ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অথবা নতুন ইতিহাস - কোন পথে কেরালা?

সারা দেশের কাছে একটা বিষয় খুবই চলতি যে, কেরালায় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকার পরিবর্তন হয়। গত ১৫ টি নির্বাচনে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ২০১৬র শেষ বিধানসভা নির্বাচনে CPIM নেতৃত্বাধীন LDF ৯১ টি আসনে জয়ী হয়েছিল
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি অথবা নতুন ইতিহাস - কোন পথে কেরালা?
ছবি প্রতীকী সংগৃহীত

আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেরালার মানুষ ভোটের লাইনে দাঁড়াবেন রাজ্যে নতুন সরকার গড়ার গণতান্ত্রিক দায়িত্ব পালন করতে। রাজ্যের ১৪০ টি কেন্দ্রেই ৬ এপ্রিল ভোট নেওয়া হবে। কেরালা রাজ্য গঠনের পর এটা ষোড়শ বিধানসভা নির্বাচন, এই নির্বাচনে মোট ভোটার ২,৭৪,৪৬,০৩৯ জন। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এরাজ্যে মহিলা ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের তুলনায় বেশি। মহিলা ভোটার ১,৪১,৬২,০২৫ এবং ১,৩২,৮৩,৭২৪ পুরুষ ভোটার। প্রসঙ্গত, মহিলা ভোটারের সংখ্যা গত বিধানসভা নির্বাচনেও বেশি ছিল।

সারা দেশের কাছে একটা বিষয় খুবই চলতি যে, কেরালায় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকার পরিবর্তন হয়। গত ১৫ টি নির্বাচনে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত শেষ বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআই(এম) নেতৃত্বাধীন বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট( এলডিএফ) ৯১ টি আসনে জয়ী হয়েছিল।

কিন্তু এবছরের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সারা রাজ্যে পঞ্চায়েত ও পৌরসভা নির্বাচনের ফল এই প্রচলিত ধ্যানধারণা সব ওলটপালট করে দিয়েছে। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের প্রতিটি স্তরে এবং পৌরসভা ও পুরনিগমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষেত্রে জয় পায় এলডিএফ; প্রতিটি ক্ষেত্রে এলডিএফ'র আসন সংখ্যা ও প্রাপ্ত ভোট গতবারের তুলনায় বেশি ছিল। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ)’র আসন ও ভোট গতবারের তুলনায় শুধু কমেইনি, ফল হয়েছিল চুড়ান্ত নৈরাশ্যজনক।

যতই পত্রপত্রিকায় প্রচার হোক না কেন, বিজেপি'র সংগঠনিক শক্তি কেরালায় বলার মতো নয়। শুধু তিরুবনন্তপুরম জেলাতে তাদের কিছু সাংগঠনিক শক্তি আছে। তারা তিরুবনন্তপুরম পুরনিগমকে পাখির চোখ করেছিল ওই নির্বাচনে। সেখানেও এলডিএফ ভালো সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হয়। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই জেলারই নেমোন কেন্দ্রে বিজেপি জিতেছিল। এবারে রাজ্যের তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রে তাদের প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।

বিধানসভাওয়াড়ি ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে,ওই নির্বাচনে এলডিএফ শতাধিক কেন্দ্রে এগিয়ে আছে। বিভিন্ন ওপিনিয়ন পোলের রিপোর্টও বলছে, কেরালায় ফের এলডিএফ ক্ষমতায় ফিরে ইতিহাস তৈরি করতে চলেছে। তবে কেরালার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস নেতা এ কে অ্যান্টনি ৪ এপ্রিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন: “ইউডিএফ ক্ষমতায় আসছে। আমরা কোনো সমীক্ষায় বিশ্বাস করিনা।” আরও তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেছেন: তাদের লক্ষ্য, কেরালায় যাতে বিজেপি'র কোনো বিধায়ক না থাকে। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন এবং সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি খুবই আত্মবিশ্বাসী যে, কেরালার মানুষ ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছেন। কেরালায় নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হবে, না, একই ট্রাডিশন বজায় থাকবে তারজন্য আমাদের ২ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু একটা বিষয় অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, গত পাঁচ বছরে দুটি ভয়ংকর বন্যা, ঝড়, কোভিড অতিমারীর মতো প্রকৃতিক বিপর্যয় এবং সবরীমালার মতো সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুকে প্রশাসনিকস্তরে, রাজনৈতিকস্তরে এলডিএফ যেভাবে মোকাবিলা করেছে তা এককথায় অতুলনীয়। এরসাথেই আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত একগুচ্ছ প্রকল্প তাদের বাড়তি মাইলেজ দিচ্ছে এই নির্বাচনে। বিশেষ করে, কল্যাণমূলক পেনশন প্রকল্প, আবাসন প্রকল্প লাইফ মিশন এবং তপশিলি জাতি-তপশিলি উপজাতি সাবপ্ল্যানের সোশ্যাল অডিট রিপোর্ট খুবই আশাব্যঞ্জক।

কল্যাণমূলক পেনশন এর আগের এলডিএফ সরকারের শুরু করা। ইউডিএফ যখন সরকার থেকে যায় তখন এই পেনশন ছিল মাসিক ৬০০ টাকা। তার আগের ১৮ মাস এই পেনশন ১ টাকাও বাড়েনি। এখন এই পেনশন প্রতি মাসে ১৬০০ টাকা। এলডিএফ এবারের ইস্তাহারে বলেছে, আগামীদিনে এর পরিমাণ বাড়িয়ে করা হবে প্রতিমাসে ২,৫০০ টাকা। গৃহস্থালির কাজে যুক্ত মহিলাদেরও এই প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। আবাসন প্রকল্প লাইফ মিশনে এলডিএফ সরকার ২ লক্ষ ৮০ হাজার বাড়ি তৈরি সম্পূর্ণ করেছে, এবছর আরও দেড় লাখ বাড়ি তৈরি শেষ হবে। ইস্তাহারে লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে আাগামী পাঁচ বছরে ভূমিহীন-গৃহহীনদের ৫ লাখ বাড়ি, এবং এসসি-এসটি'দের সম্পূর্ণ গৃহ প্রকল্প।

স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেরালায় খুবই উন্নত। গত পাঁচ বছরে প্রায় ৫০০ টি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিবার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে উন্নীত করা হয়েছে। তালুক ও জেলা হাসপাতালগুলিতে সুপার স্পেশালিটি পরিষেবা পাওয়া যায় এখন। তার প্রমাণ পাওয়া গেছে কোভিডের সময়। কেরালা এখন কোভিড সংক্রমণের হার কমের দিকে হলেও বিপদ কাটেনি। কিন্তু মৃত্যুহার সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম। পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবা না পাওয়ার অভিযোগ হরদম শুনতে পাওয়া যায়। এটা এতোটাই সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে যে, কেউ এনিয়ে খুব একটা ভাবেও না। কিন্তু কেরালায় ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে অবহেলার অভিযোগ বিরোধীরাও আনতে পারছেনা। এবারে এলডিএফ ইস্তাহারে স্বাস্থ্য বিমার ন্যায় ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলেছে। এই প্রকল্পে ২ থেকে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ সরকার বহন করবে। আউট পেশেন্ট ব্যবস্থারও উন্নতিতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বিবৃত হয়েছে ইস্তাহারে।

আর যেটায় এলডিএফ বাজিমাত করতে চাইছে তা' হলো নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করা। তারা প্রচারে বলছে, আগামী পাঁচ বছরে ২০ লক্ষ কাজের সুযোগ তৈরি করা হবে। এই প্রতিশ্রুতি মানুষের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হচ্ছেনা। গত পাঁচ বছরে এলডিএফ এক্ষেত্রে এমন কিছু কাজ করেছে যাতে মানুষের মধ্যে একটা আশা তৈরি করেছে এই প্রতিশ্রুতি। প্রচারে সরকারের সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার হলো গত পাঁচ বছরে চালু হওয়া ৩,৬০০ টি নতুন স্টার্ট আপ এবং প্রায় ৬০ হাজার ক্ষুদ্র ছোটো মাঝারি শিল্প (এমএসএমই)। এখন রাজ্য এমএসএমই'র সংখ্যা ১ লক্ষ ৪০ হাজারের মতো। ইস্তাহার অনুযায়ী এলডিএফ এই সংখ্যা ৩ লক্ষে নিয়ে যেতে চায়। ছয় লেনের রাস্তা, ফাইবার অপটিপ নেটওয়ার্ক সহ বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্পে ৬০ হাজার কোটি বিনিয়োগ হবে বলেছে এলডিএফ। বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ১০,০০০ কোটি টাকা। রাজ্যকে ইলেকট্রনিক – ফার্মাসিউটিক্যাল হাব হিসেবে তুলে ধরা। এসবের মধ্যদিয়েও কাজের সুযোগ তৈরি হবে।ন্যূনতম মজুরি মাসে ২১০০০ টাকা, প্রকল্প শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলিতে এলডিএফ ইস্তাহারে বেশি জোর দিয়েছে। ৪২ টা রাজ্য সরকারের অধীনস্থ সংস্থা ১০২ কোটি টাকা লাভ করেছে। যেটা সারা দেশে একটা বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সংস্থাগুলির আরও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছ ইস্তাহারে। প্রবাসী মালয়ালীদের পাঠানো অর্থ কেরালার অর্থনীতির স্বচ্ছলতার এক প্রধান উৎস। অতিমারী তাতে ভালোই আঘাত করেছে। বহু মানুষ বিদেশে কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থানমুখী এই চিন্তাভাবনা তাদের এবং তরুণ তরুণীদের আকর্ষিত করছে।

