‘ফির সে সেলিম, দিল সে সেলিম’ - বলছে রায়গঞ্জ

‘ফির সে সেলিম, দিল সে সেলিম’ - বলছে রায়গঞ্জ
রায়গঞ্জে প্রচারে মহম্মদ সেলিমনিজস্ব চিত্র

রায়গঞ্জের বাসিন্দা বাম কর্মী সুব্রত চক্রবর্তী দিনকয়েক আগে তাঁর বাড়ির কাজের দিদিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন – এবার কাকে ভোট দেবে গো? কাজের দিদি জানিয়েছিলো – এবার বিজেপিকে। কেন সেলিমকে নয়, জানতে চাওয়ায় তিনি জানিয়েছিলেন, বিজেপির লোকেরা বলে গেছে – এবার তো সেলিম দাঁড়ায়নি। তাই।

রায়গঞ্জে বাম প্রার্থীকে নিয়ে একদিকে যেমন এইধরণের প্রচার আছে, তেমনই আবার অন্যদিকে আনজুরা বেগম, কৃষ্ণ বর্মণ, সাইদুল মহম্মদদের বক্তব্য - ভোট দেবো তো সেলিমকে। কারণ ‘সাংসদ কেরম হতি পারে তা সেলিম জানাইছে।‘

প্রত্যন্ত নুরিপুর গ্রামের বাসিন্দা সুবল যেমন জানালেন, এবারের ভোটে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কংগ্রেস তো তৃণমূলের কাছে বিক্রি হয়ে আছে। আমাদের রুদ্রখন্ডর ৩৭, ৩৮ নম্বর বুথে পঞ্চায়েত ভোটে তৃণমূল ছাপ্পা ভোট দিয়েছে। আমাদের ভোট দিতে দেয়নি। আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম বলে আমার নামে পাঁচটা কেস হয়েছে। আজকে একটায় জামিন পেয়েছি। এখনও দুটো কেস আছে।

আসন্ন সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের যে’কটা আসন নজরকাড়া আসন হিসেবে চিহ্নিত, তার মধ্যে অন্যতম অবশ্যই রায়গঞ্জ। উত্তর দিনাজপুর জেলার এই নির্বাচনী কেন্দ্রে এবার চতুর্মুখী লড়াই।

এই লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সাত বিধানসভা আসনের মধ্যে আছে ইসলামপুর, গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া, করণদীঘি, হেমতাবাদ, কালিয়াগঞ্জ এবং রায়গঞ্জ।

বিগত লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিলেন সিপিআই(এম) প্রার্থী মহম্মদ সেলিম। ৩,১৭,৫১৫ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের দীপা দাসমুন্সীকে ১,৬৩৪ ভোটে তিনি হারিয়েছিলেন। শতাংশের বিচারে মহম্মদ সেলিম পেয়েছিলেন ২৯% ভোট এবং কংগ্রেস প্রার্থী পেয়েছিলেন ২৮.৫০% ভোট। যদিও ২০১৪ নির্বাচনে রায়গঞ্জ কেন্দ্রে সিপিআই(এম)-এর ভোট কমেছিলো ৯.৯৩% এবং কংগ্রেসের কমেছিলো ২১.৭৯%। তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থানে থাকা বিজেপি এবং কংগ্রেসের ভোট ছিলো যথাক্রমে ১৮.৩২% এবং ১৭.৩৯%। বিজেপি ভোট বাড়িয়েছিলো ১৪.১৪% এবং তৃণমূল ১৭.৩৯%।

২০১৬র বিধানসভা নির্বাচনে এই লোকসভার অন্তর্গত সাত কেন্দ্রের মধ্যে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জোট জেতে ৫টি আসনে এবং তৃণমূল জেতে ২টি আসনে। বিজেপি কোনো আসনেই জেতেনি।

যদিও গত বিধানসভা নির্বাচনে ইসলামপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জোট প্রার্থী হিসেবে জয়ী কংগ্রেস প্রার্থী কানহাইয়া লাল আগরওয়াল এবার এই লোকসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী। অন্যদিকে সিপিআই(এম) প্রার্থী করেছে মহম্মদ সেলিমকে এবং কংগ্রেস প্রার্থী করেছে দীপা দাসমুন্সীকেই।

এই কেন্দ্রে এবার বিজেপি প্রার্থী দেবশ্রী চৌধুরী। যিনি গত ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে বর্ধমান দুর্গাপুর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন এবং যাকে ঘিরে রায়গঞ্জের বিজেপি কর্মী সমর্থকরা ক্ষুব্ধ।

এক্ষেত্রে বিজেপি কর্মী সমর্থকদের দাবী ছিলো রাজবংশী কাউকে প্রার্থী করার। তা না করে বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একজন ‘বহিরাগত’কে প্রার্থী করায় প্রকাশ্যেই ক্ষোভে ফুঁসছেন বিজেপি কর্মীরা। ফলস্বরূপ কেন্দ্রে প্রায় কোনো অঞ্চলেই এখনও পর্যন্ত বিজেপি প্রার্থীর নামে দেওয়াল লিখন চোখে পড়েনি।

রায়গঞ্জের মাটিতে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে তৃণমূল প্রার্থীর কথাও। সাধারণ মানুষের মধ্যে গুঞ্জন ‘জিতলেই উনি বিজেপিতে চলে যাবেন।‘ যদিও হুডখোলা জিপে দেহরক্ষী সঙ্গে নিয়ে মনোনয়ন জমা দিতে আসা কানহাইয়া লাল আগরওয়ালের তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। গোটা রায়গঞ্জ কেন্দ্র জুড়ে দেওয়াল লিখনে এগিয়ে থাকা তাঁর দাবী, এবার রায়গঞ্জ তাঁর দখলেই থাকবে।

কিছু কংগ্রেসের সমর্থকের মধ্যে দোটানা আছে তাঁদের প্রার্থীকে নিয়েও। কিছুদিন আগেও গুঞ্জন ছিলো তিনি বিজেপিতে যোগ দেবেন। যদিও বাম-কংগ্রেস আসন সমঝোতা ভেস্তে যাবার পর তিনি ফের কংগ্রেস প্রার্থী। প্রয়াত কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সীর স্ত্রী হবার সুবাদে এই কেন্দ্রের বেশ কিছু মানুষের চোখে তিনি ‘ঘরের লোক’।

এই তিন প্রার্থীকে পেছনে ফেলে আপাতত প্রচারে অনেকটাই এগিয়ে সিপিআই(এম) প্রার্থী মহম্মদ সেলিম। ইতিমধ্যেই বাম কর্মী সমর্থকরা রায়গঞ্জ কেন্দ্র জুড়ে শ্লোগান তুলেছেন – ‘দিল সে সেলিম, ফির সে সেলিম।‘

এই কেন্দ্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঘুরলে দেখা যাবে অন্য তিন প্রার্থীর চেয়ে বাম প্রার্থী এগিয়ে মূলত তাঁর নিবিড় জনসংযোগে। সাধারণ মানুষের কথাতেও বার বারই উঠে এসেছে বিগত পাঁচ বছরে সিপিআই(এম) সাংসদের জাতি-ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের বিপদে আপদে পাশে থাকার কথা। ভয়ঙ্কর বন্যায় সবহারা মানুষের পাশে যেভাবে বাম কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মহম্মদ সেলিম ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, প্রতিটি বন্যা কবলিত এলাকায় পৌঁছে গেছিলেন, সেকথাই ফিরে ফিরে এসেছে বিভিন্ন মানুষের মুখে।

ভিনরাজ্যে কাজে গিয়ে নিহত শ্রমিকের দেহ ফিরিয়ে আনা, বা ক্ষতিপূরণ আদায় করে দেওয়া কিংবা সাধারণ মানুষের স্বার্থে সাংসদ কোটার তহবিলের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের জন্য এলাকার মানুষ ফুল মার্কস দিচ্ছেন বাম প্রার্থীকে।

বিজেপি, আর এস এস-এর হুইস্পারিং ক্যাম্পেনিং আছে, তৃণমূলের মাসল অ্যান্ড মানি পাওয়ার আছে, দুই দলের গোপন আঁতাত আছে, আছে সাম্প্রদায়িক প্রচারও। তবুও, গত ২৫ তারিখ মনোনয়ন দাখিলের দিনও একদিকে যখন তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেসের মনোনয়নে গাড়ির মেলা, তখন রায়গঞ্জ রেলগুমটি থেকে কয়েক হাজার কর্মী সমর্থক নিয়ে চড়া রোদ্দুরে প্রায় ৬ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে কর্ণজোড়া পর্যন্ত সিপিআই(এম)-এর নজরকাড়া মিছিল অনেক না বলা কথা বলে দিয়েছে। তাই তো তৃণমূলের হয়ে মনোনয়ন জমা দিতে আসা গাড়ি থেকে সিপিআই(এম)-এর মিছিলের উদ্দেশ্যে অজান্তেই মানুষ হাত নেড়ে বলে ফেলেন – ‘আবার সেলিম’।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in