বাংলা ভাষার নিয়তি

বাংলা ভাষার শরীরে যে এত শক্তির বারুদ জমা ছিল তা জিন্নাহদের জানবার কথা ছিল না। আত্মভোলা বাঙালিও ভুলে ছিল। গুলিবর্ষণের পরেই বাঙালির প্রতিক্রিয়া দেখলে মনে হয় এতকাল এই সিংহজাতি কীভাবে ঘুমিয়ে ছিল?
বাংলা ভাষার নিয়তি
গ্রাফিক্স সুমিত্রা নন্দন

বৈরিতার মধ্যেই আছে বাংলা ভাষা। এতকাল বাংলা ভাষার জীবন ছিল গ্রিক ট্রাজেডির মতো নিয়তি নির্ভর। রাষ্ট্রশাসন ও ধর্মশাসনের অভিশাপ নিতে হয়েছে। সাতচল্লিশে বাংলা ভাষার যে ট্রাজেডি রচিত হয়, তা ছিল শেক্সপীরিয়ন ট্রাজেডি। চিরকাল বাঙালির অন্ধ আবেগের উৎপাত সয়ে আসছে বাংলা ভাষা। চরম ও চূড়ান্ত আঘাত হজম করতে হয়েছে সাতচল্লিশের দেশভাগে। দুই ফালি করে চিরদিনের জন্য বাংলা ভাষার অঙ্গচ্ছেদ করে পঙ্গু করে ফেলা হয়েছে। দেশভাগের অন্ধ আবেগ পরকীয়া প্রেমের মতো ভয়ানক সর্বনাশা হয়ে যখন ধরা পড়ল, যখন আর ফেরার পথ নেই, তখন শুরু হয়ে গেল রাধাবিলাপ! চিৎকার করে একশেষ। বাংলা ভাষার দাবি কেন জিন্নাহ বা তাঁর পাকিস্তান মানবে? মানার কোন যৌক্তিক কারণ ছিল কি? বরং না মানার বহু যৌক্তিক কারণ ছিল। বলা যাবে, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল বাঙালি। এটা একটা যুক্তি বটে। যদি এই যুক্তি মানি তবে বলা যায়, জিন্নাহকে এমন দুঃসাহস ও সমর্থন জুগিয়েছে খোদ বাংলাভাষীরাই। জিন্নাহর এই শিকারখেকো চেহারা কি আগে দেখা গিয়েছিল না? বাঙালির স্বতন্ত্র সত্তাকে কলা দেখিয়ে লাহোর প্রস্তাবে states এর স্থলে state সংযুক্ত করে দিল? আর এই ট্রাজেডির ঘোষক আমাদের স্বনামখ্যাত এক বাঙালি! সেদিন state শব্দটি তাঁর কেন এত আদরের হল তার ব্যাখ্যা আমার কাছে হিপোক্রেসি বলে মনে হয়।

বাঙালি ও তার নেতৃবৃন্দ কীভাবে এবং কোন যুক্তিতে ধরে নিয়েছিল যে, মুসলিম লীগ, জিন্নাহ. পাকিস্তানের মতো অনৈসলামিক ও অনৈতিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইসলামি জীবন উপহার দেবে? বাঙালি মুসলমানের এই গ্রহণলাগা দুর্ভাগ্যের ইতিহাসের কারণ হিসেবে আমার সামনে যে ব্যাখ্যা আর যে যুক্তিই দাঁড় করানো হোক না কেন, আমাদের মুষ্টিমেয় আত্মস্বার্থপরায়ণ ও ক্ষমতাখেকো রাজনৈতিক ধূরন্ধররা কিছুতেই দায় এড়াতে পারবেন না। ইসলামের খাসভূমি হবে বাংলা, যা মধ্যপ্রাচ্যকে টেক্কা দেবে, এরকম একটি দূরস্বপ্নের যাদুমন্ত্র বলে টোটাল জনগোষ্ঠীকে একটা নিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়ে ধর্মের খোলনলচে গঠন করে পাকিস্তান। যা কিছুদিনের মধ্যেই খোলস খুলে পরিণত হয় আধুনিক ইতিহাসের চরমতম একটি অমানবিক রাষ্ট্র।

