'একটা চাকরির খুব প্রয়োজন', দেশের হয়ে ফুটবল খেলা পৌলমী এখন ডেলিভারি এজেন্ট

পৌলমী বলেন, “দেশকে রিপ্রেজেন্ট করেও আমায় খাবার ডেলিভারি করে পেটে চালাতে হচ্ছে। এটাই কি আমার প্রাপ্য? সম্মানের কথা ছেড়ে দিন। একজন মহিলা ফুটবলার দুবেলা খেতে পাচ্ছে কিনা সেদিকে নজর দেওয়ার কেউ নেই।“
পদক হাতে পৌলমী (বামদিক) এবং ডেলিভারি এজেন্টের পোশাকে পৌলমী
পদক হাতে পৌলমী (বামদিক) এবং ডেলিভারি এজেন্টের পোশাকে পৌলমীছবি সংগৃহীত

“আমার একটা চাকরির খুব প্রয়োজন। আমার যোগ্যতা অনুযায়ী আমাকে একটি চাকরির শুধু ব্যবস্থা করে দিন।“ ফেডারেশন কর্তাদের কাছে কাতর আর্তি করছেন দেশের হয়ে খেলা মহিলা ফুটবলার পৌলমী অধিকারী। পেট চালাতে বাধ্য হয়ে বর্তমানে জোমাটো, সুইগির মতো মোবাইল অ্যাপ সংস্থার হয়ে বাড়ি বাড়ি খাবার ডেলিভারির কাজ করছেন তিনি।

পৌলমী বলেন, “ইন্ডিয়াকে রিপ্রেজেন্ট করেও আমায় খাবার ডেলিভারি করে পেটে চালাতে হচ্ছে। এটাই কি আমার প্রাপ্য ছিল? পুরুষ ফুটবলে বেঙ্গল টিমে সুযোগ পেলেই রয়েছে অগাধ পয়সা। অথচ মহিলা ফুটবলে কানা কড়িও নেই। ২০০ টাকা খরচ করতে গেলেও হাত কাঁপে। পরিচিতি বা সম্মানের কথা ছেড়ে দিন। একজন মহিলা ফুটবলারের বুট রয়েছে কিনা বা সে ভরপেট দুবেলা খেতে পাচ্ছে কিনা সেদিকে নজর দেওয়ার কেউ নেই।“

সম্প্রতি এআইএফএফ'র সভাপতি তথা বিজেপি নেতা কল্যাণ চৌবে ভারতীয় ফুটবলের রোডম্যাপ প্রকাশ করেছেন। সেখানে  ফুটবল বিশ্বকাপে ভারতের অংশগ্রহণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে । একইসঙ্গে গ্রাসরুট স্তরে ফুটবলের বিকাশ ঘটানোরও একগুচ্ছ প্ল্যান সামনে এনেছে ফেডারেশন। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলছে। পৌলমীর কাহিনী চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে ভারতীয় ফুটবলের দৈনদশাকে। আইএসএল নামক হাজার ওয়াটের আলোর ঝলকানির বাইরের কোনওক্রমে দিন কাটাচ্ছেন পৌলমী অধিকারীর মতো জাতীয় স্তরের মহিলা ফুটবলাররা।

খাবার ডেলিভারি করার সূত্রেই এক ব্যক্তি পৌলমী অধিকারীর একটি ভিডিও করেন। সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।সেই ভাইরাল ভিডিওর সূত্র ধরেই পৌলমীর বাড়িতে হাজির হয় একাধিক সংবাদমাধ্যম। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় উঠে আসে এদেশের মহিলা ফুটবলের হতশ্রী পরিকাঠামোর কাহিনী।

২০১৬ সালে হোমলেস বিশ্বকাপে দেশের জার্সি পড়ে খেলেছিলেন পৌলমী। তার আগে ২০১৩ সালে অনূর্ধ্ব ১৬ এএফসি এশিয়া কাপের যোগ্যতা নির্ণায়ক পর্বে দেশের জার্সি পরে খেলেছেন। এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, আইএফএ সহ একাধিক সংস্থার বিভিন্ন বয়স ভিত্তিক টুর্নামেন্টেও খেলেছেন নিয়মিত ভাবে।কিন্তু এত কিছুর পরও সম্মান জোটা তো দুরের কথা, দুবেলা কী খেয়ে পেট ভরাবেন তাই নিয়ে ভাবতে হয় পৌলমীকে।

