জরুরি অবস্থা - ঘোষিত বনাম অঘোষিত

আজ থেকে ছেচল্লিশ বছর আগে এমন ঘোষিত জরুরি অবস্থা “ইন্দিরার ইন্ডিয়া”কে ২১ মাস ধরে কায়েম রেখেছিল। এই অবস্থা শুধু গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধই করেনি, মানুষের জৈব-জীবনের ওপরেও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিল।
জরুরি অবস্থা - ঘোষিত বনাম অঘোষিত
ছবি প্রতীকীসংগৃহীত

সামাজিক মাধ্যমে আজ একটা লেখা পড়ছিলাম। সেখানে দেখলাম চিলির সঙ্গে ভারতের তুলনা করা হয়েছে। সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচার করতেই এই তুলনা। গত শতাব্দীর সাতের দশককে সেই আলোচনায় সময়-সূচক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই কাল চিহ্ন, দিন চিহ্নেও সুনির্দিষ্ট। চিলির ক্ষেত্রে সেটা ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩। ভারতের হল ২৫-২৬ জুন ১৯৭৫। ক্ষণচিহ্নে এই দুই দেশ মিলে যায়। উভয় ক্ষেত্রেই আঁধার কালো রাতে, অন্ধকার দিনের সূচনা ঘোষিত হয়।

চিলি ও ভারতের সেই সমরূপতার গল্পটা কেমন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো মূলত শিল্পোন্নত ইউরোপ-আমেরিকাকে কাঁচামাল জোগান দিয়েই দেশের অর্থনীতির হাল চালাত। দেশের খনিজ সম্পদের রপ্তানি এবং সেখান থেকে উৎপাদিত দ্রব্যের আমদানি করাটাই ছিল এই সকল দেশের বাণিজ্যিক নীতি। এতে শিল্পে স্বয়ম্ভর হওয়ার তুলনায় দেশগুলো একদিকে যেমন প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় নিশ্চিত করতো, অন্যদিকে তেমনই জীবনধারায় পরদেশ নির্ভরতাকে আরও জাঁকিয়ে বসতে সাহায্য করতো। ছয়ের দশক থেকে তাই ব্রাজিল, বলিভিয়া, পেরু, চিলি, আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলা সহ লাতিন আমেরিকার প্রায় সকল দেশেই “লুম্পেন বুর্জোয়া”বিরোধী হাওয়া প্রবল হতে থাকে।

এই সময় অপর যে বিষয়টা লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক বয়ানে মুখ্য হয়ে ওঠে, তা হল, নয়া-উপনিবেশবাদী সম্পর্ক-সংযোগ। এই রাজনৈতিক যোগে লাতিন আমেরিকা জুড়ে ব্রিটেন-জার্মান-ফ্রান্স-পর্তুগালের রাশ আলগা হতে থাকে, কিন্তু আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দখলদারি চেপে বসতে থাকে। মার্কিন শোষণের শিকারে পরিণত হওয়ার সকল সম্ভাবনায় পূর্ণতা পাওয়া এই লাতিন দেশগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও তাই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ প্রত্যক্ষযোগ সংমিশ্রিত হতে থাকে। সাম্রাজ্যবাদের কাছে সেটা আরও বেশি করে প্রয়োজন হয়ে ওঠে এখানকার প্রতিরোধী আন্দোলনের স্বরূপের অভ্যন্তরীণ কারণে।

এই প্রতিরোধী আন্দোলনের কারিগর হিসেবে বামপন্থীদের সক্রিয় ভূমিকা আমেরিকার মাথা ব্যাথার কারণ হয়। সার্বিক সামাজিক অনাচার, আর্থিক বৈষম্য, বর্ণবাদ, দমন-পীড়ন, দুর্নীতি, এবং শোষণ ও বঞ্চনার কারণে যে জন-অসন্তোষ দানাবাঁধে, তাকে সামনে রেখেই বামপন্থীদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই গোটা লাতিন আমেরিকা জুড়ে বেশ স্পষ্ট রূপ নেয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় চিলিতে তার প্রথম প্রতিফলন ঘটে ১৯৭০ সালে। লাতিন আমেরিকার প্রথম মার্কসবাদী রাষ্ট্রপতি হিসেবে চিলিতে নির্বাচিত হন সালভাদোর আয়েন্দে। আজ ২৬ জুন, তাঁর জন্মদিন।

ক্ষমতায় এসেই আয়েন্দে চিলির সমস্ত আকরিক খনি এবং বিদেশীদের (বিশেষ করে মার্কিন) মালিকানাধীন অনেক ব্যবসা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বাজেয়াপ্ত করেন এবং এগুলোর জাতীয়করণ করেন।

ক্ষমতায় এসেই আয়েন্দে চিলির সমস্ত আকরিক খনি এবং বিদেশীদের (বিশেষ করে মার্কিন) মালিকানাধীন অনেক ব্যবসা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বাজেয়াপ্ত করেন এবং এগুলোর জাতীয়করণ করেন। কিউবা, চীন, সোভিয়েতের সঙ্গে বাণিজ্যনীতি গ্রহণ করেন। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেঁধে দেন এবং সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মন্ত্রক গঠন করে দেন। ভূমি সংস্কারের মধ্যে দিয়ে গ্রামীণ দারিদ্রের অবসানে উদ্যোগী হন। সর্বোপরি সকলের জন্য স্বাস্থ্যের দাবিটাকে মানব অধিকার, এবং সেটাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে জোরের সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন।

এতে দেশের গরীব মানুষ, খেটে খাওয়া কৃষক-শ্রমিক কুল খুশী হলেও প্রচলিত পুঁজিবাদ সঙ্কটে পড়ে। অগত্যা যা হয়! পুঁজিবাদ তার সহজ হাতিয়ারকেই ব্যবহার করে। ১৯৭৩র ১১ সেপ্টেম্বর সিআইএ-র সহায়তায় এবং তাদের ব্লু-প্রিন্ট অনুসারেই সালভাদোর আয়েন্দে খুন হন। চিলিতে কায়েম হয় অন্ধকার দিন। গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধী এই ফ্যাসিবাদী শাসন চিলির পুঁজিবাদের বিপদে রক্ষাকবজ হয়। মৃত আয়েন্দের চিলি প্রমাণ করে যে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার পরিচালকগণ যে ধরনের বাঁধার মুখোমুখি হন, সেই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করার রাজনৈতিক হাতিয়ারের নাম ফ্যাসিবাদ।

আয়েন্দের মতোই স্বাধীন ভারতে সংস্থা জাতীয়করণের পথে হেঁটেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। তাঁর এই জনমুখি উদ্যোগ নিয়ে যে বিতর্কই থাকুক না কেন, স্বাধীন ভারতে তিনিই প্রথম সরকারী-বেসরকারীকরণের দ্বন্দ্বে একটা ধাক্কা দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু ঐ যে মৌলিক সমস্যা! জনমুখি কর্মকাণ্ড বলে চালানো সরকারী পরিকল্পনা যখন আর জনগণের মন জয় করতে পারে না, সাম্যের নামে বৈষম্য বৃদ্ধি যখন অনিবার্য হয়, শাসক তখন ক্ষমতা হারনোর ভয় পান। এমন পরিস্থিতিতে শাসক ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহজেই ফ্যাসিবাদ নামক রাজনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করেন, যেটা ইন্দিরা গান্ধিও করলেন। এবং তিনি প্রমাণ করলেন যে প্রত্যেক শাসনের একটা সুনির্দিষ্ট ফ্যাসিবাদী রূপ থাকে।

জনমুখি কর্মকাণ্ড বলে চালানো সরকারী পরিকল্পনা যখন আর জনগণের মন জয় করতে পারে না, সাম্যের নামে বৈষম্য বৃদ্ধি যখন অনিবার্য হয়, শাসক তখন ক্ষমতা হারনোর ভয় পান।

১৯৭৫র ২৫-২৬ জুনের মধ্যরাতে তিনি অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারি করলেন। সারা দেশে চলতে থাকা শ্রমিক-কর্মচারী-ছাত্র আন্দোলনকে এক ঝটকায় নিভিয়ে দিতে, এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালে দুর্নীতি করে রায়বেরেলি আসনে জয়লাভ সম্পর্কিত রাজনারায়ণের আনা মামলার রায়ে এলাহবাদ হাইকোর্ট শ্রীমতী গান্ধীকে যে ছয় বছর সংসদীয় রাজনীতি থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে, তাকে ভুলুন্ঠিত করতেই অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারি হল। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় বিষয়টা জানলেও, শোনা যায়, মন্ত্রীসভার সকল সদস্য জানতেনই না যে রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ ২৫ তারিখেই ভারতীয় সংবিধানের ৩৫২ নং ধারা অনুযায়ী এই জরুরি অবস্থা ঘোষণার কাগজে সই করে দিয়েছেন।

প্রতিরোধহীন শাসন তখন উন্মত্ত। গরিব মানুষের বাসস্থান উচ্ছেদে ছেলে সঞ্জয় গান্ধির তাণ্ডব শুরু হল। তুর্কমান গেটে বুলডোজার চালিয়ে দেওয়া হল। বিক্ষোভকারীকে জোর করে নাসবন্দি করা হল। রাজনৈতিক বন্দিতে কারাগারগুলোকে ভরিয়ে তোলা হল। সাহিত্যে সেন্সরসিপ কার্যকরী হল। খর্ব হল আদালতের ক্ষমতা। সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ অনিবার্য হয়ে উঠলো। এই ঘোষিত জরুরী অবস্থার সময় ভারতের সাধারণ মানুষের কোন গণতান্ত্রিক অধিকার থাকে না। তাই ২৬ জুন, ১৯৭৫ থেকে ২১ মার্চ, ১৯৭৭ পর্যন্ত - এই ২১ মাসব্যাপী সময় কাল হল ভারতের জাতীয় ইতিহাসের ঘোষিত কলঙ্কিত অধ্যায়।

আর একভাবে লিপিবদ্ধ করা যায় এই অধ্যায়কে। সেই আঙ্গিক জয়প্রকাশ নারায়ণ, অটল বিহারী বাজপেয়ী কথা নয়, বরং তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি দেবকান্ত বরুয়ার ‘ইন্দিরাকেই ইন্ডিয়া’হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শে লুকিয়ে থাকে। এই অভিপ্রায় আজও স্বৈরাচারী শাসনের দ্যোতক হিসেবে চিহ্নিত হয়। এমন শাসনে লুঠ হয়ে যায় মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। এও হল ফ্যাসিবাদের এক রূপ, যেখানে অশুচি হয় দেশের সংবিধান। ঘোর দুর্দিনেও শাসকের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে থাকে নাগরিক সমাজ, যখন অধিকারহীন জনসমাজ জেগে কাটায় দুঃস্বপ্নের রাত। তাই ফ্যাসিবাদরূপী জরুরি অবস্থা হচ্ছে এমন একটি পরিস্থিতি যা স্বাস্থ্য, জীবন, সম্পত্তি বা পরিবেশের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে।

আজ থেকে ছেচল্লিশ বছর আগে এমন ঘোষিত জরুরি অবস্থা “ইন্দিরার ইন্ডিয়া”কে ২১ মাস ধরে কায়েম রেখেছিল। এই অবস্থা শুধু গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধই করেনি, মানুষের জৈব-জীবনের ওপরেও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিল। আজকের ভারতও তেমন এক অঘোষিত জরুরী অবস্থা মধ্যে দিয়ে চলেছে। অতিমারির সমাধানে প্রাসঙ্গিক পদক্ষেপ না গ্রহণ করে, এর মৃত্যুভয় এবং এর আইনকে সুযোগ করে নিয়ে চালানো হচ্ছে এক ভয়ঙ্কর জরুরি অবস্থার অঘোষিত শাসন।

আজকের ভারতও তেমন এক অঘোষিত জরুরী অবস্থা মধ্যে দিয়ে চলেছে। অতিমারির সমাধানে প্রাসঙ্গিক পদক্ষেপ না গ্রহণ করে, এর মৃত্যুভয় এবং এর আইনকে সুযোগ করে নিয়ে চালানো হচ্ছে এক ভয়ঙ্কর জরুরি অবস্থার অঘোষিত শাসন।

কেন এমনটি বলা যাচ্ছে? বিশেষ করে আদালত যখন আন্দোলনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে রায় দিচ্ছে! দেশদ্রোহিতার নামান্তর হিসেবে আন্দোলনকে না দেখার পরামর্শে নির্বাচিত শাসককে দিয়ে বন্দি-মুক্তি ঘটাচ্ছে, তামাম সংবাদমাধ্যম মুখরোচক খবর পরিবেশনের সঙ্গে শাসকের স্তুতি গাইছে, তখন সমকালকে আমরা কীভাবে ভাববো যে এটাও স্বাস্থ্য, জীবন, সম্পত্তি বা পরিবেশের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে?

সেই ঘোষিত জরুরি অবস্থার সময়, রাজনৈতিক নেতা থেকে সাংবাদিক, লেখক, সাহিত্যিক থেকে পত্রিকা সম্পাদক – সকলেই কোন না কোন কারণে আত্মগোপন করেছেন। পুলিশের তাড়া খেয়েছেন। ধরা পড়েছেন। কারাবাস সয়েছেন। তবুও সোচ্চার থেকেছেন মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে। শুধু তাই নয়, এসবের ব্যক্তিগত বিবরণও তাঁরা কখনও দিয়েছেন বলে জানা নেই। সিদ্ধার্থশঙ্করের ব্যক্তিগত আক্রোশে কিছু ঘটনা এই বাংলায় ঘটলেও তাকে সমাজ-রাজনৈতিক দৃষ্টিতেই তাঁরা ব্যাখ্যা করেছেন। “দোতলা থেকে লাফ দিয়ে পা-ভেঙে জ্যোতির্ময় দত্ত বালিগঞ্জ থেকে পালিয়ে বারাকপুরের সাহেবকুঠির আস্তাবলে লুকিয়েছিলেন”- তখন জানতে পেরেছেন কেউ? গৌরকিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্ত, জ্যোতির্ময় দত্তরা তো ছিলেন খবরের রান্নাঘর। তাঁরাও কি ব্যক্তি প্রচারে জাহির করে কিছু বলেছিলেন? তাঁদের সকলেরই একটা অবস্থান ছিল, যা সাংবাদিকতার নৈতিকতা নির্মাণে সহায়তা করে।

“দোতলা থেকে লাফ দিয়ে পা-ভেঙে জ্যোতির্ময় দত্ত বালিগঞ্জ থেকে পালিয়ে বারাকপুরের সাহেবকুঠির আস্তাবলে লুকিয়েছিলেন”- তখন জানতে পেরেছেন কেউ? গৌরকিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্ত, জ্যোতির্ময় দত্তরা তো ছিলেন খবরের রান্নাঘর। তাঁরাও কি ব্যক্তি প্রচারে জাহির করে কিছু বলেছিলেন? তাঁদের সকলেরই একটা অবস্থান ছিল, যা সাংবাদিকতার নৈতিকতা নির্মাণে সহায়তা করে।

