Ukraine Crisis: ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কি বিশ্ব ব্যবস্থায় নতুন ক্ষমতা শৃংখলার ইঙ্গিত দিচ্ছে?

ঠান্ডা যুদ্ধ, মেরুকৃত বিশ্ব-রাজনীতি, নব্বইয়ের পর বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের দখলদারি, পরিবেশের ক্ষয়ে কার্বন নিষ্ক্রমণ অবদান, ইত্যাদি বিশ্ব-ক্ষমতা-শৃঙ্খলাকে একমেরুকরণে চিহ্নিত করে।
প্রতীকী
প্রতীকীগ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

এই আলোচনা আমরা বহুভাবে করতে পারি। রুশদেশের উপকথা, ইউক্রেনের লোককথা দিয়ে সেই আলোচনা শুরু করা যেতেই পারে। এখানে মূলত বিশ্বব্যবস্থা তত্ত্বের দুর্বলতা এড়িয়ে যে প্রাসঙ্গিক দিকগুলি আজ সবচেয়ে বেশী আলোচিত হচ্ছে সেগুলিকেই দেখতে চাওয়া হয়েছে। ক্ষমতাসীন থাকার খেলায় কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্কের বিন্যাস প্রসঙ্গে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের অবস্থান কিভাবে সরে সরে যায়, সেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবী তার অভিজ্ঞতায় দেখেছে। ঠান্ডা যুদ্ধ, মেরুকৃত বিশ্ব-রাজনীতি, নব্বইয়ের পর বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক সম্পদের দখলদারি, পরিবেশের ক্ষয়ে কার্বন নিষ্ক্রমণ অবদান, ইত্যাদি বিশ্ব-ক্ষমতা-শৃঙ্খলাকে একমেরুকরণে চিহ্নিত করে। মহামারী, বিশ্ব অর্থনীতির ওঠাপড়া, সাইবার স্পেস দখলদারি, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পালাবদল, ইত্যাদি সেই একমেরুকরণকে প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করাচ্ছে।

করোনাকালে স্বাস্থ্য-ব্যবস্থায় বিপর্যয়, অর্থনীতিতে ভাঙন, আফগানিস্তানের পালাবদল, চীন এবং রাশিয়ার কিছুটা পাশাপাশি অবস্থান, সেই ক্ষমতা শৃংখলার অভ্যন্তরীণ বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। গণতন্ত্রপ্রিয় শান্তিকামী মানুষ পূর্বের মতো আজও যুদ্ধের বিরুদ্ধে। যে-কোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। এমনকি ব্যাক্তিস্তরে ঘটা দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের সমবেত প্রতিবাদ ইতিহাস কাল ধরে চলে আসছে। এই রচনার উদ্দেশ্য এটা নয় যে যুদ্ধকে সমর্থন করা। যুদ্ধ সকল ক্ষেত্রেই যে মানব অধিকার লংঘন করে, মানবতাকে ভুলুন্ঠিত করে, সেটা আমাদের কারুর অজানা কথা নয়।

সেই যুদ্ধ-বিরোধী বিশ্বজনীন মূল্যবোধের সাক্ষী হয়ে ইজরায়েলের নেতারাও দখলীকৃত প্যালেস্টাইনের মাটিতে দাঁড়িয়ে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের বিরোধিতা করেছে। আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর সকল ন্যাওটারা সেই সুরে সুর মিলিয়ে যুদ্ধের জন্য রাশিয়াকে তীব্র ভর্ৎসনা করেও সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, সোমালিয়ায় রক্ত ঝরানো বন্ধ করেন না।

সেই যুদ্ধ-বিরোধী বিশ্বজনীন মূল্যবোধের সাক্ষী হয়ে ইজরায়েলের নেতারাও দখলীকৃত প্যালেস্টাইনের মাটিতে দাঁড়িয়ে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের বিরোধিতা করেছে। আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর সকল ন্যাওটারা সেই সুরে সুর মিলিয়ে যুদ্ধের জন্য রাশিয়াকে তীব্র ভর্ৎসনা করেও সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, সোমালিয়ায় রক্ত ঝরানো বন্ধ করেন না। ফ্রান্স তো আবার একটু এগিয়ে পুতিনকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে ন্যাটোর হাতে পারমাণবিক অস্ত্র আছে। দৈনিক পত্রপত্রিকার কয়েকটিতে দেখলাম হেডলাইন হয়েছে যে আফগান তালিবানরাও এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে।

যুদ্ধ একটি রাজনৈতিক বিষয়। তার অর্থনীতি, জনজীবনে প্রভাব, জনসংখ্যা বিন্যাসে পরিবর্তন, সর্বোপরি নাগরিক মনে যুদ্ধ যে একটা সর্বগ্রাসী ভয়ঙ্কর ছবি আঁকে, তাতে যুদ্ধ কখনোই সমর্থন যোগ্য হতে পারে না। সেটা যেই শুরু করুক না কেন। আবার তাকে শুধু ধিক্কার জানিয়ে চানঘরে গান গাওয়া যায় না, বিষয়ের অভ্যন্তরে ঢুকতে হয়।

এখানে তিনটি বিষয় প্রশ্নাকারে প্রথমেই উঠে আসতে পারে- ১) কীভাবে স্বাধীনতার প্রথম দিকে ইউক্রেন তার আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্য রাশিয়া এবং রোমানিয়ার হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল? ২) কীভাবে এটি তার পশ্চিম প্রতিবেশীদের সঙ্গে, বিশেষ করে মধ্য ইউরোপীয় উপ-আঞ্চলিক এবং ইউরোপীয় আঞ্চলিক শক্তির দিকে ঘনিষ্ঠ হওয়ার উপায় হিসাবে সুসম্পর্ক স্থাপনের কৌশলে অগ্রগতি ঘটিয়েছিল? এবং ৩) পশ্চিমী শক্তিধর দেশগুলির সঙ্গে তার অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের নিছক প্রশস্ততা ও গভীরতা একটি বৈদেশিক এবং নিরাপত্তা নীতি তৈরিতে তাকে সাহায্য করলেও সেটা কীভাবে পূর্ব এবং পশ্চিমের প্রতিযোগী শক্তিকে আজ নতুন করে ভারসাম্যহীন করার চেষ্টা করে?

রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘর্ষের প্রেক্ষাপট অনেক পুরনো। এক কথায়, এই সংঘাত দীর্ঘদিনের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিসরে ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ান জার সাম্রাজ্যের পতনের পর, ইউক্রেনের ঘটনাগুলি সোভিয়েতের মতো একই গতিপথ নেয়নি। কিয়েভে একটি স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল, অক্টোবর বিপ্লবের সমতুল্য কোন ঘটনা সেখানে ঘটেনি। ১৯১৮ সালের জানুয়ারিতে বলশেভিকরা উত্তর থেকে আক্রমণ করলে, ইউক্রেনীয় সরকার স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯১৮ সালের এপ্রিলে, হেটম্যান পাভলো স্কোরোপ্যাডস্কি জার্মানরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং নভেম্বর পর্যন্ত শাসন করেছিলেন। যুদ্ধের শেষে জার্মানী সৈন্য প্রত্যাহার করলে, একটি জনপ্রিয় বিপ্লব ইউক্রেনীয় গণপ্রজাতন্ত্র (ইউএনআর) পুনরুদ্ধার করে এবং একই সাথে বলশেভিকদের তাড়িয়ে দেয়। ইউক্রেনে বলশেভিক শাসনকে সুরক্ষিত করতে ১৯১৯ এবং ১৯২০ সালে উত্তর থেকে আরও দুটি আক্রমণ করা হয়েছিল। এটি ঘটেছে কারণ ইউক্রেনীয় জনগণকে ভাষাগত, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকার সহ স্ব-শাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হিসেবে ইউক্রেনের নাম হয় ইউক্রেনিয়ান সোভিয়েত সোশালিস্ট রিপাবলিক।

১৯১৯ সালের জানুয়ারিতে উদ্বোধনের পর থেকে জুলাই, ১৯২৩ পর্যন্ত ইউক্রেনীয় এসএসআর-এর কাউন্সিল অফ পিপলস কমিসারের চেয়ারম্যান হিসাবে ক্রিস্টিয়ান রাকোভস্কি দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমে তিনি রাশিয়ার সঙ্গে একটি সাধারণ প্রজাতন্ত্রে ইউক্রেনের পূর্ণ একীকরণের তীব্র সমর্থন করেন এবং ইউক্রেনীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে খারিজ করে দেন। ইউএসএসআর-এর বহুজাতি ও বহুভাষাভাষী সমন্বয়ের মধ্যে একটি স্বাধীন সোভিয়েত ইউক্রেনের অগ্রগণ্য সমর্থকদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি। তিনি বোরোটবিস্টদের ইউক্রেনীয় সোভিয়েত সরকারে নিয়ে আসেন এবং ইউক্রেনীয় ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দেন। ১৯২০ সালে তিনি দেখেন যে ইউক্রেনীয় কর্মীদের ছাড়া বলশেভিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এর জন্য “আমাদের কাজ হল ইউক্রেনীয় ভাষাকে আমাদের অস্ত্র করা।” তবে তিনের দশকের প্রথম থেকেই যখন স্পষ্টভাবে “আমরা কি রাশিয়ার সাথে পুনর্মিলনের জন্য নাকি একটি স্বাধীন ইউক্রেনের জন্য লড়াই করছি?” –এই প্রশ্ন সামনে উঠে আসতে থাকে, তখন তিনি স্তালিন সহ বলশেভিকদের বিরুদ্ধাচরণ করেন এবং ১৯৩৭ সালে বন্দী হন। ১৯৪১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাঁকে মেদভেদের জঙ্গলে গুলি করে মারা হয়। ট্রটস্কির বোন ওলগাও সেই দিন খুন হন।

এরই মধ্যে অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি ও জার্মানির আশ্রিত রাষ্ট্র স্লোভাকিয়া পোল্যান্ড আক্রমণ করলে সেটা শুরু হয়। যুদ্ধ শুরুর সপ্তাহ খানেক আগে অবশ্য জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির গোপন শর্তাবলি অনুযায়ী জার্মান ও সোভিয়েতরা পূর্ব ইউরোপে নিজেদের প্রভাব বলয় নির্ধারণ করে নেয়। ১৭ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত সেনারা পোল্যান্ডে প্রবেশ করে। পোল্যান্ড কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন কেউই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। সোভিয়েত সেনারা দ্রুতগতিতে পোল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের অংশবিশেষ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। গালিৎসিয়া ও ভোলিনের অবশিষ্টাংশ জার্মানির অধীনে চলে যায়।

১৯৪০ সালের জুনে সোভিয়েত ইউনিয়ন, বেসারাবিয়া ও উত্তর বুকোভিনা অঞ্চল দু’টিকে রোমানিয়ার কাছ থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। ইউক্রেন–অধ্যুষিত উত্তর বুকোভিনা ও বেসারাবিয়ার অংশবিশেষ সোভিয়েত ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যদিকে, গালিৎসিয়া ও ভোলিনের যে অংশ জার্মানির অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, সেই অংশে জার্মানরা ইউক্রেনীয়দের সীমিত মাত্রায় ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রদান করে। কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী গ্রুপ ‘ওইউএন’ ছাড়া অন্য সব ইউক্রেনীয় রাজনৈতিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে। এই পর্বে সবচেয়ে ক্ষতির মুখোমুখি হয় ইউক্রেনের নাগরিকগণ। বিশেষ করে ইহুদি জনগণ, যারা উভয় শক্তির কাছেই শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়ে বধ্যভূমির রক্তক্ষয়ে অসহতাকেই প্রকট করেন। কিয়েভ এবং খারকিভের গোপন পুলিশ আর্কাইভ ডকুমেন্ট আজও প্রমাণ হিসেবে দেখায় যে হাজার হাজার ব্যক্তি, প্রধানত লেখক এবং ইউক্রেনীয় বুদ্ধিজীবী সদস্য, যাঁদের এই সময় হয় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, নয় সরাসরি প্রাণে মেরে ফেলা হয়েছিল৷

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউক্রেনীয়দের একাংশ, বিশেষ করে পশ্চিম ইউক্রেনের বৃহদাংশ হিটলারের নাৎসী বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছিল। তারা জার্মানদের “ত্রাতা” বিবেচনায় ভেবেছিল যে এবার তারা সোভিয়েত শাসন থেকে মুক্তি পাবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউক্রেনীয়দের একাংশ, বিশেষ করে পশ্চিম ইউক্রেনের বৃহদাংশ হিটলারের নাৎসী বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছিল। তারা জার্মানদের “ত্রাতা” বিবেচনায় ভেবেছিল যে এবার তারা সোভিয়েত শাসন থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু সেটা ঘটেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পঁয়তাল্লিশ বছর ইউক্রেন সোভিয়েতের অংশ হিসেবে খাদ্যশস্যের যোগান দিয়ে গেলেও সোভিয়েতপন্থী রুশ জনগণের বাইরে যারা জাতীয়তাবাদের পক্ষে ছিলেন, এবং যারা সোভিয়েত গোপন পুলিশের জুলুমের থেকে স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, সেই ইউক্রেনীয়দের অংশ সর্বদাই সোভিয়েতের বিরুদ্ধাচরণ করে এসেছে।

সোভিয়েতের বিপর্যয়ের পর ইউক্রেন, সেখানে মজুত থাকা সকল পারমাণবিক অস্ত্র পরিত্যাগ করে। এর বিনিময়ে তখন মস্কো ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু মিস্টার পুতিন ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি সেই প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দেন না। সে বছরই কিয়েভে এক গণবিক্ষোভ সংগঠিত হয়। “মর্যাদার বিপ্লব” নামে সেই অভ্যুত্থানের পর প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ফেডোরোভিচ ইয়ানুকোভিচ সহ ক্রেমলিন-সমর্থক সরকারের উৎখাত হলে পূর্ব ইউক্রেনে রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যুদ্ধ শুরু হয়। এর ফলে ঐ অঞ্চলের দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক ভূখন্ড দুটি ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই অঞ্চলটি ছিল খনিজ সম্পদ এবং ইস্পাত উৎপাদনের ভারী শিল্পের কেন্দ্র। এখানে কয়লারও বড় ভান্ডার মজুত আছে। এই ঘটনা ইউক্রেনের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে। ক্রিমিয়া এবং পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার সেই অপারেশন বর্ণনা করার জন্য ঐ নয়া-ঠান্ডাযুদ্ধের শুরুর সময় থেকেই “হাইব্রিড যুদ্ধ” ধারণাটি ধীরে ধীরে পছন্দের শব্দ হয়ে উঠছে।

ইউক্রেনের “অসহিষ্ণু” আচরণের হাত থেকে ডনবাস এলাকার রুশ-ভাষী মানুষকে রক্ষার নামে মস্কো ঐ অঞ্চলের বিদ্রোহীদের অর্থ, খাদ্য ও সামরিক সাহায্য পূর্ণমাত্রায় দিচ্ছে দাবি করে ইউক্রেন সহ পশ্চিমী মিডিয়ায় একযোগে প্রচার শুরু হলে রাশিয়া তা অস্বীকার করে। ইউক্রেনে তখন নতুন রাষ্ট্রপতি পেট্রো পোরোশেঙ্কো, যিনি ২০১৫ সালের ১৫ মে একটি আইনে স্বাক্ষর করেন যেখানে কমিউনিস্ট স্মৃতিস্তম্ভ (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ব্যতীত) অপসারণ এবং কমিউনিস্ট-সম্পর্কিত থিমের নামে নামকরণ করা পাবলিক স্থানগুলির নতুন নামকরণের জন্য ছয় মাসের মেয়াদ ঘোষণা করা হয়। জুলাইয়ের ২৪ তারিখ ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউক্রেনের কমিউনিস্ট পার্টি, ইউক্রেনের কমিউনিস্ট পার্টি (নবায়িত) এবং কমিউনিস্ট পার্টি অফ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পিজেন্ট-এর সদস্যদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বর এই তিনটি দলকে ইউক্রেনে নিষিদ্ধ করা হয়।

জুলাইয়ের ২৪ তারিখ ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউক্রেনের কমিউনিস্ট পার্টি, ইউক্রেনের কমিউনিস্ট পার্টি (নবায়িত) এবং কমিউনিস্ট পার্টি অফ ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পিজেন্ট-এর সদস্যদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বর এই তিনটি দলকে ইউক্রেনে নিষিদ্ধ করা হয়।

এই কাজে জার্মানি ও ফ্রান্স ইউক্রেনকে সরাসরি সাহায্য করে। আমেরিকা সহ ন্যাটোর গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলির হয়ে তারা এই কাজটি করে। পশ্চিমী মিডিয়া মাও সে-তুং-এর যুক্তিকে আশ্রয় করে প্রচার করে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়েছে এবং একটি সমাজতান্ত্রিক মুখোশ বজায় রেখে সাম্রাজ্যবাদী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকছে। অন্য দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নষ্ট করছে। “কথায় সমাজতান্ত্রিক, কাজে সাম্রাজ্যবাদী” – সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কিত এই লেনিনীয় ধারণাকে তারা মিডিয়ার প্রচারে সামনে নিয়ে আসে। উত্তর-সত্য যুগে পুতিনের রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক ছাপে প্রচার পায়, যেখানে দুর্দশার সকল আঙ্গিক “সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ” হিসেবে মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। যদিও পুতিনের রাশিয়া কতটা সমাজতান্ত্রিক তা বিতর্কের বিষয়। অন্য কোন দিন সেই বিষয়ে লেখা যাবে।