পৌলমী জানান, “আমি আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। এত বছরে যখন কিছু হয়নি, আমি ধরেই নিয়েছিলাম ফুটবল খেলা আর হবে না আমার। অনলাইন খাবার ডেলিভার করেই আমাকে সংসার চালাতে হবে। ভিডিওটা ভাইরাল হওয়ার পরে আপনারা (মিডিয়া) এসে আমার সঙ্গে কথা বলছেন। কিন্তু আপনারা তো আমার অবস্থাটা তুলে ধরা ছাড়া অন্য কিছু করতে পারবেন না।আমার খেলা বা খাওয়ার ব্যবস্থা তো করতে পারবে না।“

কিন্তু এভাবে বিখ্যাত হতে চাননি বছর ২৪ এর পৌলমী। তিনি দেশের হয়ে খেলে বিখ্যাত হতে চেয়েছিলেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি জানান, এভাবে ভিডিওর মাধ্যমে ভাইরাল তো আমি হতে চাইনি। আমি  এখনো ফুটবলটাই খেলতে চাই। তার জন্য দরকার একটা কাজের। খালি পেটে তো আর খেলা চালাতে পারবো না। সরকার,ফেডারেশন,আইএফএ'র কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, আমায় একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিন, যাতে আমি খেলা চালিয়ে যেতে পারি।“

অ্যাপ নির্ভর খাবার ডেলিভারি সংস্থার হয়ে কাজ করে পৌলমীর দৈনিক আয় কখনো ১৫০, কখনো ২০০ টাকা। উৎসবের মরশুমে সেটা কিছুটা বেড়ে হয় ৪০০ টাকা।দুমাস বয়সে মাকে হারান তিনি। তখন থেকে তাঁর আশ্রয় বেহালার শিবরামপুরের মামাবাড়িতে। পৌলোমীর  বাবা গাড়ি চালান।

২০২০ সালে জাতীয় দলের ট্রায়ালে যোগ দেন পৌলমী। এই ট্রায়াল থেকে ১২ জনকে শর্ট লিস্ট করে ফেডারেশন। প্রথম ৬ জন ডাক পান জাতীয় দলে। পৌলমীর নাম ছিল এই তালিকার ৭ নম্বরে।পৌলমীর কথায়, তারপরেই কোভিড চলে এলো। জাতীয় দলের ওয়েটিং লিস্টে এক নম্বরে নাম থাকলেও এখনো ডাক এসে পৌঁছয়নি। অগত্যা পেট ভরাতে খাবার ডেলিভারি সংস্থার কাজ করা শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি পড়াশোনাও সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছেন পৌলমী। বর্তমানে চারুচন্দ্র কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।নিয়মিত প্র্যাকটিসও করেন তিনি।

জানা গেছে, এই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর এআইআইএফের তরফ থেকে ফোন করা হয়েছিল পৌলমীকে। ফেডারেশন কর্তাদের পৌলমী জানিয়েছেন, তিনি খেলা চালিয়ে যেতে চা্ন। তার জন্য একটা চাকরির খুব প্রয়োজন তাঁর। যোগ্যতা অনুযায়ী একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিলে ভাল হয়।

এ প্রসঙ্গে  ফিফা এবং এএফসি'র এলিট প্যানেলভুক্ত মহিলা রেফারি কনিকা বর্মন জানিয়েছেন, “মেয়েরা যতদিন খেলার মধ্যে থাকে সংস্থাগুলির তরফে একটুআধটু খোঁজ নেওয়া হয়। কিন্তু তাঁরা খেলা বন্ধ করে দিলে একদিনের মধ্যে তাঁকে ভুলে যায় ফেডারেশন। খেলা ছাড়ার পরে আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।  ভারতীয় ফুটবলে যতটুকু যা আলো, তা কেবল মাত্রই পুরুষ ফুটবলকে কেন্দ্র করে। বহু ক্ষেত্রে মেয়েরা বাড়ির লোকেরই সমর্থন পায় না।“

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in