মহামারী রাজনৈতিক: মৃত্যু-উপাত্ত আজ তবে কি রাষ্ট্রের স্বার্থপূরণে নিয়োজিত?

ভুয়ো দার্শনিকরা বহু শতাব্দী ধরেই সেই দুই প্রশ্নে আমাদের ঘোরাফেরা করালেন, যার প্রথমটি হল- “আমরা কোথা থেকে এসেছি?”, এবং দ্বিতীয়টা– “আমরা কোথায় যাচ্ছি?” কিন্তু “আমরা এখন কোথায়?” – সেই প্রশ্ন তুললেন না।
মহামারী রাজনৈতিক: মৃত্যু-উপাত্ত আজ তবে কি রাষ্ট্রের স্বার্থপূরণে নিয়োজিত?
গ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

আমরা এখন ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?

শেষ অবধি আমরা একটা অনুপম উপাদানকে আমাদের বিবেচনায় নিয়ে এলাম। সেটা হল বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসে ভর করে আমরা দার্শনিক বক্তব্য নির্মাণেও আগ্রহী হলাম। আর তখনই আমাদের বিশ্বাসের ভাগাভাগি শুরু হয়ে গেল। ঘোষিত হল বিশ্বাসের স্পষ্ট পতন। তবুও আমরা সাহসের সঙ্গে পাশের মানুষটাকে দেখতে চাইলাম। দেখলাম, সে তার জৈবিক অস্তিত্ব ছাড়া আর কোনও কিছুতেই বিশ্বাস করে না। সে কেবলমাত্র সেই বেঁচে থাকার অস্তিত্বকেই যেকোনো মূল্যে সংরক্ষণ করতে চায়। তাই সেও একজন দার্শনিক সাজে, ভুয়ো পরিচয় গোপন রেখে সে হাজির করে একটা দুই-দিক ধারালো তরোয়ালকে, যা যেকোনো কারও মধ্যে নিশ্চিত প্রাণ সংহারের ভয় জাগাতে পারে।

এতে মানব সভ্যতায় সংঘাত অনিবার্য হয়। সেই দ্বন্দ্ব শুধু নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ থাকে না। তা প্রকৃতির সঙ্গেও দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিশ্বাসের বহুরূপতায় ছিন্ন হয় বন্ধনগ্রন্থি। আদর্শ ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ের মধ্যে, সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলিও ভুলুন্ঠিত হয়। “আমরা কারা?”–এই অন্বেষণ থেকে “আমি কে?”–এই দার্শনিক অনুসন্ধানে পৌঁছাতে তাই আমাদের ধর্মযুদ্ধের প্রয়োজন হয়। আমরা জৈবিক অস্তিত্ব নষ্টের সক্ষমতায় বলীয়ান হতে থাকি। আলোকায়িত সভ্যতায় সেই ক্ষমতা-দর্শনের আনুগত্যে নাগরিক জীবন প্রগতির ভুয়ো রূপকেই আসল বলে মেনে নেয়। নাগরিক তাই তার বিশ্বাসে তাদের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাগুলোকেই জৈবিক অস্তিত্ব রক্ষার স্বাধীনতা বলে মেনে নিতে কুন্ঠা বোধ করে না। প্রশ্ন তোলে না। সমকালকে শুধু গ্রহণ করে, আর গ্রহণের শর্ত মেনে নিয়েই রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ এবং সামাজিক সম্পর্কের নিখুঁত বিরতি উপস্থাপন করতে সে যূথবদ্ধভাবে সংহার-সক্ষমতায় প্রমাণ রেখে চলে।

ফলে ভুয়ো দার্শনিকরা বহু শতাব্দী ধরেই সেই দুই প্রশ্নে আমাদের ঘোরাফেরা করালেন, যার প্রথমটি হল- “আমরা কোথা থেকে এসেছি?”, এবং দ্বিতীয়টা– “আমরা কোথায় যাচ্ছি?” কিন্তু “আমরা এখন কোথায়?” –সেই প্রশ্ন তুললেন না। যারা সেটা তুললেন, তারা খন্ডিত বিশ্বাসের অস্ত্রে তীব্রভাবে সমালোচিত হলেন। আমরা সেই প্রত্যাখ্যানের রাজনীতিটাকেও একটু নেড়েচেড়ে দেখতে চাইলাম না। কেউই এতদিন ঐ বাস্তব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টাটাকে সমবেত করার কথা ভাবলাম না। আমরা শুধু খুঁজে ফিরলাম সেই সব পন্থাগুলোকে যা মানুষের মনে অতি সহজেই মৃত্যু-ভয় জাগাতে পারে। ভিন গ্রহে ছাপ ফেলা সেই মানব সভ্যতা আজ যখন মহামারীর মুখোমুখি হয়ে বিশ্বাসের সমরূপতায় ভাবতে বাধ্য হচ্ছে, তখন দার্শনিক উপলব্ধিতে মূর্ত হচ্ছে -“আমাদের জীবন দিয়েই আমাদের বুঝতে হচ্ছে যে আমরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।”

আমরা এখন একই নৌকোয় সওয়ারি। সমগ্র মানব সভ্যতা এখন মৃত্যুর মতাদর্শে দীক্ষিত। সেই মৃত্যু ভয়ের মধ্যেও দুটো বিপরীতমুখী অবস্থান রয়েছে। ডাক্তার, নার্স, এবং ঐ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একদল কর্মীরা সেই ভয়ের অবস্থানেই যখন কাজে ব্যস্ত, অনাহারে থাকা বৈষম্যের শিকার যখন ভয়কে জয় করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন আর এক বৃহৎ-অংশ ঘরে বসে মৃত্যু-ভয়ের যন্ত্রণা উপভোগ করছে। বিষয়টা ঠিক সেই বৈপরীত্যকে প্রকট করে যেখানে আমরা দেখি, আমাদের পৃথিবী যত বেশি সংযুক্ত হচ্ছে, তত স্থানীয় বেমক্কা বিপত্তি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারছে একটা ভীতি, যা শেষ পর্যন্ত একটি বিপর্যয়কে সর্বজনীন সত্য বলে হাজির করছে।

কীভাবে বাড়বে আমাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা?

