বাংলাদেশ কি অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে চলেছে?

সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই এসব শঙ্কার কথা উড়িয়ে দেওয়া হলেও সম্প্রতি সরকারের দায়িত্বশীলদের বিভিন্ন বক্তব্য ও গৃহীত কিছু পদক্ষেপ ঘিরে জনমনে আসন্ন অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টি উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ কি অর্থনৈতিক সংকটে পড়তে চলেছে?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফাইল ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশ কি অর্থনৈতিক সংকট পড়তে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নে দেশটিতে পক্ষে-বিপক্ষে চলছে তুমুল আলোচনা সমালোচনা। টানা দুই বছর করোনা ভাইরাসের ধাক্কা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অস্থিরতা, দেশের বাজারে ভোজ্য তেলসহ অন্যান্য নিত্য পণ্যের মূল্যে লাগামহীন উর্ধ্বগতি, এসব কিছু নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের বিপরীতে টাকার ক্রমাগত মান পতন, অপ্রয়োজনীয় মেগাপ্রকল্প ও সেগুলো ঘিরে লাগামহীন দুর্নীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দেশটির অর্থনীতির জন্য ব্যাপক সংকটের আলামত হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে বলে দাবি বিশ্লেষকদের।

সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই এসব শঙ্কার কথা উড়িয়ে দেওয়া হলেও সম্প্রতি সরকারের দায়িত্বশীলদের বিভিন্ন বক্তব্য ও গৃহীত কিছু পদক্ষেপ ঘিরে জনমনে আসন্ন অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টি উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে সরকারের দায়িত্বশীলদের বিভিন্ন বক্তব্য জনমনের উদ্বেগকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

গত ১৬ মে এক বক্তব্যে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশী দেশের খাদ্যপণ্যের দামের ওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অনেকটা প্রভাব ফেলেছে উল্লেখ করে বলেছেন, “সেজন্য সবাইকে সাশ্রয়ী হতে হবে। সামনের দিকে কিছুটা সংকট রয়েছে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”

এর পরের দিন ১৭ মে এক বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতিতে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে তিনি বলেছেন, “দেশবাসীকে আমি অনুরোধ করবো, সবাই যদি একটু সাশ্রয়ী হয়, মিতব্যয়ী-ব্যবহারে সতর্ক হয়, তাহলে খুব সমস্যা হওয়ার কথা না।”

বাংলাদেশে বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি

বাংলাদেশে গত কয়েক মাস ধরে টানা মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, খাদ্যদ্রব্য ও খাদ্য বহির্ভূত জিনিসপত্রের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির ফলে এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.২৯ শতাংশে। যা গত ১৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বুধবার (১৮ মে) সন্ধ্যায় বিবিএস এই তথ্য প্রকাশ করেছে। গত মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ২২ শতাংশ।

তবে সরকারের এই তথ্য মানতে নারাজ বাংলাদেশের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তার এক গবেষণায় দাবি করেছেন, সরকার ৬ দশমিক ২২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির যে কথা বলছে, এ দাবির সঙ্গে বাস্তবতার আদৌ মিল নেই। এ তথ্য বিজ্ঞানসম্মতও নয়। মূল্যস্ফীতি এখন ১২ শতাংশ হওয়াও অস্বাভাবিক নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই গবেষক জানান, গ্রামে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। মোট মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি। একই সঙ্গে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের চেয়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেশি। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির তথ্য যে বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই, এর একটি উদাহরণ হলো সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির তথ্য। ওই তথ্যে দেখা যাচ্ছে এক বছরে পাম অয়েলের দাম ৬১ শতাংশ বেড়েছে। আটা-ময়দার দাম বেড়েছে ৫৮ শতাংশ, সয়াবিন তেল ৫৬ শতাংশ, মসুর ডালের দাম ৪৭ শতাংশ, অ্যাঙ্কর ৩১ শতাংশ এবং ডিমের দাম বেড়েছে ২৯ শতাংশ। টিসিবির এই তথ্যই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস প্রকাশিত মূল্যস্ফীতির তথ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

কমছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

বিশ্ববাজারে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স থেকে বৈদেশিক মুদ্রার আয় সেই তুলনায় কমছে। ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমেছে প্রায় সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত বছরের আগস্টে রিজার্ভ বেড়ে ৪৮ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। আমদানি ব্যয় বাড়ায় গত ৯ মে রিজার্ভ ছিল ৪৪ দশমিক ১১ বিলিয়ান ডলার। এ রিজার্ভ থেকে ১০ মে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে (আকু) প্রায় ২২৪ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়। এরপর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ৪১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার বর্তমানে যে রিজার্ভ আছে, তা দিয়ে ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। গত বছরের আগস্টে আট মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ (৪৮ বিলিয়ন ডলার) ছিল বাংলাদেশের।

ডলারের বিপরীতে কমছে টাকার মান

চাহিদা বৃদ্ধি ও সংকটের কারণে এক সপ্তাহের ব্যবধানে গত ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমিয়েছে। প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য ৮০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৭ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এতে রপ্তানিকারক ও প্রবাসীরা লাভবান হলেও আমদানিকারকদের খরচ বাড়বে। যা দেশের অভ্যন্তরে খাদ্যমূল্যসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলবে মনে করছেন অর্থনীতিবিদগণ।

সর্বশেষ ৯ মে ডলারের বিনিময় মূল্য ২৫ পয়সা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এর আগে জানুয়ারি মাসের শুরুতে ডলারের বিনিময় মূল্য ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর ২৩ মার্চ তা আরও ২০ পয়সা বাড়িয়ে ৮৬ টাকা ২০ পয়সা করা হয়েছিল। গত ২৭ এপ্রিল বাড়ানো হয় ২৫ পয়সা। তাতে ১ ডলারের বিনিময় মূল্য দাঁড়ায় ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা।

বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে প্রতিনিয়ত ডলার বিক্রি করছে। আর ডলারের চাহিদা বেশি হওয়ায় ধীরে ধীরে দাম বাড়াচ্ছে। এভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এদিকে মাত্র একদিনের ব্যবধানে গত ১৭ মে খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের দাম ৪ টাকা বেড়ে ১০২ টাকা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর ঢাকার কোথাও কোথাও মানি এক্সচেঞ্জে প্রতি ডলার সর্বোচ্চ ১০৪ টাকা ধরেও বিক্রি হয়েছে। তারপরও পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করতে পারছে না মানি এক্সচেঞ্জগুলো। বাংলাদেশে গত ১৬ মে খোলা বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৯৮ টাকা।

বাজারে লাগানহীনভাবে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার বাড়তি খরচের চাপ থেকে মানুষ বের হতে পারছে না। বাজার অসহনীয় হয়ে উঠছে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, ডিম, মাছ, মাংসের মতো পণ্যের দাম আগে থেকেই চড়া। এরপর ভরা মৌসুমেও শাকসবজির দাম নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। শুধু কাঁচাবাজারই নয়, পোশাক-পরিচ্ছদ, টয়লেট্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য, ওষুধপত্র, নির্মাণসামগ্রী, রান্নার গ্যাসসহ প্রায় সব জিনিসের দাম বেড়েছে। মানুষের যাতায়াত খরচও বেড়েছে আগের তুলনায়। সামগ্রিকভাবে বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই এখন চাহিদার তুলনায় কম বাজার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে পুষ্টি সমস্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ব্যয় সংকোচন করছে সরকার

অর্থনীতির এই সংকট ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে অপ্রয়োজনীয় মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ। একই সাথে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অহেতুক ব্যয় বন্ধেরও কড়া নির্দেশ দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিলাসবহুল পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে এলসি ঋণের মার্জিন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরও বাতিল করা হয়েছে।

বাজেটে ঋণ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন

আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাজেটে ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশাপাশি ‘বিদেশি ঋণ’ ঝুঁকি সীমার নিচে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নির্দেশের পর বৈদেশিক ঋণের প্রতি ঝোঁক অনেকটা কমেছে। অর্থবছরের শুরুতে এ ঋণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে সরে আসছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রাও কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে ঋণ সংকট কাটাতে দেশের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি নেওয়া হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) বাজেট ঘাটতি হলো দুই লাখ ১৪ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। সেটি পূরণে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ এক হাজার ২২৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে এক লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার হার জিডিপির তুলনায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। সম্প্রতি গণভবনে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ভবিষ্যতে ঋণের বর্তমান এ অবস্থান ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের পর বৈদেশিক ঋণের ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ফলে চলতি বাজেটে বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২০ হাজার ১৬ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। বছরের শুরুতে এ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ এক হাজার ২২৮ কোটি টাকা। কাটছাঁটের পর চূড়ান্ত বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ২১২ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদগণ বলছেন, সরকার যদি বাজার নিয়ন্ত্রণ, বিদেশী ঋণ নির্ভর অপ্রয়োজনীয় মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন বন্ধ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রিজার্ভের পতন রোধ করতে পারে তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সামনের দিনে বড় কোনো সংকটে পড়বে না। কারণ এখনো দেশে আশানুরূপ রেমিট্যান্স আসছে। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনও ইতিবাচক।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in