আজ সেই নৈতিকতা মেনে চলা সাংবাদিক খুন হয়ে যান। খবরের সেই রান্নাঘরটাও আজ এক্কেবারে উদোম অবস্থায় দাঁড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রটি তাই আরও ঢের ঢের বিপদসঙ্কুল, কতো চোরা ঢেউ আজ সেখানে। তাই সাংবাদিক খুন হয়ে গেলেও গণতন্ত্রের এই স্তম্ভ আজ শাসকের বিজ্ঞাপন জালে আচ্ছন্ন থাকে। বাণিজ্যিক স্বার্থে ‘হাউস’তাই থাকতে চাইছে। ‘ঘোষিত জরুরি অবস্থা’র ‘মিসা’ আইন, আজকের ‘অঘোষিত জরুরী অবস্থা’য় তাই দেশদ্রোহিতার ইউএপিএ-র মত ভয়ঙ্কর আইনে কার্যকরী হচ্ছে। হতে পারছে। শাসক আজ বিরোধীদের কন্ঠরোধে শুধু গ্রেফতারী নয়, প্রতিবাদীকে আজ সহ্য করতে হচ্ছে অনেক নির্যাতন।

‘অঘোষিত জরুরী অবস্থা’র আসল গল্প এখন মহামারী আক্রান্ত। এই অতিমারী যে শাসকশ্রেণিরই সৃষ্টি, শাসক যে এটাকেই হাতিয়ার করে মানুষের ওপর তাদের শোষণ ও দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে – সেই সচেতন ধ্বনি, গণমাধ্যমের প্রতিধ্বনিতে আজ অনুরণিত হচ্ছে না। ভারভারা রাওয়েরা তাই এখন কারাগারের অন্ধকার সেলে শাসকের সর্বগ্রাসী আধিপত্যর কাব্যগ্রন্থ রচনা করছেন। আর সেই কারাকক্ষের বাইরে আমরা অতিমারীর মৃত্যু-মতাদর্শে যাপন করছি এক জীবন্মৃত অবস্থা। যদিও আমরা জানি ইন্দিরার জরুরি অবস্থার মিসা, আজকের দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা ইউএপিএ-র তুলনায় কত নিরীহ।

‘অঘোষিত জরুরী অবস্থা’র আসল গল্প এখন মহামারী আক্রান্ত। এই অতিমারী যে শাসকশ্রেণিরই সৃষ্টি, শাসক যে এটাকেই হাতিয়ার করে মানুষের ওপর তাদের শোষণ ও দমন-পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে – সেই সচেতন ধ্বনি, গণমাধ্যমের প্রতিধ্বনিতে আজ অনুরণিত হচ্ছে না।

“আজকের দিনেই গণতন্ত্রকে খুন করেছিল কংগ্রেস,” জরুরি অবস্থার ৪৬ বছরে ট্যুইট করছেন অমিত শাহ। খুব ভালো। কিন্তু তিনি নিজে দায়িত্ব নিয়ে দেশকে বর্তমানে যে এক অঘোষিত জরুরি অবস্থার পরিস্থিতিতে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, সেই কথা কে বলবে? তাঁর ও মোদীজির নেতৃত্বে চলা কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যে সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করছে, সেই অনুভূতির কথা কীভাবে জানানো যাবে? যে কোন প্রতিবাদ-আন্দোলনের উপর দমন-পীড়ন, কালাকানুন জারি করা হচ্ছে, তার মোকাবিলাই বা কীভাবে করা হবে? কেন এতদিন ধরে দিল্লীর বুকে কৃষক আন্দোলন সহ জনগণের বেশ কিছু লড়াই আন্দোলনের মূল কথাগুলো শাসকের কানে ঢুকছে না?

