উঃ প্রদেশ-ত্রিপুরায় ডবল ইঞ্জিন চলছে না, যে পলিসি ফেল করেছে তা এখানে কী করে চলবে? - মীনাক্ষী মুখার্জি

সম্প্রতি পিপলস রিপোর্টারের মুখোমুখি হয়েছিলেন নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের সংযুক্ত মোর্চা সমর্থিত সিপিআই(এম) প্রার্থী মীনাক্ষী মুখার্জি। একান্ত সেই সাক্ষাৎকারে উঠে এলো রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়।
উঃ প্রদেশ-ত্রিপুরায় ডবল ইঞ্জিন চলছে না, যে পলিসি ফেল করেছে তা এখানে কী করে চলবে? - মীনাক্ষী মুখার্জি
মন্তেশ্বরে জনসভায় মীনাক্ষী মুখার্জিফাইল ছবি সংগৃহীত

পিপলস রিপোর্টার - রাজ্যে চার দফা নির্বাচন হয়ে গেছে। আপনার কেন্দ্র নন্দীগ্রামেও ভোট হয়ে গেছে। এখনও বাকী চার দফা। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো নন্দীগ্রাম থেকেই সংযুক্ত মোর্চা তথা বামেদের প্রচার একটা অন্য সুরে বাঁধা হয়ে গেছে। অন্য মাত্রা যোগ করেছে। এই বিষয়ে আপনার কী বক্তব্য?

মীনাক্ষী মুখার্জি - নন্দীগ্রামের প্রচার একটা অন‍্য লড়াইয়ের বার্তা ছিল। গত বারো বছর ধরে নন্দীগ্রামে একটা সন্ত্রাসের আবহ তৈরি করে রেখেছে তৃণমূল। গত কয়েক বছরে রাজ‍্যের অন‍্যান‍্য জায়গায় যেভাবে আমাদের অর্গানাইজেশন কাজ করেছে, পার্টির মিটিং-জমায়েত হয়েছে, আমাদের ছাত্র-যুব সদস্যের সংখ‍্যা বেড়েছে, সেখানে নন্দীগ্রামে আমাদের পার্টি সেভাবে প্রকাশ‍্যে এসে কিছু করতে পারেনি। এক্ষেত্রে নন্দীগ্রাম একটা ব‍্যতিক্রম। কিন্তু যদি ইলেকশনকে কেন্দ্র করে একটা বার্তা যায় বা আমাদের প্রচারের ইস‍্যু হয়, সেই প্রচারের ইস‍্যু কিন্তু গোটা রাজ্যে জুড়েই আমাদের এক। সেটা নন্দীগ্রাম হোক, সেটা সিঙ্গুর হোক বা বালি হোক।

এখন একটাই কথা গত দশ বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত রাজ‍্য সরকার আর কী করেছে জানি না, তবে এটুকু বলতে পারি এরা বেকার ছেলেমেয়েদের কোমর ভেঙে দিয়েছে। SSC, PSC সহ সমস্ত চাকরির ক্ষেত্রে, কারখানার ক্ষেত্রে এই সরকারের চরম নীতিজ্ঞানহীন, ভ্রষ্ট স্বজনপোষণ দুর্নীতি এবং ঘুষকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গিয়ে, সিন্ডিকেট-তোলাবাজি-কাটমানির ক‍্যান্সারকে প্রতিনিয়ত বাড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে আসলে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ছাত্র-যুবদের ভবিষ্যতকে অন্ধকার করে দেওয়া হয়েছে। এটা আজকে গোটা পশ্চিমবঙ্গের দশ কোটি সাধারণ মানুষের কাছে তিনি তৃণমূল-বিজেপি বা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দল বা সংযুক্ত মোর্চার হোন সবক্ষেত্রেই ছাত্র-যুবদের সমস‍্যাটা এক। আর লড়াই করে যে সমাধানের পথটা একমাত্র সংযুক্ত মোর্চাই দেখাচ্ছে, তৃণমূল বা বিজেপি সমাধানের পথ দেখাতে পারছে না।

পিপলস রিপোর্টার - একদিকে বিজেপি প্রচার করছে ডবল ইঞ্জিন তত্ত্ব, তৃণমূলের প্রচার হচ্ছে বাংলা নিজের মেয়েকেই চাই তার পাশাপাশি সংযুক্ত মোর্চার প্রচার মানুষের শিক্ষার দাবি, কাজের দাবি অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা - কোন প্রচারে মানুষ বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে বলে আপনি মনে করছেন?

মীনাক্ষী মুখার্জি - ২০২১ এর নির্বাচনে তৃণমূল বিজেপির কাছে কোনো ইস‍্যুই নেই। মানুষের রুটি-রুজির দাবিতে এদের প্রচার নেই। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের পতন হয় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে মা-মাটি-মানুষের সরকারের উত্থান হয়। তখন একটা চক্রান্ত হোক বা একটা অপপ্রচার যাই হোক, তখন একটা ইস‍্যু ছিল। গোটা দেশের মানুষ তখন‌ দেখেছিলেন যারা তেভাগার নামে জমিদারের বিরুদ্ধে লড়াই করে দু ভাগ ফসলের দামও দিয়েছে এবং বর্গার নামে জমিদারদের হাত থেকে জমি কেড়ে নিয়ে গরিব চাষিদের হাতে জমি তুলে দিয়েছে, সেই বামফ্রন্টই কারখানার মালিকদের তাবেদারী করতে গিয়ে আবার জমি অধিগ্রহণ করছে - তার মানে এই বামপন্থীরা আর বামপন্থী নেই। এটা ইস‍্যু ছিল ওদের।

এবারের ইলেকশনে ইস‍্যু কী? চন্ডীপাঠ করা? ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করা? খেলা হবে? বাংলার মেয়েকেই চাই বনাম ভূমিপুত্র? সনাতন ধর্ম? তাহলে কাজ-কারখানা-ফসলের দাম-শ্রমিকের ঘাম-মা বোনেদের সম্মান-গণতন্ত্র রক্ষার কথার কী হবে? এইগুলোই আমাদের দাবি।

সেদিনও আমরা বলেছিলাম এটা চক্রান্ত, ভুল, মানুষের বিপক্ষে যাবে। আজ ১০ বছর পরে রাজ‍্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেও বলছেন সেগুলো চক্রান্ত ছিল। কিন্তু যাইহোক একটা ইস‍্যু তো ছিল। এবারের ইলেকশনে ইস‍্যু কী? চন্ডীপাঠ করা? ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করা? খেলা হবে? বাংলার মেয়েকেই চাই বনাম ভূমিপুত্র? সনাতন ধর্ম? তাহলে কাজ-কারখানা-ফসলের দাম-শ্রমিকের ঘাম-মা বোনেদের সম্মান-গণতন্ত্র রক্ষার কথার কী হবে? এইগুলোই আমাদের দাবি। সংযুক্ত মোর্চা ছাড়া আর কে বলছে এই কথা? রাজ‍্যের সাধারণ মানুষ নিজেদের প্রতিদিনের রুটি-রুজির লড়াইয়ের সাথে আমাদের এই কথাগুলো মেলাতে পারছেন বলে সংযুক্ত মোর্চার প্রতি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা, সমর্থন এবেলা-ওবেলা বাড়ছে ক্রমশ। সেটা আমরা নিজেরা প্রত্যক্ষ করছি।

পিপলস রিপোর্টার - বিজেপি যে ডবল ইঞ্জিন সরকারের কথা বলছে, আমরা যদি হরিয়ানা-উত্তরপ্রদেশ-কর্ণাটকের দিকে তাকাই। সম্প্রতি একটা সমীক্ষা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীদের জনপ্রিয়তা নিয়ে। সেই তালিকায় সবচেয়ে নীচে আছেন হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে কিন্তু ডবল ইঞ্জিন সরকার। তারপরেও বিজেপির পক্ষ থেকে কেন এই ডবল ইঞ্জিন সরকারের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে? মানুষকে কি বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে?

মীনাক্ষী মুখার্জি - আমি এক্ষেত্রে দুটো কথা বলবো। এক ডবল ইঞ্জিন আর দুই সমীক্ষা। ডবল ইঞ্জিন একটা শব্দবন্ধ ছাড়া আর কিছু নয়। যদি ডবল ইঞ্জিনের কথাই বলি তাহলে ত্রিপুরাতে রিম্পা নামের মেয়েটিকে কেন ৫ বছরের শিশুকে বিষ খাইয়ে নিজে সুইসাইড করলো? ত্রিপুরাতে কেন ডবল ইঞ্জিন চলছে না? উত্তরপ্রদেশে মণীষা বাল্মিকীকে খুন করে দেওয়া হলো, তার মাকে তার মৃতদেহ না দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হলো।

উত্তরপ্রদেশে ডবল ইঞ্জিন চলছে না, ত্রিপুরাতে ডবল ইঞ্জিন চলছে না। তাহলে যে পলিসি ফেল করেছে তা পশ্চিমবঙ্গে কী করে চলতে পারে?

পশ্চিমবঙ্গেও এরকম হয়েছে, আগামীদিনে যে হবে না তার কোনো গ‍্যারান্টি নেই। হ‍্যাঁ তবে আমরা এটুকু গ‍্যারান্টি দিতে পারি সংযুক্ত মোর্চার সরকার এলে পুলিশ-প্রশাসনের যা কাজ তা আমরা করাব। কিন্তু উত্তরপ্রদেশে ডবল ইঞ্জিনের সরকারে একটি মেয়ের সাথে ইভটিজিং করার পর সে থানাতে আইনের শাসনের কাছে সুরক্ষা চাইতে গিয়েছিল, সুরক্ষা তো পেল না উল্টে তার বাবাকে খুন করে দেওয়া হলো। উত্তরপ্রদেশে ডবল ইঞ্জিন চলছে না, ত্রিপুরাতে ডবল ইঞ্জিন চলছে না। তাহলে যে পলিসি ফেল করেছে তা পশ্চিমবঙ্গে কী করে চলতে পারে?

পিপলস রিপোর্টার - রাজ‍্যে চার দফা নির্বাচন হয়ে গেছে। আরো চার দফা বাকি আছে। বাকি যে চার‌দফা নির্বাচনে রাজ‍্যের মানুষের কাছে আপনি বিশেষ কী বার্তা দেবেন?

মীনাক্ষী মুখার্জি - আমরা একটাই বার্তা দিতে চাই পশ্চিমবঙ্গে ১৮ বছর‌ বয়সী ছেলেমেয়েদের প্রথম ভোটাধিকার স্বীকৃত করার জন্য বামফ্রন্টের সরকার এবং লালঝান্ডার পার্টি এরা জানকবুল লড়াই করেছিল।

বেকারদের ভবিষ্যত, পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের জন্য মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবেই। সিদ্ধান্ত নিয়ে সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থীদের জেতান। ভরসা রাখুন বেইমানি করবো না, দলবদলও করবো না।

গত দশ ‌বছরে কর্মসংস্থান কেড়ে নেওয়া তৃণমূল এবং তৃণমূল থেকে কয়েকজন গিয়ে তৈরি হওয়া বিজেপি রাজ‍্যের পরিস্থিতি এমন করেছে যেখানে ১৮ বছরের একজন ভোট দিতে গিয়ে খুন হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্ত সমস‍্যা থেকে বাইরে বেরোনোর একমাত্র পথ লড়াই। সেই লড়াই আমরা করছি। আমরা চাইব আর যেন কোথাও শীতলকুচি-নন্দীগ্রাম না হয়।

আগামী চার দফায় ইলেকশন ‌কমিশন ও পলিটিক্যাল পার্টি এবং মিডিয়া নিজদের নিজেদের দায়িত্ব পালন করুন। মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিক। মানুষ যা রায় দেবে সমস্ত পলিটিক্যাল পার্টির সেই সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করা উচিত। বেকারদের ভবিষ্যত, পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের জন্য মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবেই। সিদ্ধান্ত নিয়ে সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থীদের জেতান। ভরসা রাখুন বেইমানি করবো না, দলবদলও করবো না।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.