Azadi 75: স্বাধীনতা মানে কি খিদে সহ্য করে বাঁচা?

অবোধের শাসনে ধিক্কার না দেওয়া, বা উদ্বাস্তু জনস্রোতে ভেসে যাওয়াই হল পরাধীনতা। পরাধীনতা মানে রক্তে রাঙা ভাইয়ের বুক বা সন্তানহারা মায়ের মুখ। পরাধীনতা এক ধরনের অনুভূতি যেখানে শেকল পরার যন্ত্রণা আছে।
ছবি প্রতীকী
ছবি প্রতীকী ছবি সৌজন্য, সঙ্কুল সোনাওয়ানের ট্যুইটার হ্যান্ডেল

ধারণার লৌহকপাট ভাঙো

খিদের পেট পরাধীন। পরাধীনতা আমার কাছে “গোপন রন্ধ্র থেকে জঠরস্থ ভ্রূণকে নির্মূল করে ফেলার এক ভয়ঙ্কর নিষিদ্ধ দাওয়াই”-এর চল। প্রতিবাদীর কন্ঠ রোধ করার এক ঘৃণ্য প্রয়াস। পরাধীনতা আমার কাছে আত্মমর্যাদাহীনতায় বেঁচে থাকা। পরাধীনতা হল আধিপত্যের মতো এক অশ্লীলতা।

পরাধীনতা হল পিঞ্জরে বন্দী ব্যক্তি-জীবন। উন্নতিরোধক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি। বল্গাহীন উৎপীড়কের বিচার সভায় নির্দোষের সাজাপ্রাপ্তি।

পরাধীনতা মানে নীতিহীনতায় আমার নির্বাক চেয়ে থাকা। সংস্কৃতির শেকড় ছেঁড়া পরিসর। এক ভয়াতুর প্রতিবেশ।

আমি মানি অবোধের শাসনে ধিক্কার না দেওয়া, অথবা উদ্বাস্তু জনস্রোতে ভেসে যাওয়াই হল পরাধীনতা। পরাধীনতা মানে রক্তে রাঙা ভাইয়ের বুক, অথবা সন্তানহারা মায়ের মুখ। পরাধীনতা আমার কাছে এক ধরনের অনুভূতি যেখানে শেকল পরার যন্ত্রণা আছে, অধীনতা আছে, আজ্ঞানুবর্তিতা আছে, আছে অনাহারক্লিষ্ট শৈশবের মর্মর প্রতিমূর্তি।

ছোট্ট একটা ঘটনার কথা বলি। একদিন দেখলাম একটা ছোট্ট গর্তকে পিল সাজিয়ে তার চারধারে ডজন খানেক কচিকাঁচার দল। তারা খেলছিল কাঁচের কিছু রঙীন বল নিয়ে।

দখলীকৃত এই দেশটার হয়তো অনেক কল্পনাকে, অনেক স্বপ্নকে “স্বাধীনতার যুদ্ধ” সহজেই মুছে দিতে পেরেছিল। কিন্তু কিছুতেই খেলাধুলো থেকে বাচ্চাদের তারা সরিয়ে রাখতে পারেনি।

বোমারু বিমানের লক্ষ্যভেদটা বেশ ভালই হয়েছিল। বোমটা ঠিক ঐ বাচ্চাদের জটলার মধ্যেই এসে পড়েছিল। লোকজনেরা তাদের ঘরদোর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছিল। আর যখন তারা ঐ বাচ্চাগুলোর ক্ষতবিক্ষত দেহাংশগুলোকে জড়ো করছিল, তখন তাদের আতঙ্কিত নিদ্রাহীন লাল চোখগুলো কোটরের গভীর থেকে আরও গভীরে বসে যাচ্ছিল। তারা সামনের ঐ স্কুলের হল ঘরটাতেই সেই লাশের পাহাড়টা গড়ে তুলেছিল, যেখান থেকে বাচ্চাগুলো প্রাণের প্রাচুর্য আর খেলার উচ্ছ্বলতা নিয়ে কিছুক্ষণ আগেই এই বেলাভূমে খেলতে এসেছিল।

