড়ে চারটে পর্যন্ত। সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসিরউদ্দিন সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইন মেনে দায়িত্ব পালন করছেন। নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে আন্তর্জাতিক মহলের ৩৯৪ জন পর্যবেক্ষক ইতিমধ্যেই ঢাকায় পৌঁছেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন দেশ থেকে ১৯৭ জন সাংবাদিক বাংলাদেশের নির্বাচন উপলক্ষ্যে এই মুহূর্তে ঢাকায়। যাদের মধ্যে আছে রাশিয়া, ইরান, জর্জিয়া, ভুটান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক, চিন, জাপান প্রভৃতি দেশের প্রতিনিধি। এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস-এর পক্ষ থেকে ২৮ জন, কমনওয়েলথ সেক্রেটারিয়েট থেকে ২৭ জন, যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক আই আর আই থেকে ১৯ জন এবং এনডিআই ১ জন পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে৷
কী জানিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ?
বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনের মুখে মহিলাদের নিরাপদ এবং অর্থবহ অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ। বুধবার জারি করা এক বিবৃতিতে রাষ্ট্রসংঘের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মহিলা সহ সব ভোটার যেন ভয়ভীতি, বৈষম্য, অনলাইন নির্যাতন বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই প্রার্থী ও ভোটার হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের নির্বাচনে মোট আসন, মোট ভোটার
বাংলাদেশের সংসদের মোট ৩০০ আসনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লক্ষ ১১ হাজার ৭৯৩। মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ এবং মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারের সংখ্যা ১ হাজার ২৩২ জন। সব থেকে বেশি ভোটার গাজীপুর-২ আসনে (৮,০৪,৩৩৩) এবং সবথেকে কম ভোটার ঝালকাঠি-১ (২,২৮,৪৩১) আসনে।
কতগুলি রাজনৈতিক দল এবং মোট কতজন প্রার্থী?
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুসারে এবারের নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে এবং মোট প্রার্থীর সংখ্যা ২ হাজার ৩৩। যাদের মধ্যে নির্দল প্রার্থীর সংখ্যা ২৭৫। দলগতভাবে মোট পুরুষ প্রার্থীর সংখ্যা ১,৬৯২, মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা ৬৩। নির্দল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৫৩ জন পুরুষ প্রার্থী, ১৯ জন মহিলা প্রার্থী এবং ১ জন তৃতীয় লিঙ্গের প্রার্থী। এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন হচ্ছে না।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কারা?
এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি হল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামী। বাংলাদেশে তিরিশ বছর পর এরকম নির্বাচন হচ্ছে যেখানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়া লড়াইয়ের ময়দানে নেই। নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের নির্বাচন শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই নয়। বরং এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠনের এক পরীক্ষার মুহূর্ত।
কোন দলের কত প্রার্থী?
সবথেকে বেশি সংখ্যক প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি (২৯১ আসন)। এরপরেই আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (২৫৮ জন) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (২২৮ জন), জাতীয় পার্টি (২০০ জন)। এছাড়াও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ৬৫ জন এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ৩৭ জন, বাসদ (মার্কসবাদী) ৩৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনে চার বাম দল ঐক্যবদ্ধভাবে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট গঠন করে লড়াই করছে।
প্রতিটি বিভাগের প্রার্থী সংখ্যা কত?
অঞ্চল ভিত্তিতে রংপুরে ২৩৭ জন, রাজশাহীতে ২১৬ জন, খুলনাতে ২০৪ জন, বরিশালে ১৩১ জন, ময়মনসিংহে ২৩৭ জন, ঢাকায় ৩৬০ জন, ফরিদপুরে ১১৭ জন, সিলেটে ১০৫ জন, কুমিল্লায় ২৭১ জন, চট্টগ্রামে ১৫৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বাংলাদেশের নির্বাচনে মোট বুথ ও নিরাপত্তারক্ষী কত?
নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোট ১ লক্ষ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দেশ জুড়ে ৮ হাজার ৭৭০ ভোটগ্রহণ কেন্দ্রকে স্পর্শকাতর বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শুক্রবার ভোটের ফলাফল প্রকাশিত হবে।
বাংলাদেশের অতীত ১২টি সাধারণ নির্বাচন
বাংলাদেশে এর আগে ১২টি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যার প্রথমটি হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। দ্বিতীয় নির্বাচন হয় ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ নির্বাচন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ নির্বাচন, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম নির্বাচন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের একাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর এবং দ্বাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি।
কোন পরিস্থিতিতে এবারের নির্বাচন?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশজুড়ে বিক্ষোভের জেরে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৯ আগস্ট বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন মহম্মদ ইউনুস। এরপর থেকেই দুই পক্ষের চাপানউতোর চলেছে। এরই মাঝে মুহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সব সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন ২০২৫ সালের ১৩ মে। নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ জানান, "আওয়ামী লিগের ওপর সরকারিভাবে নিষেধাজ্ঞা জারির পরপরই দলটির রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করা হয়েছে।" কমিশনের মতে, দলটি আর কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না।
গত বছরের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের প্রধান শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ের পরই বাংলাদেশজুড়ে উৎসবে মেতে ওঠে হাসিনা বিরোধীরা। তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই নির্দেশ দেয়। শেখ হাসিনার সাথে বাংলাদেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া আর এক অভিযুক্ত প্রাক্তন পুলিশকর্তা আল-মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ছাত্র আন্দোলনের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ, উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ এবং পুলিশকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করার অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। তাঁকে ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি তা করেননি।
এবারের নির্বাচনী ময়দানে নেই আওয়ামী লীগ। যদিও নির্বাচনের প্রাক্কালে গত জানুয়ারি মাসে এক সাংবাদিক সম্মেলনে অডিও বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, “দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনুস আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।” তিনি আরও বলেন, 'আমি মনে করি বাংলাদেশের জনগণের কাছে ডঃ মহম্মদ ইউনুসের ক্ষমা চাওয়া উচিত।" আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত দেড় বছর ক্ষমতায় থাকা মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্ন তোলা হয়। দাবি জানানো হয় ইউনুস সরকার অপসারণের।
যদিও শেখ হাসিনার আনা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউনুস সরকার। বরং তিনি বারবার ভারতের কাছে শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণের দাবি জানান। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশে বিভিন্ন ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্ত একাধিক বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন এবং তাঁরা এনজিও-র আড়ালে ভারত থেকে আওয়ামী লীগের কাজ পরিচালনা করছেন।
আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে অস্থিরতার অবসান হবে কি না প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শেখ হাসিনার অপসারণের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠা বাংলাদেশে বিগত সময়ে ক্রমশ বেড়েছে অস্থিরতা ও হিংসা। জুলাই আন্দোলনে বহু মানুষের মৃত্যুর পর হাসিনার দেশত্যাগ এবং অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার পরেও যা কমেনি। বিগত সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের একাধিক ঘটনায় উত্তাল হয়েছে প্রতিবেশী ভারতের রাজনৈতিক মহল। তাই এই নির্বাচন একদিকে যেমন দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেমনই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উন্নতির জন্যেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন