Colombia: ইতিহাসের মুখে কলম্বিয়া, উল্কাবেগে বাম উত্থান, জনমত সমীক্ষায় এগিয়ে প্রাক্তন গেরিলা নেতা

ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র এই দেশটিতে কোনোদিন কোনো বাম সরকার ক্ষমতায় আসেনি। কিন্তু ২০২২-এর মার্চ মাসের কলম্বিয়ার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অপেক্ষা করছিল নতুন চমক।
Colombia: ইতিহাসের মুখে কলম্বিয়া, উল্কাবেগে বাম উত্থান, জনমত সমীক্ষায় এগিয়ে প্রাক্তন গেরিলা নেতা
গুস্তাভো পেত্রো - বাম জোটের প্রার্থীগ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

৯০-এর দশক থেকে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বামপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, চিলে, পেরু, উরুগুয়ে কম বেশি সব দেশেই বাম বা মধ্য-বাম সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এর ব্যতিক্রম ছিল কলম্বিয়া।

ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র এই দেশটিতে কোনোদিন কোনো বাম সরকার ক্ষমতায় আসেনি। কিন্তু ২০২২-এর মার্চ মাসের কলম্বিয়ার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অপেক্ষা করছিল নতুন চমক। ফল ঘোষণা হতেই দেখা বাম জোট ‘প্যাক্টো হিস্টোরিকো’ বা ‘হিস্টোরিক প্যাক্ট’ ১৬.৭৮ শতাংশ ভোট আর ২৭ টি আসন লাভ করে ভোট শতাংশের বিচারে প্রথম এবং আসন সংখ্যার বিচারে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে।

পরে আরও কয়েকটি বাম দল যারা পৃথক ভাবে লড়াই করেছিল এবং সদ্য সশস্ত্র রাজনীতি ছেড়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে যোগদান করা F.A.R.C-এর রাজনৈতিক দল ‘Comunes’ এই জোটে যোগদান করলে জোটের আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৪, অর্থাৎ আসন সংখ্যার বিচারেও তারা কলম্বিয়ায় প্রথম স্থানে উঠে আসে।

কলম্বিয়ার রাজনীতিতে বামপন্থীরা দীর্ঘকাল সংসদীয় রাজনীতির পথ পরিহার করেছিলেন। এখানে M-19 বা F.A.R.C-এর মতো দলগুলি সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টাই করে এসেছে দীর্ঘকাল এবং সেই প্রচেষ্টা বিশেষ ফলপ্রসূ হয়নি। উপরন্তু মার্কিন সমর্থনে কলম্বিয়ান সরকার সেনাবাহিনী এবং অতি-দক্ষিণ বেসরকারী আধা-সামরিক বাহিনীর সহায়তায় সাফল্যের সঙ্গে বিপ্লব প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। একের পর এক বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নিস্ট, সমাজকর্মী, বুদ্ধিজীবী খুন হয়েছেন। এই পথ সঠিক পথ নয়, তা উপলব্ধি করে নব্বই-এর দশক থেকে গেরিলা বাহিনীগুলি অস্ত্র পরিত্যাগ করে সংসদীয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন, যদিও তাতে বাম নেতা কর্মীদের রাজনৈতিক হত্যার সুমহান ঐতিহ্যের কোনো ছেদ হয় নি।

১৯৯০ সালে M-19 সংসদীয় রাজনীতিতে ফেরত এলে দলের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সময়ই রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ও দলের নেতা কার্লোস পিজারো গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন। এই ২০২২ সালেও এখনও অবধি ৪৮ জন বামপন্থী কর্মী সমর্থক রাজনৈতিক হত্যার শিকার হয়েছেন। এইবারের বাম জোটের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হয়েছেন গুস্তাভো পেত্রো, তিনিও প্রাক্তন M-19 গেরিলা। গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টা থেকে তিনিও রেহাই পাননি। প্রচেষ্টা সফল না হলেও তিনি এবং তাঁর রানিং মেট, ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী পরিবেশকর্মী ফ্রান্সিয়া মার্কেজ দুজনের কেউই বিপদমুক্ত নন, যে কোনো মুহূর্তে তাঁদের প্রাণ সংশয় হতে পারে।

এই প্রবল প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েও সব যদি ঠিক থাকে, তাহলে আজকের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেই বাম জোট ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছে। প্রথম রাউন্ডে সরাসরি জয় না পেলেও এখনও অবধি সব জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী পেত্রো-মার্কেজ জুটি সবথেকে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট-ভাইসপ্রেসিডেন্ট প্রার্থী। দ্বিতীয় রাউন্ডে তাঁদের জেতার সম্ভাবনা প্রবল। জয়লাভ করলে পেত্রো দেশের দেশের ৪০০০ জন ধনকুবেরের উপর বিশেষ কর বসিয়ে সেই অর্থে বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প চালু করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া কলম্বিয়াকে তেল ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদনের দিকে নিয়ে আসবেন বলেও তিনি কথা দিয়েছেন।

পেত্রো ঘোষণা করেছেন, বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদারি তিনি জিতলে কলম্বিয়া আর করবে না। ল্যাটিন আমেরিকার বাকি বামপন্থী সরকারগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলারও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলা বাহুল্য, অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে এই সকল প্রস্তাব পেত্রোকে কলম্বিয়ার মার্কিন সমর্থক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় করেনি। কলম্বিয়ার সেনাবাহিনী যে প্রাক্তন গেরিলার রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনাকে মেনে নিতে পারছে না তা সেনাপ্রধান জেনারেল এডুয়ার্ডো জাপাতেইরোর মন্তব্যেই স্পষ্ট। পেত্রোর বিরুদ্ধে তাঁর প্রকাশ্য বিষোদ্গার সংবিধানের প্রকাশ্য লঙ্ঘন। তাই পেত্রো যদি নির্বাচনে জিতে যান, তাহলে সামরিক ক্যু-এর আশঙ্কাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

পেত্রো নিজে অবশ্য খুব চিন্তিত নন। তিনি এবং তাঁর রানিং মেট মার্কেজ দুজনেরই জন্ম নিম্নবিত্ত পরিবারে। জীবনে চলার পথ তাঁদের কাছে কোনোদিনই গোলাপ ছড়ানো ছিল না। রাজনীতিতেও রাজধানী বগোটার মেয়র হিসেবে তিনি কলম্বিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে লড়াই করেই প্রশাসন চালিয়েছেন, প্রতিটি অধিকার প্রতিটি দাবী লড়াই করেই আদায় করতে হয়েছে। এইরকম প্রতিকূল স্রোতের বিরুদ্ধে তিনি সাঁতার দিতে অভ্যস্ত।

গেরিলা হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতার জন্য কলম্বিয়ার গ্রামাঞ্চলকে তিনি হাতের তালুর মতো চেনেন। একসময় সশস্ত্র সংগ্রামে যে অভিজ্ঞতা গড়ে উঠেছিল, সেই অভিজ্ঞতা তিনি এখন সংসদীয় সংগ্রামে সাফল্যের সঙ্গে কাজে লাগাচ্ছেন। বহু প্রাক্তন গেরিলা গোষ্ঠীর নেতা কর্মী, পুরোনো বিবাদ ভুলে তাঁর পতাকার নিচে জড়ো হয়েছেন। পেত্রো সফল হবেন কিনা, এর উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। কিন্তু এতে সন্দেহ নেই, কলম্বিয়ার রাজনীতিতে বামেরা আর প্রান্তিক শক্তি না, পেত্রোর নেতৃত্বে তাঁরা এখন দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি। তাঁদের উপেক্ষা করা আর কারোর পক্ষে সম্ভব নয়।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in