আমফানের সময় যে সীমাহীন দুর্নীতি জয়নগরের মানুষ দেখেছে তা এক কথায় বেনজির - অপূর্ব প্রামাণিক

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর কেন্দ্রে সিপিআই(এম) প্রার্থী অপূর্ব প্রামাণিক। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা তরুণ প্রার্থী অপূর্ব প্রামাণিকের মুখোমুখি পিপলস রিপোর্টার।
আমফানের সময় যে সীমাহীন দুর্নীতি জয়নগরের মানুষ দেখেছে তা এক কথায় বেনজির - অপূর্ব প্রামাণিক
জয়নগর কেন্দ্রের সিপিআই(এম) প্রার্থী অপূর্ব প্রামাণিকফাইল ছবি নিজস্ব

১. পিপলস রিপোর্টার- আপনার রাজনৈতিক জীবন শুরু কীভাবে? কীভাবেই বা বামপন্থী রাজনীতিতে প্রবেশ?

অপূর্ব প্রামাণিক- ছোটো থেকেই বামপন্থী পরিবারেই বেড়ে ওঠা। আমার বাবা ৭২ সালে দক্ষিণ বারাশত ধ্রুবচাঁদ হালদার কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট। বাবা আজীবন পার্টি কর্মী ছিলেন। সেই একই কলেজ থেকেও আমি গ্র্যাজুয়েট। কলেজে এসে প্রথম এস.এফ.আই এর সংস্পর্শে আসা। ২ বার ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। তারপর ছাত্র আন্দোলন করতে করতে এস.এফ.আই দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা সম্পাদক হই। বর্তমানে সিপিআই(এম) দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা কমিটির সদস্য। এইভাবেই আমার বামপন্থী রাজনীতিতে হাতেখড়ি।

. পিপলস রিপোর্টার- আচ্ছা, সিপিআই(এম)-এর সাদা চুলের বৃদ্ধতন্ত্র নিয়ে অনেকের অনেক বক্তব্য আছে। সেখান থেকে এত কম বয়সে প্রার্থী হওয়া- এই নিয়ে আপনার কি প্রতিক্রিয়া?

অপূর্ব প্রামাণিক- এই বৃদ্ধতন্ত্র বা সাদা চুল, এটা একটা প্রচার বলা যেতে পারে। আমরা যে রাজনীতিতে বিশ্বাসী সেখানে শুধু তরুণ তুর্কি নয়, আবার শুধু বয়স্কও নয় - উভয়কে মিলিয়েই চলতে হয়। এবারের যে নির্বাচন সেখানে আমাদের প্রচুর তরুণ প্রার্থী। এমনকি আমার থেকে কম বয়সী প্রার্থী রয়েছে। পৃথা তা, প্রতিকুর, সৃজন, দীপ্সিতা, ঐশী এরা প্রত্যেকেই ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে এসেছে। বর্তমানে আমি যে সংগঠন করি সেই ডিওয়াইএফআই এর সভানেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জীও নন্দীগ্রামের প্রার্থী হয়েছে। সুতরাং বৃদ্ধতন্ত্র কথাটা খুব একটা যুক্তিসঙ্গত নয়, বরং বাম্পন্থীদের খাটো করার উদ্দেশ্যে প্রচার মাত্র।

আচ্ছা, নরেন্দ্র মোদীর বয়স কত? অমিত শাহর বয়স কত? কৈলাস বিজয়বর্গীয়র বয়স কত? দিলীপ ঘোষেরই বা বয়স কত? অথবা মমতা ব্যানার্জীর বয়স কত? কিংবা তাঁর আশেপাশের লোকজন যেমন- সৌগত রায় কিংবা পার্থ চ্যাটার্জীর বয়স কত? বরং বামপন্থীদের মধ্যে নতুন প্রজন্ম অনেক বেশি পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং বৃদ্ধতন্ত্র কথাটা বামপন্থীদের বিরুদ্ধে হাওয়ায় ভাসানো কথা। এই কথার এমন কিছু গুরুত্ব আছে বলে মনে করি না।

৩. পিপলস রিপোর্টার- গত বিধানসভা নির্বাচনে জয়নগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রার্থী ছিলেন কংগ্রেসের সুজিত পাটোয়ারি। এইবারের নির্বাচনে আপনি প্রার্থী হবেন এইরকম কোনো প্রত্যাশা ছিল?

অপূর্ব প্রামাণিক- আমাদের প্রার্থী হওয়ার বিষয়টা তো আর আমাদের প্রত্যাশার উপর নির্ভর করে না। এটা দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোতে হয়। যেমন ধরুণ কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে- কেউ কেউ শাসক দলকে দেড় কোটি টাকা দেওয়ার পর টিকিট পেয়েছে জয়নগর বিধানসভা কেন্দ্রে। বিজেপির প্রার্থী হওয়ার জন্যও নাকি অনেকে টাকা দিয়ে বসে আছে শোনা যাচ্ছে। আমাদের তো আর এসব হয় না। আমাদের সংযুক্ত মোর্চার নেতৃত্ব বসে ঠিক করেন কে কোথায় প্রার্থী হবেন।

৪. পিপলস রিপোর্টার- এবার সরাসরি এলাকার প্রসঙ্গে আসি। জয়নগর বিধানসভা কেন্দ্রের মূল সমস্যাটা কী বলে আপনার ধারণা?

অপূর্ব প্রামাণিক- প্রথম সমস্যা পানীয় জল। জয়নগরে পানীয় জলের সমস্যা মারাত্মক। যেটা এখানকার বিধায়ক আগের ভোটে প্রতিশ্রুতি দিয়েও প্রতিশ্রুতি রাখেননি। দ্বিতীয় সমস্যা পরিবহন ব্যবস্থা। এই যে জয়নগরের গঞ্জের মোড়ে যেখানে জ্যাম হয় এর বিকল্প কিছু করতে হবে। হয় উড়ালপুল বানাতে হবে, অথবা বাইপাস করতে হবে। তৃতীয়ত বেকারত্ব। জয়নগরে হাজারো অল্প বয়সী তরুণ যারা পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করে, লকডাউন না হলে তথ্য হয়তো আমরা জানতেও পারতাম না সংখ্যাটা এই পরিমাণে। তাদের যাতে রাজ্যের বাইরে না যেতে হয়, যাতে পরিবারকে বাইরে যেতে না হয় – সেই বিষয়টি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

আর যেটা সবচেয়ে বড় সমস্যা এই এলাকায়, সেটা হল তৃণমূলের সীমাহীন চুরি। তৃণমূলে থাকলেই যা খুশি করা যায়- এই প্রবণতায় সামাজিক জীবন বিষাক্ত হচ্ছে। সরকারী প্রকল্প থেকে কাটমানি খাওয়া এখন শিল্পে পরিণত হয়েছে। আম্ফানের সময়ও যে সীমাহীন দুর্নীতি জয়নগরের মানুষ দেখেছে তা এক কথায় বেনজির। এলাকার সিনিয়র তৃণমূল নেতা পর্যন্ত সাংবাদিক সম্মেলন করে বিধায়কের বিরুদ্ধে আম্ফানের টাকা চুরির অভিযোগ করেছিলেন। জয়নগরের বিধায়ক বামফ্রন্টের সময় এসএসসি দিয়ে চাকরি পেয়েছিলেন। উনি বলতে পারবেন না- ওনার সরকার কটা বেকার ছেলেমেয়েকে চাকরি দিতে পেরেছে। জয়নগরবাসী এইসবই দেখছেন, আশা করি তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার ভোট দেবেন।

৫. পিপলস রিপোর্টার- জয়নগরে ধর্মীয় মেরুকরণের হাওয়া বইছে প্রবল। একদিকে এই বিভাজন, অন্যদিকে পেশি শক্তি - এলাকার বেশিরভাগ দেওয়ালই শাসক দলের দখলে। সেখান থেকে কীভাবে লড়বেন?

অপূর্ব প্রামাণিক- দেখুন যার বাড়ির দেওয়াল, তিনি যদি বলেন- তৃণমূলকে দেওয়াল দেবেন না অথবা সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থীর সমর্থনে দেওয়াল দেবেন তাহলে তাঁর খবর আছে। হুমকি থেকে শুরু করে সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হবে তাঁর পরিবারকে। এই যে বাইনারির কথা বলছেন এসব মানুষের জীবন জীবিকার ইস্যুর উপরে ওঠে না কখনও।

সাম্প্রদায়িকতা কখনও মানুষের পেটের খিদের উর্ধ্বে ওঠে না। বিশেষ করে এই লকডাউন চলাকালীন সময়ে মানুষ তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন। যেভাবে সারা রাজ্যজুড়ে বামপন্থীরা কমিউনিটি কিচেন চালিয়ে হাজার হাজার মানুষের মুখে খাবার তুলে দিয়েছে, তা কেন্দ্র অথবা রাজ্যের শাসক দলের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তৃণমূল-বিজেপি উভয়েই তখন ঘরে ঢুকে বসে ছিল। অথবা ধরুন এই দিল্লি সীমান্তে যে কৃষক আন্দোলন। বামপন্থীরা ময়দানে আছে। তৃণমূল বা বিজেপি আছে নাকি!

৬. লকডাউনের সময়ের কমিউনিটি কিচেন চালানো কিংবা আম্ফান ত্রাণের দুর্নীতির কথা বলে ভোট জেতা যাবে বলে আপনার মনে হয়?

