একটি না খবর…

একটি না খবর…
ছবি প্রতীকী

মিডিয়া টিআরপি বোঝে। তাই খবরও হয় টিআরপি-র হিসেব কষে, নিক্তি মেপে।

সেই কারণেই দুই বহিষ্কৃত সাংসদের কার্যকলাপে মিডিয়ার যতটা উৎসাহ, তার থেকে ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ খবরে মিডিয়া উদাসীন থেকে যায়। আসলে গুরুত্বের মাপকাঠি নির্ধারকদের বিচারের ওপর আপামর আমজনতার ভরসা করাই হয়তো একমাত্র নিয়তি! যেখানে জনগণ কী খাবেন, কী পড়বেন থেকে শুরু করে জনগণ কোন খবরের কাগজ পড়বেন সেটাও নিয়ন্ত্রিত হয়, সেখানে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বিশেষ কারুর কারুর খাম খেয়ালীপনার শিকার হবে তাতে আর আশ্চর্যের কী!

যে ঘটনার কথা বলতে চাইছি, গুরুত্বহীন(!) সেই ঘটনা ঘটেছে গত ২৭ সেপ্টেম্বর। পাকিস্তান সীমান্ত লাগোয়া রাজস্থানের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। ডান্তাল নামক ওই প্রত্যন্ত গ্রামে সেদিন পিটিয়ে মারা হয়েছে এক সঙ্গীতশিল্পীকে। শিল্পীর যেহেতু একমাত্র পরিচয় তিনি শিল্পী, তাঁর আলাদা কোনও জাত হয়না, তাই ওই মৃত শিল্পী যে মুসলমান ছিলেন সে কথা নাহয় বাদই দেওয়া গেল।

কিন্তু ঠিক কী অপরাধে ওই শিল্পীকে পিটিয়ে মারা হল? তিনি কি চুরি ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? তিনি কি অন্য কোনও অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন? না। এসব কিছুই নয়। ওই শিল্পীর একমাত্র অপরাধ, তিনি গান গেয়ে এক মন্দিরের পুরোহিতের মনোরঞ্জন করতে পারেননি। তাই শাস্তি স্বরূপ প্রথমে তাঁর যন্ত্র ভেঙ্গে দেওয়া হয় এবং তাঁকে হেনস্থা করা হয়। অপমানিত ওই শিল্পী বাড়ি ফিরে যান। এরপর ওই রাত্তিরেই তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে এনে পিটিয়ে হত্যা করে ওই পুরোহিত এবং তাঁর শাগরেদরা।

লাঙ্গা মাঙ্গানিয়ার গোষ্ঠীর ৪৫ বছর বয়সী লোকসঙ্গীত শিল্পী আহমেদ খান পেশায় গায়ক ছিলেন। বংশানুক্রমে মন্দিরে মন্দিরে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে গান গেয়ে বেড়ানোই তাঁর একমাত্র পেশা ছিলো। এক্ষেত্রে খেয়াল করার মত বিষয় হল মসজিদ নয়, আহমেদ খান গান গাইতেন মন্দিরে মন্দিরে। ভারতবর্ষের সুদীর্ঘকালীন ‘বিবিধের মাঝে’ মহান মিলনের ঐতিহ্যর সঙ্গে যা খুবই মানানসই, এবং বর্তমান অসহিষ্ণুতার আবহে যা বড়ই বেমানান।

ঘটনার দিনও এক মন্দিরে দেবীমূর্তির সামনে গান শোনাচ্ছিলেন শিল্পী আহমেদ খান। সঙ্গীত পরিবেশন চলাকালীন ওই মন্দিরের পুরোহিত, রমেশ সুতারের মনে হয়েছিলো আহমেদ খান দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত সঙ্গীত পরিবেশনের সময় ভুল গেয়েছেন। তাই তিনি হাতেনাতে শাস্তি দেন নিজেই। প্রথমে শিল্পীর যন্ত্র ভেঙ্গে, তাঁকে হেনস্থা করে এবং পরে দলবল নিয়ে ওই শিল্পীকে বাড়ি থেকে তুলে এনে পিটিয়ে হত্যা করে।

যদি এখানেই এই ঘটনাটা শেষ হয়ে যেত তাহলে নাহয় ‘এক শিল্পীর অপমৃত্যু’ শিরোনামে ঘটনাটাকে চালিয়ে দেওয়া যেত। কিন্ত ঘটনাটা এখানেই শেষ নয়। এবং শেষ নয় বলেই এই ঘটনাকে শুধুমাত্র এক শিল্পীর অপমৃত্যু বলে চালানো গেল না। কারণ, এরপর ওই গ্রামের প্রায় ২০০ মুসলিম পরিবারকে ঘরছাড়া হয়ে জয়সলমীরের কাছে এক শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়েছে। উচ্চবর্ণের হিন্দুদের হুমকিতে এবং প্রাণভয়ে। বলা তো যায়না, কখন ওই পুরোহিত এবং তার দলবলের আবার নতুন করে কিছু মনে হয়!

দেশটার নাম যদিও ভারতবর্ষ, এই দেশের অতীত ঐতিহ্য যদিও গৌরবের, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গৌরব, সেই ঐতিহ্যই আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। তাইতো দেশের এক রাজ্যের প্রধান বিচারপতি ময়ূরের যৌনজীবন নিয়ে আজগুবি গল্প শোনাতে পারেন, শুধুমাত্র গুজবে প্রাণ দিতে হয় জুনেইদ, আখলাখদের। পর্যটনস্থল থেকে বেমালুম বাদ পড়ে যায় তাজমহল, অনায়াসে ঐতিহ্যশালী মুঘলসরাই স্টেশনের নাম বদলে হয়ে যায় দীনদয়াল। বেঘোরে প্রাণ দিতে হয় আহমেদ খানদের।

দেখার এই সবে শুরু কী না তা বলবে সময়।প্রতিবাদ করে কালবুরগি, পানসারে, লঙ্কেশদের তালিকা আরও কত ভারী হয় তার জন্য নাহয় আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করা যাক। ততদিন আরও আরও অনেক আহমেদ খানরা গান শুনিয়ে যাক মন্দিরে মন্দিরে। মাথা কুটে মরুক পাথরের মূর্তির পায়ে ন্যায়বিচার চেয়ে।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in