জীবন বড় সমাজমুখী। সেখানে স্বাস্থ্যকে বাজারমুখী হলে চলে না। বাজার ঝুঁকিকে নিশ্চিত করে। এই ঝুঁকি প্রসঙ্গে সমকালে যে দার্শনিক সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় হন, তিনি জার্মান সমাজবিজ্ঞানী আলরিখ বেক। ১৯৮৬ সালে বেক তাঁর মাতৃভাষায় রিজিকোগ্যজেলস্যাপ্ট শিরোনামে যে গ্রন্থটি প্রকাশ করেন তার ইংরাজি অনুবাদের কাজটি করেন মার্ক রিটার। ১৯৯২ সালে সেই অনুদিত গ্রন্থটি রিস্ক সোসাইটি : টুওয়ার্ডস অ্যা নিউ মডার্নিটি নামে সেজ থেকে প্রকাশিত হয়। আধুনিকতার ধূসর পান্ডুলিপি হিসেবে বেক ঝুঁকির নানা প্রসঙ্গ এই গ্রন্থে উল্লেখ করেন। নতুন আধুনিকতায় শ্রেণী নয়, বরং এখানে ঝুঁকি চিহ্নে, মৃত্যু পরিণামে সমাজ সংগঠনের যে সমাজবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমরা পাই সেই সম্পর্কে আমি আমার সমাজতত্ত্বের ইতিবৃত্তে অনেক কথা বলেছি।

এই করোনা কালে সেই বাড়তি কথায় না গিয়ে জীবন-মৃত্যুর সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় বেককে আমরা দেখতে পারি। বিপুল জনপ্রিয়, এবং সমাজতত্ত্বে পাঠ্য, এই গ্রন্থে বেক দূষণ, জল সঙ্কট, বনাঞ্চল ধ্বংস, গণতন্ত্রহীনতা, ক্রয়, ভোক্তা জীবনধারা, রোগ, পারমাণবিক শক্তি, জিন প্রযুক্তি ইত্যাদি বহুবিধ পরিসরে ঝুঁকির কথা বলেছেন। বিপদ আর ঝুঁকির সূক্ষ্ম পার্থক্যে জীবনের কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি মৃত্যুর সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা হিসেবে এটা ধরে উঠতে সফল হননি যে জীবনের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হল মৃত্যু। তাই গোটা বইয়ের কোথাও একটা ভাইরাস কীভাবে মানব সভ্যতার গতিপথে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে তার কথা বলা হয়ে ওঠে না। অথচ বিশ্ব-মহামারীর ইতিহাসে ভাইরাস-ব্যাক্টিরিয়ার হাজিরা সম্পর্কিত উদাহরণ ইতিহাসে অনেক আছে। জীবন-মৃত্যু সংক্রান্ত সেই সব প্রসঙ্গ বেক তাঁর গ্রন্থে অনালোচিত রাখলেন, যেখানে তিনি চিকিৎসা শব্দটি প্রায় পঞ্চাশ বার, এবং মৃত্যু শব্দটি কুড়ি বার ব্যবহার করলেন।

এই দুর্বলতা নিয়েও নতুন আধুনিকতায় চিকিৎসা সংক্রান্ত সমাজতত্ত্বের ব্যাখ্যায় বেক সফল হন যখন তিনি জীবন এবং মৃত্যুর রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিকে, স্বাস্থ্য এবং রোগের সামাজিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করেন। উঠে আসে অবিসংবাদিত ঘটনার নীতি হিসেবে জীবন ও মৃত্যুর প্রসঙ্গ, যাকে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা এই করোনা কালে, আজ আবার একবার নতুন করে, ভেবে দেখতে পারি। চিকিৎসা সংক্রান্ত সমাজতত্ত্ব বা যাকে আমরা মেডিক্যাল সোসিওলজি বলি, সেই সমাজতাত্ত্বিক উপধারার ধ্রুপদী তত্ত্বে জীবন ও মৃত্যুকে যে জৈবনৈতিকতায় দেখা হয়, এখন আমরা আর সেইভাবে দেখি না। বরং এটাকে নিতান্তই এক ব্যক্তিগত ইস্যু হিসেবে আজ বিবেচনা করি। ধরে নেওয়া হয় যে এতেই নাকি বিষয়ীগত উপাদানকে অনুভব করেও এর বিষয়গত বৈশিষ্ট্যকে একজন মানুষ বেঁচে থাকা হিসেবে চিনতে পারবেন। জীবনের মানে খুঁজে পাবেন।

তাই আমরা এখন বুঝি যে বৈশ্বিক ব্যবস্থার অনিয়ন্ত্রিত ও দূরবর্তী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে, অসংগঠিত এবং শিথিল বন্ধনযুক্ত সামাজিক সম্পর্কে অভ্যস্ত হতে হতে আমাদের এক অনিশ্চিত এবং অনিরাপদ জীবন প্রতিমুহূর্তে অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এই রাজনৈতিক-সংস্কৃতি অপ্রত্যাশিত পরিণামের দিকে আমাদের প্রাণশক্তিকে ঠেলে দিয়েছে, এবং দিচ্ছে। বৈশ্বিক কল্যাণের কথা না ভেবে রাষ্ট্রসমূহ যেমন আলাদা হয়ে লড়ে আসছে, তেমনি ব্যক্তিমানুষও আজ জীবন সন্ধানে একাই লড়ছে অতিমারীর বিরুদ্ধে। এই অতিমারী মানুষকে আগের চেয়ে আরো বেশি একা করে দিয়েছে এবং দেওয়ার চেষ্টা করছে ঠিকই, তবে বিশ্ব-নাগরিকের যে অংশ এর থেকে শিক্ষা নিতে চাইছেন তারাও সংখ্যায় কম নন। এখানেই চিকিৎসা সংক্রান্ত সমাজতত্ত্বের নতুন তাত্ত্বিক ধারার অবদানের কথা স্বীকার করতে হয়।

সেই নতুন তাত্ত্বিক চিন্তাধারায় জীবন-মৃত্যুর মেরুকৃত বাস্তবতাকে চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত সকল মানুষের সমবেত কাজের ফল হিসেবে দেখলে চলে না। এখানে আজ রোগীও যেমন যুক্ত থাকেন, তেমনি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সেই সংক্রান্ত নীতির সারিবান্ধা পরম্পরাকে যাচাই করার বিষয়টিও নিবিড়ভাবে সংযুক্ত থাকে। জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞান আজ তাই চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে যে শিক্ষাকে সামনে আনতে চায় তাকে স্পষ্ট না করলে মৃত্যুকে সরিয়ে রেখে, অতিমারীকে দমিয়ে রেখে, সামাজিক পরিসরে জীবনকে মূর্ত করে তোলা সম্ভব হয় না।

এই পথ পোলিশ সমাজতাত্ত্বিক জিগমুন্ট বাউম্যানও দেখতে পাননি। ২০০০ সালে পলিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত লিকুইড মডার্নিটি গ্রন্থে মুক্তি প্রসঙ্গে জীবন ও মৃত্যুর কথা তিনি আলোচনা করলেও, মৃত্যু যে আদতে আমাদের ধর্ম, দর্শন, রাজনৈতিক মতাদর্শ, কলা এবং চিকিত্সা প্রযুক্তি হিসেবে দৈনন্দিন জীবনে ইচ্ছাকৃতভাবে হাজির হওয়া এক গুনাগার– তা তিনি লেখেননি। একইভাবে প্রথম লিখিত ধারণায় মৃত্যুর সমাজতাত্ত্বিক বর্ণনার ইতিহাসকে সামনে আনা আমেরিকান সমাজতাত্ত্বিক ডেভিড আনরুও ব্যর্থ হন, যখন তিনি কেবলমাত্র মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত বিষয়গুলিতেই তাঁর আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রাখেন। ১০ নম্বর খন্ডের ৪ নম্বর ইস্যুর কনটেম্পোরারি সোসিওলজি পত্রিকায় প্রায় পাতা ৫ (৫০৮-৫১২) জুড়ে “ইজ দেয়ার অ্যা সোসিওলজি অব ডেথ” শীর্ষক আলোচনায় ডেভিড আনরু সেই ১৯৮১ সালেই মৃত্যুকে নিছক নিষিদ্ধ অজাচারের নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার বাইরে আনতে সফল হন। তবুও তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ এখানেও সমাজতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় দাবি করা হয় যে মৃত্যু হয়ে ওঠে এক অবাক করা গ্রেপ্তারী, যদি না তা আত্মতৃপ্তিতে জাগ্রত হয়।

এই ব্যাখ্যামূলক অনুধাবনকে স্পষ্ট করে আরও দুটি বই। প্রথমটি ১৯৮৯ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে এন্ডিংস : অ্যা সোসিওলজি অব ডেথ এন্ড ডায়িং শিরোনামে প্রকাশিত হয়, লেখেন মিশেল কর্ল। দ্বিতীয়টি সম্পাদিত গ্রন্থ, যা ১৯৯৩ সালে ব্ল্যাকওয়েল থেকে দ্যা সোসিওলজি অব ডেথ : থিয়োরি, কালচার, প্র্যাক্টিস নামে প্রকাশিত হয়। প্রায় ১৩টি নিবন্ধকে সংযুক্ত করে সম্পাদনার কাজটি করেন ডেভিড ক্লার্ক। এই কাজ দুটিকে খুটিয়ে পড়লে দেখা যায় যে মৃত্যু ও মরণের একটি সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে যা অন্তিমকে নিশ্চিত করলেও তা ইঙ্গিতবাহী পরিসমাপ্তির সূচক হয়ে ওঠে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে তাই বলা হয় যে প্রবাদের সেই দুই-দিক ধারালো তরোয়াল হল মৃত্যু, যা ছন্দ পতনকে নিশ্চিত করেও সামাজিক সংহতি বাড়িয়ে তোলে এবং অল্পবয়সীদের ঊর্ধ্বমুখি সচলতাকে গতিশীল করে।

বিজ্ঞানের সঙ্গে সমাজের সম্পর্কটাতে চোখ ফেরাতে বাধ্য করে মহামারী। সেদিনের (২০০২ সাল) সার্স ভাইরাস, যা প্রায় ২৬টি দেশে ছড়িয়েও এবং আজকের সার্স কোভ-২ ভাইরাসের সঙ্গে ৯০ শতাংশ মিল ও তার মারণ ক্ষমতা বেশী নিয়েও সে তখনও পুঁজিবাদী রাজনীতিতে বিশেষ সমস্যা করেনি। আজও কিছুটা তেমন। বরং আজ ক্ষণ হল স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা পরিষেবায় বাধ্যতামূলক পুঁজি বিনিয়োগে রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলার নতুন মুহূর্ত। ফলে আজকের চিকিৎসা সম্পর্কিত সমাজতত্ত্ব ফুকোবাদী সেই ধারণাকে নস্যাৎ করে যেখানে বলা হয় যে জীবনের নিস্তেজ একঘেয়েমি থেকে প্রকৃত ব্যক্তিস্বাতন্ত্রতার পরপার হল মৃত্যু। যত্নের সমাজতত্ত্ব অন্তর্দর্শনের নতুন আঙ্গিকে জ্ঞানীয় অনিয়মের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে মৃত্যুকে দোষী করে। যত্নহীন সামাজিক পরিমণ্ডলকে বিলম্বিত আধুনিকতার কারসাজি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা তাই মহামারী সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্যে কারসাজি চায়।

এই কারসাজি রুখে দেওয়ার জায়গাতেই আমাদের দাঁড়াতে হবে। তা না হলে জীবন কর্মতৎপর থাকে না। বরং মরণের প্রাতিষ্ঠানিক ক্রম হয়ে ওঠে ধর্মশালার বেসরকারী পরিসর। সামাজিক মৃত্যু ও জৈবিক মৃত্যু তখন সমাসনে বসে। সাইটোকাইনের ঝড় থামানো কঠিন হয়ে যায়। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি তার নিজস্ব দুর্বলতায় সামাজিক অথবা সম্প্রদায়গত স্বাস্থ্য বিধানের পথে আর হাঁটতে পারে না। প্রযুক্তির সুফল তখন কতিপয়ের লালসাপূরণেই ক্ষান্ত থাকে। দুর্নীতি প্রলুব্ধতায় বাসা বাঁধে।

সেই দুর্যোগের মধ্যেও প্রতিকল্পীয় বিকল্পে নলজাতক যেমন নতুন জীবন সৃষ্টির ইতিহাস রচনা করে, গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুষম পরিকল্পনাও তেমন মৃত্যুর প্রাদুর্ভাবকে কমিয়ে ফেলতে পারে। বেড়ে যায় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। মৃত্যু-ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়। মৃত্যুর সমাজতত্ত্ব তখন প্রাণহীন ধারণার ঊর্ধ্বে উঠে ফুরিয়ে যাওয়া জীবন রেখার সর্বোচ্চ স্তরকে ছুঁতে পারে। মরণশীল মানব, প্রাণী হয়েও প্রাণীকুলে তার অনন্য হাজিরায় টিকে থাকে।

বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ও মৃত্যুর মতাদর্শ

বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ঊনবিংশ শতাব্দীর দার্শনিক আলোচনায় কেন্দ্রীয় বিষয়। স্তরীকৃত সমাজে সেই সম্ভাবনা দার্শনিক ব্যাখ্যায় শ্রেণী কাঠামোকেই চিহ্নিত করে। বিংশ শতাব্দীর দার্শনিক বিশ্বাস জীবনের মতাদর্শকে মৃত্যুর মতাদর্শে লালন করে। মতাদর্শকে নিছক একটা মিথ্যা-সচেতনতা হিসেবে না দেখে, অথবা এটাকে নিছক বিকৃত বাস্তবতা বলে ধরে না নিয়ে, এখানে মৃত্যুর মতাদর্শেও জীবনকে খুঁজে দেখার চেষ্টা হয়। কিন্তু শতাব্দী শেষে মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপিত হয় মৃত্যু-ভয়কে সহজাত করে। ক্ষমতা স্তরের সর্বোচ্চ আসন তখন সেই দখল করে, যে অনেক বেশী মৃত্যুবাণে সমৃদ্ধ। কিন্তু শক্তি প্রদর্শনের সেই হাতিয়ারগুলো একবিংশ শতাব্দীর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কেমন ভোঁতা হয়ে যায়।

সেই দৃষ্টিকোণে স্লাভোজ জ়িজ়েক তাঁর ২০২০ সালে অর বুকস্ থেকে প্রকাশিত প্যান্ডেমিক : কোভিড-১৯ সেকস্ দ্যা ওয়াল্ড শীর্ষক গ্রন্থে একটা ভাইরাস কীভাবে বিশ্বের তাবড় শক্তিধর রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হল তার দার্শনিক ব্যাখ্যা দেন। বিশ্বের অন্যতম প্রসিদ্ধ এবং সুপরিচিত এই স্লোভেনীয় দার্শনিক এবং সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক, বাম এবং ডান উভয় আঙ্গিকেই প্রচলিত জ্ঞান এবং স্বীকৃত সত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত হন। এই কাজে তাঁর উদ্ভাবক চিন্তাধারা একদিকে যেমন হেগেলীয় রূপক, লাকানীয় মনবিশ্লেষণ, অপরদিকে সেটাই আবার মার্কসীয় দ্বান্দ্বিকতার সঙ্গেও মিশে যায়।

জ়িজ়েক দাবি করেন যে মহামারীর সংকটকে একটি আপৎকালীন মুহূর্ত হিসেবে দেখাটা ঠিক হচ্ছে না। গণস্বাস্থ্যে সমাধানের কাজটা রাষ্ট্র শক্তির দায়িত্বে ছেড়ে দিয়ে আমরা যে কেবলমাত্র সরকারী নির্দেশাবলী অনুসরণকেই নিজেদের কাজ হিসেবে বিবেচনা করে বসে থাকতে চাইছি –সেটাও ভুল হচ্ছে। এই প্রত্যাশায় ভুলটা লুকিয়ে থাকে সেই ধারণায়, যেখানে ধরে নেওয়া হয় যে অদূর ভবিষ্যতে স্বাভাবিকতাকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। এটা সমকালীন ভুয়ো দার্শনিক ধারণার একটা অন্যতম ফসল। আমাদের বরং এখানে ইমান্যুয়েল কান্টকে অনুসরণ করা উচিত। রাষ্ট্রের আইন সম্পর্কে কান্ট লিখেছেন: “মেনে চলুন, কিন্তু ভাবুন। চিন্তার স্বাধীনতা বজায় রাখুন!”

কান্ট যেটিকে “জনসাধারণের ব্যবহার” বলেছেন, আমাদের সবার আগে সেই বিষয়টাকে পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ বন্যা-খরা-ভূমিকম্প-জলোচ্ছ্বাস থেকে শুরু করে পঙ্গপাল পর্যন্ত সকল পরিবেশগত হুমকির সঙ্গে একটা মহামারী যে আমাদের ঘরের দরজায় প্রতিদিন ফিরে আসবে, সেই একত্রিত রূপ সম্পর্কে আমাদের এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এক ধরনের নৈতিক অগ্রগতির পথে মানব সভ্যতাকে আমরা এগিয়ে নিয়ে চলেছি বলে আমরা প্রতিমুহূর্তে যা করে চলেছি, সেটাকে কিছুটা ভণ্ডামি না বললে আমাদের দৈনন্দিন জীবন যে ঝুঁক্যাতঙ্কের মুখোমুখি হওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছে সেটা মিথ্যে হয়ে যায়। তাই ধর্মভীরু প্রাণেও আমরা এখন আর দুর্ভাগ্যকে আমাদের ভাগ্য হিসেবে মানতে প্রস্তুত নই।

সেই বিকল্প প্রস্তুতিতে মৃত্যুর মতাদর্শ আমাদের ভাঙতে হবে। জনসৃজনে তৈরি হবে রাষ্ট্রের পরিকল্পনা - সেও এখন একটা পুরোনো প্রত্যাশা। আজকের দিনে তাই বুঝতে হবে যে মতাদর্শ হল সেই রাজনৈতিক বয়ান, যার প্রাথমিক কাজ আজ আর রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক তাত্ত্বিক বক্তব্য গঠন করা নয়, বরং তা এখন জীবনের স্পন্দনগুলোকে বাস্তবতার মধ্যে এবং বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করতে চায়। তাই আমরা এখনও মেনে নিতে পারি না যে সমকাল নতুন যুগের সূচনা ঘোষণা করছে। আমরা এখনও সমকালের আগামীকে আমাদের জ্ঞানে সেই পুরানো স্বাভাবিকতায় ফিরে আসার স্বপ্নে দেখছি। বিপর্যয়কে তাই অরাজনৈতিক আঙ্গিকে বিচার করার কাজের মধ্যেই আমরা বেঁচে রয়েছি। স্বাভাবিকতার প্রত্যাশা নিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলার মানবিকতায় রাষ্ট্রের রাজনীতিতে তাই আমরা শুধু সহযোগিতা করে চলেছি। জৈব-রাজনীতির শিকার হয়ে চলেছি।