অপূর্ব প্রামাণিক- দেখুন মানুষ একটু রিলিফ চেয়েছিলেন শুধু, তাঁদের তৃণমূল নিয়ে অনেক প্রত্যাশা ছিল লকডাউনের সময়। কিন্তু শাসক দলের কাছ থেকে খালি হাতেই ফিরতে হয়েছে তাঁদের। সরকারে না থেকেও আমরা চেষ্টা করেছি মাত্র। টানা ৪২ দিন ধরে আমাদের কমিউনিটি কিচেন থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০০-৭০০ মানুষ খাবার পেয়েছেন। যেটা সরকারের দায়িত্ব ছিল, সেটা আমরা নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী করার চেষ্টা করেছি। হ্যাঁ, ঠিকই এই দিয়ে ভোটে জেতা যায় না, কিন্তু আমরা মানুষকে বোঝাতে চেয়েছি সরকার এই একই কাজটা করতে পারতো। যেটা আমরা বামপন্থীরা করেছি। আমরাই বিকল্প।

আর আম্ফান ত্রাণের দুর্নীতি নিয়ে যত কম বলা যায় ততোই ভালো। যারা যারা টাকা চুরি করেছে কেউ রেহাই পাবে না। সবকটা জেলে যাবে। ত্রিপলের পরিবর্তে প্লাস্টিক দিয়েছে, যার ২০ হাজার টাকা পাওয়ার কথা সে পায়নি। কিন্তু নেতার ঘনিষ্ঠ লোকজনের পরিবারে সবাই পেয়ে বসে আছে। এমনকি এক তৃণমূল গোষ্ঠী আর এক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ করেছে। সব মিলিয়ে একেবারে কেলেঙ্কারি ব্যাপার। এসবই মানুষ চোখের সামনেই দেখেছেন।

৭. পিপলস রিপোর্টার- জয়নগরে এখন তৃণমূলের গোষ্ঠী কোন্দল চরমে। শোনা যাচ্ছে বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী আপনার সাথে যোগাযোগ করছে? কতটা সত্যি?

অপূর্ব প্রামাণিক- দেখুন, কোনো মানুষই কারো কেনা গোলাম নয়। এবার তৃণমূলের আভ্যন্তরীণ ঝামেলা তারা কিভাবে মেটাবে তাদের ব্যাপার। এক জন বিধায়কের গাড়ির মধ্যেই ৪ জন খুন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে- এসবই ওদের গোষ্ঠী কোন্দলের ফলাফল। হতে পারে যুযুধান দুই গোষ্ঠীর নেতায় নেতায় মিল হয়ে যাওয়া। কিন্তু ওই ৪টি পরিবার তো ভেসে গেল। তৃণমূলের এই রোজকার গোষ্ঠী কোন্দলে জয়নগরের মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অতিষ্ঠ। যাদের নিজেদের মধ্যে ভাতৃত্ববোধ নেই তারা কিভাবে মানুষের পরিষেবা দিতে পারে!

৮. জেতার জন্য লড়বেন না অপেক্ষাকৃত ভালো ফল করার জন্য লড়বেন?

অপূর্ব প্রামাণিক- না না, আমার জেতার জন্যই লড়বো এবং জেতার ব্যাপারে ১০০% আশাবাদী। এলাকার মানুষের মধ্যেও সেই স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ্য করছি।

৯. একেবারে শেষ প্রশ্ন- আপনাকে জয়নগরের মানুষ ভোট দেবে কেন? কী বার্তা দেবেন দেবেন জয়নগর বিধানসভার মানুষকে?

অপূর্ব প্রামাণিক- শুধু ভোটের সময় বলে নয়, সারা বছর ধারাবাহিকভাবে মানুষের কাছে যে দাবিগুলো নিয়ে গেছি সেই দাবির ভিত্তিতেই ভোট চাইবো। প্রথমত বেকার শিক্ষিত যুবকদের রাজ্যের বাইরে চলে যেতে হচ্ছে। এসএসসি-পিএসি সহ সরকারি চাকরির পরীক্ষা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। রাজ্যে নতুন শিল্প নেই। দিনের পর দিন কোলকাতার বুকে শিক্ষিত ছেলেরা চাকরির দাবিতে অনশন করছে, আন্দোলন করছে। কোনো নিয়োগ নেই। আমাদের সংযুক্ত মোর্চার সরকার ক্ষমতায় এলে এক বছরের মধ্যে সমস্থ শূন্যপদে নিয়োগ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। দ্বিতীয়ত কৃষকের ফসলের ন্যায্য মূল্য চাই এবং কৃষি বিল বাতিল করার প্রক্রিয়া করা। তৃতীয়ত অসংগঠিত শ্রমিকদের মাসে ২১,০০০ টাকা বেতন দিতে হবে। কেরালার মতো রাজ্য তা করতে পেরেছে। চতুর্থত, ইলেক্ট্রিক বিল। যা অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় আমাদের রাজ্যে অনেক বেশি। আমরা বলছি ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ভর্তুকি দেব আমরা, সংযুক্ত মোর্চার সরকার হলে।

সবশেষে এলাকার শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কাছে আবেদন সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি ও তৃণমূলের সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। জয়নগরবাসীকে আশাহত করব না- শুধু এইটুকু প্রতিশ্রুতি রইলো।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.