নয়ের দশকের শুরুতে চেচেন জঙ্গি-আন্দোলন রাশিয়ার অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে দেয়। ১৯৯৭ সালে চেরনোমোরস্কি ফ্লোত (ফ্লিট) ভাগাভাগি করে নেওয়ার সময় রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে সীমান্তরেখা মেনে নিতে বাধ্য হয়। তখন ক্রিমিয়া ছিল ইউক্রেনের অংশ। কিন্তু তখন স্কুল পাঠ্যে রুশভাষা হয়ে যায় ব্রাত্য। তাতে ইউক্রেনে নাগরিক ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ২০০৩ সালে ইউক্রেনের তুজলা দ্বীপের কেরচেন প্রণালিতে একটা বাঁধ নির্মাণের কাজ ইউক্রেনের চাপে রাশিয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। পরের বছর নির্বাচনে কারচুপি করে ন্যাটো ভক্ত ভিক্তর ইউশেঙ্কোর জয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ইউক্রেন। এই পর্বে ২০০৬ ও ২০০৯ সালে দু’বার ইউক্রেন দিয়ে যাওয়া রাশিয়ার তেলের পাইপলাইন বন্ধ করে দেয় ইউশেঙ্কোর সরকার। ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাসের রপ্তানি বিঘ্নিত হয়। ইউক্রেনের এই পদক্ষেপ আমেরিকা ও ইউরোপের অভ্যন্তরীণ পুঁজিবাদী দ্বন্দ্বের কারসাজিতে পক্ষপাত। রাশিয়া এখন সমুদ্রের অভ্যন্তর দিয়ে আরেকটি পাইপলাইন তৈরি করছে, যা ইউক্রেনের বাইরে দিয়ে গিয়েছে। এতে ইউক্রেনের অর্থনীতি দুর্বল হয়।

বাল্টিক রাষ্ট্র সহ পূর্ব-ইউরোপের সাবেক ‘সোভিয়েত’ সাধারণতন্ত্রগুলির অধিকাংশই এখন ন্যাটোর নিয়ন্ত্রণাধীন। জার্মান, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও মার্কিন সমরাস্ত্রের ঝলকানিতে ১৯৯৭র পর থেকেই রাশিয়ার এই সীমান্ত অঞ্চল মেতে উঠছে।

এই সময়ই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে ন্যাটোর সদস্যপদ দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। সেই প্রক্রিয়া এই অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, লাতভিয়া, এস্তনিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, চেক সাধারণতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, স্লোভানিয়া সহ প্রায় ১৪টি দেশ তখন ন্যাটোর সদস্যপদ পেয়েছে। বাল্টিক রাষ্ট্র সহ পূর্ব-ইউরোপের সাবেক ‘সোভিয়েত’ সাধারণতন্ত্রগুলির অধিকাংশই এখন ন্যাটোর নিয়ন্ত্রণাধীন। জার্মান, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও মার্কিন সমরাস্ত্রের ঝলকানিতে ১৯৯৭র পর থেকেই রাশিয়ার এই সীমান্ত অঞ্চল মেতে উঠছে। প্রাকৃতিক সম্পদ সহ কৃষিজ পণ্যের জন্য এই অঞ্চল ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করার প্রয়াস অঞ্চলটিকে আরও দুর্যোগপূর্ণ করে তোলে।

পূর্ব-ইউক্রেনের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়ার স্বীকৃতি দেয়ার পর খেকেই ওই অঞ্চলে উত্তেজনা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ইউক্রেনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অভিযানে ন্যাটোর অবস্থান, স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনকে না মানা, বরং সোভিয়েতের অংশ হিসেবে সেটাকে দেখা, ইত্যাদি কারণ উঠে এসেছে। কারণ যাই থাকুক, এই আগ্রাসন নিন্দনীয়। নেপথ্যে থাকা মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ এবং ব্রিটিশ সংস্থা এম ১৬ কার্যকলাপে সতর্ক থাকতে রক্ষাকারী সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকায় রাশিয়া আজ ইউক্রেন আক্রমণ করেছে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতা গেনাডি জুগানভ মস্কোতে একটি সংবাদ সম্মেলনে এই আক্রমণকে সমর্থন করে বক্তব্য রাখলেও সারা বিশ্ব থেকে ২৬টি কমিউনিস্ট এবং ওয়ার্কার্স পার্টি ইতিমধ্যে ইউক্রেনে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে। রক্ষাকারী সাম্রাজ্যবাদও স্বাধীনতাকে সীমায়িত করে, আগ্রাসনের প্রতীক হয়।

ভারত থেকে চীন, পাকিস্তান থেকে উত্তর কোরিয়া, অনেক দেশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাশিয়ার এই আক্রমণাত্মক অবস্থানকে সমর্থন করেছে। অথবা ইউক্রেনের কান্না মোছাতে যায়নি। সবচেয়ে বড় বিষয় হল সরাসরি কোন দেশ ইউক্রেনের পক্ষ নিয়ে তার পাশে দাঁড়ায়নি। শুধুমাত্র কূটনৈতিক আলোচনায় সমাধানের পন্থা বাতলেই শক্তিধরেরা ক্ষান্ত থেকেছেন। ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি কৌতুক অভিনেতা ভলোডিমির ওলেক্সান্দ্রোভিচ জেলেনস্কির অসহায় কান্নাভেজা আবেদনে নয়া-উপনিবেশবাদী ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদ এখনও পর্যন্ত তেমনভাবে সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসেনি।

এই ব্যতিক্রমী বর্বরতা ও আগ্রাসনের সক্ষমতা তবে কি বিশ্ব ব্যবস্থায় নতুন ক্ষমতা শৃংখলার ইঙ্গিত দিচ্ছে? সেই বিন্যাস কি হিংসার জুয়া খেলা বন্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে দিতে পারবে বিশ্ববাসীকে?

এই অবস্থা আফগানিস্তানের শিক্ষা থেকে এটা স্পষ্ট করে যে ইউরেশিয়ার বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ চীন-রাশিয়ার এক্তিয়ারে চলে আসছে। এতে বিশ্বায়িত অর্থনীতি সাইবার পরিষেবার হাত ধরে আর উত্তর-দক্ষিণ নয়, বরং পূর্ব-পশ্চিমে পৃথিবীকে ভাগ করছে। তাতে বিশ্ব-ব্যবস্থা নতুন ক্ষমতা বিন্যাসে ক্রমশ মূর্ত হচ্ছে, সরে সরে যাচ্ছে পুরনো অবয়ব। এই পরিবর্তনের সাপেক্ষে বিশ্লেষকগণের অনেকেই বলছেন যে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপে রাশিয়া আলোচনার দরজা একটু খুলতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্যে একটা কথা বলার আছে। সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের বিরুদ্ধে, বিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত আছে বলে লিবিয়ায় গদ্দাফির বিরুদ্ধে জর্জ ডব্লিউ বুশের অথবা বারাক ওবামার সেই ‘আকাঙ্ক্ষার যুদ্ধে’ পুতিন বিরোধিতা করেছিলেন। ন্যাটো বাহিনী সেই সময় প্রতিপক্ষের কথা পাত্তা দেননি। আজ যদি পুতিন তেমন কোন জনমতে পিছু হটেন, তাহলে তো বলতে হয় যে এই সাম্রাজ্যবাদী রূপ প্রচলিতের সমরূপী নয়। এই ব্যতিক্রমী বর্বরতা ও আগ্রাসনের সক্ষমতা তবে কি বিশ্ব ব্যবস্থায় নতুন ক্ষমতা শৃংখলার ইঙ্গিত দিচ্ছে? সেই বিন্যাস কি হিংসার জুয়া খেলা বন্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে দিতে পারবে বিশ্ববাসীকে? নাকি পুতিন যে রক্ষাকারী সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্যগুলিকে স্পষ্টভাবে পুনঃনিশ্চিত করেছেন তা চীনের সমন্বয়ে দুর্বলের অনিশ্চিত ভবিতব্যকেই নিশ্চিত করবে? আমেরিকায়ন প্রক্রিয়ার অভিমুখ কি তবে এখন ইউরেশীয়করণকে নিশ্চিত করছে?

আলোচনা চলতে থাকুক।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in