৩৬ এ পর্তুগীজ যুবরাজ - মেদেইরার ছোট্ট শহর থেকে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা - রোনাল্ডোর স্বপ্ন উত্থান

৩৬ এ পর্তুগীজ যুবরাজ - মেদেইরার ছোট্ট শহর থেকে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা - রোনাল্ডোর স্বপ্ন উত্থান
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ট্যুইটার হ্যান্ডেলের সৌজন্যে

পর্তুগালের মেদেইরার এক ছোট্ট শহর ফুঞ্চাল। তিন সন্তানকে নিয়ে অভাব অনটনকে নিত্য সঙ্গী করে দিন কাটাচ্ছিলেন জোসে দিনিস আভেইরো এবং মারিয়া ডলোরেস দস সান্তোস আভেইরো। পেশায় মালির কাজ করা দিনিসের পরিবারে আবার আসতে চলেছিল এক সন্তান। অভাবের কথা মাথায় রেখে মারিয়া ডলোরেস চেয়েছিলেন তাঁকে পৃথিবীর আলো না দেখাতে। পরে ওই দম্পতি ঠিক করেন সমস্ত অভাব অনটনের মধ্যেও তাঁদের চতুর্থ সন্তানের জন্ম হোক। তখন কি মারিয়া ডলোরেস জানতেন তিনি রত্নগর্ভা! তাঁর জঠরে বেড়ে উঠছেন এক কিংবদন্তী।

অবশেষে সেই দিন এলো। ১৯৮৫ সালের ৫ ই ফেব্রুয়ারি। মারিয়া ডলোরেসের কোল আলো করে আবির্ভাব হলো এক পুত্র সন্তানের। বাবা ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগানের বড় ভক্ত। তাই ভালোবেসে ছেলের নাম রাখলেন রোনাল্ডো। পুরো নাম ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো দস সান্তোস আভেইরো। আজ তাঁরই জন্মদিন। ৩৬ বছরে পা দিলেন ফুটবল ইতিহাসের প্রথম বিলিওনেয়ার।

অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম হওয়ায় রোনাল্ডোর শৈশবটা আর পাঁচটা সাধারণ ছেলের মতো ছিলোনা। ফুটবল অন্তঃপ্রাণ ছেলেটাকে খেলার শেষে হোটেলের পরিত্যক্ত খাওয়ার খেয়েও দিন কাটাতে হয়েছে। তবে তিনি থেমে থাকেননি। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের সৌজন্যে আজকের ফুটবল বিশ্বে তিনি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। পেশাদারী ফুটবলে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি।

ফুটবলের সংস্পর্শে আসা মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই। আট বছর বয়সে তিনি অপেশাদারী ফুটবল ক্লাব 'আন্দোরিনহোতে' তাঁর ফুটবল জীবন শুরু করেন। অল্প দিনের মধ্যেই গোটা পর্তুগালে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। মাদেইরার শীর্ষ দুই শীর্ষ দুটি দল 'সিএস মারিতিমো' ও 'সিডি ন্যাশিওনাল' তাঁকে পেতে মুখিয়ে থাকে। রোনাল্ডোর সুযোগ হয় ন্যাশিওনালে। সেখানে এক বছর কাটানোর পর তিনি চলে আসেন স্পোর্টিং সিপিতে।

সালটা ২০০৩। লিসবনে স্তাদিও জোসে এলভালাদে স্টেডিয়াম উদ্বোধনের জন্য এক সম্প্রীতি ম্যাচে স্পোর্টিং সিপির বিরুদ্ধে খেলতে আসে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। আর এখানেই ভাগ্য ফেরে রোনাল্ডোর। ওই ম্যাচে ৩-১ ব্যবধানে জেতে সিপি। দুই উইং-এ দক্ষতা দেখিয়ে রোনাল্ডো নজর কাড়েন ম্যান ইউ ম্যানেজার স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের। ওই বছরই ডেভিড বেকহ্যামের রিয়েল মাদ্রিদে পাড়ি জমানোর পর ১২.২৪ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে আনা হয় তরুণ রোনাল্ডোকে। ম্যান ইউতে এসে রোনাল্ডো চেয়েছিলেন ২৮ নম্বর জার্সি। কিন্তু তাঁকে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন দিয়েছিলেন জর্জ বেস্ট, ব্রায়ান রবসন, এরিক ক্যান্টোনা ও ডেভিড বেকহ্যামদের ৭ নম্বর জার্সিটি। নিজ দক্ষতার গুণে এখানেই তিনি হয়ে উঠলেন সিআর সেভেন। রেড ডেভিলদের হয়ে ৬ বছরে লীগ টাইটেল, চ্যাম্পিয়ন লীগ, এফএ কাপ সহ সাম্ভাব্য সকল শিরোপা জিতে ইউরোপীয়ন ফুটবলের মহাতারকা হয়ে উঠলেন। ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের ক্লাবটির হয়ে মিডফিল্ডার পজিশনে খেলা রোনাল্ডো গোল করেন ৮৪ টি। ম্যান ইউর জার্সিতে জেতেন পুসকাস এবং প্রথম ব্যালন ডি’অর।

২০০৯ সালে রেকর্ড ৯৪ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফীর মাধ্যমে রোনাল্ডো চলে আসেন স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়েল মাদ্রিদে। এখানেই রোনাল্ডোর সুবর্ণ যুগ শুরু হয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত লস ব্ল্যাঙ্কোসদের জার্সিতে চারটি চ্যাম্পিয়নস লীগ জয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে জিতেছেন চারটি ব্যালন ডি’অর। ৪৫০ গোল করে রিয়েলের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনিই। চ্যাম্পিয়নস লীগের ইতিহাসেও সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তকমা তাঁরই মুকুটে।

২০১৮ সালে রিয়েলকে সম্ভাব্য সমস্ত কিছু দিয়েই ৩৩ বছর বয়সে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে সান্তিয়াগো বার্নাব্যূ ছেড়ে রোনাল্ডো পাড়ি জমান তুরিনে। জুভেন্তাসের হয়ে সিরি আ'তে নতুন যাত্রা শুরু হয় তাঁর। এখনও কার্যত জুভেন্তাসের হৃদপিন্ড হয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

ক্রিশ্চিয়ানো দেশের জার্সিতেও সমান সফল। দেশের হয়ে গোলের সেঞ্চুরি করার পাশাপাশি পর্তুগালকে জিতিয়েছেন ইউরো কাপ এবং উয়েফা নেশনস লীগ।

আজ ৩৬ বছরে পা রাখলেন রোনাল্ডো। মেদেইরা বিমান বন্দর থেকে গোটা শহর সেজে উঠছে নতুন রংএ। আজ যে তাদের যুবরাজের জন্মদিন। আজ কোটি কোটি তরুণদের অনুপ্রেরণার জন্মদিন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর জন্মদিন।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in