ঠান্ডি রাত, বুলন্দ হোসলা - টিকরি সীমান্ত থেকে

সাধারণ মানুষ তো বটেই, অসাধারণ মানুষদেরও দেখেছি, সামনে ক্যামেরা ধরলে কিরকম জবুথুবু হয়ে যায়। এদিকে এদের দেখছি হুঁকোয় টান দিয়ে, ইনক্লাব জিন্দাবাদ বলে অনর্গল ২০ মিনিট বলে যেতে। কোনো ভারী-ভারী শব্দ নেই।
ঠান্ডি রাত, বুলন্দ হোসলা - টিকরি সীমান্ত থেকে
টিকরি সীমান্তেছবি উদিত সেনগুপ্ত

বাগডোগরা এয়ারপোর্টে সিকিউরিটি চেকিং করানোর সময় দেখি প্রচুর লোক কম্বল নিয়ে যাচ্ছেন। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা দিল্লিতে। মনে মনে ভাবলাম এই যে বর্ডারে যাবো, সেখানে রাতে থাকতে হবে। দিল্লি নেমেই একটা কম্বল কিনতে হবে। মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিলো কম্বলের কথা।

প্লেন থেকে নেমে এক বন্ধুর বাড়িতে উঠেছি। পরের দিন সকালে বেরোতে হবে বলে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে বেরিয়ে অটো ধরলাম। দিল্লির বুক দিয়ে রবিবারের সকালে অটো ছুটে চলছে। চারিদিকে বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়। দেশ চালানোর সব অফিস। দেশের মানুষের জন্য ১০-১২ তলা অফিস। কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ হয় এসব দপ্তর থেকে। এরকমই কোনো দপ্তর থেকে কিছু মাস আগে কয়েকটি আইন পাশ হয়েছে দেশের মানুষের জন্য। আমি সেই মানুষদেরই মাঝে যাচ্ছি যারা সেই আইন মানছেন না। এক অদ্ভুত শিহরণ সারা শরীরে।

যেতে যেতে বারবার ভাবছি, গিয়ে হবেই বা কী? এ কি প্রবল রোমান্টিসিজম যা আমায় টেনে নিয়ে চলেছে দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে? কয়েকজন মানুষ তাঁবুর নিচে বসে আছে। এই দেখতেই কি এতদূর ছুটে যাচ্ছি? নিজেই নিজেকে বোঝাচ্ছি যাওয়া উচিৎ। কিন্তু কেন যাওয়া উচিৎ সেটা কিছুতেই বোঝাতে পারছিনা। কৃষিকাজের নিয়ম বা সমস্যা পেপার আর বই পড়ার মাধ্যমে যা জানার জানি। তার বেশি তো কিছু নয়। তাহলে কি নেহাতই অজানাকে জানার টানে যাচ্ছি? আবার অনেক সময় মনে হচ্ছে, কতো কিছুই তো জানি না। সব জিনিস এভাবে টানে না কেন? উত্তরগুলো গিয়ে তাদের মাঝে থাকার পর পেয়েছিলাম।

এক জায়গায় অটো থামলো। ভাড়া দেওয়ার পর অটোচালক বললেন, সাহেব, এই আন্দোলন দেখতে এসছেন? হিন্দিতেই বললেন। ‘হ্যাঁ’ বলার পর বললেন, ‘জয় জওয়ান জয় কিসান’। এই চারটি শব্দের কোনো ভাষা হয় না। এটা মানুষের ভাষা। সহমর্মিতার ভাষা। একসাথে থাকার ভাষা। আবেগপ্রবণ আমি কোনোকালেই নই। তবে দুর্গাপূজার সময় যেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করে সব বাঙালীর মনে, ঠিক সেইরকম অনুভূতি হচ্ছিলো। বিপ্লব একটা উদযাপন তো বটেই।

যাই হোক। টিকরি বর্ডারে পৌঁছে মনে পরলো এই তাড়াহুড়োতে কম্বলের কথাটা মাথা থেকেই বেরিয়ে গেছে আবার। মনে মনে ভাবলাম আজ আবার ফেরত যেতে হবে। একটা কম্বল কিনে পরের দিন ফেরত আসবো।

আমি যেদিন টিকরি পৌঁছলাম তার আগের রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছে। রাস্তায় জল জমে গেছে। সকালে আমরা গেলাম বর্ডারে। ঢোকার সময়েই পুলিশ ব্যারিকেড। সবিনয়েই বলল, গ্রামের ভেতর দিয়ে ঘুরে যান। সেই মত গ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে দেখি, গ্রামের লোকেদের সাথে আন্দোলনকারী কৃষকেরা মিলে মিশে একাকার। সত্যি কথা বলতে কি, একটু দাঁড়িয়ে না গেলে বুঝতেও পারতাম না এনারা নিজেদের গ্রাম ছেড়ে এক ভিন্ন গ্রামকেই নিজেদের ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছেন। রাস্তার মধ্যে দিক নির্দেশিকা আছে। তার নিচে বসেই কেউ কেউ হুঁকো টানছেন। কোনো কৃষক আন্দোলনেকারী সেই গ্রামের বাচ্চার সাথে ক্রিকেট খেলছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনছে গ্রামের দোকান থেকে। বৃদ্ধ শিখ কৃষককে দেখলাম যে হয়তো পাঞ্জাবি ভাষা ছাড়া আর অন্য কোনো ভাষা জানেন না, সে তার ভাষাতে কথা বলছে আর দোকানদার তার দিল্লির হিন্দি ভাষায় জবাব দিচ্ছেন। দোকানদারের কথা শুনে আন্দাজ করলাম ওনারা নিজেদের বাড়ির গল্প করছেন। কি সুন্দর আড্ডা। সত্যজিৎ রায়ের আগন্তক সিনেমায় উৎপল দত্ত যেমন বলেছিলেন, "আড্ডা আ্যট ইটস হাইয়েস্ট লেভেল। পরনিন্দা নয়, পরচর্চা নয়, নিছক আড্ডা।"। ঠিক সেইরকম আড্ডা।

রাস্তায় জমা জল-কাদা পেরিয়ে যাচ্ছি। সাদা জুতো আর জিন্সে কাদা ছিটে আসছে। ভাবছি যে এই ভাবে নোংরা হলে আবার কবে ধুতে পারবো। ভাবতে ভাবতেই দেখতে পেলাম রাস্তার ওপর লাইন দিয়ে রাখা গোটা ১০ ওয়াশিং মেশিন। এ যেন গুপি-বাঘার যাদুজুতো পেয়েছি। চাইলেই সব পাওয়া যাচ্ছে।

হেঁটে যাচ্ছি। যত ভাবছি এখুনি শেষ হবে, ততই মনে হয় রাস্তা বেড়ে চলছে। এ রাস্তা শেষ হওয়ার নয়। এ রাস্তা যেন Stairway to Heaven. স্বর্গরাজ্য কায়েম করার রাস্তা। যেতে যেতে দেখলাম এক পাশে লাইব্রেরি৷ প্রচুর বই। কেউ দান করতে চাইলে সেখানে দিয়েও যেতে পারেন। চেয়ার পাতা। কেউ এসে ওখানে পড়তে পারে। বই নিয়েও যেতে পারে। লোকজন পড়ছেও। তাঁবু লাইন দিয়ে টানানো। খুব কম তাঁবু আছে যেখানে উঁকি মেরে দেখলে, কেউ পড়ছে না, এটা দেখা যাবে না। পড়াশোনা ও বিপ্লবের এই হাতে হাত রেখে এগোনোর স্লোগান তো SFI এর তোলা স্লোগানের সাথে মিলে গেলো। Study and Struggle। একটু দূরে যেতেই দেখি এক তাঁবুর তলায় বাচ্চারা বসে। সেটা নাকি স্কুল। বাচ্চাদের পড়াশোনায় যাতে কোনো ক্ষতি না হয়। এক মহিলা পড়াচ্ছেন তাদের। পাশে লস্যির লঙ্গর। হাত বাড়িয়ে এক গ্লাস লস্যি নিয়ে এগিয়ে চললাম AIKS এর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে।

AIKS এর তাঁবু ঠিক পন্ডিত শর্মা মেট্রো স্টেশনের থেকে ১০০ মিটার। এক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে সেই তাঁবুর মধ্যে। ঢুকে দেখি এক সত্তর বছরের কৃষক, পাগড়ি মাথায় আর বুকে কাস্তে হাতুড়ি ব্যাজ পড়ে বসে। হাতে তার একখানা বই। AIKS এর বই। আমি ঢুকে জিজ্ঞেস করলাম এটা কি AIKS এর তাঁবু? শিশুসুলভ উৎসাহ নিয়ে বললেন "হা। ইয়ে দেশ কা সাবসে পুরানা কিষাণ সংস্থা হে। মুঝসে ভীঁ উমর মে বড়া হে"! সেখানে বিশাল আয়োজন। চেয়ার টেবিল পাতা। কয়েকজন লোক অনবরত রুটি বানাচ্ছে। দু'জন সবজি বানাচ্ছেন। মিশেলি তরকারির গন্ধে তাঁবু ভরে উঠেছে। বসার সাথে সাথে এক বোতল করে জল দিলেন একজন। নাম তার সুরিন্দর। তবে নামের আগে "বাতাইয়ে, কেয়া সেবা কর সাকতা হু!" বললেন। "সেবা"ই বটে। বিনিময়মূল্যহীন এই সম্পর্ক। আমি কিই বা আর করতে পারি এদের জন্য। জল খাওয়ার পর নিজেরাই বললেন যে খানা খানে কে বাদ, দুধ পিকে যানা। এখনকার দিনে কারোর বাড়ি গেলে, বিশেষত অপরিচিত কারোর বাড়ি গেলে, এরকম আন্তরিকতা কি সত্যি পাওয়া যায়? আজকালকার দিনে এরম রূপকথা বাস্তবিকতায় বদলে যেতে দেখে খানিকটা চুপ হয়ে থাকলাম। তরুণ প্রেমিক যখন তার প্রেমিকার ঠোঁটে প্রথম চমু খায়, সেই ভালোবাসার স্পর্শে দুজনই যেমন অনেকক্ষণ নির্বাক হয়ে যায়, এদের সেই ভালোবাসার স্পর্শ আমায় সেরকমই নির্বাক করে দিয়েছিলো।

পাশে যে ভদ্রলোক বসেছিলেন, তিনি আমাদের হয়তো সাংবাদিক ভেবেছিলেন। কিঞ্জলদাকে দেখে বললেন, নিকালো ক্যামেরা। ম্যায় বোলতা হু। আপ ফ্যায়লা দেনা হার জাগা মে।" সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক অসাধারণ মানুষদের দেখেছি, সামনে ক্যামেরা ধরলে কিরকম জবুথুবু হয়ে যায়। এদিকে এনাদের দেখছি হুঁকোয় টান দিয়ে, ইনক্লাব জিন্দাবাদ বলে অনর্গল ২০ মিনিট বলে যেতে। কোনো ভারী-ভারী শব্দ নেই। কোনো বেলাইনের কথা নেই। হিংসাত্মক ভাব নেই। শুধু নিজেদের দাবী আর কৃষি বিল। হ্যাঁ। বেশ কয়েকবার বলতে বলতে "ভদ্রসমাজে বলা যায় না" এরকম ভাষা উচ্চারণ করছেন তিনি। কিন্তু এটাই তো মাটির ভাষা। পলিটিকাল কারেক্টনেসের কোনো দায় নেই এদের। দায় থাকা উচিৎও না বলে আমিও মনে করি।

গল্প চলছে। এরই মাঝে দেখলাম একদল বুড়ো মানুষ ঢুকলো। এসে বলে গেলো, বেটা, এক গাল পে মারে, তো দুসরা গাল আগে কর দেনা। হাত নহি উঠানা হে। দিমাগ ঠান্ডা রাখনা হ্যায়।

এরই মাঝে বুড়ো লোকটার সাথে একটা ছবি নেবো, আর ঠিক তখনই মোবাইলের চার্জ শেষ। পাশে দাঁড়িয়ে এক বছর ২৫ এর ছেলে বললো, হামারা ট্র‍্যাক্টর পে চার্জ কর দিজিয়ে। কিঞ্জলদাও বললো, সে চার্জ করবে। মোবাইল চার্জে বসিয়ে দেওয়ার পর কিঞ্জলদা বললো, চল একটু ঘুরে আসি। অনেক দূর চলার পর, একই সাথে মনে হলো যে ছেলেটাকে চিনি না। দেখাও হয়নি, সেখানে দুজনের মোবাইল চার্জে বসিয়ে চলে এসছি অনেক দূর। রাস্তাটা খুঁজে পেতে সমস্যা। চেনা পরিচিত সাজানো ছকের গোছানো শহরে রাস্তা খুঁজে পাওয়া যত সহজ, বিপ্লবের টানে স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের গড়া ঠিকানা খোঁজা ততটাই কঠিন।

কিঞ্জলদা বলল, কোনো মন্দির-দরগাতে ঢুকতে যাওয়ার সময় বাইরে জুতো খুলে এতটা নিশ্চিন্তে যাওয়া যায় না, যতটা নিশ্চিন্তে এক অজানা সাথীর অচেনা ট্র‍্যাক্টরে মোবাইল চার্জে বসিয়ে এসেছি। অনেকক্ষণ লাগলো ঠিকানা খুঁজে পেতে। বারবার একি রাস্তা দিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছি। হঠাৎ চেনা কন্ঠ কানে আসলো। "ভাইসাহাব, ইধার আজাও। মোবাইল চার্জ হো গ্যয়া"।

মোবাইল চার্জ হতেই প্রথমেই ফেসবুক খুললাম। একটা পোস্টার চোখে পড়লো। এক মাঝারি উচ্চতার লোক ধুতি পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে আছেন। ২২ বছরের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি আমার রাজ্যের। তার নিচে লেখা, " মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ। মানুষই ইতিহাস রচনা করেন।

মোবাইল চার্জ হয়ে গেছে। এবার ভাবলাম একটু ছবি তোলা যাক। যদিও খুব ভালো ছবি তুলতে পারি না। তবে এটাও ঠিক পৃথিবীর তাবড় তাবড় ফটোগ্রাফার আসলেও এই আন্দোলনের মূহুর্তগুলিকে ঠিক কতটা ক্যামেরাবন্দী করতে পারবেন, এই নিয়ে সন্দেহ আছে। ভালোবাসা আর আবেগকে কি ক্যামেরাবন্দী করা যায়? শব্দেও কতটা বর্ণনা করা যায় সেটাও জানি না। হয়তো রবীন্দ্রনাথ পারতেন। বা হয়তো মার্কেজ। আমার দ্বারা এ কাজ হওয়ার নয়। তাই সিধু জ্যাঠাকে স্মরণ করে মনের জানলা খোলা রেখে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম।

AIKS এর পতাকা হাতে একখানে দেখলাম বছর ৬ এর, হুবহু এক দেখতে, দুজন ছেলে দাঁড়িয়ে। পাশে লাল পাগড়ি পরে তাদের বাবা। "আপ AIKS সে হো? হাম বাঙাল সে হে" বলাতে জড়িয়ে ধরলেন। আদি অনন্তকালের সম্পর্ক আমাদের মধ্যে যে ছিল, আমরা যেন একে অপরকে বহুকাল ধরে চিনি, একে অপরের সব জীবনযুদ্ধের সাথী এই কথাটা বারবার মনে হতে লাগলো। রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়েই গল্প করছিলাম, এমন সময় যমজ ভাইয়ের একজন বলে উঠলো, সাইড মে খাড়া হো যাও। ট্র‍্যাক্টর ঘুস রহা হে। সত্যি তো। হাজার হাজার ট্র‍্যাক্টর ঢুকছে। আর আমি বোকার মতো রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। স্কুলে পড়ার সময় টিচাররা বলতেন, এক লাইনে যাও। লাইন থেকে বাইরে যেও না। তারপর ২০ বছর প্রায় কেটে গেলো। আমি বড় হইনি। কিছুই শিখিনি। এই ৬ বছরের দু ভাই শিক্ষক রূপে অবতীর্ণ হলো আমার চোখের সামনে। এদের কাছে ডিসিপ্লিন্ড হতে শিখলাম আবার। আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত হলেও, তাতেও ডিসিপ্লিন্ড হতে হয়। আমার স্কুল, কলেজ আমায় যা শেখায়নি, এই দু’জন তাই শেখালো।

আমি মজা করেই বললাম, তোমরা ঘুমাতে যাবে না? বললো, আমাদের ডিউটি তাহলে আপনি করুন। আমরা ঘুমালে কে জাগবে? মাষ্টারমশাইয়ের এরকম বকুনি খেয়ে তাদের বাবার সাথে কথা বলাটাই শ্রেয় মনে করলাম।

সুরিন্দরের গ্রাম তে কালান্দার। জালালাবাদ তেহেসিলে। জেলা ফাজিল্কা। তাদের জমির অর্ধেক ভাগ পাকিস্তানের মাটিতে। সেনা তাদের পাস দিয়েছেন। তারা তারকাঁটা পেরিয়ে সেই দেশে যায়৷ চাষ করে। আবার চলে আসে। তার দাবী, সে দেশের সরকার তার জমি নিয়ে এরকম করছেন না যা এই দেশের সরকার করছে। সেই দেশ যাকে সে নিজের মনে করে। এরই মধ্যে পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো একজন যুবক। সুরিন্দর ওকে ডেকে বললেন, উদিত, ইনি আপনাদের ভাষা বলেন। আপনাদের ওদিকে থাকেন। নাম জানলাম আর্য ওরাও। ফাইবারের ভাস্কর্যের কাজ করেন। ছোটুরামের মূর্তি কাঁধে তার মৃত চাষির এক ভাস্কর্য গড়ে তুলছেন। এরকম নিপুণ কাজ যা সহজের Louvre এ স্থান পেতে পারে। বিপ্লব। পাঠশালা। লিঙ্গ সমতা। গান। কবিতা। শিল্প। রেঁনেসাঁ ছাড়া আর কি বলা যায় একে?

