নন্দীগ্রাম আজ

মনে পড়ে যাচ্ছিল ক্ষমতার সেই সদম্ভ হুঙ্কার – “নন্দীগ্রামে এখন আপনি লাল পতাকা কেন, লাল রঙের একটুকরো ছেঁড়া ন্যাকড়াও খুঁজে পাবেননা”। হুঙ্কারকারী নিজে আজ নন্দীগ্রামে ভোটপ্রার্থী। শুধু পালটে গেছে পতাকার রঙ।
নন্দীগ্রাম আজ
নন্দীগ্রামে মীনাক্ষী মুখার্জির সমর্থনে প্রচারছবি নিজস্ব

চন্ডীপুর থেকে বাঁদিকে ঘুরে নন্দীগ্রামে যখন গাড়িটা ঢুকছিল, মনে পড়ে যাচ্ছিল ক্ষমতার সেই সদম্ভ হুঙ্কার – “নন্দীগ্রামে এখন আপনি লাল পতাকা কেন, লাল রঙের একটুকরো ছেঁড়া ন্যাকড়াও খুঁজে পাবেননা”। সেই হুঙ্কারকারী নিজে আজ নন্দীগ্রামেই ভোটপ্রার্থী। শুধু পালটে গেছে তার নিজের পতাকার রঙটা। নন্দীগ্রামে প্রবেশের আগে থেকেই রাস্তার দুইধার জুড়ে পতাকার সমাহার। পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে স্থান করে নিয়েছে গেরুয়া শিবির ও ঘাসফুল শিবির। অর্থ আর ক্ষমতার দম্ভ ঢেকে দিতে চাইছে দশ বছরে নন্দীগ্রামের অনেককিছু না পাওয়ার বেদনাকে। আমার চোখ ইতিউতি খুঁজছিল লাল পতাকা – আছে নন্দীগ্রামে? ঠাকুরচকে পৌঁছাতেই সেই দৃশ্য দেখা গেল – এক সারি লাল পতাকা বহন করছে একদল যুবক। তাদের নেতৃত্বে এক তরুণী। আর তরুণীর ঠিক পাশে থেকে তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন আটপৌরে শাড়ি পরা এক প্রৌঢ়া। তাঁর পেছনে আছেন গ্রামের আরও কয়েকজন।

কতদিন দেখেনি নন্দীগ্রাম ভোট প্রচারে নেমে প্রার্থীর এইরকম বাড়ি বাড়ি যাওয়া? রাস্তায় থেমে বড়দের পা ছুঁয়ে হাতজোড় করা? কতদিন নন্দীগ্রামের মানুষ কাঁদেনি ভোটপ্রার্থীকে বুকে জড়িয়ে ধরে? কতদিন বলতে পারে নি তাদের ঘর ভাঙ্গার কথা, যন্ত্রণার কথা, স্বপ্নভঙ্গের কথা?

ঠাকুরচক থেকে মোড় ঘুরে ২ নং ব্লকের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে মিছিল। মিছিল দেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় উঠে আসছেন মহিলারা। পথ চলতে চলতে থমকে দাঁড়াচ্ছেন পথচারী। পড়া সেরে সাইকেলে চেপে ফিরতে থাকা কিশোর কিশোরীর দল সাইকেল থেকে নেমে পথের পাশে সরে দাঁড়াচ্ছে। কতদিন দেখেনি নন্দীগ্রাম ভোট প্রচারে নেমে প্রার্থীর এইরকম বাড়ি বাড়ি যাওয়া? রাস্তায় থেমে বড়দের পা ছুঁয়ে হাতজোড় করা? কতদিন নন্দীগ্রামের মানুষ কাঁদেনি ভোটপ্রার্থীকে বুকে জড়িয়ে ধরে? কতদিন বলতে পারে নি তাদের ঘর ভাঙ্গার কথা, যন্ত্রণার কথা, স্বপ্নভঙ্গের কথা? আজ যেন আগল খুলে বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মত বেরিয়ে আসতে চাইছে সব কথা। মীনাক্ষী এসে দাঁড়িয়েছে যেন ঝর্ণার মুখে পাথরখানা সরিয়ে দিতে।

পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মীনাক্ষী বলছে, মানুষ শুনছেন। মীনাক্ষী বলছে নন্দীগ্রামের সেই যুবকের কথা যে এম এ পাশ করার পরেও চাকরী পায় নি, কাটা চুল প্রসেসিং করে বিক্রী করে আর এইভাবে নিজের সংসার চালায়। মীনাক্ষী বলছে সেই সমস্ত কিশোর কিশোরীদের কথা যারা লেখাপড়া শেখার সুযোগ না পেয়ে জীবনে অন্ধকার দিকটা বেছে নিতে বাধ্য হয়। মীনাক্ষী বলছে এইসব কিছু পালটে দেওয়ার কথা, সব হাতে কাজ, সব পেটে ভাতের কথা, সকলের মাথা উঁচু করে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার কথা। আমরা পৌঁছে গেলাম আমড়াতলার বাজারে। ছোট একটা মিটিং। তারপর আবার শুরু পথচলা, কখনো বাইকে চড়ে, কখনো হেঁটে। গ্রামের রাস্তা দিয়ে প্রখর রোদে এগিয়ে চলেছে মিছিল।

