

দিনটা ছিলো ১৯৮৯ সালের ১ জানুয়ারি। গাজিয়াবাদের পুর নির্বাচন উপলক্ষ্যে স্থানীয় সিপিআই(এম) প্রার্থীর সমর্থনে প্রচার সভা চলছে শাহিবাদের ঝান্ডাপুরে। সিআইটিইউ-র ডাকে নাটক করতে পৌঁছে গেছেন জনম-এর সদস্যরা। সকালেই স্থানীয় আম্বেদকর পার্কে শুরু হয়ে গেছে পথ নাটক ‘হল্লা বোল’।… এর পরের ঘটনা অনেকে যেমন ভুলে গেছেন তেমনই আজও অনেকে ভুলতে পারেননি। ভুলতে পারেননি সফদর হাশমির নাম।
নাটক চলাকালীন আচমকা কংগ্রেস প্রার্থী মুকেশ শর্মার নেতৃত্বে আক্রমণ নেমে আসে সফদর হাশমিদের উপর। চলে লাঠি, গুলি। প্রতিরোধ করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন রাম বাহাদুর এবং স্বয়ং দল পরিচালক সফদর। নাট্যকর্মীদের স্থানীয় সিপিআইএম পার্টি অফিসে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে আরেকদফা আক্রমণ নেমে আসে। ২ জানুয়ারি দিল্লির এক হাসপাতালে মৃত্যু হয় গুরুতর আহত সফদর হাশমির। এর ঠিক দু’দিন পর ওই জায়গাতেই সদ্য নিহত সফদরের স্ত্রী মালা হাশমির পরিচালনায় মঞ্চস্থ হয় ‘হল্লা বোল’।
সে সময় মিডিয়ার এত রমরমা ছিলো না। ফলে প্রাথমিক অবস্থায় সফদরের মৃত্যু সেভাবে প্রচারিত হয়নি। যদিও ওই বছরেরই ১০ জানুয়ারি এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মহলে পৌঁছে দেন শাবানা আজমি।
দিল্লির সিরি ফোর্ট অডিটোরিয়ামে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলার সুযোগ পেয়েই শাবানা বলেন, “দিল্লি থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে শাহিবাবাদ শহরে একটি পথ নাটক করার সময়, ১লা জানুয়ারী, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সদস্য এবং একজন সুপরিচিত সাংস্কৃতিক কর্মী সফদার হাশমিকে প্রকাশ্য দিবালোকে কংগ্রেস (আই) প্রার্থীর অনুগামীরা হত্যা করে। থিয়েটারে কাজ করার পাশাপাশি, সফদার একজন সমালোচক, অভিনেতা এবং ভাষ্যকার হিসাবে সিনেমাতেও অবদান রেখেছিলেন। আমরা চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং চলচ্চিত্রপ্রেমীরা এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ জানাতে চাই যা একদিকে সৃজনশীলতাকে প্রচার করার দাবি করে এবং অন্যদিকে সাংস্কৃতিক কর্মীদের হত্যায় জড়িত থাকে।”
শাবানা ঠিক বা ভুল তা নিয়ে পরবর্তী সময়ে অনেক বিতর্ক হলেও সফদরের নামের সঙ্গে বা কাজের সঙ্গে অপরিচিত মানুষরাও চিনে ফেলেন এই বাম নাট্যকর্মীকে। পরবর্তী সময় সফদরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ - শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী, শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে একত্রিত হয়ে এক বিশাল, নজিরবিহীন প্রতিবাদ জানায়। আজ, সফদারের নাম তাঁর মৃত্যুর ৩৫ বছর পরেও প্রাসঙ্গিক। আজ ভারতের পথনাটক এবং প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সমার্থক সফদর।
হানিফ হাশমি এবং কমর আজাদের সন্তান সফদর ১২ এপ্রিল ১৯৫৪ সালে দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর শৈশব আলীগড়ে অতিবাহিত করেন এবং পরবর্তী সময় দিল্লীতে তাঁর স্কুল শিক্ষা শেষ করেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করার পর গাড়ওয়াল, কাশ্মীর এবং দিল্লির বিশ্ববিদ্যালয়ে অল্প সময়ের অধ্যাপনার পর তিনি প্রেস ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়াতে কাজ শুরু করেন। পরে দিল্লিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রেস ইনফরমেশন অফিসার হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি একজন হোলটাইমার হিসেবে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কাজ করার জন্য চাকরি ছেড়ে দেন।
জননাট্য মঞ্চ বা জনমের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সফদার ছিলেন এক উজ্জ্বল তাত্ত্বিক। রাজনৈতিক থিয়েটার, বিশেষ করে পথ নাটকের অনুশীলনকারী। এক বহুমুখী ব্যক্তিত্ব। একাধারে নাট্যকার, গীতিকার, থিয়েটার পরিচালক, ডিজাইনার এবং এক দক্ষ সংগঠক। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাটক - 'আওরাত' (নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নাটক), 'মেশিন' (যন্ত্রসভ্যতা, পুঁজিবাদ ও মজদুরদের শোষণের বিরুদ্ধে নাটক), 'ডিটিসি কি ধান্দালি' (মুদ্রাস্ফীতি ও তার থেকে উৎপন্ন হওয়া সমস্যা বিষয়ক নাটক), 'গাঁও সে শহর তক' (ক্ষেতমজুরদের যন্ত্রণা নিয়ে নাটক), 'কুর্সি কুর্সি কুর্সি' (সরকারের ক্ষমতার রসায়নকে সমালোচনা করা নাটক), 'দুনিয়া সবকি' (আকবর-বীরবল কথোপথনে বৈষম্য বিরোধী অবস্থান নেওয়া নাটক), 'বাঁশুরিওয়ালা' (একজন সাধারণ মানুষের গণতন্ত্রে অংশ নেওয়া নিয়ে নাটক) ইত্যাদি। স্ট্রিট থিয়েটার আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ, ১৯৮৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সফদারকে মরণোত্তর ডি লিট ডিগ্রি প্রদান করে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন