ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের ৫৪তম বর্ষপূর্তিতে রাজ্য জুড়ে ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের প্রতিবাদ, আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

কেন্দ্র সরকার সাধারণ মানুষের কথা না ভেবে, পুঁজিপতিদের স্বার্থে ব্যাংক বিজাতীয়করণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কলকাতায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে একথা জানান ব্যাঙ্ক অফিসারস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় দাস।
বিবাদী বাগে ব্যাঙ্ক বাঁচাও পথসভা
বিবাদী বাগে ব্যাঙ্ক বাঁচাও পথসভাছবি সংগৃহীত

মুষ্টিমেয় কিছু ধনী শিল্পপতিদের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতি আম জনতার উন্নতিতে ব্যবহারের জন্য ব্যাংক জাতীয়করণ হয়েছিল। তার ফল সাথে সাথে পাওয়া গিয়েছিল দেশের বিকাশ দরের উন্নতির মাধ্যমে। ১৯৬৯ সালের আজকের দিনেই তা করা হয়েছিল। অথচ বর্তমান কেন্দ্র সরকার সাধারণ মানুষের কথা না ভেবে, পুঁজিপতিদের স্বার্থে ব্যাংক বিজাতীয়করণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সংসদে। মঙ্গলবার কলকাতায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে একথা জানান অল ইন্ডিয়া ন্যাশনালাইজড ব্যাঙ্ক অফিসারস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় দাস।

মঙ্গলবার ৫৪তম ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ দিবস উপলক্ষ্যে কলকাতায় জীবনদীপ ভবনের সামনে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংযুক্তিকরণ, বেসরকারিকরণের প্রতিবাদ জানানো হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ বিভিন্ন কর্পোরেট পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের আমানত লুঠ করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে সরব হন ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ। সভায় বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৌম্য দত্ত, অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিত বোস প্রমুখ। সভায় সভাপতিত্ব করেন কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি।

এদিন শিলিগুড়িতে সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেন, ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষকে ব্যাঙ্কিং পরিষেবার আওতায় নিয়ে আসা। আজকের দিনে ব্যাঙ্ক শুধু আদানি আম্বানির জন্য। ব্যাঙ্কে কর্মী নিয়োগ হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের আমানত বিপদের মুখে। দেশের অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাঙ্কের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। ব্যাঙ্কগুলোকে দেউলিয়া করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ বেসরকারি মালিকানায় নিয়ে যাবার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা তার বিরোধিতা করছি।

এদিন রাজ্যজুড়ে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ দিবস উপলক্ষ্যে সর্বত্র প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়। মিটিং, মিছিল, আলোচনাসভার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক বিরোধী ভূমিকার সমালোচনা করা হয়। ব্যাঙ্ক কর্মীদের তরফ থেকে স্লোগান ওঠে - ব্যাঙ্ক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও। সন্ধ্যায় ৫৪তম ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ দিবস উপলক্ষ্যে বিবাদী বাগে বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্সের সামনে এক বিরাট পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।

মঙ্গলবারের সাংবাদিক সম্মেলনে সঞ্জয় দাস বলেন, ব্যাংক জাতীয়করণ দেশের সামগ্রিক উন্নতির জন্য, সকল দেশবাসীর কল্যাণের জন্য। অন্যদিকে ব্যাংক বেসরকারিকরণ সাধারণ দেশবাসীর জন্য বা ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিকাঠামোর উন্নতির জন্যে নয়। দেশের জনসাধারণের অধিকাংশই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের আশা ভরসা, বিশ্বাসের জায়গা সরকারি ব্যাংক, কারণ জাতীয়করণের পর একটিও জাতীয় ব্যাংক সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। উল্টোদিকে ১৯৯১ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত ৩৮ টি বেসরকারি ব্যাংক বন্ধ হয়েছে। সরকারের এই বেসরকারিকরণের নীতি ভারতবর্ষকে ১৯৬৯ সালের আগে পৌঁছে দেবে যে সময় মহাজন প্রথার প্রধান লক্ষ্যই ছিল সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের শোষণ করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করা।

তিনি আরও বলেন, করোনা অতিমারীর পর ভারতীয় অর্থনীতি যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার উপর এই ব্যাংক বেসরকারীকরণের নীতি কর্মী ছাঁটাই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত এবং কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করবে। এর ফলে দেশের বর্তমান যুবসমাজের প্রভূত ক্ষতি হবে। স্থায়ী পদে লোক নিয়োগ না করে দমন পীড়ন, শোষণের রাস্তা প্রশস্ত করতে ও কম বেতনে কাজ করানোর জন্য অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ চলছে।

দাস বলেন, ব্যাংক বেসরকারীকরণের পিছনে রয়েছে কিছু মুষ্টিমেয় পুঁজিবাদীদের স্বার্থসিদ্ধি। সাধারণ মানুষকে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকিং সুবিধা পেতে গেলে ব্যয় করতে হবে উচ্চ মূল্য। বর্তমানে সমস্ত সরকারী ব্যাংকগুলি মুনাফা করছে এবং সরকারকে ডিভিডেন্ড ও ট্যাক্স দিচ্ছে কিন্তু তাতেও সরকার মিথ্যে আর্থিক উন্নতির দোহাই দিয়ে ব্যাংকগুলির বেসরকারীকরণে মনোনিবেশ করেছে। সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থার অনাদায়ী সম্পদ নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত আইনানুগ ব্যবস্থা লক্ষ্যণীয় নয়।

তিনি আরও জানান, সরকার এই সরকারি ব্যাংকগুলোকে এখন ঋণ খেলাপি পুঁজিবাদীদের হাতে তুলে দেবার চেষ্টা করছে যাদের প্রধান লক্ষ্যই শুধুমাত্র মুনাফা অর্জন। ব্যাংকিং পরিষেবার গুণগত মানের পর্যালোচনা এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে এই পরিষেবা সঠিক ভাবে পৌঁছাচ্ছে কিনা তা তাদের আলোচ্য বিষয় নয়। যদিও সরকারি ব্যাংক শুরু থেকে কোনও দিন দেউলিয়া হয়নি তথাপি অনেক বেসরকারি প্রতিপক্ষ সংস্থার দরজা বন্ধ হওয়ার দায় সরকারি ব্যাংকগুলোকে নিতে হয়েছে। ডুবে যাওয়া বেসরকারী ব্যাংক ডুবে যাওয়া বেসরকারি সংস্থা, ইচ্ছাকৃত বড় বড় শিল্পপতিদের অনাদায়ী লোনই সরকারি ব্যাংকের সমস্যার কারণ। সরকারী ব্যাংক সরকারি সম্পত্তি। এই সম্পত্তি বিক্রি করে দেশের যুবসমাজকে অর্থনীতির পরাধীনতার কবলে ফেলতে দেশবাসী রাজী নয়।

প্রসঙ্গত, গত রবিবার ব্যাংকিং ইউনিয়নের সংযুক্ত মোর্চার আহ্বানে টুইট প্রচার বিশাল সাড়া ফেলেছে টুইটারে। #PublicBanksNotForSale প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে ট্রেন্ডিংয়ের তালিকায় শীর্ষে ছিল। আগামী দিনেও আন্দোলনের মাত্রা আরো বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার নেতৃবৃন্দও ব্যাংকের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছে।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in