বাঙালি মুসলমানের এই গ্রহণলাগা দুর্ভাগ্যের ইতিহাসের কারণ হিসেবে আমার সামনে যে ব্যাখ্যা আর যে যুক্তিই দাঁড় করানো হোক না কেন, আমাদের মুষ্টিমেয় আত্মস্বার্থপরায়ণ ও ক্ষমতাখেকো রাজনৈতিক ধূরন্ধররা কিছুতেই দায় এড়াতে পারবেন না।

পাকিস্তান গঠনের মূল নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় বাঙালি মুসলমানরা কম শক্তি জোগায়নি। একটি সুনির্মিত জাতি, যার আছে সমৃদ্ধ ভাষা ও সাহিত্য, আছে হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সেইসব ভুলে বা কলা দেখিয়ে ধর্মের রঙিন চশমা চোখে সেঁটে যেমন দেউলিয়া হয়ে পাকিস্তান আন্দোলনে মরিয়া ছিল, যেমন নির্মমভাবে বাঙালি মুসলমান ও হিন্দু আত্মঘাতি বিচ্ছেদের তলোয়ারের নিচে ঘাড় পেতে দিয়েছে, এবং পরিণাম বরণ করে নিয়েছে, এমন একটি আত্মবিসর্জিত বা আত্মঘাতি জাতি ও তার ভাষার মর্যাদা কেন দেবেন মিস্টার জিন্নাহ বা তাঁর পাকিস্তান? বাস্তবে দিলেনও না।

গ্রামে একটি প্রবাদ আছে-‘আমি তাকিয়ে আছি ভাইয়ের দিকে, ভাই তাকিয়ে আছে আমার বউয়ের দিকে।’ আমাদের নিয়তি এই প্রবাদের মতো! দেবতার মর্যাদায় অধিষ্ঠান করে আমরা তাকিয়েছিলাম জিন্নাহর দিকে, আর দেবতাও তার অন্তরের বাসনা মাফিক যা করবার তাই করেছে। বাংলা ভাষা বিনাশের ইতিহাসে এত বড় কাপালিকের মুখোমুখি আর হয়নি। কী বাংলা ভাষা, কী বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্ব এতটা খেলো, এতটা অপমান ও বিনাশের মুখোমুখি দাঁড়ায়নি হাজার বছরে। বাংলা বর্ণমালাকেই চিরদিনের জন্য নাই করে দিতে উর্দু, আরবি, রোমান হরফে বর্ণান্তকরণের নব নব প্যাকেজ আসে। গণপরিষদ থেকে পোস্টকার্ড বা ট্রেনের টিকেটে সর্বত্রই বাংলা বর্জনের মহোৎসব চলে। সৈয়দ আলী আহসান, গোলাম মোস্তফার মতো দরদি পাকবন্ধু বা উর্দুবন্ধুও বাংলায় প্রস্তুত থাকে।

বাংলা বর্ণমালাকেই চিরদিনের জন্য নাই করে দিতে উর্দু, আরবি, রোমান হরফে বর্ণান্তকরণের নব নব প্যাকেজ আসে। গণপরিষদ থেকে পোস্টকার্ড বা ট্রেনের টিকেটে সর্বত্রই বাংলা বর্জনের মহোৎসব চলে। সৈয়দ আলী আহসান, গোলাম মোস্তফার মতো দরদি পাকবন্ধু বা উর্দুবন্ধুও বাংলায় প্রস্তুত থাকে।

একরকম সৌভাগ্যও বটে, আঘাত খেয়ে গর্জে উঠা প্রেমিকের মতোই বাংলা ভাষার প্রেমিকরা এবার জেগে উঠে। বাংলা ভাষার অপমান বাঙালি মুসলমান শরীরে মাখে এই প্রথম! এবং এই প্রথম বাংলা ভাষাকে নিরঙ্কুশভাবে নিজের ভাষা বলে মনে করে। গুটিকয়েক শিক্ষিত বিবেকবান মানুষ ছিলেন, যাদের বিবেক হিমঘরে কুম্ভঘুমে ছিল, তাঁরা অবশেষে বুঝলেন বটে, দাঁতাল জিন্নাহ ও তাঁর হনুমান বাহিনীর দিলবাঞ্চা। বাংলা ভাষা বিনাশের, বাঙালিকে আফ্রিকার কালো মানুষের মতো ক্রীতদাস বানাবার চমৎকার নকশা তাদের হাতে। একে তো শারীরিক দিক থেকে বিকলাঙ্গ একটি রাষ্ট্র, তার উপরে পিছিয়ে পড়া বাঙালির প্রতিনিধিত্ব করে অবাঙালি, বিশেষভাবে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিদ্বেষী শক্তি। ফলে বাঙালির ভাষা ধোলাই হবে, সাহিত্য-সংস্কৃতি ধোলাই হবে, মগজ ধোলাইসহ সব রকমের ধোলাই চলবে। এই সহজ সমীকরণ সহজেই সামনে আসে। তাই রাষ্ট্রের তৃণমূল পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে ছাটাইকরণের বিরুদ্ধে প্রবলাকারে না হলেও ক্ষীণভাবে প্রতিবাদ উঠেছে খোদ সরকারের বেতনভোগীদের মধ্য থেকে। নীলক্ষেতের কলোনির সরকারি চাকুরিজীবীরা রাষ্ট্রের ভাষার বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছোটখাটো মিছিলও করে। প্রকাশ্যে শুরুটা এখানেই। ক্ষীণকণ্ঠের উচ্চারণ হলেও ধীরে ধীরে সেই দাবি যে প্রচণ্ড চিৎকারে রূপ নেবে এবং অসংখ্য কণ্ঠস্বর এক হয়ে ইউনিক শক্তিতে পরিণত হবে তা আন্দাজ করা গেছিল।

রাষ্ট্রভাষার দাবি একটা, কিন্তু একের মধ্যেই বহুত্বের ব্যঞ্জনা ছিল। দেশভাগের নাটকের সময় যে সকল বিবেকপ্রবণ জাতীয় চেতনাসমৃদ্ধ মানুষ নির্বাক পুতুলের মতো তাকিয়ে দেখেছিল কিন্তু কিছুই করার ছিল না, তারা খুব সহজেই মিলে গিয়েছিল রাষ্ট্রভাষার দাবির মিছিলে। অন্যদিকে, বাঙালি মুসলমানদের সামনে স্বপ্নের পাকিস্তানের ইমারতের একটি একটি করে ইট খসে পড়েছিল। প্রকাশ হতে থাকে আসল চেহারা। অবশ্য, রাজনৈতিক সচেতনতাসমৃদ্ধ সুশীল বুদ্ধিজীবীশ্রেণির মধ্যে অখণ্ড পাকিস্তান বিশ্বাসে তখনও যথেষ্ট জোশ। ফলে বাংলা ভাষার নির্মম লাঞ্জনা ও বিনাশের ষড়যন্ত্র কোনটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি তাদের কাছে। বাংলা ভাষার ভাগ্য ভাল, নবজাগরিত তরুণ সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়ারা ঠিকই ধরে ফেলেছিল বিনাশের এই সুপরিকল্পিত নাটক। ধরে ফেলে এই নাটকের শেষ দৃশ্যও। বলা যায়, বাঙালির জাতীয়চেতনা এই একটি জায়গায় এসে দাঁড়ায় ভাষার পটভূমিতে; এবং তা অবশ্যই তরুণ সমাজের হাত ধরে। আধুনিক দেশপ্রেম, আধুনিক রাজনীতি, এই দুটিই তরুণসমাজের সৃষ্টি ও পরিণত রূপদাতা। একটি পটভূমি তৈরি হয়। এই পটভূমিতে ভাষার দাবি প্রধান হয়ে সামনে আসলেও, বাস্তবে অলিখিতভাবে ছিল বাঙালির সার্বভৌম অর্থনীতি, সার্বভৌম সংস্কৃতি ও সাহিত্যচিন্তা। ছিল সার্বভৌম রাষ্ট্রচিন্তা। অনেকগুলো প্রশ্ন সুতোর মতো একত্রিত হয়ে একটি শক্তিতে পরিণত হয়। যা কোনতেই ছিঁড়বার শক্তি ছিল না। গুলি চালিয়ে, লাশ ফেলে, গভীর রাতে রাস্তা থেকে লাশ নিয়ে মাটি চাপা দিয়ে কোনমতেই আর কিছু করার শক্তি ছিল না।