খানিক পরে আমরা গেলাম নন্দীগ্রাম বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে এসেছে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের লোকশিল্পী শাখা তাদের গান ও নাটকের দল নিয়ে। শুরুতে আমাদের দু-চার কথা বলতে বলা হল। দুপুর বারোটা বেজে গেছে, ফাঁকা রাস্তাঘাট। সামনে মাঝে মাঝে কিছু অটো এসে দাঁড়াচ্ছে, আবার যাত্রী নিয়ে চলে যাচ্ছে। বলব কাকে আর শুনবে কে? তবু শুরু করলাম। শুরু করতেই কোথাও থেকে চলে এলেন অনেকেই। শুধু এলেন না, দাঁড়ালেন, পুরো বক্তব্য শুনলেন, এবং তারপর নাটকও দেখলেন। এরপর দুপুরের খাওয়া দাওয়া আর পার্টি অফিসে বিশ্রাম।

এই সেই পার্টি অফিস যেটা আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ২০০৭ সালে। দেওয়ালে আজও সেই পোড়ার দাগ, আধপোড়া জানলা ঝুলছে কব্জা থেকে। সেই সময়ে ওপর তলায় আটকে পড়া কমরেড, আজকে সি পি আই এম-এর জেলা কমিটির মেম্বার ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন সব কিছু

এই সেই পার্টি অফিস যেটা আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল ২০০৭ সালে। দেওয়ালে আজও সেই পোড়ার দাগ, আধপোড়া জানলা ঝুলছে কব্জা থেকে। সেই সময়ে ওপর তলায় আটকে পড়া কমরেড, আজকে সি পি আই এম-এর জেলা কমিটির মেম্বার ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন সব কিছু – কোন ঘরে তাঁরা আটকে পড়েছিলেন, বর্ণনা করছিলেন কিভাবে তাঁরা সেই আগুন থেকে বেঁচে পালাতে পেরেছিলেন। এরমধ্যেই এসে ঢুকলেন আরও কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে একজন আজও ঘরছাড়া, আজও ফিরতে পারে নি নিজের বাড়িতে।

বিকালে নাটকের দলের সঙ্গেই আমরা চললাম দাউদপুরে। সেখানে নাটক আর তার আগে আমাকে বলা হল কিছু কথা বলতে। ফাঁকা মাঠে চেয়ার পেতে বসে আমরা কয়েকজন। পেছনে ফুটবল খেলছে ১৫ থেকে ২৫ বছরের কিছু কিশোর ও যুবক। কিন্তু এবারেও আগের মত অভিজ্ঞতা। বলতে শুরু করতেই আশপাশ থেকে জড়ো হলেন প্রায় শখানেক মানুষ। শুনলেন আমাদের কথা মন দিয়ে। তারপর নাটক শুরু হল। আমাদের অন্য প্রোগ্রাম থাকায় আমরা এগোলাম আমাদের পথে। ওখান থেকে বেরনোর পথে এক প্রৌঢ়ের প্রশ্ন – “আচ্ছা ভাইজান কবে আসবেন?”

বলা শেষ করে যখন বেরিয়ে আসছি, তাঁদের উদ্দেশ্য করে বললাম – “আসছি, দেখবেন আমাদের মেয়েটাকে”। তাঁরাই এগিয়ে এসে আমার দুটো হাত ধরে বললেন – “দিদি, একবার ভুল হয়ে গেছে। কি করব বলুন? আর হবে না”।

দাউদপুর থেকে আমদাবাদ। ওখানে নাটক নয়, কিন্তু চটজলদি একটা সভার আয়োজন করা হয়েছে। রাস্তা চেনা নয়। ফলে লোককে জিজ্ঞাসা করতে করতে পৌঁছানো তো গেল। পৌঁছে দেখা গেল হঠাৎ করে ঠিক হওয়ায় তখনই মাইকের ব্যবস্থা, আলোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মধ্যেই এক কমরেড এসে খবর দিলেন সি পি আই এমের ঝাণ্ডা ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েক জায়গায়। আর বিজেপি বা তৃণমুলের ঝাণ্ডা? না ওগুলোতে হাত পড়ে নি – অটুট রয়েছে। আবার বোঝা গেল মানুষের শত্রুদের আসল লড়াই কাদের সাথে। আমদাবাদের এই এলাকাটা বাজার অঞ্চল। আমদাবাদ হাই স্কুল পাশেই। ফলে রাস্তায় লোকজন ছিলেনই। তাঁরাই অনেকে বসে পড়লেন পথের ওপর। মন দিয়ে শুনলেন আমাদের কথা। আসলে যা তাঁদেরই কথা। বলার সময়ই লক্ষ্য করছিলাম পাশে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকজন মহিলা। বলা শেষ করে যখন বেরিয়ে আসছি, তাঁদের উদ্দেশ্য করে বললাম – “আসছি, দেখবেন আমাদের মেয়েটাকে”। তাঁরাই এগিয়ে এসে আমার দুটো হাত ধরে বললেন – “দিদি, একবার ভুল হয়ে গেছে। কি করব বলুন? আর হবে না”।

ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম সেই ভুলের কথা। কারুর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে শুধু বলি হয় নি কয়েকটি মানুষ, বলি হয়েছে নন্দীগ্রামের মানুষের স্বার্থ, তার সঙ্গে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ। আজ তাই নন্দীগ্রাম ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে প্রত্যয়ের সঙ্গে। একসাথে সিঙ্গুরও নিশ্চয় ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে গোটা পশ্চিমবঙ্গটাই। তাদের সামনে সুযোগ এনে দিয়েছে মীনাক্ষী, সৃজন, দীপ্সিতা, ঐশী, প্রতিকুর, পৃথা ও তার সাথে তাদের চেয়ে আর একটু বড় একঝাঁক তরুণ মুখ। এরাই আগামী পশ্চিমবঙ্গে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। এদের হাত ধরেই এগোবে পশ্চিমবঙ্গ স্বপ্নজয়ের পথে, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, গণতন্ত্রের পুনর্স্থাপন, মাথা উঁচু করে বাঁচার পথে।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.