'মনুস্মৃতি’র প্রশংসায় দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি প্রতিভা - সমালোচনার ঝড় দেশজুড়ে

AIDWA জানিয়েছে, বিচারক মনে হয় ভুলে গেছেন যে, ভারত বহু ধর্মের দেশ। মনুস্মৃতিকে 'আমাদের ধর্মগ্রন্থ' হিসাবে বর্ণনা করে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চেয়েছেন।
দিল্লি হাইকোর্টের বিচারক প্রতিভা এম সিং
দিল্লি হাইকোর্টের বিচারক প্রতিভা এম সিংছবি সৌজন্যে নিউজক্লিক

‘আমাদের ধর্মগ্রন্থ ‘মনুস্মৃতি’তে মহিলাদের সম্মানের কথা বলা হয়েছে।’ একথা কোনও ধর্মগুরু বা রাজনীতিকদের নয়। এমন মন্তব্য করেছেন দিল্লি হাইকোর্টের বিচারক প্রতিভা এম সিং (Justice Prathiba M. Singh)। যা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বুধবার, দিল্লিতে ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (FICCI)-র এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন দিল্লি হাইকোর্টের বিচারক প্রতিভা এম সিং। সেখানে তিনি বলেন, মনুস্মৃতির মতো প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র মহিলাদের ‘সম্মান’ দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ভারতীয় মহিলা হিসাবে আমরা সৌভাগ্যবান। কেননা, এ দেশের প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র মনুস্মৃতি মহিলাদের সম্মানজনক জায়গা দিয়েছে। যেমন, মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে - যদি আপনি মহিলাদের সম্মান না করেন, তাহলে আপনার পূজা-অর্চনার কোনও মূল্য নেই। আমি মনে করি, বৈদিক শাস্ত্র এবং আমাদের পূর্বপুরুষেরা মহিলাদের সম্মান করতে জানতেন।’

বর্তমানে দেশেজুড়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা এবং গণিত (STEM)-এর ক্ষেত্রে মহিলাদের কিভাবে ‘অদৃশ্য বাধা’র সম্মুখীন হতে হচ্ছে, তা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এমনই মন্তব্য করেন দিল্লি হাইকোর্টের বিচারক।

তবে, বিচারপতি সিং-এর এই ধরণের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন একাধিক ব্যক্তি ও সংস্থা। একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বিচারক হিসাবে প্রতিভা এম সিং কিভাবে ‘মনুস্মৃতি’র প্রশংসা করেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রেস বিবৃতি দিয়ে বিচারপতি সিং-এর মন্তব্যের তীব্র আপত্তি জানিয়েছে অল ইন্ডিয়া ডেমোক্রেটিক উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন (AIDWA)।

এক প্রেস বিবৃতিতে AIDWA জানিয়েছে, ‘প্রথমত মনুস্মৃতির আসল উদ্ধৃতি হল, 'দেবতারা এমন জায়গায় বাস করেন যেখানে নারীদের সম্মান করা হয়'। এই পাঠ্য থেকে অন্যরাও অন্তত দশটি উদ্ধৃতি দিতে পারেন। তাঁরা বলতে পারেন, সেখানে মহিলাদের সম্পূর্ণরূপে যৌন আবেগ দ্বারা চালিত করা হয়েছে। সেখানে মহিলাদের স্বাধীনভাবে কাজ করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে।’

‘মনুস্মৃতি’ নিয়ে প্রেস বিবৃতিতে AIDWA জানিয়েছে, মনুস্মৃতিকে 'বৈদিক পাঠ' বলে দাবি করেছেন বিচারক। কিন্তু, এটি তা নয়। ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য বিস্তার এবং তা শক্তিশালী করতে, এক বিশেষ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এটি রচিত হয়েছে। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, এক বিচারক ভারতীয় সংবিধান এবং আইনি ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করেছেন, যা তিনি মেনে চলার শপথ নিয়েছেন।’

মহিলাদের সংগঠন AIDWA-র পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ‘বিচারক মনে হয় ভুলে গেছেন যে, ভারত বহু ধর্মের দেশ। মনুস্মৃতিকে 'আমাদের ধর্মগ্রন্থ' হিসাবে বর্ণনা করে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে চেয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি ভারতীয় জনগণের বিশাল অংশ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করছেন। মনে রাখতে হবে, শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের মাধ্যমে ভারতীয়রা একে অপরের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারেন; এখানে মনুস্মৃতির কোন মূল্য নেই।’

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সকলের জন্য ন্যায়বিচারের প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে তিনি কখনই এটি (এই মন্তব্য) করতে পারেন না। বর্তমানে আমরা কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছি। প্রায় প্রতিদিনই শাসক দলের রাজনীতিবিদরা নারীদের অবমাননা করছে। জনজাতি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অপমান করেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে নৃশংসতাকে অনুমোদন দিচ্ছেন। এমন সময়ে বিচার বিভাগের কেউ যদি পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব পোষণ করেন, তাহলে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়বে।’

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in