Bangladesh: ডিসেম্বর মাস ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে; বিরোধী সমাবেশ ঠেকাতে শাসকের হরতাল

বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময় বাকি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠ দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক দল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াফাইল ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময় বাকি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠ দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক দল, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। দুই দলই ডিসেম্বর মাসকে টার্গেট করে বড় ধরনের কর্মসূচি সামনে রেখে পরস্পরকে মাঠ দখলের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। বক্তব্য পাল্টা বক্তব্য দিয়ে মাঠ গরম করছে, কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক জনসমাগমের প্রতিও জোর দিচ্ছে দল দুটি। পাশপাশি গত কয়েক বছরের তুলনায় দু'দলই রাজনৈতিক সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচির পরিমাণও বাড়িয়েছে।

এদিকে বিরোধী দল বিএনপির বিভাগীয় পর্যায়ে গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে পরিবহন ধর্মঘট ডাকছে বাসমালিক সমিতি। সরকার দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই ধর্মঘটের পেছনে তাদের কোনো হাত নেই। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা হরতাল দিচ্ছে।

তবে বিরোধী দল বিএনপির দাবি সরকারের নির্দেশেই পরিবহন বন্ধ করে হরতাল দিচ্ছে বাসমালিক সমিতি।

রাজনীতির মাঠে দলীয় শক্তির জানান দিতে সমাবেশে লোকসমাগম করা নিয়েও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিরোধী দল বিএনপি ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।

গত ২২ অক্টোবর খুলনায় বিএনপির সমাবেশে ব্যাপক লোকসমাগম করে বিএনপি। সমাবেশে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, 'বিএনপির সমাবেশে জনসমুদ্র দেখে সরকারের কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে গেছে।'

এরপরই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও ব্যাপক লোকসমাগমের কথা বলে আসছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। শুক্রবার ২৮ অক্টোবর নিজ বাসবভনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিবকে উদ্দেশ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, 'জনসমাগম কাকে বলে তা আগামীকাল ২৯ অক্টোবর থেকে বিএনপিকে বুঝিয়ে দেয়া হবে।'

বিএনপির সমাবেশ দেখেই সরকারের কাঁপা-কাঁপি শুরু হয়ে গেছে, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন বক্তব্যের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, 'এখানে সরকারের কাঁপা-কাঁপির কী আছে? কোনো কোনো সমাবেশে দশ লাখের টার্গেট করেও এক লাখ হয়নি। আবার কোথাও পাঁচ লাখ টার্গেট করেও এক লাখেরও অর্ধেক হয়নি। এটাই তো বিএনপির সমাবেশের চেহারা।'

ডিসেম্বরে দুই দলের মাঠ দখলের ঘোষণা:

দু'দলের পক্ষ থেকেই ডিসেম্বর মাসকে টার্গেট করে পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে। গত ৮ অক্টোবর রাজধানীতে ঢাকা রিপোর্টাস উইনিটিতে (ডিআরইউ) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখার সময় বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও দলের ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান বলেন, 'আগামী ১০ ডিসেম্বরের পরে বাংলাদেশ চলবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কথায়। এর বাইরে দেশ চলবে না কারো কথায়।'

সেই বক্তব্যে আমান উল্লাহ দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে ১০ ডিসেম্বরকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা অবরোধের প্রস্তুতি গ্রহণ করার নির্দশে দিয়ে বলেন, 'টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া- সারা বাংলাদেশ বন্ধ করে দেবেন। এই বাংলাদেশ চলবে না। প্রয়োজনে আমরা শহীদ হবো কিন্তু বাংলাদেশে শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়। এই সরকারের বিদায় ঘটিয়ে আমরা ঘরে ফিরবো।'

পরবর্তীতে আমানের এমন বক্তব্যের সমর্থনে কথা বলেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন নেতা।

বিএনপি নেতাদের এমন ডেড লাইনের হুঁশিয়ারীতে আওয়ামী লীগও বেশ নড়েচড়ে বসেছে। লীগ নেতারা বলছেন, ১০ ডিসেম্বরে বিএনপিকে ঘরে বন্দী করে রাখা হবে।

গত ১৫ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের অর্ন্তগত পল্টন থানার আওয়ামী লীগের এক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, ‌'১০ ডিসেম্বর রাজপথে নামা তো দূরের কথা, বিএনপি নেতারা বাসা থেকেই বের হবেন না। তারা সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিজয়ের মাসকে কলঙ্কিত করতে চাইছে। কিন্তু জনগণের প্রতিরোধে তাদের সে খায়েশ পূরণ হবে না।'

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আগামী ডিসেম্বরে যে কোনভাবে বিএনপিকে প্রতিহত করার ঘোষণাও দেয়া হচ্ছে। গত ২৩ অক্টোবর ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দলটি সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, 'রাজপথে সব মোকাবিলা হবে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে খেলা হবে।'

এদিকে আগামী ১১ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন আওয়ামী যুবলীগ। মহাসমাবেশে উপস্থিতি থাকবেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সমাবেশকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ সংখ্যক জনসমাগম করতে চায় যুবলীগ।

যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ তার এক বক্তব্যে বলেন, '১১ নভেম্বর সমাবেশ থেকে বুঝিয়ে দেয়া হবে রাজপথ কাদের দখলে। মহাসমাবেশ থেকে বিএনপিকে বুঝিয়ে দেয়া হবে যুবলীগের শক্তি কতোটা মজবুত।' রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের এখনই সময় বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সভায় আগামী ২৪ ডিসেম্বর দলটির ২২তম জাতীয় সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ঘোষণা এসেছে। জাতীয় সম্মেলন ঘিরে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ও সহযোগী সংগঠনগুলো।

বিরোধী দল বিএনপির সমাবেশ ঠেকাতে সরকার দলের হরতাল:

জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, দলীয় কর্মসূচিতে গুলি করে নেতা-কর্মীদের হত্যার প্রতিবাদ, দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার দাবিসহ চলতি মাস থেকে দেশব্যাপী বিভাগীয় পর্যায়ে গণসমাবেশের আয়োজন করছে বিএনপি। গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম বিভাগে গণসমাবেশের আয়োজনের মাধ্যমে এই কর্মসূচি শুরু হয়। দলটির প্রায় দুই মাসব্যাপী এই কর্মসূচি শেষ হবে ১০ ডিসেম্বর ঢাকার মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে।

বিভাগীয় পর্যায়ে বিএনপির মহাসমাবেশ ঠেকাতে সরাসরি রাজপথে নেই সরকারি দল আওয়ামী লীগ। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা বাদে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনায় বিভাগীয় সমাবেশ শেষ করেছে বিএনপি। ২৯ তারিখে রংপুরেও সমাবেশ হয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর বরিশালে মহাসমাবেশ করবে বিএনপি।

তবে সরাসরি রাজপথে বিএনপিকে মোকাবিলা না করলেও বিভাগীয় সমাবেশের আগের দিন থেকে হরতাল কর্মসূচির মাধ্যমে বিরোধী দলের সমাবেশে লোক সমাগম বন্ধের কৌশলে নেমেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।

গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে কয়েকটি স্থানে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিএনপির সমাবেশগামী লোকজনকে বাধা দিলেও কোনো ধরনের পরিবহন বন্ধ করেনি। কিন্তু গত ১৫ অক্টোবর বিএনপির ময়মনসিংহ বিভাগের গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে উক্ত বিভাগের চারটি জেলার বাসমালিক সমিতি কোনো ধরণে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ১৪ তারিখ সকাল থেকে ১৫ তারিখ সন্ধ্যা পর্যন্ত ময়মনসিংহের সাথে বাস যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এরপর গত ২২ অক্টোবর খুলনার সমাবেশেও কই কৌশল নেয় আওয়ামী লীগ।

অন্যদিকে ২৯ অক্টোবর রংপুর বিভাগের বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে শুক্রবার ২৮ অক্টোবর সকাল থেকে ২৯ তারিখ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সারাদেশের সাথে সকল ধরনের গণপরিবহন বন্ধের ঘোষণা করেছিল রংপুর বিভাগের বাসমালিক সমিতি। আগামী ৫ নভেম্বর বরিশাল বিভাগের সমাবেশকে কেন্দ্র করেও ৪ নভেম্বর সকাল থেকে ৫ নভেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত হরতালের ঘোষণা দিয়েছে বরিশাল জেলার বাসমালিক সমিতি।

সমাবেশকে কেন্দ্র করে বাসমালিক শ্রমিকদের হরতালকে সমাবেশে লোক সমাগম বন্ধ করার জন্য আওয়ামী লীগের অপকৌশল বলে বিএনপির দাবি।

তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। দলের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, 'বিরোধী দল বিএনপির সভা-সমাবেশে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সরকার সৃষ্টি করছে না বরং ‘সহযোগিতা’ নিয়ে পাশে আছে।'

বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশকে কেন্দ্র করে পরিবহন ধর্মঘটের বিষয়ে কিছু করার নেই বলে জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, 'পরিবহন মালিকেরা সরকারের বিরুদ্ধেও ধর্মঘট করেন। বেসরকারি গাড়ি, মালিকেরা চালাবেন কি চালাবে না, সেটা তো আমি জোর করতে পারি না। আমার বিরুদ্ধে যখন (বাস বন্ধ করে) আন্দোলন করা হয়, তা আপনারা দেখেন না।'

তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এমন বক্তব্যের বিপরীত বক্তব্য দিয়েছেন খুলনা জেলা মটরবাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল গফফার খান। গত ২২ অক্টোবর এক টেলিভিশনে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, 'বিএনপির সমাবেশ ঘিরে বাসমালিক সমিতি কোনো হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। এটা আওয়ামী লীগের কিছু মালিক-শ্রমিক সংগঠনের কাজ।'

- লেখক পিপলস রিপোর্টারের বাংলাদেশ প্রতিনিধি

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in