স্বজনতোষী পুঁজিবাদ কি এখন সংযোগী পুঁজিবাদের চেহারায় বাঁচতে চাইছে?

উদারবাদী গণতন্ত্রই যে ফ্যাসিবাদী চেহারা নিতে পারে সেই পূর্ব-প্রমাণ ফুকুয়ামাও ২০১৫য় এসে মেনেছেন। সোভিয়েত বিপর্যয়ের পর খাড়া করা নিজের ধারণাকেই তিনি নিজেই নস্যাৎ করছেন।
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবিছবি সৌজন্যে - নিউজক্লিক

একটি চিঠি সর্বদা তার গন্তব্যে আসে। কথাটা ফ্রয়েড পরবর্তী সবচেয়ে বিতর্কিত মনোসমীক্ষক লাকাঁপন্থীদের কাছে একটি সাধারণ বিষয়। কিন্তু একটি নেটওয়ার্ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আজ এই চিঠিটির অর্থ কী? এর অর্থ হল সংযোগমূলক পুঁজিবাদে এটি একটি চিঠি, একটি বার্তা, যা সত্যিই কখনও পাঠানো হয়নি। সেটার কোনো প্রাপ্তি সংবাদ প্রাপক নিজেই জানেন না, তাই এর কোন প্রত্যুত্তরও নেই। এখানে শুধু একটা কন্টেন্ট আছে, আর আছে একটা বিষয় প্রচারে অবদান।

সেই কারণেই কি আমরা নতুন পোশাকের এই সাম্রাজ্যবাদকে চিনতে ভুল করছি? পুঁজি বিকাশের যে কৌশল নেটওয়ার্ক-সাম্রাজ্য অবলম্বন করছে, ভোক্তা তৈরির পন্থা গড়ে তুলছে, সেটা কি স্বজনতোষী পুঁজিবাদের অনুপন্থী? সত্যিই কি বিশ্বব্যাপী টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কগুলি পুঁজিবাদকে সর্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের চেহারা নিতে সাহায্য করছে? বিশেষ করে যখন সকলের অজান্তে আমাদের ভাষা, যোগাযোগ, অথবা অমূলক সংযোগী শ্রম ও সহযোগিতা পুঁজি গঠনে প্রভাবশালী শক্তি হয়ে ওঠে, তখন এগুলোকে নিয়ে আলোচনা করাটা কি আর অপ্রাসঙ্গিক থাকে?

সমাজবিজ্ঞানে এই ধরনের প্রশ্নকে সামনে রেখেই মিশেল ফুকো, মানুয়েল কাস্তেল্স, ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা, মাইকেল হার্ডট, জিগমুন্ট বাউম্যান, জ্যুর্গেন হ্যাবামাস, জর্জিও এগাম্বেন, স্লাভোজ জ়িজ়েক, আন্তোনিও নেগ্রি, জডি ডিন, প্রমুখ চিন্তাবিদ তাঁদের তত্ত্বে অনেক প্রকল্পের কথা বলেছেন। সকলেই যে এক সুরে কথা বলেছেন, তেমনটি নয়। আবার একসময়ে নিজের বলা কথাও তাঁরা নিজেই কেটেছেন, কখনও উল্টোটাও স্বীকার করেছেন। যেমন, উদারবাদী গণতন্ত্রই যে ফ্যাসিবাদী চেহারা নিতে পারে সেই পূর্ব-প্রমাণ ফুকুয়ামাও ২০১৫য় এসে মেনেছেন। সোভিয়েত বিপর্যয়ের পর খাড়া করা নিজের ধারণাকেই তিনি নিজেই নস্যাৎ করছেন। বিশ্বখ্যাত ফুকোর ভাবনাতেও আমরা তেমন অনেক দুর্বল দিক দেখতে পাই। ফুকো ক্ষমতা-সম্পর্কের বিষয়টিতে মানুষের বশ্যতার উপর প্রযুক্তিগত ক্ষমতার প্রভাবগুলিকে বেশী জোর দিয়ে দেখেন, যেটা তাঁর তত্ত্বের একটা সাধারণ দুর্বলতা। এতে প্রতিরোধের যে কোন প্রচেষ্টাকে বৃথা বলে বিবেচনা করাটাও সহজ হয় এবং ক্ষমতার একটি নিষ্ক্রিয় প্রতিফলনে ঘটমান বর্তমানকে তখন সকলেই আমরা দেখে থাকি।

সেই তত্ত্বালোচনা এই লেখার মূল বিষয় নয়। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া কীভাবে ভুবন গ্রামের ধারণায় বিশ্বজুড়ে সংযোগী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, সেটাও এখানে কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় নয়। রাজনীতির ক্ষমতা কীভাবে উন্নয়ন অর্থনীতির মোড়কে, ব্যবসায়ী সংযোগে, স্বজনতোষী হয়ে উঠছে, তার ব্যাখ্যাও এটা নয়। এখানে আমি সেই উদ্যোক্তাশ্রয়ী পুঁজিবাদী মতলবের বাগিয়ে নেওয়ার বাগাড়ম্বরপূর্ণ বর্ণনাও দিতে চাইছি না। রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষ মহলের স্বজন হয়ে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ কীভাবে আদানির হাত ধরে সুদূর ফিলিপিন্স থেকে ফরাক্কায় পৌঁছে যায়, সেই রাজনৈতিক ভাষ্যও আমার এই রচনার লক্ষ্য নয়। এই সব বিষয় প্রসঙ্গে কিছু লেখা আগেই লিখেছি, আগামীতেও লিখতে হবে।

আজকের আলোচনা মূলত সাম্রাজ্যবাদের নতুন পোশাকটাকে চিনে নিতে চায়। কোন কৌশলী নেটওয়ার্ক-সাম্রাজ্যকে অবলম্বন করে সংযোগী পুঁজিবাদ তার পুঁজি বিকাশের পন্থাগুলোকে আজ গড়ে তুলছে, সেটা এখানে দেখতে চাওয়া হয়। স্বজনতোষী পুঁজিবাদের সহযোগী হয়ে বিশ্বব্যাপী টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কগুলি কোন আধিপত্যকে সর্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের চেহারায় গড়ে তুলতে চাইছে, সেই পথটাকেই এই আলোচনায় বুঝে নিতে চাওয়া হয়েছে। তাতে সামাজিক প্রক্রিয়া গঠনে প্রযুক্তির ভূমিকাকে দেখে নেওয়া যায়। আমি নিজেও দেখতে চাই যে সংযোগী পুঁজিবাদী চেহারাটা বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে ঠিক কেমন প্রভাব ফেলেছে।

সেই আলোচনায় আমরা প্রথমে নেটওয়ার্ক যোগাযোগ প্রযুক্তির রাজনৈতিক প্রভাবটাকে বুঝবো। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে এই যোগাযোগমূলক প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তি তার অর্থ ও সময় বিনিয়োগের মাধ্যমেই অংশগ্রহণ করেন। অর্থ বিনিয়োগ না করলে নেটওয়ার্ক থাকে না। সংযোগী হওয়ার মোহবদ্ধতায় ব্যক্তি সেই বিনিয়োগ করে থাকেন। সেই সংযোগে ব্যক্তির রাজনৈতিক-অর্থনীতির গঠনকে প্রথমেই সংযোগী পুঁজিবাদের পক্ষে আনতে সেখানে অরাজনৈতিককরণ প্রক্রিয়ায় জোর দেওয়া হয়। সম্প্রদায়গত নিয়ম লঙ্ঘনের যুক্তিটি সেখানে হাজির থাকে। কাল্পনিক এবং বাস্তব, উভয়ই মজুত হয় বিশ্বব্যাপী নিয়োজিত অমূলক সংযোগী শ্রম ও সহযোগিতার মাধ্যমে। পাশে হাজির থাকে অ্যানিমেটিং কল্পনার আলোকে গড়া প্রাচুর্যের ফ্যান্টাসি বার্তা, যা অবদানে ব্যক্তির জীবনাভ্যাসের কিছু মৌলিক একককে পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যায়।  

এই ফ্যান্টাসি, বন্ধু এবং শত্রুর মধ্যে একটি সুস্পষ্ট বিভাজন রেখার জন্মে বাধা দেয়। সৎ-অসৎ গুলিয়ে যায়। যার ফলস্বরূপ প্রতিক্রিয়াহীন মনন প্রসারে সংযোগী পুঁজিবাদ সফল হয়। আজ, বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের নিবিড় নেটওয়ার্কগুলিতে বিষয়বস্তুর প্রচলন এমনভাবে করা হচ্ছে যা আমাদের শীর্ষ-স্তরে থাকা পদাধিকারিদের (কর্পোরেট, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সরকারী) কাজের প্রতিক্রিয়া জানানোর বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেয়। মানবাধিকার কর্মীদের, অথবা সমালোচকদের পাঠানো বার্তাগুলির প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে, সেগুলোকে রেস্ট্রিক্ট করা হয়। অবদানে (সংখ্যার দিক থেকে অথবা দার্শনিক প্রকৃতির বিচারে) সেগুলি প্রাধান্য পেলেও ব্যাপকভাবে সেগুলিকে মোকাবিলা করার জন্য একটি শক্তিশালী পাল্টা আধিপত্য গঠনে সেই অবদান কোনো কাজে আসে না। গণতান্ত্রিক শাসন এবং প্রতিরোধ বাড়ানোর মূর্ত অবস্থান থেকে অনেক আলোকসেকেন্ড দূরে অবস্থান করে যোগাযোগের অ্যাক্সেস, সুযোগের বিস্তার, বন্টন, ত্বরণ এবং তীব্রতা। সেখানেই তৈরি হয় সংযোগী পুঁজিবাদের পরবর্তী রাজনৈতিক গঠন। বলা বাহুল্য, এখানে আমি দাবি করছি না যে, নেটওয়ার্ক যোগাযোগ কখনই রাজনৈতিক প্রতিরোধকে সহজতর করে না।

আমার বক্তব্য হল নেটওয়ার্ক মিডিয়ার রাজনৈতিক কার্যকারিতা তার প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর করে। গণমাধ্যমের নিবিড় বিস্তারের শর্তে, বিষয়বস্তুর ব্যাপক সঞ্চালনে, নিছক অবদান হিসাবে বার্তাগুলি হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই আজ বেশি। আবার এক সামাজিক প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্রকে উন্নত করে যে বার্তা, সেটা অন্য প্রেক্ষাপটে আধিপত্যের নতুন রূপ হয়ে ওঠতে পারে। সেই কারণেই সংযোগী পুঁজিবাদে বিষয়বস্তুর তীব্র সঞ্চালন রাজনীতির জন্য প্রয়োজনীয় বৈরিতাকে অগ্রাহ্য করে। তুলনামূলকভাবে বদ্ধ সমাজে, সেই বৈরিতা, কেবল মাত্র মূর্তভাবে নয়, বরং খোলা এবং বন্ধের মধ্যবর্তী সীমান্তে স্পষ্টভাবে হাজির থাকে।

সংযোগী পুঁজিবাদের ধারণাটি সংযুক্তি এবং সংযোগের রূপগত পরিবর্তনের উপর জোর দেয়। কৌশল হিসেবে এখানে যেহেতু অ্যানিমেটিং কল্পনার আলোকে জোর দেওয়া হয়, তাই এখানে একটি বার্তা কম গুরুত্বপূর্ণ হয়। মুখ্য হয় অবদান। সংযোগের এই রূপগত পরিবর্তনের উপায় সংক্রান্ত আলোচনায় আমাদের মৌলিক এককগুলিকে দেখা দরকার। প্রথমেই সেখানে আভাসী হাজিরাকে মেনে নিতে হয়। দ্বিতীয়ত, কল্পলোক গঠনের প্রযুক্তি মোহবদ্ধতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। পরিশেষে, আমি ফ্যান্টাসির সম্পূর্ণতা প্রসঙ্গে বাজারের কথা বলবো, যা আজ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার স্থান।

এই তিনের মিলিত রূপ রাজনৈতিক-অর্থনীতির সংযোগে ক্ষমতাধর চালকের আসনে বসতে পারে। প্রযুক্তির হাত ধরেই এই ক্ষমতায়ন। উদাহরণ হিসেবে ম্যাকডোনাল্ডস, ওয়ালমার্ট এবং রিয়েলিটি টেলিভিশনের জনপ্রিয়তাকে আমরা দেখতে পারি। বিশ্ববাজারে এমন অনেক কোম্পানি আছে যারা লোকে যা চায় তা পুষিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আমরা কীভাবে জানি যে লোকেরা যা চায় তা তারা অফার করে? কারণ, মানুষ তাদের বেছে নেয়। অর্থাৎ, ভোক্তার ইচ্ছা, অনিচ্ছা নিয়ে তারা ভাবে, গবেষণা করে। আজকের এই সংযোগী পুঁজিবাদের ধারণা গণতন্ত্র এবং পুঁজিবাদী আগ্রাসনের (প্রকৃতিকে লুঠে খাও) এক অদ্ভুত মিলনকে ধরার চেষ্টা করে। নেটওয়ার্কযুক্ত সংযোগের মাত্রা ঐ বিপরীতমুখী দুই ইচ্ছাকে একত্রিত করার উপায়গুলিকে গুরুত্ব দেয়। প্রযুক্তিনির্ভর পন্থাকে ব্যবহার করে। সংযোগী পুঁজিবাদ বিলম্বিত পুঁজিবাদের সেই রূপকে চিহ্নিত করে, যেখানে গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসাবে চিহ্নিত নতুন স্বাভাবিকতাগুলিকে নেটওয়ার্কযুক্ত যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বস্তুগত রূপ নেয়। এই ভণিতা প্রতিরোধের উত্তাপকে মিইয়ে দিতে সাহায্য করে।

দল এবং ইউনিয়নগুলিতে সক্রিয়ভাবে সংগঠিত হওয়ার পরিবর্তে, এই আভাসী বাস্তবতা রাজনীতির বিজ্ঞাপন, বাহ্যনিয়ন্ত্রিত জনসংযোগ, গণযোগাযোগের অন্যান্য মাধ্যমকে কেন্দ্র করে বিষয়ের পুনরাবৃত্তি, আর্থিকভাবে মধ্যস্থতা, আত্মপ্রচার এবং পেশাদারিত্বের অনুশীলন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। হয়তো সেই কারণেই বিশ্ব পুঁজি-সঞ্চয়নের এবং যোগাযোগের পণ্যীকরণের মধ্যে দিয়ে মানবজীবনের প্রতিটি উপাদানে আজ আরও বেশী করে বাজার এবং দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতগুলিকে পুনর্বিন্যস্ত করা হচ্ছে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে আমার ধারণা, একটি অর্থ- এবং ভোগ-চালিত বিনোদন সংস্কৃতির মানগুলি আজ গণতান্ত্রিক প্রশাসনিকতার শর্তগুলিকে নির্ধারণ করে দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও মানুষের যোগাযোগমূলক সারাংশের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা একটি মাত্রায় অনুমিত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছিল, যেটি একটি সাধারণ স্থলে (জাতি, ভাষা, ধর্ম, ইত্যাদির মূর্ত অবস্থানে) কার্যকরী ছিল। কিন্তু এখন সেই একই যোগাযোগ, সেই একই জেনেরিক সারাংশ (ভাষা), যা একটি স্বয়ং-চালিত গোলক হিসাবে গঠিত হয়েছে, যেখানে ব্যক্তি নিজেই সেই উত্পাদন চক্রের অজানা উপাদান হয়ে উঠেছেন। তাই আজ যোগাযোগকে বাধা দেয় কেবলমাত্র সংযোগ-যোগ্যতা : মানুষ বোঝে না যে, যা তাদের একত্রিত করে, তার দ্বারাই তারা এখন বিচ্ছিন্ন হচ্ছেন। ভাষাগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর পরিপ্রেক্ষিতে জাতি-রাষ্ট্রের অভিন্নতা যেভাবে পুঁজিবাদ ভেবেছিল, সেই রাস্তা ধরেই বিলম্বিত পুঁজিবাদ, স্বজনতোষী পুঁজিবাদের কাঠামোয়, সংযোগী পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ায় পুঁজি গঠনের অভ্যন্তরীণ সংকটের মোকাবিলা করছে।

প্রাথমিকভাবে যোগাযোগ আজ একটি অর্থনৈতিক রূপ হিসাবে কাজ করার জন্য আত্মীয়তার রাজনৈতিক আদর্শ এবং সামাজিক মূল্যবোধ অন্বিত স্থানিক সংযোগ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ভিন্নভাবে বললে, গণতান্ত্রিক রাজনীতির মৌলিক উপাদান না হয়ে যোগাযোগমূলক আদান-প্রদান এখন পুঁজিবাদী উৎপাদনের মৌলিক উপাদানে পরিণত হচ্ছে। পুরোনো মতাদর্শগত বিভাজনগুলিকে পিছনে ফেলে, নতুন সমস্যাগুলিকে মোকাবিলা করার প্রয়োজনীয়তা, এখানে গুরুত্ব পায়। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং মুক্ত আলোচনার সঙ্গে সজ্জিত সেই গণতথ্যালয়ে জনগণের সুনির্দিষ্ট চাহিদাগুলিকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলেই ধরে নেওয়া হয়, যেখানে ঐকমত্য ও সহযোগিতার উদ্দ্যেশ্যটাই হল বন্ধনের প্রাথমিক ভিত্তি। এখানেই উত্তর-রাজনীতির সামাজিক পরিসরে সংযোগী পুঁজিবাদ বৈধতা পায়। তাই যে বিষয়গুলোকে আগে বিতর্ক ও সংগ্রামের প্রয়োজন বলে মনে করা হয়েছিল, সেগুলিকে এখন ব্যক্তিগত সমস্যা, অথবা একটি প্রযুক্তিগত উদ্বেগ হিসেবে সম্বোধন করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, এগুলি রাজনীতিকরণের বিষয় নয়, বরং এগুলিকে সমসাময়িক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বৈশিষ্ট্য, সম্ভাব্যতা, কল্যাণমূলক ব্যবস্থা এবং নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়নের ভবিতব্য হিসেবে আমরা ভাবতে পারি।

সমস্যা হল এই সমস্ত সহনশীলতায় এবং পার্থক্যের প্রতি অনুপ্রাণিত হওয়ার মধ্যে দিয়ে, অথবা অন্যের ভাবাবেগে আঘাত করে ফেলার ভয়ে, আমরা পুঁজিবাদী রাজনীতিকরণকে প্রতিমুহূর্তে সাহায্য করে চলেছি। এভাবেই তৃতীয় ধারার সমাজগুলি বিশ্বব্যাপী পুঁজিকে সমর্থন করে চলেছে। এই প্রবাহ স্থানিক রাজনীতিকরণ প্রক্রিয়াগুলিকে বাধা দেয়। বিশ্বাসের বহুত্বে আজ যোগাযোগ হল পুঁজিবাদী উৎপাদনের একটি রূপ, যেখানে পুঁজি সমস্ত বিকল্প প্রতিরোধী পথকে দমন করে, প্রতিটি সমাজকে সম্পূর্ণভাবে এবং বিশ্বব্যাপী তার শাসনের অধীনে নিয়ে আসতে সফল হয়। এই কাজে তাকে রূপ বদলে বদলে চলতে হয়।

তাই সংযোগী পুঁজিবাদের টিকে থাকার মূল গঠনমূলক বৈশিষ্ট্যটি হয় তার পরিবর্তন ক্ষমতা। সে সহজেই একটি বার্তাকে অবদানে পরিণত করতে পারে। বার্তা হল কন্টেন্ট প্রচারে অবদান –প্রতিক্রিয়া প্রকাশের জন্য সম্পাদিত কোনো ক্রিয়া নয়। ভিন্নভাবে বলা যায়, বার্তার বিনিময়-মূল্য তাদের ব্যবহারের মানকে ছাড়িয়ে যায়। সুতরাং, একটি বার্তা আর প্রাথমিকভাবে একটি প্রেরকের কাছ থেকে একটি প্রাপকের কাছে পাঠানো একটি বার্তা নয়৷ অ্যাকশন এবং অ্যাপ্লিকেশনের প্রেক্ষাপট থেকে মিলিত - যেমন ওয়েবে বা প্রিন্ট এবং সম্প্রচার মিডিয়াতে - বার্তাটি কেবল একটি প্রচলনকারী ডেটা স্ট্রিমের অংশ। তার ব্যবহারিক-মূল্য নগণ্য।

বার্তার বিষয়বস্তু তাই এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কে পাঠিয়েছে সেটাও এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কে পায় সেটাও অপ্রাসঙ্গিক। এইভাবেই এটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে বলেই প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজন সেখানে থাকে না। সঞ্চালনের বাস্তবতার কাছে প্রতিক্রিয়া এখানে গৌণ অবস্থানে থাকে। ফলে যোগাযোগ লক্ষণীয়ভাবে তার নিজস্ব নেতিবাচকতা তৈরি করে, যা সংযোগের সাবেকী গঠনের পুনরুৎপাদনে বাধা দেয়। সংযোগী পুঁজিবাদে তাই যোগাযোগ কখনই বোঝাপড়ার দিকে ক্রিয়াশীল হয় না।

প্রযুক্তিগত মোহবদ্ধতায়, ব্যক্তিস্তরের ক্রিয়াকলাপ, সংযোগী পুঁজিবাদকে শক্তিশালী করে। তিনটি ক্রিয়াকলাপের নিরিখে আমরা সর্বগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের সেই রূপটিকে বুঝতে পারি যা সংযোগী পুঁজিবাদের মুখ। নজরদারির সর্বমাত্রিক প্রসারের নেপথ্যে থাকা সেই তিনটি ক্রিয়াকলাপ হল– ঘনীভবন, স্থানচ্যুতি এবং নিষ্ক্রিয়-সমাপ্তি।

প্রযুক্তিগত মোহবদ্ধতা ঘনীভবনের মাধ্যমে কাজ করে। রাজনীতির জটিলতাগুলি – সংগঠন, সংগ্রাম, সময়কাল, নির্ধারকতা, বিভাজন, প্রতিনিধিত্ব, ইত্যাদি - একটি জিনিসের মধ্যে ঘনীভূত হয়। ডিজিটাল জীবনের সব ক্ষেত্রেই ধরে নেওয়া হয় যে একটি সামাজিক সমস্যার সমাধান আসলে একটি কারিগরি প্রয়াস। সুতরাং, গণতন্ত্রের সমস্যা হল জনগণকে অবহিত করা নয়, বরং কার্যকরভাবে অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রযুক্তি মানুষকে এই তথ্য প্রদান করে। এই ধরণের কৌশলে অবশ্যই সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছায় দেখা সমস্যাগুলি বাদ যায়।

প্রযুক্তিগত মোহবদ্ধতার ক্রিয়াশীলতা স্থানচ্যুতির মাধ্যমে দ্বিতীয় রীতিটিকে প্রকাশ করে। মানুষের সাধারণ এবং দৈনন্দিন কার্যকলাপের ওপর ভর করেই রাজনীতি স্থানচ্যুত হয়। আগে একজন লেখক, পাঠক, সমালোচক, অথবা একজন শিক্ষাবিদ থেকে একজন রাজনৈতিক কর্মীকে তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য অসাধারণ ধরা হত। কিন্তু এখন প্রাত্যহিক জীবনে মানুষ যা করেন, সেটাকেই রাজনৈতিক কার্যকলাপের অংশ বলে ধরে নেওয়া হয়। দ্বন্দ্ব, আলোচনা, ব্যাখ্যা, প্রতিরোধ, মিলন, সহযোগিতা, সীমালঙ্ঘন এবং পদত্যাগ – সবই রাজনীতির বিষয়। তবে সেটা ব্যক্তি স্তরে। সেই প্রকাশে আজ ইন্টারনেট, সেই সঙ্গে সেল ফোন, সংকেত জ্ঞাপনকারী যন্ত্র সহ অন্যান্য যোগাযোগ ডিভাইস (যদিও, অদ্ভুতভাবে, নিয়মিত পুরানো টেলিফোন নয়) রাজনীতির সাথে মিশে যায়৷ একটি ওয়েবসাইট স্থাপন করা, একটি ওয়েবসাইটকে বিকৃত করা, অন্য সাইটগুলিতে হিটগুলি পুনঃনির্দেশ করা, একটি ওয়েবসাইটের অ্যাক্সেস রেস্ট্রিক্ট করা, একাধিক পরিচয় পত্রের মধ্যে লিঙ্ক গড়ে তোলা, ইত্যাদিকে আজ প্রকৃত রাজনৈতিক কর্ম হিসেবে বোঝানো হয়। এই ধরনের প্রয়াস সংগঠন ও সংগ্রামের কঠোর পরিশ্রম থেকে রাজনৈতিক শক্তিকে স্থানচ্যুত করে। এটি অদ্ভুতভাবে ক্রমশ একতরফা রূপ নেয়।

প্রযুক্তিগত মোহবদ্ধতার শেষ প্রণালীটি পূর্ববর্তী দুটি রূপ থেকেই অনুসৃত। এই তৃতীয় ক্রিয়াশীল রূপটি হল নিষ্ক্রিয়-সমাপ্তি। প্রযুক্তিগত মোহবদ্ধতায় ফাইল শেয়ারিং হল একটি রাজনৈতিক ঘটনা। একটি ওয়েবসাইটও এখানে রাজনৈতিক। ব্লগিং রাজনৈতিক। সেই রাজনৈতিক বাণিজ্যে তাত্ক্ষণিকতার প্রাচুর্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্য সব কিছুকে প্রভাবিত করে। আর তাতেই সঠিক রাজনীতিকরণের সম্ভাবনাকে বর্জন করা সম্ভব হয়। প্রতিরোধের মূর্ত অবস্থানকেও বাদ দেওয়া যায়। কোন লাভ নেই ধারণায় স্থান ও কালের নিরিখে বাস্তব হয়ে ওঠে নিষ্ক্রিয়-সমাপ্তি।

এতেই সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব এবং আমূল পরিবর্তনের প্রসঙ্গ জাদুকরীভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। এখানে বিপ্লব মানে “উইকিফিকেশন”, যা বিশ্বমানবের সামনে একটি অবৈধ শর্ট সার্কিট হাজির করে। কিন্তু তখনই সকলের জন্য জ্ঞানের আধারকে উচ্চমূল্যে খুলে দেওয়া হয় এবং দাবি করা হয় যে, বিশ্বের রাজনৈতিক প্রকৃতি প্রযুক্তিগত অনুশীলনে উত্পাদিত হয়। এই সত্তাতাত্ত্বিক ভাবনা “ওপেন সোর্সের” জন্য একটি কল্পিত স্থান তৈরি করে। এখানেই সমাজতাত্ত্বিকগণ একটি নতুন কথা বলেন। সামাজিক সমস্যার কিছু উপাদানকে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করে এই অধিবিদ্যক চেতনাকে তাঁরা সেকেলে বলতে চান। কারণ রাজনীতিকে সত্তাতত্ত্বীয় করার অর্থ হল রাজনীতিকরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতীকী স্থানটি ভেঙে ফেলা।

পুঁজিবাদে রাজনীতিকরণ হল একটি বস্তু ও তার প্রতিনিধির মধ্যে বর্তমান থাকা একটি স্থান। নিজের বাইরে বেরিয়ে বার্তার পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। প্রযুক্তিগত মোহবদ্ধতার শক্তি সেই রাজনীতিকরণকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। সংযোগী পুঁজিবাদে যন্ত্রমানব তাই ঝুঁকির কথা মানেন না। বৈশ্বিক পুঁজির বর্বরতার মধ্যেই তিনি ধারনশীলতায় প্রাণ খুঁজে পান। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সেবায় তাদের নিজেদের বাইরে দাঁড়িয়ে কোনো ঘটনার বা বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব যে তাদের করা উচিত, সেটা তখন তারা মানেন না। তারা ভুলে যান যে এই বিশ্বটি তাদের, এবং একটি স্থান হিসাবে কাজ করে এটি একদিন শিল্প পুঁজিবাদের প্রসারে শ্রমিক সরবরাহ করেছিল।

সংযোগী পুঁজিবাদে স্থান হল আভাসী। ব্যক্তি এখানে একা এবং একা। প্রাতিষ্ঠানিকতার জন্য প্রতীকীভাবে দাঁড়াতে জাতির ব্যর্থ ইতিহাস এখানে মুদ্রিত থাকে। ইন্টারনেট এবং সেই নেটওয়ার্ক সংযোগগুলি বিশ্বব্যাপী ঐক্য এবং সম্পূর্ণ সহযোগিতার নির্দিষ্ট কল্পনাকে মডেল হিসেবে বাস্তবায়িত করে। ক্ষমতার আলোকে যদিও সেগুলি শূন্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে আবির্ভূত হয়, তবুও এখানে ক্ষুধা, দারিদ্র, ইত্যাদি বিষয়গুলি রহস্য রোমাঞ্চে ভরা থাকে। বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের বাস্তব হিসাবে নেটওয়ার্কযুক্ত লেনদেনগুলি যদিও এখানে থাকে সুরক্ষিত। সম্ভাবনার অসীমতায় সংযোগী পুঁজিবাদ সম্পদ লুঠের শক্তি জোগাড় করে।

এই ব্যবস্থায় সম্ভাবনার কল্পনাগুলি বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকে। বিশ্ব-প্রান্তর থেকেই সেগুলোকে আহরণ করা হয়। যোগানদাতার ভূমিকায় আমরাই হই অংশীদার। আমাদের ভাষা সেখানে লিপিবদ্ধ হয়। আমরা সেখানে যা করি সেটাই অমূলক সংযোগী শ্রম ও সহযোগিতা হয়ে পুঁজি গঠনের উৎস হিসেবে কাজ করে। সংযোগী পুঁজিবাদ প্রসারিত হয়। মানব পুঁজি সংযোগী পুঁজিবাদের চালিকা শক্তি হয়ে ওঠে। প্রযুক্তি তার নবউদ্ভাবনে প্রত্যাশা এবং প্রভাব তৈরি করে, যা ব্যক্তিবিশেষের প্রেক্ষাপট অনুসারে পরিবর্তিত হয়। বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক যোগাযোগে ঘটা মিথস্ক্রিয়া বিশ্ব-পুঁজি হিসেবে স্বজনতোষী লুঠেরার মুখোশ হয়ে আমাদের জন্য একটা নির্দিষ্ট বিশ্ব তৈরি করে। সেই বিশ্ব-বাজার যন্ত্রমানবের সহায়তায় সংযোগী পুঁজিবাদকে শক্তিশালী করে।

সংযোগী পুঁজিবাদে গণতন্ত্র হল সুনির্দিষ্ট পরিসমাপ্তি যুক্ত একটি বহুমাত্রিক অবস্থা। এখানে অযৌক্তিক যুক্তিবদ্ধতায়, অথবা যুক্তিহীনতার যৌক্তিকতায়, বৈধতার মাপকাঠি গঠিত হয়। বাঙালি সবেতেই অনুপ্রাণিত হয়ে যে ভক্তির গণতন্ত্র গড়ে তোলে, সেটাই সংযোগী পুঁজিবাদের মূল মন্ত্র। এই গণতন্ত্রে মতামত প্রচার করা হবে, মতামত প্রকাশ করা হবে, তথ্য অ্যাক্সেস করা হবে, একটি ই-মেইল পাঠানোর মাধ্যমে, অথবা একটি পিটিশনে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে, কিম্বা কোনো ব্লগে লেখা একটি নিবন্ধে প্রতিক্রিয়া জানানোর মাধ্যমে, বাঙালি রাজনৈতিক অনুভব পেতে পারে, কিন্তু সেই অনুভূতি দিনের শেষে নিষ্ক্রিয়-সমাপ্তিকে ঘোষণা করে।

সংযোগী পুঁজিবাদ প্রযুক্তির নৈপুণ্যে রাজনীতির সময়সাপেক্ষ, ক্রমবর্ধমান এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রচেষ্টাকে পিছনে ফেলে দেয়। এমনকি বিশ্বজোড়া নেটওয়ার্ক সংযোগ সংগ্রামের হাতিয়ারগুলোকে ভোঁতা করে দিতে সচেষ্ট হয়৷ আমাদেরও উচিত পুঁজিবাদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা ফ্যান্টাসিগুলির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন করা৷ করোনা-উত্তর সমাজে সেই প্রয়োজন প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

প্রতীকী ছবি
আদিবাসী বনাম বনবাসী: ভারতে আদিবাসীদের হিন্দুকরণ

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in