নিশ্চিতভাবে ভারতীয় রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটা কালো অধ্যায় সেদিনের সেই “ঘোষিত জরুরী অবস্থা।” কিন্তু আজকের এই “অঘোষিত জরুরি অবস্থা!” – সে তো আরও দীর্ঘ। কয়েকটা ২১ সপ্তাহ আমরা পার করে চলেছি। আজও কৃষক কৃষি বাঁচাতে, গণতন্ত্র বাঁচাতে খোলা আকাশের নীচে, রাস্তায় অভুক্ত অবস্থায় বসে আছে। পরিযায়ী শ্রমিক এখন কর্মস্থল থেকে হেঁটে কয়েক হাজার মাইল দূরের গ্রাম-ঘরে ফেরেন। রাষ্ট্র অথবা সরকার নামের কেউ তার জীবনের কোন দায়িত্বই নেয় না, যখন সে রাস্তায় সন্তান প্রসব করে। দেশবাসীকে কর্পোরেটদের গোলামে পরিণত করার চক্রান্ত বিরোধী কন্ঠ কারাগারে নিক্ষেপিত হয়। নয়া-কোম্পানীরাজ কায়েম করে শিল্প-কৃষি-শিক্ষা ব্যবস্থাকে বেচে খাওয়ার উদ্যোগ মহামারী আইনে রক্ষিত হয়। চুক্তি চাষের মধ্য দিয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে ধ্বংস করার পদক্ষেপ প্রশস্ত হয়।

নিশ্চিতভাবে ভারতীয় রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটা কালো অধ্যায় সেদিনের সেই “ঘোষিত জরুরী অবস্থা।” কিন্তু আজকের এই “অঘোষিত জরুরি অবস্থা!” – সে তো আরও দীর্ঘ।

এই অঘোষিত জরুরী অবস্থায় প্রতিবাদহীনভাবে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন তুলে দিয়ে দেশে কালোবাজারী, মজুতদারীকে বৈধ করা হয়। কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র অভুক্ত থাকে, করোনার মৃত্যু-ভয় ও আইনি জুলুমে, সকল ন্যায্য দাবী’র সমর্থনে সমস্ত মানুষ এক হওয়ার সুযোগ অরক্ষিত থেকে যায়! ফসলের ন্যূনতম সংগ্রহমূল্য থাকার আইন চালু হয় না, কিন্তু এই অঘোষিত জরুরী অবস্থায় কর্পোরেটের বিরুদ্ধে কৃষক আইনি সহয়তা পাবে না তা আইনে বলে রাখতে শাসক ভোলে না। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য, সার-বীজ-বিদ্যুৎকর সহ সকল বেঁচে থাকার উপাদান এখানে ব্যয়বহুল হতে থাকলেও মৃত্যু পরোয়ানা খুব সস্তা হয়ে যায়! গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থা অদৃশ্য হতে সময় নেয় না। এটাই আজকের অঘোষিত জরুরী অবস্থায় একটা অন্যোন্য বৈশিষ্ট্য।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অথবা পরার্থবাদী কাজে তাই এখন দুর্নীতি বাসা বাঁধতে পারে। শাসক সহজেই ভুয়ো রাজনীতিতে ভুয়ো আন্দোলন গড়তে তুলতে সফল হন। আজকের অঘোষিত জরুরী অবস্থার সেই জৈব-রাজনীতির আস্ফালনে তাই সহজেই বিভ্রান্ত হন জনগণ। আয়েন্দেরা জন্মদিনের অস্ফুট স্মরণ-উচ্চারণে মিলিয়ে যান। অনুমতি সাপেক্ষের গণতান্ত্রিক পরিসরে জনসমাজ পরিমিততে অভ্যস্ত হতে থাকে। গণতন্ত্রের সঙ্গে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থানের যোগসূত্র খুঁজে পেতে তাদের অসুবিধা হয়। এও হল এক মোড়কের রাজনীতি, মড়ক যেখানে শাসকের প্রধান হাতিয়ার। জনমানস এখানে দণ্ডিত হয়েই জীবনের নির্বাক শোভাযাত্রায় সামিল হয়। মরণের প্রাতিষ্ঠানিক ক্রম এখানে হয়ে ওঠে ধর্মশালার বেসরকারী পরিসর।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in