শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি নয়, লড়াই দেবে বাম-কংগ্রেস জোটও

শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি নয়, লড়াই দেবে বাম-কংগ্রেস জোটও
গ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

হাতে মাত্র আর কয়েকটি দিন। তার পরেই বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করতে পারে নির্বাচন কমিশন। যদিও তার অনেক আগে থেকেই বঙ্গ রাজনীতিতে প্রতিদিন বেড়ে চলেছে রাজনৈতিক উত্তাপ। কী হবে এবারে ফলাফল? মানুষ রায়ে পাল্লা ভারী হবে কার? কে দখল করবে বাংলার মসনদ? এসব প্রশ্ন ঘোরাফেরা করতে শুরু করেছে চায়ের ঠেক থেকে খেলার মাঠ, সর্বত্র।

আপাতদৃষ্টিতে উত্তাপের পারদ শাসকদল তৃণমূল ও বিরোধী হিসাবে বিজেপির মধ্যে চড়ার হিসাব সংবাদমাধ্যম দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে অন্য কথা! কারণ, এবার নির্বাচনে বিজেপিকে তৃণমূলের মূল চ্যালেঞ্জার হিসেবে দেখা হলেও বাম-কংগ্রেস জোট যে অনেক হিসেব উলটে দেবে তা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

২০১১ সালে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর থেকে বামেদের নির্বাচনী রক্তক্ষরণ অব্যাহত। ২০১৯ এর লোকসভা ভোটে ভরাডুবির চূড়ান্ত রূপ দেখা গিয়েছে। দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে জনমানসে বামেদের বিরুদ্ধে এতটাই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল যে রাজ্যের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কৃষিকে ভিত্তি করে শিল্প গড়ার প্রতিশ্রুতি রূপায়নে বিরূপ প্রতিফলন ঘটেছিল। কিন্তু সেদিন রাজনৈতিক আবেগে গা ভাসানো জনসাধারণের সেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া আজকের প্রজন্মের ভবিষ্যতকে যে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে তা এখন সবাই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। আর তাই সেদিন যে রাজনৈতিক দলের হাত ধরে বাংলার পরিবর্তন চেয়েছিল এখন সেই দলকেই সরাতে ফের পরিবর্তনের স্লোগান তুলছেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু তৃণমূলের পরিবর্তে কে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে জল্পনা! ফের বামেরা নাকি বিজেপি?

এই পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিকে ব্যবহার করে গত কয়েক বছরে বামেদের থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে গিয়েছিল বিজেপি। তার প্রভাব ইতিমধ্যেই পঞ্চায়েত ও লোকসভা নির্বাচনে স্পষ্ট হয়েছে। বামেদের ভোট নিজেদের ঝুলিতে ভরে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে বিজেপি। স্বাভাবিকভাবেই একুশের বিধানসভা নির্বাচনেও মানুষের মধ্যে সেই প্রভাব কাজ করছে বলে মনে করছে একাংশ। কিন্তু তলায় তলায় হাওয়া আবার অন্যদিকে বইতে শুরু করেছে। গত একবছরে করোনা-ঘূর্ণিঝড় আমফান ও কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের কৃষিবিল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির মতো ঘটনা বদলে দিয়েছে বাম রাজনীতির সমীকরণ। আর সেই বদলের উপর ভর করে বামেরা ফের বাংলায় প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পেতে শুরু করেছে। একথা এক বাক্যে স্বীকার করে নিচ্ছে বাম বিরোধীরাও। তৃণমূল-বিজেপির ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে বাম-কংগ্রেস এর ধর্ম নিরপেক্ষ জোটের পক্ষে জনমত তৈরি হচ্ছে।

জনসাধারণের মধ্যে একথা শোনা যাচ্ছে, বাম আমলের থেকে তৃণমূল আমলে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক হিংসার ক্ষেত্রে। এর পাশাপাশি করোনা সংক্রমণের জেরে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন মানুষের মনে উদয় হতে শুরু করে দিয়েছে। এই অতিমারী পরিস্থিতিতে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের যে কাজ করা উচিত ছিল বামেরা সরকারে না থেকেও সে কাজ করেছে। করোনা ও আমফান পরিস্থিতি বাম গণসংগঠনের কর্মীরা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজ করে চলেছে একদম প্রথম থেকেই। গোটা রাজ্যে এক লক্ষের বেশি মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিলি থেকে শুরু করে লকডাউনে বিপর্যস্ত পরিবারগুলির জন্য রাজ্যজুড়ে কয়েকশো বিনামূল্যে সবজি বাজার, ৬০০ এর বেশি কমিউনিটি কিচেন, ৫ টির বেশি শ্রমজীবী ক্যান্টিন, বিনামূল্যে বই-খাতা, এমনকি স্যানিটারি ন্যাপকিন পর্যন্ত মানুষের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওযার কাজ করে চলেছে তারা। এখনও পর্যন্ত এই কর্মসূচি সফলভাবে চাালিয়ে যাচ্ছে তারা। স্বাভাবিকভাবেই অতিমারির সময় বামেদের কাজকর্ম মানুষের মধ্যে ফের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের সিএএ-এনআরসি নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে তাতেও রাজনৈতিকভাবে অনেকটা লাভবান হবে বামেরা। কারণ সিএএ-এনআরসি নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূল যে একই পথের পথিক তা মানুষের কাছে পরিষ্কার। তাই একুশের নির্বাচনে এটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে বলেই মনে করা যায়।

আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দলবদলের খেলা। রাজ্যের মানুষ যে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনতে চেয়েছিলেন, এখন দেখা যাচ্ছে সেই তৃণমূলের নেতারাই দলবদল করে বিজেপির মুখ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আর তার ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। এই বিভ্রান্তি বাম-কংগ্রেস জোটের পক্ষে সুবিধা জনক হবে বলেই মনে করা যাচ্ছে।

আর এই সমস্ত সমীকরণ দেখে একথা বলাই যায়, যারা মনে করছিলেন, এবার নির্বাচনে লড়াই শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি হবে, এখন তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন বাংলার রাজনীতিতে ফের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে লড়াইয়ে অন্যতম শক্তি হিসাবে উঠে আসছে বাম-কংগ্রেস জোট।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in