হেগেল লিখেছিলেন যে আমরা ইতিহাস থেকে একমাত্র যেটা শিখতে পারি, তা হল আমরা ইতিহাস থেকে কিছুই শিখি না। তাই এই মহামারীটি মানব প্রজাতিকে যে আরও বুদ্ধিমান করে তুলবে সেই প্রশ্নে হেগেলীয় জ়িজ়েক সন্দেহ প্রকাশ করেন। ল্যুইস অলথ্যুজারের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন না যে মৃত্যু মতাদর্শের জালিকাকে আমরা সহজে ছিঁড়ে ফেলতে পারবো। বিশেষ করে যখন আমরা নির্দ্বিধায় আমাদের স্বাধীনতাকে অনুভব করি, কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না যে পরাধীনতাকে প্রকাশ করার মতো ভাষা আমাদের কাছে আছে কিনা! না নেই। আর নেই বলেই ঝুঁকি আটকাতে আমরা প্রতিষেধক হিসেবে ঝুঁকিতেই বিনিয়োগ করি।

আফ্রিকাতে অনাহারে থাকা শিশুদের দৃশ্য যখন আমাদের দেখানো হয়, এবং তাদের সাহায্য করার জন্য যখন আমাদের কিছু করার আহ্বান জানানো হয়, তখন অন্তর্নিহিত আদর্শিক বার্তাটি আমাদের যা বোঝায়: “ভাববেন না। রাজনীতিকরণ করবেন না। তাদের দারিদ্র্যের আসল কারণগুলি ভুলে যান। শুধু নিজের কাজটা করুন, অর্থ সাহায্যে অবদান রাখুন, যাতে আপনাকে ভাবতে না হয়!” ঠিক তেমন ভাবেই মহামারী সহ সকল দুর্যোগে রাষ্ট্র প্রধান আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে যখন সাহায্য চান, তখনও তিনি মৃত্যুর মতাদর্শকেই হাতিয়ার করেন।

আমাদের মনের ইচ্ছাগুলোর সন্তুষ্টি ঘটা, বা না ঘটার সঙ্গে আজ আর সুখের সম্পর্ক যুক্ত নয়। বরং এই মতাদর্শের কারণে আমাদের প্রধান যে সমস্যাটি হচ্ছে তাতে আমরা আজ বুঝে উঠতে পারছি না যে সুখে বাঁচতে আমাদের আসলেই কী প্রয়োজন। ফলে আমরা কেউ ধরে উঠতে পারছি না যে প্রকৃত নৈতিক পরীক্ষাটি কেবল ভুক্তভোগীদের বাঁচানোর তৎপরতা নয়, আরও বেশি - সম্ভবত - যারা তাদের শিকার করেছে তাদের নির্মূল করার জন্য নির্মমভাবে উৎসর্গীকৃত। একজন খারাপ শাসক জনগণের জন্য ভয়াবহতার সৃষ্টি করতেই পারেন, সেটা প্রত্যাশিত। কিন্তু একজন সুশাসক দুর্দান্ত কিছু করার নামে জনজীবনকে ভয়ঙ্করের মুখোমুখি করে তুলবেন অথচ আমরা তার জয়ধ্বনি দেবো, তখনই বুঝতে হবে যে মৃত্যুর মতাদর্শ আবেশে আমরা সম্মোহিত।

মহামারী সম্পর্কিত তথ্যে ও উপাত্তে রাষ্ট্রকে কেন কারসাজি করতে হয়?

মরণের নির্মম অভিজ্ঞতায়, জীবনের জয়গানে মানুষ রাষ্ট্রকে কল্যাণকামী করে তুলেছিল। গণতান্ত্রিক অধিকার বোধে উদার মননে প্রতিনিধির শাসনে মানুষ জীবনকে খুঁজেছিল। কিন্তু প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রেও রাষ্ট্র তার স্বৈরাচারী মর্মকে দৃশ্যমানতায় প্রকাশ ঘটায়। এটা উদারনৈতিক গণতন্ত্রের একটা জৈব-রাজনৈতিক পরিণতি। ওপর থেকে সকল কিছু চাপিয়ে দেওয়ার ফলে এখানেও সমস্ত কিছুর শেষে যৌবনের এবং সৌন্দর্যের আসল বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায় জীবনের শেষ ইচ্ছা। সেই কারণেই, প্লেটোর মতো বলতে হয় যে আনন্দের সঙ্গে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক পথটি অত্যাচারের দুঃস্বপ্নে শেষ হয়। এখানে যেটা ঝুঁকির মধ্যে থেকে যায় তা হ’ল মানব জীবনের প্রতি আমাদের প্রাথমিক অবস্থান। মূল বক্তব্যটি হ’ল: গণতন্ত্র যদি আর্থিক বিমূর্ততার সমান হয়ে একটি সংগঠিত মৃত্যু ইচ্ছের সমান হয়, তবে তখন এর বিপরীত রূপ হিসেবে স্বৈরতন্ত্র বা সর্বগ্রাসিতাকে খুঁজে পেতে আমাদের অসুবিধা হয়।