এক সরকারী ফটোগ্রাফার এসেছিলেন এবং তিনি তাঁর ক্যামেরায় ঐ বীভৎসতার দলিল চিহ্নটাকে বন্দী করেছিলেন। তবে ঐ দৃশ্যের ভয়বহতা তাঁর ফটোগ্রাফির দক্ষতাকেও অকেজো করে দিয়েছিল।

জুলিয়াস ফুচিকের চোখ দিয়ে আমি আমার মতো করে এই করুণ ঘটনার সাক্ষী হলাম। আমার চেতনায় এখানে পরাধীনতার একটা বহু মাত্রিক ছবি ধরা পড়ল। আমি দেখলাম পরাধীন নাগরিকের উৎকন্ঠাপূর্ণ দৈনন্দিন জীবনধারা। পরাধীন শৈশবের লাশ হয়ে যাওয়া, অথবা জীবনের পরাকাষ্ঠায় অন্যদের বেঁচে থাকা। আমি দেখলাম পরাধীন কর্তব্য পালকের শিল্পহীন বাধ্যবাধকতা। আমি এও দেখলাম কিভাবে জনগণের স্বপ্নভঙ্গের অনুভূতি পরাধীনতার জ্বালাকে বাড়িয়ে তোলে। সে উত্তাপ বিরুদ্ধতায় শক্তি জোগায়। রক্তে ভাসে শিশুর মুখ।

পরাধীনতা ভবিতব্যের বাণী শোনালেও ভব্যতার গন্ডি মানে না। ভদ্রতার বাণী শোনায় না। নৈতিকতার তোয়াক্কা করে না। মূল্যবোধের পরিমাপ সেখানে শাসকের ইচ্ছানুসারে চলে, যা প্রকাশহীন চিন্তারাশির হানাহানিকে অনিবার্য করে তোলে। বিরুদ্ধাচরণ স্বাধীনতায় উঁকি দেয়।

স্বাধীনতা শব্দটা আক্ষরিক অর্থেই এই সব থেকে মুক্তির কথা বলে। স্বাধীনতা হয় সক্ষমতার দ্যোতক। ক্ষমতায়নের চিহ্ন। স্বাধীনতায় সুখ আছে, শান্তি আছে, আছে এক ধরনের আনন্দ। স্বাধীনতা মানে সার্বভৌমত্ব, আত্মনির্ভরশীলতা। নারী পুরুষ নির্বিশেষে এক ধরনের বৈষম্যহীন অবস্থা। বিভাজনহীন আমরা-বোধ। সকল ধরনের জুলুম থেকে নিষ্কৃতিপ্রাপ্ত এক সমাজ ব্যবস্থাকে বোঝাতে, মুক্তি অর্থে, আমরা সাধারণভাবে সেই স্বাধীনতা ধারণাটিকে ব্যবহার করি। একসঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক আর সাংস্কৃতিক মুক্তিই সেখানে কাম্য, এবং কাঙ্খিত। খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিরাপত্তাকে সবার আগে নিশ্চিত করে স্বাধীনতা।

স্বাধীনতাহীনতায় বিরোধ একটা স্বতঃসিদ্ধ সত্য। সেই লক্ষ্যেই প্রাক্-বৈজ্ঞানিক যুগে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষকে লড়াই করতে হয়েছে। অন্য কোন কৌম গোষ্ঠীর পরাধীনতা মানবে না বলেই তাকে রক্ত ক্ষয় করতে হয়েছে। অন্য জাতি, অন্য ধর্মের অধীনতা সে মেনে নিতে পারেনি বলেই বিদ্রোহী হয়েছে। অধীনতা না মেনে নেওয়াটাই মানব চরিত্র প্রসঙ্গে একটা অঙ্গীকারোক্তি, যার থেকে মরণ ভালো। তবুও মানুষ হয়েছে মানুষের কাছে পরাধীন। সে পরাধীন থাকতে বাধ্য হয়েছে। শ্রম তাকে স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছে, যখন পেট দিয়েছে পরাধীনতার গ্লানি। এই কারণেই অন্যান্য ভূখণ্ডের মতো এই ভূখণ্ডেও নানা জাতি, সম্প্রদায়, ভাষা ও আচার-বিচারের নিরিখে বাসিন্দাদের জীবনধারাও সময়ের অন্তরে অত্যন্ত জটিল হয়েছে।

