Italy: ফ্যাসিবাদ প্রায় মুছে যাওয়া ইতালিতে মুসোলিনির ছায়া, উগ্র-দক্ষিণপন্থার প্রত্যাবর্তন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরেই ইতালির রাজনীতি থেকে শক্তি হিসেবে ফ্যাসিবাদ প্রায় মুছেই গেছিল। যুযুধান দুই প্রধানশক্তি ছিল খ্রিশ্চান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং ইতালির কমিউনিস্ট পার্টি বা (PCI)।
জর্জিয়া মেলোনি হতে চলেছেন ইতালির প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী
জর্জিয়া মেলোনি হতে চলেছেন ইতালির প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীগ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

২০১৬ সাল। ফল ঘোষণা করা হচ্ছে রোম শহরের কাউন্সিল নির্বাচনের। দেখা গেল নির্বাচিত কাউন্সিলারদের মধ্যে সবথেকে বেশি ভোট পেয়েছেন এক বছর চল্লিশের তরুণী। নাম তাঁর র‍্যাচেল। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এই নেহাতই এক মামুলি খবর। ১৯৪৬ সালে ইতালিয়ান প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর এরম কত কাউন্সিল নির্বাচনই তো হয়েছে, প্রত্যেকবারই কাউন্সিলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন কেউ না কেউ। ইতালির মিডিয়ার এই খবরের নিরুত্তাপ কভারেজ দেখেও মনে হওয়া অতি স্বাভাবিক যে অস্বাভাবিক কিছুই এই নির্বাচনে হয়নি।

সমাজ বিজ্ঞানী লরেঞ্জো জাম্পোনির মতে এই ঘটনাই ছিল ইতালির রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদের নর্মালাইজেশন বা স্বাভাবিকীকরণ-এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কারণ র‍্যাচেলের পদবি - মুসোলিনি, তিনি ইতালির ফ্যাসিস্ট একনায়ক বেনিতো মুসোলিনির নাতনি। অবশ্যই কেউ ফ্যাসিস্ট একনায়কের নাতনি হলেই তিনিও ফ্যাসিস্ট হবেন এমন মনে করার কোনো কারণ নেই, কিন্তু র‍্যাচেল বারবার স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন তিনি তাঁর পিতামহের ঐতিহ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জিত নন, বরং গর্বিত এবং তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন উগ্র-জাতীয়তাবাদী ‘ফ্রাটেল্লি দ’ইতালিয়া’ বা Fdl দলের হয়ে, যারা ইতালির ফ্যাসিবাদী অতীতকে লজ্জার নয়, গর্বের বিষয় মনে করে।

যদি হিটলারের কোনো বংশধর ‘আমার ঠাকুরদা যা করেছেন বেশ করেছেন’ বলে বার্লিনের নগর কাউন্সিলের নির্বাচনে লড়তেন, সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দূরে থাক, নাৎসিবাদী অ্যাপলজিয়ার অপরাধে তাঁকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হতে হত। ইতালিতে র‍্যাচেল মুসোলিনির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েও শুধু গ্রেপ্তার হলেন না তাই নয়, সর্বোচ্চ ভোট প্রাপ্ত নির্বাচিত কাউন্সিলার হলেন, টি.ভি-তে মন খুলে ইন্টারভিউ দিলেন এবং এমনকি নিজের মুসোলিনি আর ফ্যাসিবাদকে থিম করে ফাঁদা ট্যুরিজম ব্যবসাও বেশ ভালোই জমিয়ে ফেললেন। ফ্যাসিবাদও আর পাঁচটা মতের মতো মত, র‍্যাচেল মুসোলিনিও আর পাঁচজনের মতো রাজনীতিবিদ এবং Fdl-এর মতো দলও আর পাঁচটা দলের মতো দল – ফ্যাসিস্ট বা বলা ভালো নবকলেবরের এই পোস্ট-ফ্যাসিস্ট অতিদক্ষিণপন্থার স্বাভাবিকীকরণ কতটা সফল, এই ঘটনায় ইতালিয়ান মিডিয়ার নিরুত্তাপ মনোভাব ছিল তার মাপকাঠি।   

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরেই ইতালির রাজনীতি থেকে শক্তি হিসেবে ফ্যাসিবাদ প্রায় মুছেই গেছিল। নতুন ইতালীয় প্রজাতন্ত্রে যুযুধান দুই প্রধানশক্তি ছিল খ্রিশ্চান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং ইতালির কমিউনিস্ট পার্টি বা PCI। প্রবল ভাবে কমিউনিস্ট বিরোধী  খ্রিশ্চান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সময় সময় কমিউনিস্ট প্রভাব প্রতিপত্তি আটকাতে নব্য ফ্যাসিস্টদের সাহায্য নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কখনই তাদের ইতালির রাজনীতিতে কোনো নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে দেয়নি। তৎকালীন ইতালির রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে তা সম্ভবও ছিল না। পশ্চিম ইউরোপের সবথেকে শক্তিশালী এবং ফ্যাসিস্ট বিরোধী সংগ্রামে অভিজ্ঞ কমিউনিস্ট পার্টি তখন ইতালির প্রধান বিরোধী দল। কোনোভাবেই ফ্যাসিস্টদের তাঁরা মাথা তুলতে দিতে রাজি ছিলেন না। ঠিক এই কারণে প্রধান নব্য ফ্যাসিস্ট দল ‘মুভমেন্টো সোশিয়ালে ইতালিয়ানো’ বা MSI কে তারা রাজনৈতিক ভাবে একেবারে অচ্ছুৎ করে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আর্তুরো মিচেলিনির নেতৃত্বে MSI ‘ইনসেরিমেন্টো’ নামক কৌশল গ্রহণ করে। এই কৌশলের মূল কথা ছিল ঠান্ডা লড়াইয়ের ফলে ইতালিতে যে অ্যান্টি কমিউনিজমের হাওয়া উঠেছিল, তাকে ব্যবহার করে খ্রিশ্চান ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যে ঢুকে ফ্যাসিস্ট রাজনীতিকে আবার মূল ধারায় নিয়ে আসা বা ‘ইনসার্ট’ করা। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে এইরকম একটা সম্ভবনা দেখাও দিয়েছিল, কিন্তু কমিউনিস্টদের জঙ্গি আন্দোলনের ফলে খ্রিশ্চান ডেমোক্র্যাট পার্টি ক্রমে MSI-এর থেকে দূরত্ব তৈরি করে। MSI এবং সামগ্রিক ভাবে নব্য-ফ্যাসিস্ট রাজনীতিই একটি কানাগলিতে গিয়ে ধাক্কা খায়। যতদিন ইতালির মাটিতে কমিউনিস্ট পার্টি ছিল, ততদিন ফ্যাসিস্ট রাজনীতি এই কানাগলি থেকে বেরোতে পারেনি।

ফ্যাসিস্ট রাজনীতির মূলধারায় আগমনের পথ খুলে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। ইতালির কমিউনিস্ট নেতারা তখন বিভ্রান্ত, হতচকিত। ইতালির কমিউনিস্ট পার্টি কোনোদিনই সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির অন্ধ অনুসরণ করেনি। পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত সাম্যবাদের মডেলের বিপরীতে পশ্চিম ইউরোপের কমিউনিস্ট দলগুলি যে ইউরোকমিউনিস্ট মডেল গড়ে তুলেছিল তার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিল ইতালির কমিউনিস্টরা। কিন্তু তাহলেও এই পতন ছিল তাঁদের দীর্ঘকালের লালিত বিশ্বাসের উপর এক নির্মম আঘাত। পশ্চিম ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা নিজেরাই মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা পার্টি ভেঙে দেবেন। একদল সাম্যবাদী এর বিরোধিতা করলেন। কিন্তু তাঁরা ছিলেন সংখ্যালঘু। কমিউনিস্ট পার্টির অধিকাংশ পুরোনো সংগঠন নিয়ে তৈরি হল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ দ্য লেফট। তারপর আরও ভাঙা গড়া জোড়ার মধ্যে দিয়ে গিয়ে ২০০৭ সাল নাগাদ এই পার্টি পরিণত হল মধ্য-বাম ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা PD-তে। একদা নব্য-ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রাচীরের মত খাড়া থাকা কমিউনিস্ট পার্টির শতাব্দী ব্যাপী সংগ্রাম ও আত্মত্যাগে গড়ে তোলা সংগঠন ও অর্থ অধিকাংশই এল টোনি ব্লেয়ারের ধাঁচের তৃতীয় ধারার উদারনীতির রাজনীতি অনুসরণ করা এই দলটির হাতে।

ইতিমধ্যে ইতালির দক্ষিণপন্থী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন সিলভিও বার্লুসকোনি। ধনকুবের, ইতালিয়ান মিডিয়া ব্যবসার বেতাজ বাদশার বণিকের মানদন্ড পরিণত হয়েছে রাজদন্ডে। আর তাঁর হাতে রাজদন্ড যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফ্যাসিস্ট রাজনীতি বেরোতে পেরেছে কানা গলি থেকে। তখন পুরোনো ফ্যাসিস্ট দল MSI আর নেই। কিন্তু MSI থেকে সৃষ্টি হওয়া অ্যালিয়েনজা ন্যাজনাল বা AN বহাল তবিয়তে রয়েছে। তারা তাদের ফ্যাসিস্ট ভাষ্যে আরও ভদ্রতার মোড়ক দিতে শিখেছে। একপ্রকার ভাবে তাদের পোস্ট-ফ্যাসিট বলাই সঠিক হবে। কিন্তু অতি-দক্ষিণপন্থার যে ডি.এন.এ তা তাদের মধ্যে তখনও রয়েছে পূর্ণ মাত্রায়। যে কাজ খ্রিশ্চান ডেমোক্র্যাটরা কমিউনিস্টদের আন্দোলনের ভয়ে করতে সাহস পায়নি, সেই কাজই বার্লুসকোনি করলেন। তিনি তাঁর ক্যাবিনেটে স্থান দিলেন এই অতি-দক্ষিণপন্থী দলের একাধিক সদস্যকে। দলের প্রেসিডেন্ট ইগ্নাজিও লা রুসা হলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, ছাত্র নেত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে করা হল যুব মন্ত্রী। তাঁরা কথায় বার্তায় ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিলেন ক্ষমতার অলিন্দে এসে তাঁদের পূর্ব মত খুব কিছু পাল্টায় নি। মেলোনি তো প্রকাশ্যেই মুসোলিনি বন্দনা করে বসলেন। তখনও ফ্যাসিস্টদের হয়ে সাফাই গাওয়া ইতালিতে অতটাও স্বাভাবিক বলে ধরা হত না। খুব হইচই হল, কাগজে কাগজে লেখালেখি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। বার্লুসকোনি বরং তাঁর দলের সঙ্গে AN-কে মিশিয়ে দিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ফ্যাসিস্টদের তিনি হজম করে নেবেন। তাঁর বোধহয় ইল্বল আর বাতাপির কাহিনী জানা ছিল না। বার্লুসকোনি অগস্ত্য ছিলেন না। ফ্যাসিস্টদের তিনি হজম করতে পারেননি। নানা ব্যক্তিগত ও সরকারী কেলেঙ্কারিতে তিনি কাদায় পড়লেই তাঁর দলের উদর বিদীর্ণ করে বহুগুণ অধিক শক্তিশালী হয়ে AN নতুন নামে আত্মপ্রকাশ করল ২০১২ সালে। এই দলই হল পূর্বে উল্লেখিত মুসোলিনির নাতনির দল, ‘ফ্রাটেল্লি দ’ইতালিয়া’ বা Fdl।

ইতিমধ্যে উত্থান হয়েছে লেগা (Lega) নামক আরেকটি দলের। মূলতঃ উত্তর ইতালির আঞ্চলিক দাবী দাওয়া নিয়ে এই দলের যাত্রা শুরু হলেও অধিকাংশ আঞ্চলিক দলের মতো শেষ পর্যন্ত ‘বহিরাগত’-দের বিরুদ্ধে ‘ভূমিপুত্র’-দের সংগ্রামের ভাষণ দিতে দিতে লেগা গিয়ে পড়ল সেই অতি-দক্ষিণপন্থার খোঁয়াড়েই। সমগ্র উত্তর ইতালিতে এই সময় তাদের প্রভাব ভালোই বৃদ্ধি পেল। ভেনিস তো হয়ে উঠল এই দলের দুর্গ। উগ্র জাতীয়তাবাদী বক্তা হিসেবে এই দলের নেতা মাত্তেও সালভিনি বেশ নামডাক করে ফেললেন। রাজনীতিতে এলো ফাইভ স্টার মুভমেন্ট বা M5S নামক একটি দলও। উগ্র দক্ষিণপন্থী না হলেও জনমোহিনী এই দলটির অরাজনীতির রাজনীতি দক্ষিণপন্থীদের ক্ষেত্র আরও উর্বর করে দিল।      

উগ্র দক্ষিণপন্থার এই জয়যাত্রা প্রতিরোধের ভার গিয়ে পড়ল পুরোনো কমিউনিস্ট পার্টির ভিত্তির উপর নির্মিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বা PD­-এর হাতেই। ইতিমধ্যে দলের নেতৃত্ব থেকে একে একে বিদায় নিয়েছেন প্রাক্তন কমিউনিস্ট নেতারা। পরের প্রজন্ম যারা এসেছে তারা কমিউনিস্ট তো ননই, প্রাক্তন কমিউনিস্ট নেতাদের মধ্যে বামপন্থার প্রতি বা ফ্যাসিস্ট বিরোধী রাজনীতির প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা ছিল, সেইটুকুও তাদের নেই। অ্যান্টি-ফ্যাসিজম তাঁদের কাছে তখন ভোট চাওয়ার একটা হাতিয়ার মাত্র, শুধুই স্লোগান আর অর্থনৈতিক নীতিতে তাঁদের সঙ্গে বার্লুসকোনির খুব সামান্যই তফাৎ। যাঁদের এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল, তার অবসান হল মাত্তেও রেনজি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেই। ইতালির শ্রম আইনে তিনি আমূল পরিবর্তন আনলেন শ্রমিকদের বিপক্ষে, বেসরকারীকরণের দিকে জোর দিলেন এবং সামগ্রিক ভাবে এমন সব অবস্থান নিতে শুরু করলেন যে অন্ততঃ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বার্লুসকোনির দক্ষিণপন্থী সরকারের সঙ্গে রেনজির মধ্য-বাম সরকারের ঠিক কি তফাৎ তা বুঝতে না পেরে বাম ভোটাররা মাথা চুলকাতে লাগলেন। এইভাবে যে ছিঁটেফোঁটা অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ও বাম ঐতিহ্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টি বহন করছিল, রেনজি তা জলাঞ্জলি দিয়ে হাত মুছে ফেললেন।

২০১৮-এর নির্বাচনের পর ইতালির আইনসভায় বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে M5S। তাঁরা ঘোষিত ভাবে অরাজনীতির রাজনীতি করেন। তাই পাক্কা ‘বাবা আমি সাতে পাঁচে থাকি না’ বলা লোকজনের মতো তারা কিছুদিন Lega-এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে দক্ষিণপন্থীদের সাহায্য নিয়ে সরকার চালালেন। আবার দক্ষিণপন্থীরা তাঁদের সরকার ফেলে দিয়ে নিজেরাই রাজা হওয়ার উপক্রম করলে PD বা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির হাত ধরলেন। ইতিমধ্যে ইতালিতে কোভিড-১৯ জাঁকিয়ে বসেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সঙ্গিন। এই পরিস্থিতিতে মারিও দ্রাঘির নেতৃত্বে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠিত হল। Lega, M5S, PD- দেশের তিনটি প্রধান দল একসাথে এক অভিনব জোট সরকার নির্মাণ করলেন। ডান, ‘সাতে-পাঁচে থাকি না’ আর মধ্য-বাম-এর এই অদ্ভুত জগাখিচুড়ি সরকার গঠিত হওয়ায় সবথেকে লাভবান হল সরকারের বাইরে থাকা Fdl। সমস্ত জনক্ষোভকে পুঁজি করে মুসোলিনির আধুনিক অনুগামীরা ২০২২-এর নির্বাচনে মরিয়া হয়ে ঝাঁপাল জিততে।

গত ২৫-শে সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ইতালির সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে গেল এই প্রকল্পে Fdl প্রবল ভাবেই সফল। প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট পেয়ে তারা একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আর তাদের নেতৃত্বাধীন অতি-দক্ষিণ আর মধ্য দক্ষিণপন্থীদের মিলিত জোট পেয়েছে প্রায় ৪৪%-এর কাছে ভোট। সংবিধান পাল্টানোর মতো শক্তি তারা এযাত্রায় অর্জন করতে পারেনি, এটাই একরকম আশার কথা বলা চলে। অপরদিকে মধ্যবাম PD এবং জনমোহনী রাজনীতি করা M5S-উভয় দলেরই প্রবলভাবে রক্তক্ষরণ হয়েছে। PD পেয়েছে মাত্র ৬৯-টি আসন, যা Fdl-এর শরিক Lega-এর প্রায় সমান সমান। ফ্যাসিস্টরা কানা গলিতে আবদ্ধ না। রোম আবার মুসোলিনির অনুগামীদের দখলে। নব্য-ফ্যাসিস্ট প্রতীক ট্রাইকালার ফ্লেম লাঞ্ছিত পতাকা সগর্বে উড়ছে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির পাশেই।

১৯৬০-এর দশকে ইতালিয়ান ফ্যাসিস্টরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে উৎখাত করার প্রচেষ্টা করে লাভ নেই। বরং এই ব্যবস্থার মধ্যেই নিজেদের অ্যাজেন্ডাকে বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হতে হবে। কাজ সহজ ছিল না। তাঁদের সামনে ছিল পশ্চিম ইউরোপের সবথেকে সংগঠিত ও লাড়াকু একটি কমিউনিস্ট পার্টি, যারা ফ্যাসিবাদকে যে কোনো মূল্যে কফিন থেকে উঠতে না দিতে বদ্ধপরিকর ছিল। কিন্তু ৯০-এর পরবর্তী সময়ে ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির পতনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের কফিনের ডালা খোলার কাজ সহজ হয়ে যায়। যে প্রক্রিয়ার ইতালিতে ৯০-এর দশকে সূত্রপাত ঘটেছিল, তারই অতি স্বাভাবিক পরিণতি ২০২২-এর নির্বাচন। নব্য-ফ্যাসিস্ট, পোস্ট-ফ্যাসিস্ট যে নামেই ডাকা হোক না কেন, মোট কথা হচ্ছে ইতালির রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ভাবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে উগ্র দক্ষিণপন্থীদের হাতে চলে গেল। কর্পোরেট রাষ্ট্র না হলেও কর্পোরেশনগুলির সমর্থক একটি রাষ্ট্র নির্মাণের প্রক্রিয়ায় তারা প্রবল বেগে অগ্রসর হবে। স্থানীয় স্তরে ইতিমধ্যেই ফ্যাসিস্ট কায়দায় কুচকাওয়াজ করে প্রতিপক্ষদের ভয়ে রাখার কৌশল শুরু হয়েছে। Fdl বিরোধী শিল্পী, সাহিত্যিক, অধ্যাপকদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। গত ২০২১ সালেই রোমে ফ্যাসিস্টরা হামলা চালিয়েছে হয়েছে ইতালির বৃহত্তম বাম ট্রেড ইউনিয়ন CGIL-এর জাতীয় দপ্তরে। এই প্রকার স্কোয়াদ্রিস্তি গুন্ডামি আরও বাড়বে বই কমবে না। CGIL-এর জেনারেল সেক্রেটারি মরিজিও ল্যান্ডিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইতালি অতি দ্রত ফ্যাসিস্ট যুগের দিকে ফিরে যাচ্ছে, অন্ততঃ শ্রমিক অধিকারের ক্ষেত্রে।

এর থেকে ইতালিকে ফেরত আনার কাজ সহজ হবে না। PD-এর পক্ষে এই কাজ সম্ভব নয়। গ্রিন অ্যান্ড লেফট অ্যালায়েন্স বা AVS নামক বামপন্থীদের জোট এই নির্বাচনে সাড়ে তিন শতাংশ মত ভোট পেয়েছে। এছাড়া দৌড়ে ছিল ISP এবং UP নামে আরও দুই ছোটো র‍্যাডিক্যাল বামজোট। তাদের ঝুলিতেও দেড় শতাংশ-দেড় শতাংশ করে তিন শতাংশ ভোট। ধরে নিতে হবে এই ৬ শতাংশ ভোট-এর যে ভোটাররা, তাঁরাই ইতালির বামদের কোর ভিত্তি। PD-এর রাজনীতির প্রতি অনেকেই বীতশ্রদ্ধ, M5S-এর প্রতিও। এই ভোটাররা দক্ষিণপন্থী নন। এঁদের অনেকের অ্যাজেন্ডার সঙ্গেই বামেদের অ্যাজেন্ডা মেলে। এর পাশাপাশি এইবারের নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল ঐতিহাসিক ভাবে, ২০১৮-এর নির্বাচনের থেকে প্রায় ৯% কম। এই যে বিপুল সংখ্যক ইতালির জনতা, যাঁরা সব দলের প্রতিই বীতশ্রদ্ধ ও কাউকেই ভোট দিতে আগ্রহী নন এবং যাঁদের অধিকাংশই শ্রমিক শ্রেণীর, AVS,ISP এবং UP-কে প্রচেষ্টা করতে হবে তাদের আস্থা অর্জন করার। নিজেদের মধ্যে আরও ব্যপক বোঝাপড়া, গণ-আন্দোলন এবং PD-এর বিকল্প একটি বাম রাজনীতির কেন্দ্র গড়ে তোলা, একমাত্র এই পথেই সম্ভবত মুসোলিনির পচা লাশকে আবার কবরে পাঠানো সম্ভব। ইতালির বামেরা তা আদৌ পারবেন কিনা, নাকি ফ্যাসিস্টরাই শেষ হাসি হাসবে, সেটাই এখন দেখার।

জর্জিয়া মেলোনি হতে চলেছেন ইতালির প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী
Sri Lankan Crisis: চিন নয় - উগ্র জাতীয়তাবাদ, সংখ্যাগুরুবাদের কারণেই শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in