বাঙালি মুসলমানদের সামনে স্বপ্নের পাকিস্তানের ইমারতের একটি একটি করে ইট খসে পড়েছিল। প্রকাশ হতে থাকে আসল চেহারা। অবশ্য, রাজনৈতিক সচেতনতাসমৃদ্ধ সুশীল বুদ্ধিজীবীশ্রেণির মধ্যে অখণ্ড পাকিস্তান বিশ্বাসে তখনও যথেষ্ট জোশ। ফলে বাংলা ভাষার নির্মম লাঞ্জনা ও বিনাশের ষড়যন্ত্র কোনটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি তাদের কাছে। বাংলা ভাষার ভাগ্য ভাল, নবজাগরিত তরুণ সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়ারা ঠিকই ধরে ফেলেছিল বিনাশের এই সুপরিকল্পিত নাটক।

এত শক্তির উৎস কোথায়? বাংলা ভাষার শরীরে যে এত শক্তির বারুদ জমা ছিল তা জিন্নাহদের জানবার কথা ছিল না। আত্মভোলা বাঙালিও ভুলে ছিল। আন্দোলন চলে আসছে, কিন্তু গুলিবর্ষণের পরেই বাঙালির প্রতিক্রিয়া দেখলে মনে হয় এতকাল এই সিংহজাতি কীভাবে ঘুমিয়ে ছিল? পাকিস্তানের স্বাদ তেতো হয়ে গেল! ধীরেন্দ্রনাথরা তো বিকট চিৎকার করে আসছিলেনই, এবার খোদ মুসলিম লীগের পার্লামেন্টের সদস্য মাইকে চিৎকার করেন! জালিম সরকারের পদত্যাগ চাই বলেন! নিজেরা পদত্যাগ করেন! বাংলা ভাষার মতো বাংলা সাহিত্যকেও ধর্মের খোলসে পুরে ফেলতে চাইলে, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের গান-কবিতাকে শত্রু মনে করলে, বাঙালিও অস্তর হিসেবেই গ্রহণ করেছে তার সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের কবিতা-গান। রাতারাতি জাতির সামনে চলে আসে একটা শহীদ মিনার। একটি স্থায়ী প্রেরণা ঠিকানা।

স্বাধীনতার বাস্তব উদ্বোধন ছিল শহীদ মিনার নির্মাণ। একটি নয়, অসংখ্য শহীদ মিনার তৈরি হয়ে গেল প্রার্থনা মন্দিরের মতোই বাঙালির ঘরে, উঠোনে, মাঠে, প্রাঙ্গণে। একদিকে চালু রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার হাঁড়ি নিয়ে বেসামাল, মাসে মাসে একটি করে নতুন সরকার আসে, অন্যদিকে একুশের শহীদ মিনারকে সামনে নিয়ে স্বাধীনতার ইমারত নির্মাণের ইট-সুরকির যোগান চলে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে বিশাল জনবিপ্ল¬বের ইতিহাস, আর একাত্তরের জনযুদ্ধ এসবই ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনারের পাদদেশে রচিত এক একটি মহাকাব্য।

একটি রাষ্ট্রের জন্মের প্রত্যক্ষ শক্তি জুগিয়েছে একটি ভাষা। এই দৃষ্টান্ত বিরল, ভাষার মানচিত্রে দ্বিতীয়টি নেই। এই প্রথম দ্ব্যর্থহীনভাবে সংবিধানে উঠে আসে-‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা।’ রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্র থেকে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হবে। কিন্তু বাংলা ভাষার কপালে আছে শনি, কে আর ঠেকাবে? রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলে কী হবে, রাষ্ট্রই চলে গেল বাংলা ভাষার প্রতিকূলে। একুশের সেই মূল স্পিরিট নেই।

একটি রাষ্ট্রের জন্মের প্রত্যক্ষ শক্তি জুগিয়েছে একটি ভাষা। এই দৃষ্টান্ত বিরল, ভাষার মানচিত্রে দ্বিতীয়টি নেই। এই প্রথম দ্ব্যর্থহীনভাবে সংবিধানে উঠে আসে-‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা।’ রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্র থেকে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন হবে। কিন্তু বাংলা ভাষার কপালে আছে শনি, কে আর ঠেকাবে? রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলে কী হবে, রাষ্ট্রই চলে গেল বাংলা ভাষার প্রতিকূলে। একুশের সেই মূল স্পিরিট নেই। এবার শক্র ঘরের বিভীষণ। কৌশল আলাদা। শহীদ মিনার নয়, জাতীয় চেতনার প্রতীক হয়ে গেছে মাজার আর ধর্র্মীয় প্রতিষ্ঠান। বড় বড় স্থাপনা তৈরি করে নামকরণ করে চলছি সেই পীর-ফকিরদের নামেই।

