Afghanistan: আফগানিস্তানে নতুন তালিবান আইন: ন্যায়বিচারের বদলে বৈষম্যর শাসন? নারী-শিশুদের ভবিষ্যৎ কী?

People's Reporter: নয়া বিধি অনুসারে নারী, শিশু, সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হবার আশঙ্কায় বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে নতুন আইন ন্যায়বিচারের পরিবর্তে বৈষম্যমূলক আইনি কাঠামোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।
ছবি প্রতীকী
ছবি প্রতীকী গ্রাফিক্স আকাশ
Published on

আফগানিস্তানে নতুন আইনি বিধি

আফগানিস্তানে চালু হল ‘ক্রিমিনাল প্রোসিডিওর কোড ফর তালিবান কোর্টস’ (Criminal Procedure Code for Taliban Courts)। সম্প্রতি শাসক তালিবানরা এই সংক্রান্ত বিধিতে স্বাক্ষর করেছে। নতুন এই বিধি আফগানিস্তানের আগেকার ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার বদলি হিসেবে জারি হবে। বিধি অনুসারে নারী, শিশু, সংখ্যালঘুদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হবার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে নতুন এই আইন ন্যায়বিচার দেবার পরিবর্তে বৈষম্যমূলক আইনি কাঠামোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে।

নতুন আইনি বিধির প্রতিক্রিয়ায় কারা কী বলছেন?

এর প্রতিক্রিয়ায়, কো-অরডিনেশন কাউন্সিল অফ দ্য ডিপ্লোম্যাটিক অ্যান্ড কনস্যুলার মিশন অফ দ্য ইসলামিক রিপাবলিক অফ আফগানিস্তান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতি জারি করেছে। বিবৃতিতে নতুন এই আইনকে আফগানিস্তানের প্রতিষ্ঠিত আইনি কাঠামো এবং এর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতা থেকে গুরুতর পশ্চাদপসরণ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তালিবানদের ফৌজদারি কার্যবিধি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকারের মান লঙ্ঘন করে, লিঙ্গ-ভিত্তিক বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে এবং শান্তিপূর্ণ প্রকাশ, ভিন্নমত এবং জমায়েতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। এই আইন যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই নির্বিচারে আটক এবং শাস্তি দেবার সুযোগ করে দেবে। একই সাথে শিশু, সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য দুর্বল গোষ্ঠীর সুরক্ষা নষ্ট করবে।

কী বলছেন আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রতিনিধি?

আফগানিস্তানের আইনি কাঠামোর এই পরিবর্তনে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পাকিস্তানের মহম্মদ আসিফ। যিনি একসময় আফগানিস্তানে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নিজের এক্স হ্যান্ডেল (পূর্বতন ট্যুইটার) পোষ্টে তিনি লিখেছেন, “এটা অবিশ্বাস্য যে উলেমারা (ধর্মীয় পণ্ডিতরা) বিচারের আওতা থেকে মুক্ত, অথবা আইন অভিজাতদের স্পর্শ করতে পারবে না এবং সমাজে “দাস” থাকবে যারা শাস্তির যোগ্য।”

ওই বিবৃতিতেই তিনি আরও বলেছেন, নতুন এই আইনে ন’বছরের কমবয়সী মেয়েদেরও নারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং তাদের বিবাহযোগ্য বলে গণ্য করা হবে।

মানবাধিকার সংগঠন এবং সমাজকর্মীদের প্রতিক্রিয়া কী?

আফগান মানবাধিকার সংস্থা রাওয়াদারির এক সদস্য সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, “এই বিধি ন্যায়বিচার নিয়ে নয়। এটি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য, যেখানে রাষ্ট্র যেকোনো সময়, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই যে কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে পারবে।” এই প্রসঙ্গে গত ২১ জানুয়ারি এক বিবৃতি প্রকাশ করেছে ওই মানবাধিকার সংস্থা

সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মতে, এর ফলে দেশে বৈষম্য বাড়বে। আইনের চোখে সকলে সমান এই ধারণা ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের আশঙ্কা, নতুন এই আইনের ফলে দরিদ্র এবং প্রান্তিক মানুষেরা কঠোর শাস্তির মুখে পড়বেন। আর অন্যদিকে ক্ষমতাবানরা রেহাই পেয়ে যাবেন।

নতুন বিধিতে কী কী বলা হয়েছে?

দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন অনুসারে, গত ৪ জানুয়ারি তালিবানদের পক্ষ থেকে ১১৯টি ধারা সম্বলিত নতুন এই আইনি বিধি প্রকাশ করা হয়েছে। যাতে তিনটি বিভাগ এবং ১০টি অধ্যায় আছে। যদিও এই আইন প্রণয়ন প্রকাশ্যে করা হয়নি এবং এই আইন প্রণয়নের আগে কোন আলোচনা, বিতর্ক বা সরকারি ঘোষণা করা হয়নি।

নতুন বিধিতে আফগান সমাজকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যার মধ্যে আছে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব (Religious Scholars), অভিজাত (Nobility), মধ্যবিত্ত (Middle Class) এবং নিম্নবিত্ত (Lower Class)। প্রত্যেকটি বিভাগের জন্য আছে আলাদা আলাদা আইনের শাসন। যেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান অনুসারে তাঁর শাস্তির ব্যবস্থা আছে।

নতুন এই আইনে ধর্মীয় বৈষম্যের কথাও স্পষ্ট। যেখানে হানাফি পথের অনুসারীদের ‘প্রকৃত মুসলিম’ বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষজনকে ‘ধর্মদ্রোহী বা ধর্মীয় উদ্ভাবক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে ভিন্ন বিশ্বাস বা ভিন্ন মতাবলম্বীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবার আশঙ্কা বাড়বে।