কিছুদিন আগে এক নেতা বলেছিলেন, "পঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা, দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ" থেকে "সিন্ধু" বাদ দিতে হবে। কারণ সেটা পাকিস্তানে। তিনি যদি সুরিন্দরের মন কি বাত শুনতেন? তিনি কি আদৌ জানেন এই ব্যাপারে? এ সব প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে খেতেই রওনা দিলাম ট্রাক্টরের দিকে ঘুমাতে। ট্র‍্যাক্টরে উঠতে যাবো, এরই মধ্যে সতীশ, যার ট্র‍্যাক্টর, সে বললো, জলের বোতলটা ধরুন। রাতে পিপাসা পেতে পারে।

শীতের রাতের তাপমাত্রা তখন বোধহয় ২ ডিগ্রী। ট্রাক্টরের মধ্যে বিছানো ফোমের ওপর চাদর। তার ওপরে কম্বল চাপা হয়ে আমি আর ৪ জন সাথী। একজন সাথী সারারাত তার মধ্যে লাঠি হাতে জেগে রয়েছেন৷ বাইরে থেকে আসায়, তারা কোনো রকম ঝুঁকি নিতে চাননি আমাকে নিয়ে। হতেও তো পারে যে আমি এখানে তাদের আন্দোলন ভন্ডুল করে দিতে এসেছি। মজার বিষয় হলো, চোখাচোখি হলেই হাত জোর করে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন। আর জিজ্ঞেস করছেন আমি চা খাবো নাকি। তিনি হরিয়ানার জিন্দ জেলার নারবানা গ্রামের বাসিন্দা। আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম যে ৮ বছর আগে তাদের গ্রামে আমি কাজ করার সূত্রে ছিলাম বহু দিন। তাই নিয়ে তার সন্দেহ কমলো তো নাই, বরং বাড়লো।

যাই হোক, তখন কাকভোর। হালকা ঘুম ভেঙেছে। কানে আসছে "জয় রাম জয়ব্রাম, জয় সিয়া রাম" আর ইন্টারলিউডে ট্র‍্যাক্টর আসার আওয়াজ আসছে অবিরত। সারা রাত যে কত হাজার ট্র‍্যাক্টর আসছে তার ইয়ত্তা নেই। ট্র‍্যাক্টরের ট্রলির ত্রিপলের পর্দা সরিয়ে দেখলাম এক জায়গায় আগুন জ্বলছে। বৃদ্ধ মহিলারা সেখানে আগুন তাপছেন। আর চা বানাচ্ছেন দু'জন শিখ ভদ্রলোক। কিঞ্জলদা ঘুমচোখেই বলে উঠলো, "উত্তাল গণআন্দোলন কি লিঙ্গসমতার আন্দোলনের লঞ্চপ্যাড হিসেবে কাজ করছে?"

গিয়ে বসলাম তাদের পাশে। এক কাপ চা না চাইতেই হাতের সামনে ধরলেন শিখ বৃদ্ধ। মধ্যবিত্ত বাঙালী সুলভ ভদ্রমানুষের মত বললাম, "নহিঁ পিনা হে তাউজি"! তাউজি হেসে বললেন, "আপ তো বাঙালী হো। আপকো তো খানা হ্যায়। আউর বেটা, ইনকিলাব কে সময় না নহি কেহনা চাহিয়ে"! অতএব, দীর্ঘ ৬-৭ বছর পর সকাল সকাল মোষের দুধের চা কপালে জুটলো।

আমি গিয়ে বসলাম আগুনের কাছে। কনকনে ঠান্ডার থেকে বাঁচতে। এক দিকে আন্দোলন আরেক দিকে আগুনের উত্তাপ। এরই মাঝে এক মহিলা বলে উঠলেন, "কঁহা সে আয়া বাচ্চা?" পশ্চিমবঙ্গের বলাতে বললো, "মোদি তো আপকে উঁহা বহুত লাফরা কর রহা হে। উনকা কাম নহি হে হিন্দু-মুসলমান কো লড়ানে কে সিওয়া"!

১৫ মিনিট কেটে গেছে, তবুও "জয় রাম জয় রাম জয় সিয়া রাম" ছাড়া আর কোনো গানের শব্দ তখনও শুনি নি। এরই মাঝে দেখলাম সূর্য আকাশের কোণে উঁকি দিচ্ছে। টিকরি জেগে উঠছে নতুন ভোরকে আলিঙ্গন করতে।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in