অনাহারী স্বাধীনতা

গত শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে খেটে খাওয়া মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়তে থাকে। প্রথমে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও গান্ধীজীর নেতৃত্বে পরিচালিত অহিংস অসহযোগ আন্দোলন এবং পরে শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী জওহর ও আবুল কালাম আজাদদের নেতৃত্বে চলা খিলাফৎ আন্দোলন প্রত্যাহৃত হওয়ায় ব্রিটিশ বিরোধী জনরোষে যে একটা হতাশার জন্ম হয়, সেটা কাটাতেই সশস্ত্র বিপ্লবীরা একধরনের আন্দোলনের চেষ্টা করেছিলেন যেখানে কমিউনিস্টরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের সংগঠিত করলেন। “সর্বজনীন ভোটাধিকার, জমিদারি উচ্ছেদ, শ্রমিকের মজুরির হার ও কাজের সময়, সামাজিক কুপ্রথার অবসান, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, প্রেস ও বক্তব্যের স্বাধীনতা, নারী পুরুষের সমানাধিকার, সাধারণের হিতকারী সব ব্যবস্থার মালিকানার সামাজিকীকরণ” ইত্যাদি দাবির পাশাপাশি খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিরাপত্তার দাবিও ক্রমে দানা বাঁধতে থাকে।

সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়ন, ভেত্তি প্রথা, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের মর্মান্তিক দুরবস্থা, ইত্যাদি তিনের দশক জুড়েও ভারতবাসীর জীবনকে করে তোলে দুর্বিষহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসরে সেই পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে। চারের দশক শুরুর আগে থেকেই দুর্ভিক্ষের ক্ষেত্রে বাংলার সর্বনাশের রাজনৈতিক মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৩০ আগস্ট, ১৯৪৩, বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী ও রাজনীতিবিদ পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য একটি জনসাধারণের বক্তৃতায় এটিকে “রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি” হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর মতে, “এটি একটি বড় ট্র্যাজেডি যে আমাদের মতো দেশে প্রচুর খাদ্যসামগ্রী, রেলওয়ের একটি বিস্তৃত ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক উভয় সরকারের বিশাল সংস্থান, তবুও অনাহারে মৃত্যু হওয়াটা এখানে একটি রাজনৈতিক অনিবার্যতা।” ১৬ নভেম্বর, ১৯৪৩ তারিখে “টাইমস অফ ইন্ডিয়া”র বিশেষ সংবাদদাতা রিপোর্ট করেছেন: “পূর্ব বাংলায় আজ একটি ভয়াবহ কিন্তু সম্পূর্ণভাবে অস্বাভাবিক নয় এমন এক দৃশ্য হল মাঠের কোণে পরে থাকা একটি সাদা কঙ্কাল, যে মাঠ আজ অর্ধ শতাব্দী ধরে সোনার ধান ফলায়।”

