মে দিবস

১৮৮৬ সালের ১ মে'র শিকাগোর হে মার্কেটের ঘটনার ৩০ বছর আগে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিক ধর্মঘট হয় ১৮৫৬র ২১ এপ্রিল অস্টেলিয়ায়। তাঁরা প্রথম দাবিসনদে বলেছিলেন - “৮ ঘণ্টা শ্রম, ৮ ঘণ্টা আনন্দ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম।
মে দিবস
কার্টুন সংগৃহীত

“কাজের ঘণ্টা কমাবার আন্দোলনের সঙ্গে মে দিবসের জন্ম-কাহিনি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে”-মহান আমেরিকান কমিউনিস্ট আলেকজান্ডার ট্রাকটেনবার্গ তাঁর বিখ্যাত ‘মে দিবসের ইতিহাস' পুস্তকটি লেখা শুরু করেছিলেন এই বাক্যটি দিয়ে। বাস্তবিকই দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের সীমার জন্য দেশে দেশে লড়াই-ই মে দিবসের ইতিহাসের অক্ষরমালা তৈরি করেছিল।

১৮৮৬ সালের ১ মে'র শিকাগোর হে মার্কেটের ঘটনার প্রায় ৩০ বছর আগে দুনিয়ায় প্রথম আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকরা ধর্মঘট করে ১৮৫৬ সালের ২১ এপ্রিল অস্টেলিয়ায়। তাঁরাই প্রথম দাবিসনদে বলেছিলেন - “আট ঘণ্টা শ্রম, আট ঘণ্টা আনন্দ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম।” আর এর ছয় বছর পর ১৮৬২ সালের মে মাসে হাওড়ার রেলওয়ে শ্রমিকরাও ধর্মঘট করল আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে। ভারতে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের বিকাশ অনেক পরে ঘটলেও আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলনের ইতিহাসটা বেশ পুরোনোই।

শিকাগোর হে মার্কেটের ঘটনার ১৩৫ বছর পর এই ২০২১ সালে এসে অস্টেলিয়া কিংবা ভারত দৈনিক কাজের সময়সীমা আট ঘণ্টার নিয়ম খাতায় কলমে থাকলেও কোথাও তাকে মালিকশ্রেণির মান্যতা দেবার বাধ্যবাধকতা আর নেই। ভারতে তো এই শ্রমআইন লঙ্ঘন গত কয়েক দশক ধরে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই অতিমারীর সময়েই এদেশের মোদী সরকার তিনটি শ্রম কোড সংসদে পাশ করিয়েছে, যাতে চেষ্টা হয়েছে এই শ্রমআইন লঙ্ঘনকে একটা আইনি সিলমোহর দেওয়ার। ওই শ্রমকোডে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করানোর একটা সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ আইনি দিক দিয়েও শ্রমিকদের কোণঠাসা করার প্রচেষ্টা।

কোভিড অতিমারীর দ্বিতীয় ধাক্কায় ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রায় বেসামাল। গত বছর কোভিড সংক্রমিতের দৈনিক সংখ্যা যেখানে সর্বোচ্চ ৯৭-৯৮ হাজার উঠেছিল, সেখানে এখন ইতিমধ্যেই দৈনিক সংক্রমিতের সংখ্যা ৪ লক্ষ পেরিয়ে গেছে। কোথায় যে এর শেষ হবে তা সময়ই বলবে। তবে গতবারের থেকে আরও বেশি যন্ত্রণা কষ্ট ক্ষতি যে এবারে দেশের মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।

অতিমারী-লকডাউনকে ব্যবহার করে গতবছর মোদী সরকার একতরফাভাবে কৃষি আইন, শ্রম কোড চালু করেছিল; আর নিয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদের লাগামছাড়া বেসরকারিকরণের কর্মসূচি। লকডাউনের ফলে কোটি কোটি পরিযায়ী শ্রমিকের করুণ পরিণতি সারা দেশ প্রত্যক্ষ করেছে।ঠিক কত যে শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন, কত যে ব্যবসা – উৎপাদন ক্ষেত্র বন্ধ হয়েছে তার সঠিক হিসাব এখনও করা যায়নি। এর সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের এইসব কর্মসূচি দেশের শ্রমিক-কৃষকদের কোমর ভেঙে দেবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। একদিকে দেশের অর্থনীতি গত আর্থিক বছরে সংকুচিত হয়েছে সাত শতাংশেরও বেশি হারে। চারিদিকে কাজের হাহাকার। আনলক পর্যায়ে শ্রমিকদের এই অসহায় অবস্থার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করছে মালিকশ্রেণি। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী সদর্পে ঘোষণা করেছেন, কোভিড পরিস্থিতির যতই অবনতি হোক না কেন আর্থিক সংস্কারের কাজ আটকে থাকবে না। নিশ্চিতভাবেই আরও শ্রম সংস্কারেরও চেষ্টা চালাবে কেন্দ্র। এখন প্রশ্ন এটাই, গণতান্ত্রিকভাবে মানুষের ভোটে নির্বাচিত একটা সরকার জনগণের অসহায় অবস্থাকেই তাদের ওপর আক্রমণ চালানোর সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। এটা কোন্ ধরনের নৈতিকতা?

দেশের কয়েকটি রাজ্যে লকডাউন - আংশিক লকডাউন শুরু হয়ে গেছে। পরিযায়ী শ্রমিকরা গত বছরের অভিজ্ঞতায় আগে থেকেই ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। পরিযায়ী ও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকরা কোভিডের দ্বিতীয় আঘাতে যেমন অর্থনৈতিকভাবে ফের ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, একইভাবে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনাও তাঁদেরই বেশি। এঁদের চিকিৎসা, ভ্যাকসিনের বিষয়টা অবশ্যই অগ্রাধিকার পাওয়া দরকার। কিন্তু কেন্দ্র ইতিমধ্যে যেভাবে হাত গুটিয়ে ভ্যাকসিনকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেবার কৌশল নিয়েছে, তাতে এই অংশের শ্রমজীবী মানুষ আর ভ্যাকসিনের নাগাল পাবেন না। অথচ এঁরাই দেশের শ্রমশক্তির ৯২ শতাংশ। এঁদেরই বেশিভাগের বয়স ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। এঁরা সংখ্যায় বিরাট হলেও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের বিচারে রাষ্ট্রশক্তিকে এঁদের আঘাত করার ক্ষমতা কম। ইস্পাত, তেল, বিদ্যুৎ, খনি, ব্যাঙ্ক, বিমা প্রভৃতি সংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক – কর্মচারীদের রাষ্ট্রশক্তিকে আঘাত করার ক্ষমতা অনেক বেশি। তাই মোদী সরকার দ্বিতীয় দফার শাসনে সব লক্ষ্য নিবদ্ধ করেছে সংগঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের ওপর।

সঙ্ঘ পরিবারের শ্রমিক সংগঠন বিএমএস ছাড়া সমস্ত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন, কর্মচারীদের ফেডারেশনগুলি এক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই উদারনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালাচ্ছে। বর্তমান কোভিডের দ্বিতীয় আঘাতেও তাদেরই বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিশেষ করে, এই ট্রেড ইউনিয়নগুলির সংগঠিত ক্ষেত্রকে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির আন্দোলন তৈরি করতে হবে। সর্বোপরি এই আন্দোলনগুলিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রকে বাঁচানোর যেমন লক্ষ্য থাকবে, একইভাবে আয়কর দেয়না এরকম পরিবারপিছু প্রতিমাসে ৭,৫০০ টাকা প্রদান, প্রতি ব্যক্তিকে প্রতিমাসে ১০ কেজি খাদ্যশস্য দেবার এবং বিনামূল্যে সর্বজনীন ভ্যাকসিনের মতো দাবিগুলিকেও তুলে ধরতে হবে। সিআইটিইউ এই ধরনের ৮ দফা দাবি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জানিয়েছে। অন্যান্য কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক দলগুলিকেও একই দাবিতে সোচ্চার হতে হবে। পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি' ফল খারাপ হলে এই দাবিতে আন্দোলন জোরালো হতে পারে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাইহোক না কেন, কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির একটা বড়ো দায়িত্ব থাকবেই, এই বিরাট অংশের শ্রমজীবী মানুষের এজেন্ডাগুলিকে রাজনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসার। তারা দীর্ঘদিন ধরে ঐক্যবদ্ধভাবে এক মঞ্চে রয়েছে, এটা তাদের ওই দায়িত্ব পালনে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।

২০১৯ সালে ডিসেম্বর মাসে কোভিড অতিমারী শুরু হবার পর এটা দ্বিতীয় মে দিবস। দৈনিক কাজের সময়সীমা আট ঘণ্টা বজায় রাখার লড়াই শুধু নয়, শ্রমজীবী মানুষ সহ সংখ্যাগরিষ্ঠ নিপীড়িত মানুষের বহুমাত্রিক বিষয়সমূহ আজ দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সামনে হাজির হয়েছে। যদিও গত কয়েকমাসে দেশের শ্রমিক-কৃষকদের আন্দোলন-সংগ্রামের ক্রমশ রক্ষণাত্মক স্তর থেকে আক্রমণাত্মক স্তরে উন্নীত হবার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানের কঠিন সময়ে এই ইতিবাচক উপাদানটিকে যদি দেশের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন আরও প্রসারিত ও নিবিড করতে পারে তা'হলে দাবি আদায়েও তারা সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। সর্বোপরি দেশের শ্রমজীবী মানুষরাও একটা ভরসা-স্থল খুঁজে পাবে। যেটা এই অতিমারী পরিস্থিতিতে খুবই জরুরি ও মানবিক প্রয়োজন।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in