দ্বিধা-বিভেদে-অবিশ্বাসে, দুর্নীতি, দুঃশাসন, অপশাসন, আর লোভ-লুটপাটে রাষ্ট্রে নেমেছে জীবনানন্দের কথিত সেই ‘অদ্ভূত আঁধার’। রাষ্ট্র চলে গেছে নষ্টদের দখলে, চলে গেছে শকুন আর শেয়ালের ইজারায়। কোনমতেই পারা যাচ্ছে না ধর্মের সেই পাকগিঁট খুলে বেরুতে। তিনদশকে এই গিঁট কতটা মজবুত হয়েছে, তার প্রমাণই ধর্মীয় জঙ্গিবাদের রাজকীয় উত্থান, রাজাকারের ক্ষমতায়ন। টের পাওয়া যাচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে গিয়ে। তারুণ্যের বিশাল শক্তি ও সমর্থন আর হিমালয়সম মেজোরিটি নিয়েও কিছুতেই খুন-ধর্ষণের বিচার করা যাবে না। সংবিধানটাকেও আর কিছুতেই রাষ্ট্রের সকলের করা যাবে না। জনগণের করা যাবে না। সংবিধানের মালিকানা অদৃশ্য শক্তির হাতে ছেড়ে দিতে হবে। এই যে করা যাবে না, কিছুতেই করা যাবে না, এর উত্তর জানার বাকি নেই। এসব অসহায়ত্বের কথা ভাবলে, স্বাধীনতা শব্দটিও অর্থহীন মনে হয়। নিচে নামতে নামতে এখন নর্দমায় পা। এই কয় বছরে স্বাধীনতার সব অর্জনকে ভাগবাটোয়ারা করে যে যার মতো পকেটস্থ করে নিয়েছি। এত রক্তপাতের প্রাপ্তিতে এত বড় প্রহসন!

ইতিহাসের অতীত যেকোন দুঃসময়ের চেয়ে বাংলা ভাষার বর্তমান বাস্তবতা আরও করুণ। ধর্র্মকরণের প্রচেষ্টা থেকে যেভাবে বেরুতে পারল চল্লিশের দশকে, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও প্রযুক্তির অজুহাতে চরম অবহেলা আর অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারছে না। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রই নাটেরগুরু। জাতীয় জীবনের প্রাণপ্রবাহে বাংলা ভাষার বাস্তব প্রয়োগে রাষ্ট্রের তেমন মাথাব্যাথা নেই, যেমন মাথাকূটে মরছে ইংরেজি শেখানোর জন্যে। কৌশলে শিক্ষাব্যবস্থাটাকে ছেড়ে দিয়েছে প্রযুক্তি আর মুক্তবাজার অর্থনীতির যুধিষ্ঠিরদের হাতে। পুঁজিবাদের এতই বিচিত্র রূপ যে, কৃষ্ণলীলাকেও হার মানায়। এখন যত ইচ্ছা শিক্ষাকে পণ্য বানাও। বাজারে বিকোতে হবে যে। মানুষ কী পশু বানালো তার কোন তদারকি নেই। বিপরীতে বাংলা ভাষার শিক্ষা দিয়ে বড়জোড় কেরানি, স্কুল-কলেজের মাস্টার। ব্রাহ্মণ্যবাদের নতুন চেহারা! বাংলা ভাষায় অর্থনীতি-বাণিজ্য চর্চা করা যাবে না, বাংলা ভাষায় ডাক্তারি পড়া যাবে না, আদালতের রায় ঘোষণা করা যাবে না, বাংলা ভাষায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া যাবে না—ফতোয়ার শেষ নেই। পচনের আর বাকি নেই। এখন রীতিমত ইংরেজি মাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও লেবেল এ লেবেল ইত্যাদি খুলে নিয়েছি; ওয়াশিং মেশিনে ময়লা কাপড় ঢোকালে যেমন ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে লন্ড্রি হয়ে বেরোয়, আমাদের সন্তানেরাও সেখান থেকে জলজ্যান্ত ইংরেজ হয়ে বেরোয়, আর এসব ইংরেজের দাপট দেখা যায় থার্টিফাস্ট নাইটে, ক্লাবে আর রক্সঙ্গীতের আসরে।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.