তাহলে কি ফ্রাঙ্ক ডিলের মতো উদারপন্থী হয়ে আমাদের স্ববশ স্বাধীনতার উপর আরোপিত যেকোনো ধরনের অদৃশ্য হস্তক্ষেপকে আমরা প্রত্যাখ্যান করবো? আমরা কি সংখ্যাগরিষ্ঠদের আর্থিক সুস্থতা বজায় রাখতে হাজার হাজার জীবন উৎসর্গী উপকারীদের বিসর্জনের জন্য প্রস্তুত রাখবো? মৃত্যুদূতের উদরপূর্তির স্বেচ্ছাসেবক নির্মাণ করাটাই কি আমাদের আশু কর্তব্য? আমরা কি সেই রকম কর্তৃত্ববাদী, যারা বিশ্বাস করি যে কেবলমাত্র একটি কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা সর্বগ্রাসী সামাজিক নিয়ন্ত্রণই কেবলমাত্র আমাদের বাঁচাতে পারে? আমরা কি নতুন যুগের সেই অধ্যাত্মবাদী, যারা মনে করি যে এই মহামারীটি প্রকৃতির একটি সতর্কবার্তা, এবং এটা আমাদের নির্বিচারে প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণের একটা প্রতীকী শাস্তি? আমরা কি বিশ্বাস করি যে ঈশ্বর কেবলমাত্র আমাদের পরীক্ষা করছেন এবং শেষ পর্যন্ত কোন একটা উপায় খুঁজে পেতে তিনিই আমাদের সহায়তা করবেন? মানুষ যে কী, সেই সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করেই এখানে প্রতিটি প্রশ্নের আঙ্গিক গঠিত হয়েছে। প্রতিটি প্রশ্ন এটাও জানে যে আজকে আমরা, সকল ভুয়ো দার্শনিকরা, চিন্তার কোন স্তরে রয়েছি।

এই সমস্ত বিষয়কে বিবেচনাধীন করে ইতালীয় দার্শনিক জর্জিও এগাম্বেন দাবি করেছেন যে আমরা যদি মহামারীটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করি, তবে আমরা আমাদের মানব প্রজাতি সত্তা হিসেবে উন্মুক্ত সামাজিক পরিসরকে স্বেচ্ছায় ত্যাগ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এক সমাজবিচ্ছিন্ন বেঁচে থাকার মেশিনে পরিণত হই, এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করি। অভিজ্ঞানের আধারে সেই সত্তা হল অতিকথন। তাই জ়িজ়েকের ধারণার সঙ্গে এগাম্বেন এখানে একমত হচ্ছেন। কিন্তু আমাদের সাবধানও করে দিচ্ছেন। জ়িজ়েক বলেছেন, তাহলে কি আমাদের ঘরে আগুন লাগার সময়ও আমাদের স্বাভাবিক হিসাবে জীবনযাপন করার সাহস সংগ্রহ করা উচিত? এগাম্বেনের কন্ঠে অনুরণন, শেষ পর্যন্ত আমাদের তবে কি মর্যাদার সঙ্গে মরে যেতে হবে?

“টিকাপ্রাপ্ত মরণ” সেই মর্যাদার তকমা। “টিকাপ্রাপ্ত পাসপোর্ট” বৈধতার চাবিকাঠি। বহিষ্করণের এই জৈব-রাজনীতি প্রসঙ্গে এই ২০২১ সালে, এরিস থেকে, এগাম্বেন প্রকাশ করেন তাঁর হোয়ের আর উই নাও? দ্যা এপিডেমিক অ্যাজ পলিটিক্স গ্রন্থটি। এখানে এগাম্বেন দাবি করেন যে আধুনিক রাজনীতি হ’ল উপর থেকে নীচের দিকে প্রবাহিত হওয়া এক জৈব-রাজনীতি। এই প্রহেলিকায় শেষ পর্যন্ত জৈবিক সত্তা, বা জীবন, ঝুঁকির মধ্যে থাকে। আর তাই আজ এর স্বাস্থ্য নামক নতুন উপাদানটি যে কোনও মূল্যে পরিপূর্ণ হওয়া আইনের একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ বাধ্যবাধকতা হয়ে অন্তর্ভুক্তির সঙ্গেই বর্জনকে অনিবার্য করে তোলে। এগাম্বেন এখানে ফুকোর সেই জৈব-রাজনীতির আইনি অধিকার সম্পর্কিত ধারণার বিরোধিতা করেছেন। এক বিকল্প এবং ব্যতিক্রমী উদাহরণে তিনি সেই বিরোধিতার কাজটা করছেন। সেটি হল হোমো-স্যাসার ব্যতিক্রম।

রোমান আইনে এই হোমো-স্যাসার ব্যতিক্রমের অবস্থাটিকে এগাম্বেন একটি চিত্র হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। সেখানে যে ব্যক্তি নিষিদ্ধ তাকে যে কেউ, যখন খুশী, মেরে ফেলার অধিকার রাখলেও তাকে ধর্মীয় আচারে কোরবানি দেওয়া যায় না। এই হোমো-স্যাসার ব্যতিক্রমী অবস্থানে এই মহামারী একই সঙ্গে জীবনের অন্তর্ভুক্তি এবং বর্জনযোগ্য অবস্থানকে সমাজ জীবনে মূর্ত করছে। আইনের অনির্দিষ্ট স্থগিতাদেশই ব্যতিক্রমের অবস্থাটিকে যে চিহ্নিত করে সেটা ফুকো সেদিন দেখতে পাননি।

এগাম্বেন বলছেন যে জীবনের বিভাজন একটি বিমূর্ততা। আমরা জানি যে আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞান তার পুনঃসঞ্জীবিতকরণ যন্ত্রগুলির মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই বিমূর্ত রূপটির বাস্তবায়ন ঘটায়। ডিপ কোমা অবস্থা থেকে মানুষ ফিরে আসে। অর্থাৎ কৃত্রিম সঞ্চালন প্রক্রিয়াগুলির পুনর্নির্মাণ কক্ষটি অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থায় একটি মানব দেহকে দীর্ঘকাল ধরে সংরক্ষণ করে রাখে। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থা জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতাবস্থা বজায় রাখে। একটি অন্ধকার অঞ্চলে কঠোরভাবে চিকিত্সার মধ্যে দিয়ে দেহ বেঁচে ফিরে আসতে পারে। আজকের মহামারী নতুন যা ঘটাচ্ছে তাতে জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে কৃত্রিমভাবে স্থগিত হওয়া এই মানব দেহটি নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে যেখানে নাগরিকরা তাদের আচরণগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য থাকবে শুধু যেকোনও মূল্যে জীবন সংরক্ষণ করার তাগিদ থেকে। এও এক ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ কক্ষ। নিভৃতবাস এখানে প্রথমেই বিমূর্ত সামাজিক জীবনোপলব্ধির মন থেকে দেহকে পৃথক করে। কিন্তু এটা করার ফলে প্রতিষ্ঠিত নতুন ধর্মের সবচেয়ে মর্মান্তিক রূপ হয়ে ওঠে জীবন, আর তার একমাত্র উপাদান হয়ে ওঠে ওষুধ।

এগাম্বেনের তর্ক-বিতর্কে একটি অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা যায়। প্রশ্নের অবকাশ থাকে যে মহামারী, বিশ্ব-উষ্ণায়ন ইত্যাদির কারণেই কি সুশাসনের ইঙ্গিত বহনে কাজ করে রাষ্ট্রের কারসাজি? অথবা মহামারী বাস্তবতার জন্য সৃষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে আমরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি তার কারণেই কি আমাদের ঘরে আগুন লাগছে? আজ সেই আগুনের শিখা তার রূপ ও প্রকৃতি বদলেছে, এটি ডিজিটাল, অদৃশ্য এবং আধারহীন হয়ে উঠেছে - তবে ঠিক এই কারণেই কি এটি আরও নিবিড় এবং প্রতিটি মুহুর্তে আমাদের চারপাশ ঘিরে রেখেছে? এই প্রশ্নরেখাগুলির উত্তর এগাম্বেনের গলায় স্পষ্টভাবেই হাইডেগারিয়ান বক্তব্যের প্রতিধ্বনিতে শোনায়: আগুন হয়ে চিকিত্সা বিজ্ঞান এবং ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ আমাদের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার উপায় হিসেবেই মহামারীটিকে রাজনীতিগত দিক থেকে শক্তিশালী করেছিল, আর তার মধ্যে তারা প্রাথমিক বিপদটি আবিষ্কার করেছিল মৃত্যুচিহ্নে।

এই দুর্বলতায় জ়িজ়েক আজ এগাম্বেনের বিরোধিতা করেন। এগাম্বেন যেহেতু ভাইরাসটিকে রাষ্ট্রের জৈব-হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেন, তাই তিনি আবার পুরোনো স্বাভাবিকতায় ফিরতে চান। এটা ভুল। সেই বিরোধী অবস্থানে জ়িজ়েক বলেন, আমাদের যদি এগাম্বেনকে মানতেই হয় তবে আমাদের উচিত মানবিক ক্ষতির জন্য ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করা এবং আমরা যে সামাজিক স্বাধীনতা ব্যবহার করেছিলাম তাকেও আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত। কিন্তু আমরা যদি একটা জ্ঞানাত্মক বাঁক নিই, প্রকৃতপক্ষে সীমাবদ্ধ থাকা সেই সমাজঘটিত স্বাধীনতাগুলিকে উপেক্ষা করে প্রতিকল্পীয় নতুন ধারায় জীবনকে দেখি, তবেই একমাত্র আমরা এই নিখোঁজ হওয়ার শূন্যপদ পেরিয়ে নতুন স্বাধীনতা-আগমনের জন্য সামাজিক স্থানটিকে উন্মুক্ত রাখতে পারবো।

যদি আমরা আমাদের পুরোনো জীবনযাত্রার সঙ্গে লেগে না থাকি, তবেই আমরা নতুন বর্বরতার অবসান ঘটাতে পারবো। এই বক্তব্য ফুকোর মতো এগাম্বেনের সেই ধারণাকেও নস্যাৎ করে যেখানে তাঁরা বালিতে সেই জীবন-রেখা টানছেন যা সমুদ্রের ঢেউয়ে অদৃশ্য যাচ্ছে। ফুকোর দ্যা অর্ডার অব থিংস : অ্যান আরকিওলজি অব দ্যা হিউম্যান সায়েন্সেস গ্রন্থের ব্যাখ্যায় পাওয়া ধারণার মতো এগাম্বেনও বলছেন যে এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কিছুটি আর করার নেই। আমরা মানব-উত্তর যুগে কার্যকরভাবে প্রবেশ করছি। রোগ, মহামারী, বিশ্ব-উষ্ণায়ন এবং আমাদের মনস্তাত্ত্বিক জীবনের সকল প্রত্যক্ষ ডিজিটাল অ্যাক্সেস সহ আমাদের জীবনে সচল সার্বিক “বায়ো-ডিজিটালাইজেশন” প্রক্রিয়া, আমাদের মানবিক মৌলিক স্থানাঙ্কগুলিকে সহজেই সঙ্কুচিত করে। এগাম্বেনের ধারণায় তাই এই পরিস্থিতি মানব-উত্তর অধ্যাত্মিকতার এক নতুন রূপ উদ্ভবের সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করে।

এই সম্ভাবনা থেকেই এগাম্বেন বলছেন যে আজ মানবজাতি অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বালির মুখে টানা রেখার মতো ঢেউয়ে ধুয়ে যাচ্ছে। তবে যা এর স্থান গ্রহণ করছে তার আর একটি বিশ্ব নেই; শক্তি এবং বিজ্ঞানের গণনার করুণায় এটি ইতিহাস ব্যতীত কেবল একটি খালি এবং নিঃশব্দ জীবন। সম্ভবত, এই ধ্বংসস্তূপ থেকে শুরু করেই ধীরে ধীরে বা আকস্মিকভাবে অন্য কিছু উপস্থিত হতে পারে - অবশ্যই ঈশ্বর নয়, অন্য একজনও নয় - সম্ভবত একটি নতুন প্রাণী, কোনও আত্মা, যা অন্যভাবে বেঁচে থাকতে পারে।

জ়িজ়েক এখানেই এগাম্বেনকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন যে তাহলে মানবতা কীভাবে পুনরায় উদ্ভাবিত হতে পারে? রাষ্ট্রের জৈবনিক কারসাজি তবে কি মানব সত্তা টিকিয়ে রাখার অনুকূলে থাকে না? এগাম্বেন এখানে একটি ইঙ্গিত দেন। নাগরিকদের দেহের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা এবং অনুশীলনকে আধুনিক জৈব-রাজনীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন। তাঁর ধারণায় সমসাময়িক রাজনৈতিক জীবনের গোপন ম্যাট্রিক্সটি সাধারণত উদার গণতন্ত্রের সভ্য মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা হাতিয়ার। জরুরী সময়ে, তবে প্রয়োজনে, আধুনিক রাষ্ট্রশক্তি তার সত্যিকারের মুখ দেখায় এবং এক ‘ব্যতিক্রমী অবস্থা’ অবলম্বন করে। সেখানে নাগরিকদের নিরীহ জীবন নিরবচ্ছিন্ন সেই রাষ্ট্রশক্তির অধীনে শ্বাসরুদ্ধ হতে পারে।

অর্থাৎ, এগাম্বেন প্রতিরক্ষামূলক মুখোশ পরার যে বিরোধিতা করেন তা ফরাসি দার্শনিক এম্মান্যুয়েল লেভিনাসকে সমর্থন করে এবং দাবি করে যে মুখটি হ’ল দেহের সেই অংশ যা দিয়ে অন্যের দুর্ভেদ্য অনন্যতা স্থানান্তরিত হয়। মুখ আমাদের কথা বলে এবং আমাদেরকে সেই অসম্পূর্ণ সম্পর্কের সঙ্গে ক্ষমতা পরিচালনার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। এখানে এগাম্বেনের সুস্পষ্ট উপসংহারটি হ’ল, মুখটি অদৃশ্য করে দেওয়ার মাধ্যমে, প্রতিরক্ষামূলক মুখোশটিকেই কেবল সামনে রাখা যায়। আর তাতে সত্যের অতল গহ্বরটাকেই অদৃশ্য করে দেওয়া সম্ভব হয় যেখানে বিশ্বাসের উপাদানগুলোকে মুখোশে ঢাকা মানুষের মুখ দিয়েই প্রতিধ্বনিত করা যায়।

এই দাবির একটি স্পষ্ট ফ্রয়েডিয়ান উত্তর আমরা সামাজিক ডারউইনবাদে আগেই পেয়েছি। ফ্রয়েড ভাল করেই জানতেন যে একজন চিকিৎসক ও তার রোগী, সমস্যা দূরীকরণের মুখোমুখি বিশ্লেষণাত্মক অধিবেশনে, কখন এবং কেন পরস্পর বিরোধী হয়ে ওঠেন। এগাম্বেন বলছেন যে মুখটি এখন তার একেবারে একটা মৌলিক মিথ্যা। মুখোশটাই চূড়ান্ত। এবং নিদানদাতা বিশ্লেষক আজ কেবল রোগীর মুখটাকে না দেখে রোগের অতল গহ্বরে প্রবেশ করছেন। রোগীও তার ওষুধ আর পারিপার্শ্বিক যন্ত্র ছাড়া চিকিৎসকের স্পর্শ আর পাচ্ছেন না। আভাসী বাস্তবতায় স্পর্শহীন উপশম উপায় আজ একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তি ও বর্জনকে মূর্ত করে। এটাই এগাম্বেনের জৈব-রাজনীতির সমকাল।

জৈব-রাজনীতির প্রহেলিকায় শেষ কয়েকটি কথা

এই জৈব-রাজনীতির কথা বাঙালি মার্কসবাদী তাত্ত্বিক রণবীর সমাদ্দারও মানছেন। ২০২১ সালে উইমেন আনলিমিটেড থেকে প্রকাশিত তাঁর অ্যা প্যানডেমিক অ্যান্ড দ্যা পলিটিক্স অব লাইফ শীর্ষক গ্রন্থটিতে বিকল্প হিসেবে তিনি নীচ থেকে উঠে আসা আর এক জৈব-রাজনীতির কথা বলছেন। সমাদ্দারের ধারণায় সেই বিকল্প হল ‘জীবনের রাজনীতি’, যেখানে জনতার একাংশ প্রতিনিধিত্বমূলক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে আর রাজনীতির উদ্দেশ্য-বিধেয় না খুঁজে, নিজেরাই সম্মিলিত ভাবে জীবনের নিজস্ব রাজনীতি নির্মাণের চেষ্টা করছে। এটাকেই তিনি সর্বাঙ্গীণ সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ বলছেন।

কিন্তু এখানেই এগাম্বেনের মতো সমাদ্দারও ভুল করেন। তাঁরা উভয়েই “গণতান্ত্রিক জৈব-রাজনীতি” আদতে সম্ভব কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে ভুলে যান। তাই তাঁদের সকলের ধারণায় মহামারীর তথ্য ও উপাত্ত সম্পর্কে রাষ্ট্রের কারসাজির দিকগুলো অব্যাখ্যাত থেকে যায়। তাঁরা একবারও ভেবে দেখেন না যে জবরদস্তির এবং নজরদারির ফর্মগুলোর সমান্তরাল প্রসার ছাড়াই জনগণের স্বাস্থ্যের পক্ষে এমন সমষ্টিগত অনুশীলনগুলো কীভাবে সম্ভব হচ্ছে? এখনও পর্যন্ত এই দিকটিতে কোনও দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক, আলোকপাত করেছেন বলে আমরা জানি না। জ়িজ়েক নিজেও এই প্রসঙ্গে এখনও নিরুত্তর থাকেন।

মৃত্যুর সমাজতত্ত্ব যে ছিদ্রে আমাদের চোখ রাখতে বলে সেখানে মানবতা-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাই আমাদের একমাত্র আশা। একটি “পুরোনো স্বাভাবিকতায় ফিরে আসার” স্বপ্ন দেখার পরিবর্তে আমাদের উচিত একটি নতুন স্বাভাবিকতা তৈরির কঠিন এবং বেদনাদায়ক প্রক্রিয়ায় নিজেদের জড়িত রাখা। এই নির্মাণ কোনও চিকিত্সা বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সমস্যা। যেখানে আমরা আমাদের সমগ্র সামাজিক জীবনের একটি নতুন রূপ আবিষ্কার করতে বাধ্য হই। রাষ্ট্র তখন আর তার পুরনো কায়দায় মহামারী সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ও উপাত্তকে নিজের সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে না। মৃত্যু মতাদর্শ সেখানে জৈব-নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয় না।

- লেখক, প্রফেসর এস এন এইচ কলেজ, ফারাক্কার অধ্যাপক

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in