MAY DAY 2022 - কাজ ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে লড়াই-ই দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ

২০২০-২১ সালে ২০-২৪ এবং ২৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল যথাক্রমে ৩৯ শতাংশ এবং ১৩ শতাংশ। কমছে মজুরি। দেশের শ্রমিকশ্রেণি এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সামনে এবছরের মে দিবসে এটাই বড়ো চ্যালেঞ্জ।
MAY DAY 2022 -
কাজ ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে লড়াই-ই দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ
প্রতীকী ছবি

গত দুবছরের মেদিবস লকডাউন-মহামারীর আবহে কেটেছে। এবছর মহামারীর প্রকোপ অনেকটাই কম।জনজীবনও স্বাভাবিক। তবে দেশের অর্থনীতি এখনও মহামারীজনিত বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা দেশের কাজের বাজারের। নতুন কাজ তো তৈরি হচ্ছেই না, কাজ থেকে ছাঁটাইয়ের হারও ঊর্ধ্বমুখী। ২০২০-২১ সালে ২০-২৪ এবং ২৫-২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল যথাক্রমে ৩৯ শতাংশ এবং ১৩ শতাংশ। শেষ আর্থিক বছরের পরিসংখ্যান এখনো আমাদের হাতে আসেনি। তবে যতটুকু জানা গেছে তাতে অবস্থার বিরাট কিছু পরিবর্তন ঘটেনি। ভয়াবহ বেকারত্বের পরিণতিতে কমছে মজুরি। দেশের শ্রমিকশ্রেণি এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সামনে এবছরের মেদিবসে এটাই বড়ো চ্যালেঞ্জ।

কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন, এটা তো দেশের সরকারের কাজ। সে অনুকূল নীতি প্রণয়ন করে এ সমস্যার সমাধানের পথে এগোবে। শ্রমিকশ্রেণি, ট্রেড ইউনিয়নের এক্ষেত্রে কী ভূমিকা থাকতে পারে। আসলে সরকারের নীতি প্রণয়নের অভিমুখটাই এখানে প্রধান আলোচ্য বিষয়।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যে অর্থনৈতিক নীতিই নেওয়া হোক না কেন তা বেকার সমস্যা সমাধান করতে পারে না। দর্শনগত অবস্থানের কারণেই পুঁজিবাদ এ সমস্যার সমাধান চায় না। পুঁজিবাদের মূল চালিকাশক্তি হলো শোষণ, মুনাফা এবং লুট। পুঁজিবাদকে বেঁচে থাকতে হলে এই উপাদানগুলিকে সজীব রাখতেই হবে। আর এর লোভেই সে দুনিয়াজুড়ে ছুটে বেড়ায়। শোষণ এবং মুনাফাকে সক্রিয় রাখতে হলে শ্রমের মজুতবাহিনীকে হালকা হলে চলবে না। তাকে সবসময়ে স্ফীত রাখতে হবে। বর্তমান পর্যায়ের নয়াউদারনীতি হলো পুঁজিবাদের এই বেঁচে থাকার উপাদানগুলিকে গতিশীল রাখার আরও আগ্রাসী, আরও হিংস্রতর রূপ। মোদি সরকার এই নীতির ঘোরতর সমর্থক। ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে যখন নরসিমা রাও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে উদারনীতি গ্রহণ করল, তখন বিজেপি বলেছিল, এই নীতি তাদের থেকে কংগ্রেস হাইজ্যাক করেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই মোদি সরকার এমন কোনো নীতি নেবে না, যা পুঁজিবাদের বেঁচে থাকার উপাদানগুলির বিরুদ্ধে কাজ করবে।

মহামারী অর্থনীতির চাকাটাকেই প্রায় স্তব্ধ করে দিয়েছিল। অর্থনীতির সংকট যেমন কাজের বাজারকে প্রভাবিত করে, ঠিক একইরকমভাবে মালিকদের মুনাফাও এর আঘাত থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। তাকে সুস্থ-স্বাভাবিক রাখতে তাই নরেন্দ্র মোদিদের মাঠে নামতে হয়। শ্রেণিগত অবস্থানের কারণেই তারা একাজ করতে দায়বদ্ধ। তাই কেন্দ্রের বিজেপি সরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো আলোচনার সুযোগ না দিয়ে তিন কৃষি আইন, শ্রম কোড সংসদে পাশ করিয়ে নেয়। রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ বেচার জন্য ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপলাইনের মতো সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু দেশের বেকার সংখ্যা কমাতে কিংবা কর্মছাঁটাই রুখতে হলে দরকার ছিল দেশের উৎপাদন ব্যবস্থাকে চাঙ্গা রাখা। তার জন্য প্রয়োজন বাজারে চাহিদা। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি । দেশের গরিব, প্রান্তিক জনগণকে সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নগদ অর্থ দিতে পারত তাহলে বাজার কিছুটা হলেও চাঙ্গা হতো। গরিব ও প্রান্তিক জনগণই দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। মহামারীতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে এঁরাই। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এঁদের বাজারমুখী করাটা একান্তই জরুরি ছিল। মোদি সরকার এঁদের নগদ অর্থ দেওয়ার নীতি নেয়নি। দেশে যা বাজেটের আকার তাতে তা করা সম্ভব ছিল। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়েরও পরামর্শ ছিল তাই। এর পরিবর্তে বাজারে চাহিদা-অভাবের সময় মুনাফাকে ঠিক রাখতে কর্পোরেটদের করছাড় সহ নানাভাবে ত্রাণ দিয়ে গেছে মোদি সরকার।

এই মহামারীর সময়েই দেশের শ্রমিক, কৃষক এবং খেতমজুররা ঐক্যবদ্ধভাবে তিন কৃষি আইন ও চার শ্রম কোড বাতিল, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলেছে। দুটি সফল সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘট সংগঠিত করেছে। টানা একবছরের রাস্তার লড়াইতে কৃষকরা মোদি সরকারকে তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেছে। এ লড়াইতে শ্রমিকদের তারা সক্রিয়ভাবে পাশে পেয়েছে। এটা দেশের গণআন্দোলনে একটা নতুন দিক। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির মঞ্চ আরও শক্তিশালী হয়েছে। তাদের ডাকা সম্প্রতি সময়ে দুটি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটে চারটি শ্রম কোড বাতিল, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেসরকারিকরণ বন্ধ, রেগা'য় শ্রমদিবস বৃদ্ধির মতো দাবিগুলি ছিল। এটা ঠিক যে, সব দাবি আদায় হয় নি। কিন্তু শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন মোদি সরকারের উদারনীতির রথের গতিকে কিছুটা হলেও স্লথ করতে পেরেছে।

কৃষক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে শ্রমিক-কৃষক-খেতমজুরদের যে ঐক্য গড়ে উঠেছে তাকে ব্যবহার করে কাজের দাবিতে, ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে এবং মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে দেশজোড়া আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই আন্দোলনে শ্রম কোড বাতিল, রেগা'য় কর্মদিবস বৃদ্ধি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ২১ হাজার টাকা, ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আইনি নিশ্চিতিকরণের মতো বিষয়গুলি থাকবে। বর্তমানে দেশে চালু থাকা ২৯টি শ্রমআইনকে ৪টি শ্রম কোডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শ্রম কোডে ন্যূনতম মজুরি আইন, দৈনিক শ্রমঘণ্টা আইনকে একেবারেই বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। এরফলে এখন মালিকশ্রেণি শ্রমিক-কর্মচারীদের যেকোনো মজুরিতে দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত খাটাতে পারবে। আন্দোলন ছাড়া এই শ্রম কোড মোদি সরকার বাতিল করবে না কিংবা ওই দাবিগুলিও মেনে নেবে না। ওই দাবিগুলির মীমাংসার ওপরই নির্ভর করছে দেশের কাজের বাজারের যে সংকট তৈরি হয়েছে তার সমাধান। এখানেই হলো দেশের শ্রমিকশ্রণি ও ট্রেড ইউনিয়নগুলির দায়িত্ব এবং চ্যালেঞ্জ।

দেশের সামনে আরেকটি মহাবিপদ হলো ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি। আরএসএস-বিজেপি'র উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি দেশকে সেইদিকে নিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক-কৃষক-খেতমজুরদের সমস্ত দুঃখ অভাব যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দেবার জন্য ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি শাসকদলের বড়ো হাতিয়ার। আর তা প্রয়োগে যে তারা সফল হচ্ছে তার বড়ো উদাহরণ উত্তরপ্রদেশের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচন। কাজ ও মজুরি বৃদ্ধি এবং ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের আন্দোলন শাসকশ্রেণির এই হাতিয়ারকে ভোঁতা করতে সবচেয়ে কার্যকরী। ইতিহাসও আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.