নয়া বিধির ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ ‘ইমাম’কে ‘জনস্বার্থ’ রক্ষার জন্য অপরাধীদের হত্যার অনুমোদন দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। এর মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও অন্তর্ভুক্ত, যারা ইসলামের অধীনে মিথ্যা বলে বিবেচিত বিশ্বাসকে সমর্থন করে, যারা অন্যদেরকে এই ধরনের বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করে। এর মধ্যে যুক্ত করা হয়েছে ‘জাদুকর’ এবং ‘ধর্মদ্রোহী’দের।

২ নম্বর অনুচ্ছেদের ১১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে, যে কেউ জনসমাজে দুর্নীতি ও ক্ষতি ছড়ানোর জন্য কাজ করলে, তাকে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনোভাবে সংশোধন করা যাবে না।

অনুচ্ছেদ ২৪ অনুযায়ী নাগরিকরা তালিবান-বিরোধী যে কোনও কার্যকলাপের খবর জানাতে বাধ্য থাকবে। যা না করলে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

অনুচ্ছেদ ৩৪ অনুযায়ী, কোনো নারী যদি অনুমতি ছাড়া বারবার স্বামীর ঘর ছেড়ে বাবা বা অন্য আত্মীয়দের বাড়িতে যান এবং ফিরতে অস্বীকার করেন, তবে তাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে এবং তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে।

অনুচ্ছেদ ৫৮ অনুসারে কোনও বিচারক একজন “ধর্মত্যাগী নারীকে” ইসলামে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিতে পারেন। এছাড়াও প্রতি তিন দিনে দশটি করে বেত্রাঘাত এই শাস্তির অন্তর্ভুক্ত।

অনুচ্ছেদ ৫৯ অনুযায়ী, নৃত্যশিল্পী—পুরুষ বা মহিলা—এবং তাদের দর্শকরা সমানভাবে অপরাধী এবং এঁদের প্রত্যেকের দুই মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ কেন?

আফগানিস্তানের নয়া আইন বিধি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। তাদের মতে, এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। আফগান জনগণের যুদ্ধ শেষ হয়নি। আফগানিস্তান ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে না। বরং, আফগানিস্তানকে এমন এক সমাজে রূপান্তরিত করা হচ্ছে যেখানে তালিবানরা মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারকে উপেক্ষা করে ভয়, বৈষম্য এবং হিংসার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা চালাচ্ছে।

নতুন বিধি প্রসঙ্গে কী জানাচ্ছেন আফগানিস্তানের প্রাক্তন অ্যাটর্ণি জেনারেল?

আফগানিস্তানের প্রাক্তন অ্যাটর্ণি জেনারেল মহম্মদ ফারিদ হামিদি তাঁর এক্স হ্যান্ডেল পোষ্টে এই আইনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি লিখেছেন, এই আইন “সব নাগরিককে দোষী সাব্যস্ত করার ঘোষণাপত্র”। তিনি বলেন, ব্যক্তিদের নিকৃষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করা, যা বিপুল সংখ্যক সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা একটি সুস্পষ্ট অপমান, মর্যাদার ওপর সরাসরি আক্রমণ এবং মানবিক মূল্যবোধের গুরুতর লঙ্ঘন।

হামিদি লিখেছেন: “এই বিধিগুলি প্রকাশ্য বৈষম্যের ওপর ভিত্তি করে একটি অন্যায্য ফৌজদারি নীতিকে সামনে এনেছে। এই বিধি নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে হিংসাকে উৎসাহিত করার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, নাগরিকদের অপমান করে, জীবন, রক্ত, সম্পত্তি, সম্মান ও মর্যাদার পবিত্রতাকে উপেক্ষা করে, রাজনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা, সম্পদ ও দারিদ্র্য অনুসারে নাগরিকদের বিভক্ত করে আইনের সামনে আইনি ও বিচারিক সমতাকে লঙ্ঘন করে এবং আফগানিস্তানে প্রকাশ্য ধর্মীয় বৈষম্য প্রয়োগ করে।”

বদলে যাওয়া আফগানিস্তান

২০২১ সালে আফগানিস্তান ছাড়ে আমেরিকান বাহিনী। ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের দখল নেয় তালিবানরা। ওই সময় তাদের দাবি ছিল, আগের মতো নৃশংস রূপে তাদের দেখা যাবে না। কারণ, তারা বদলে গিয়েছে। যদিও তাদের এই আশ্বাস বাণীতে গোটা বিশ্ব সেইসময় একেবারেই ভরসা করেনি। বিশ্বের আশঙ্কাকে সত্যি করে কিছুদিনের মধ্যেই তালিবান কারাপ্রধান জানিয়েছিলেন, শরিয়ত মেনে তৈরি হবে দেশের আইন। অপরাধের শাস্তি হিসাবে হাত-পা কেটে নেওয়া হতে পারে। অথবা প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করার যে আইন ছিল, তা ফিরিয়ে আনা হবে। এর পরের দিনই হেরাটের রাস্তায় ক্রেনের মাথায় মৃতদেহ ঝুলতে দেখা যায়।

ছবি প্রতীকী
Afghanistan: তালিবানি বিধিনিষেধে চরম খাদ্য সঙ্কটে আফগানিস্তানের ২ কোটি মানুষ - রাষ্ট্রসঙ্ঘ
ছবি প্রতীকী
Afghanistan: তালিবান সরকারের ফতোয়া - আফগান বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষিদ্ধ হচ্ছে মহিলাদের লেখা বই

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

Related Stories

No stories found.
logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in