

দেশে এই প্রথম পরোক্ষ মৃত্যুতে (Passive Euthanasia) সায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। সম্মানজনক মৃত্যুর অধিকারকে সংবিধানের ২১তম অনুচ্ছেদের আওতায় ২০১৮ সালে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। এই প্রথম তার আইনি প্রয়োগ হল। ৩২ বছরের হরিশ রানার নিষ্কৃতি মৃত্যুর অনুমতি দিল আদালত।
দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে কোমায় রয়েছেন হরিশ রানা। তাঁর বাবা মায়ের অনুরোধে তাঁর জীবনদায়ী ব্যবস্থা খুলে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ। নিষ্কৃতিমৃত্যু নিয়ে একটি নির্দিষ্ট আইন আনার বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা উচিত কেন্দ্রের বলে মনে করছে আদালত।
পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের বাসিন্দা হরিশ। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি টেক করছিলেন। অত্যন্ত প্রতিভাবান ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের টপার ছিলেন। যে বাড়িতে পেয়িং গেস্ট থাকতেন তিনি, ২০১৩ সালে তারই পাঁচ তলা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর চোট পান তিনি। সেই থেকে কোমায় রয়েছেন। টিউবের মাধ্যমে তাঁর শরীরে পুষ্টিকর পদার্থ চালান করতে হয়, এই পদ্ধতিই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কোনও চেতনা নেই তাঁর।
চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে করতে ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়ছিলেন বৃদ্ধ দম্পতি। চিকিৎসকরাও জানিয়ে দিয়েছিলেন হরিশের সেরে ওঠার আর কোনও সম্ভাবনা নেই। তাই ২০২৪ সালে অসুস্থ ছেলের পরোক্ষ নিষ্কৃতিমৃত্যু চেয়ে দিল্লি হাই কোর্টে আবেদন করেন হরিশের বাবা অশোক রানা। মামলা যায় সুপ্রিম কোর্টে। তাঁকে Passive Euthanasia দেওয়া যায় কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য নয়ডা জেলা হাসপাতালে একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। এ বছরের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির শুনানি হয়। মেডিক্যাল বোর্ড এবং কেন্দ্রের সঙ্গে বহুস্তরীয় আলোচনার হয়। কিন্তু রায়দান স্থগিত রাখে শীর্ষ আদালত। অবশেষে বুধবার হরিশের নিষ্কৃতিমৃত্যুর অনুমতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
রায়দানের সময় আদালত জানিয়েছে, দু’টি মেডিক্যাল বোর্ডই হরিশের জীবনদায়ী ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে সায় দিয়েছে। তাঁর বাবা-মাও চান তাঁকে কৃত্রিম পুষ্টি দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হোক। তাই এখানে আদালতের আলাদা করে হস্তক্ষেপের কোনও প্রয়োজন নেই।
আদালত জানিয়েছে, দিল্লির এইমস-এ রোগীর সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে সুপরিকল্পিতভাবে তাঁর জীবনদায়ী ব্যবস্থা সরাতে হবে। তাঁকে বাড়ি থেকে দিল্লী নিয়ে আসার ব্যবস্থা এমইস কর্তৃপক্ষকেই করতে হবে।
রায়ে হরিশের বাবা-মায়ের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন বিচারপতি পারদিওয়ালা। তিনি বলেন, “দীর্ঘ ১৩ বছর তাঁরা পুত্রের পাশ থেকে সরেননি। তাঁর পরিবার কখনও তাঁকে ছেড়ে যায়নি। কাউকে ভালোবাসার মানে হল জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও তাঁর পাশে থাকা।“ রায় পড়তে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন হরিশের বাবাও। রায় ঘোষণার পর সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি বলেন, “এই রায়ের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। ঈশ্বরের অশেষ কৃপা, বিচারপতিরা আমাদের কথা শুনেছেন। আমরা যা চেয়েছিলাম, সেই রায়ই দিয়েছেন তাঁরা। চিকিৎসকদের কাছ থেকে অনেক সহযোগিতা পেয়েছিলাম।‘’
তিনি আরও বলেন, “এই সিদ্ধান্ত হরিশ এবং আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। মৃত্যুই একমাত্র ওকে নিষ্কৃতি দিতে পারে। গত ১৩ বছর ধরে তিলে তিলে যে কষ্ট ভোগ করছে, সেই কষ্ট থেকে নিষ্কৃতি পাক আমার সন্তান।“ কথাগুলো বলার সময় কান্নায় গলা বুজে এসেছিল তাঁর।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন