যদি ব্রিটেন ক্ষমা চাইতে পারে তবে একই অপরাধে পাকিস্তান কেন নয়?

মানবসভ্যতার ইতিহাসে যতগুলো গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে তাতে অল্প সময়ে সব থেকে বেশি সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ১২ হাজার মানুষ তখন খুন হয়েছিলেন বাংলাদেশে।
যদি ব্রিটেন ক্ষমা চাইতে পারে তবে একই অপরাধে পাকিস্তান কেন নয়?
বাংলাদেশের মেহেরপুরে ১৯৭১ গণহত্যা স্মরণে ভাস্কর্যছবি উইকিপিডিয়ার সৌজন্যে

১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯ সাল। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসের একটি কলঙ্কময় দিন। একজন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা পাঞ্জাবের অমৃতসরের বিক্ষোভ রত নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল সেদিন। পরিণতিতে বহু লোকের মৃত্যু হয়। “জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড” বলে পরিচিত ঐ ঘটনার সূচনা অমৃতসরের একটি সমাবেশ থেকে।

অমৃতসর শিখ সম্প্রদায়ের একটি পবিত্র শহর। এই শহরেই শিখদের পবিত্র স্বর্ণ মন্দির। ১৯১৯ সালে এই শহরে ভারতীয় স্বাধীনতাকামীদের সাথে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছিলো। এপ্রিলের ১৩ তারিখে শহরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন সিনিয়র অফিসার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল ডায়ার খবর পেলেন শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগে বিক্ষোভের জন্য মানুষজন জড় হচ্ছে। সাথে সাথেই তিনি একদল সৈন্য নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে গেলেন। তিনি এসেই শহরে যে কোন ধরণের সমাবেশ নিষিদ্ধ করে দিলেন। কিন্তু অনেক মানুষ এই সিদ্ধান্তের কথা জানতো না। জালিয়ানওয়ালাবাগের পার্কে সেদিন অনেকে এসেছিলেন দুই স্বাধীনতা সংগ্রামী সত্য পাল ও সইফুদ্দিন কিচলুর দ্বীপান্তরের প্রতিবাদে একটি সভায় যোগ দিতে। বেশ কিছু শিখ তীর্থযাত্রীও ছিলেন। কর্নেল রেজিনাল্ড ডায়ার সেনাবাহিনীর শিখ, রাজপুত, গোর্খা ও বালোচ রেজিমেন্টের সেনাদের নিয়ে জালিয়ানওয়ালাবাগ ঘিরে ফেলেন। সবকটি প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর কাউকে সতর্ক না করে, পালানোর সুযোগ না দিয়ে শিশু, নারী নির্বিশেষে নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন।

সার্জেন্ট উইলিয়াম এন্ডারসন ব্রিগেডিয়ার ডায়ারের অধীনে কাজ করতেন। ঐ ঘটনা সম্পর্কে পরে তিনি লিখেছিলেন, "যখন গুলি শুরু হলো, মানুষ মাটিতে শুয়ে পড়তে লাগলো। কেউ কেউ উঁচু দেয়াল বেয়ে উঠে পালানোর চেষ্টা করছিলো। তারা যে আমাদের দিকে তেড়ে আসবে, সেই ভয় তখন আমার হয়নি।" কত লোক সেদিন জালিয়ানওয়ালাবাগে ছিলেন, তা নিয়ে নানা বক্তব্য রয়েছে। ঐ হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরে ব্রিটিশ সরকার একটি তদন্ত করে। রিপোর্টে নিহতের সংখ্যা বলা হয় ৩৭৯। কিন্তু ভারতের করা তদন্তে এই সংখ্যা প্রায় এক হাজার। উল্লেখ্য এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজ সরকারের দেওয়া "নাইটহুড" উপাধি ত্যাগ করেন।

তবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের এত বছর পরে হলেও ব্রিটেনের বোধোদয় হয়েছে। ব্রিটেন উপলব্ধি করেছে নিরপরাধ মানুষ হত্যা কখনই সভ্যতার নিদর্শন হতে পারে না। তাই এই হত্যাকাণ্ডের শতবর্ষ পূরণ হওয়ার তিনদিন আগে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে বলেছিলেন, “সেদিন যা ঘটেছিল এবং তার কারণে মানুষের যে ক্ষতি হয়েছে আমরা তার জন্য গভীরভাবে অনুতপ্ত।“ ব্রিটেনের তৎকালীন বিদেশ মন্ত্রী মার্ক ফিল্ড হাউস অফ কমন্সে এই “অতীত ইতিহাসের লজ্জাজনক ঘটনা”র জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। তবে আনুষ্ঠানিক ভাবে ক্ষমা চাওয়ার সঙ্গে কিছু অর্থনৈতিক দিক জড়িয়ে থাকে বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন।

অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম রাতের প্রাণহানির সংখ্যাই ছিল কমপক্ষে ৩৫,০০০। চুকনগর গণহত্যায় প্রাণহানি ঘটেছিল ১০,০০০ এর ওপরে। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ প্রকাশিত New York Times-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২৭ মার্চে প্রাণহানির সংখ্যা ১০,০০০।

অবশ্যই মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই ক্ষমা এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে আরেকবার প্রমাণিত হল নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষ হত্যা কখনই কোন সুস্থ এবং সভ্য সমাজে কাম্য হতে পারে না। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের চেয়েও আরও ভয়াবহ এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ড ১৯৭১ সালে সংগঠিত করার পরও পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি ক্ষমা তো চায়নি বরং আরও ধৃষ্টতা এবং ঔ দ্ধতপূর্ণ আচরণ প্রকাশ করে যাচ্ছে।

আমরা যদি একটু গভীর ভাবে লক্ষ্য করি তাহলে দেখবো রাজনৈতিক পটভূমি এবং নৃশংসতার বিচারে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের চেয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান কর্তৃক সংগঠিত গণহত্যা ছিল অনেক বেশী নিষ্ঠুর এবং বর্বর। রাজনৈতিক পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ১৯৭১ সালের পাকিস্তানিরা আমাদের উপর যে বর্বর আক্রমণ চালায় তা কোন ভাবেই কোন বিছিন্নতাবাদী দমনের আক্রমণ ছিল না বরং তা ছিল গণতন্ত্র হরণের আক্রমণ, তা ছিল ১৯৭০ সালে জনগণ যে ম্যান্ডেট দিয়েছিল তা স্তব্ধ করার আক্রমণ। সর্বোপরি পাকিস্তানিদের সেই আক্রমণ ছিল গণতন্ত্রের কবর রচনা করার আক্রমণ।

যদি নৃশংসতার দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করি তাহলে দেখি ১৯৮১ সালের UNHRC (ইউনাইটেড ন্যাশনস হিউম্যান রাইটস কমিশন) রিপোর্ট অনুযায়ী মানবসভ্যতার ইতিহাসে যতগুলো গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে তাতে অল্প সময়ের মধ্যে সব থেকে বেশি সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। প্রতিদিন গড়ে ৬,০০০ থেকে ১২,০০০ মানুষ তখন খুন হয়েছিলেন বাংলাদেশে। গণহত্যার ইতিহাসে এটাই সর্বোচ্চ গড়। তবে এখানে উল্লেখ্য, অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম রাতের প্রাণহানির সংখ্যাই ছিল কমপক্ষে ৩৫,০০০। চুকনগর গণহত্যায় প্রাণহানি ঘটেছিল ১০,০০০ এর ওপরে। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ প্রকাশিত New York Times-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২৭ মার্চে প্রাণহানির সংখ্যা ১০,০০০। ১৯৭১ সালের Sydney Morning Herald-এর রিপোর্ট অনুযায়ী মার্চের ২৫ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত (৫ দিনে) প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। এতে দেখা যায় দিনপ্রতি প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এমনকি রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র ‘প্রাভদা’ ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসেই বাংলাদেশে ত্রিশ লক্ষ শহীদের বিষয়টি প্রকাশ করে। এই প্রাভদার ইংরেজি সংস্করণে উল্লেখ করা হয়, ‘Over 30 lakh persons were killed throughout Bangladesh by the Pakistani occupation forces during the last nine months’। প্রাভদা পত্রিকাটির ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারির বাংলা সংস্করণে শিরোনাম হয় “দখলদার বাহিনী বাংলাদেশে ত্রিশ লক্ষাধিক মানুষ হত্যা করেছে”।

বিষয়টি একেবারেই স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক পটভূমি এবং নৃশংসতার বিচার যে ভাবেই দেখা হোক না কেন জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের চেয়ে বহুগুনে জঘন্য ও বর্বর ছিল পাকিস্তান কর্তৃক সংঘটিত ১৯৭১ সালের হত্যাকান্ড। তবুও পাকিস্তান নামক অসভ্য রাষ্ট্রটির বোধোদয় হয়নি। উপরন্তু পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি তাদের দেশী-বিদেশি বিভিন্ন পেইড এজেন্টের মাধ্যমে গণহত্যার বিষয়ে শুধু মিথ্যাচারই করছে না বরং তাদের এদেশীয় দোসরদের বিচারকেও বাধাগ্রস্থ করার কূটচক্র চালিয়ে যাচ্ছে।

তাই সময় এসেছে ব্রিটেনের পথ অনুসরণে পাকিস্তানকে বাধ্য করা। সে জন্য সরকারী, বেসরকারি এমনকি ব্যক্তি পর্যায়েও বিশ্বের বিভিন্ন ফোরাম এবং গণমাধ্যমে পাকিস্তানিদের বর্বরতার কথা তুলে ধরতে হবে। বিশ্ববাসীর মধ্যে এই ভাবনার উদ্রেক ঘটাতে হবে যে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি যতদিন পর্যন্ত ১৯৭১ সালের কৃত গণহত্যার জন্য ক্ষমা না চাইবে ততদিন মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কময় দেশ হিসেবে পরিগণিত হবে।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in