কৃষিক্ষেত্রে গত পাঁচ বছরে ধানচাষের এলাকা বেড়েছে প্রায় ৫৫ হাজার হেক্টর, উৎপাদন বেড়েছে ২০ হাজার টনের মতো। এবারে এলডিএফ কৃষি থেকে আয় ৫০ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলছে। সবমিলিয়ে একটা নতুন আশার কথা শোনাচ্ছেন পিনারাই বিজয়ন। প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং বিরোধীদের রাজনৈতিক ইস্যুগুলিকে বিজয়ন যেভাবে সামলেছেন তাতে তাঁর দক্ষ প্রশাসক হিসেবেও ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।

উল্টোদিকে কংগ্রেস এই নির্বাচনে কোনো ইস্যুকেই জনপ্রিয় করতে পারেনি। কিন্তু তাদের হাতে এলডিএফ'কে বেকায়দায় ফেলার মতো ইস্যু ছিল। সবরীমালা নিয়ে নরম হিন্দুত্বের লাইনে হাঁটতে গিয়ে বিজেপি' র কাছে বেশ কিছুটা জমি খুইয়েছে কংগ্রেস। এখন বিপদ বুঝে বলছে, ধর্মনিরপেক্ষ ভোটে ভাগ বসাচ্ছে বিজেপি।

সোনা চোরাচালান ঘটনায় বিজেপি প্রথম থেকেই নিশানা করেছিল বিজয়ন এবং এলডিএফ'কে। কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকেও কাজে লাগিয়েছিল। কিন্তু যতদিন এগোচ্ছে দেখা যচ্ছে সবই ভিত্তিহীন। রাজনৈতিক উদ্দেশেই যে এসব করা হয়েছিল তা ক্রমশ পরিষ্কার হচ্ছে। কংগ্রেস কেন্দ্রীয় সরকারের কাজে সমর্থন দিয়ে জাতধর্ম দুই-ই খুইয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের একেবারে শেষ পর্যায়ে বিজেপি বিরোধিতায় নামলেও যা ক্ষতি হবার তা আগেই হয়ে গেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও তারা এখনও কাউকে প্রোজেক্ট করতে পারেনি। বহু কংগ্রেসি নেতা এবং বিধায়ক বিক্ষুব্ধ হয়ে দল ত্যাগ করেছেন। তারা বিজেপি- তে যোগ দিয়েছেন। পি সি চাকো, পি সুরেশ বাবু, কে সি রোসাককুট্টির মতো বরিষ্ঠ কংগ্রেসি নেতারা কংগ্রেস ত্যাগ করে এলডিএফ’ র অংশ হয়েছেন। এই দলত্যাগ নির্বাচনে তাদের ভালোই চিন্তায় রেখেছে। এটা যে তাদের বিরুদ্ধে যাবে সেটা কংগ্রেসও ভালোই বুঝতে পারছে।

নরেন্দ্র মোদী,অমিত শাহর মতো বিজেপি’র শীর্ষনেতারা যখন কেরালায় প্রায়ই প্রচারে আসছেন, সেই তুলনায় রাহুল গান্ধী প্রিয়াঙ্কা বঢরাদের সেরকমভাবে কেরালা নিয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছেনা। যেটা কংগ্রসের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ সমর্থকদের অবাক করেছে। কংগ্রেসের এই মরা গাঙে সামান্য হলেও আশার আলো জ্বালিয়েছে এলডিএফ সরকারের মার্কিন কোম্পানি ইএমসিসি' র সঙ্গে মৎস্যচাষ গবেষণা ও উন্নয়ন এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা সম্পর্কিত মউ। মৎস্যচাষিদের স্বার্থের কথা বলে কংগ্রেস এর বিরোধিতা করেছে। সিপিআই (এম) নেতা কালাপুরাক্কলও এই চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন। কেরালার অর্থনীতিতে মৎস্যচাষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উপকূল এলাকায় ৪৯ টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে, ২০১৬ সালের নির্বাচনে যার মধ্যে ৩৪ টিতে এলডিএফ জিতেছিল। এলডিএফ দাবি করেছে, এই চুক্তিতে মৎস্যজীবীদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হবেনা। এখন দেখার এই চুক্তি নির্বাচনী ফলকে কতোটা প্রভাবিত করতে পারে, কংগ্রেসই বা তার থেকে কতোটা ডিভিডেন্ড নিতে পারে।

এই চুক্তির বিষয়টা বাদ দিলে বাকি বিষয়গুলি সব এলডিএফ'র অনুকূলেই রয়েছে। রাজ্যের জনগণের মধ্যে সেরকমভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়াও নেই।প্রতিকূল সময়ে পিনারাই বিজয়নের দক্ষ নেতৃত্ব সব অংশের মানুষের কাছে খুব আকর্ষণীয় এবং গ্রহণীয় হয়েছে। একদিকে গত পাঁচ বছরে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে একগুচ্ছ কাজ, আগামী উন্নয়নের পরিকল্পনা আর বিজয়নের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি, দক্ষ প্রশাসকের রেকর্ডের ওপর ভর করেই নতুন ইতিহাস রচনার স্বপ্ন দেখছে এলডিএফ।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.