বাংলার দুর্ভিক্ষ দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির একটি মৌলিক বিচ্ছেদের প্রতিনিধিত্ব করে। এই শক্তি ভারতের এমন একটি ভাবমূর্তি গঠন ও প্রচার করেছিল যেখানে এটি একটি প্রকৃতির কৌতুকপূর্ণ কোপানলের অধীনে থাকা মৃত্যু-উপত্যকা হিসেবেই চিহ্নিত হয়। একটি সমাজ হিসাবে ভারতকে তখন প্রতিপন্ন করা হয়েছিল এমন একটা জনগোষ্ঠীর আবাস হিসেবে যারা নিজেকে রক্ষা করার পক্ষে খুবই দুর্বল এবং নিয়তিবাদী। এমন শত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মানুষ সমবেতভাবে সেই আরোপিত সাম্রাজ্যবাদী প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে ফুঁসতে থাকেন, কিন্তু খাদ্যের জন্য রেশনের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মৃত্যুকে তারা সহজেই আলিঙ্গন করেন।

এই দুই দশকে স্বাধীনতা আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত বদলে যেতে থাকে। ভেজা বারুদের স্তূপে আগুন ধরায় ভারতের কৃষক কুল। তেলেঙ্গানা, তেভাগা, নকশালবাড়ি, একের পর এক আন্দোলনের পরিসর লাঙলের মালিকানায় জমির অধিকার, চাষ করার অধিকার, ফসলের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ভারতীয় কৃষক কৃষি বিপ্লবের গান বাঁধে, যা স্বাধীন ভারতকে পরবর্তীতে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভর করে। এই ভূখণ্ডে মানুষের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তার মৌলিক উপাদান যোগানে এই লড়াইগুলির অবদান তাই অস্বীকার করা হয় না।

লক্ষ মানুষের “ভুখা” পেটকে মেনে নিয়ে ভগ্ন ভারত মধ্যরাতে তার স্বাধীনতা লাভ করে। সেই স্বাধীনতার প্রাক্কালে এটি ছিল একটি খাদ্য ঘাটতির দেশ। জনগণকে খাওয়ানোর জন্য খাদ্যশস্য তখন তাকে আমদানি করতে হত। ভিক্ষার বাটি নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ যাওয়ার ঘটনাটা সেই সময় ছিল লজ্জাজনক, কিন্তু অনিবার্য। ছয়ের দশকে সেই সংকটময় পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সমস্যার দ্রুত সমাধানে আমদানীকৃত খাবার স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। পরিস্থিতিটিকে “শিপ টু মাউথ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এই ধরনের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি এড়াতে, ভারতকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে, সরকার কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। ফলস্বরূপ, উচ্চ-ফলনশীল জাত (এইচওয়াইভি) উদ্ভাবিত হয়েছিল। বীজ, সেচের পরিকল্পনা, কীটনাশক ও সারের সংমিশ্রণ দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদনে একটি উত্সাহ দিয়েছে যাকে সাধারণত “সবুজ বিপ্লব” বলা হয়। মারণ রোগ, মাটির নীচে মজুত জলের সংকট সম্পর্কিত নেতিবাচক প্রভাবের কথা বাদ দিলে, সেই খাদ্য ঘাটতির সংকট কাটিয়ে ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (এফসিআই)-এর গোডাউনগুলিতে ক্রমে খাদ্যশস্য উপচে পড়ার যে ছবি আমরা দেখি সেটা ঐ বৈপ্লবিক সাফল্যকেই তুলে ধরে। এই ইতিবাচক রূপান্তরের পথ অবশ্য মসৃণ ছিল না। যদিও আজও কেন্দ্রীয় সরকারের বদান্যতায় কৃষক তার পণ্যের জন্য উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে অক্ষম থেকে যায়। চাষা আজও চাষ করে অভুক্ত পেটে, সরকারের বদান্যতায় ভুঁড়ি মোটা কর্পোরেট সেখান থেকে মুনাফার পাহাড় লোটে।

কৃষিতে স্বজনতোষী পুঁজিবাদের বাড়বাড়ন্ত

সবুজ বিপ্লবের প্রভাব উত্তরে পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ এবং দক্ষিণে (একীভূত) অন্ধ্রপ্রদেশের মতো কয়েকটি এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। অবশিষ্ট অংশের অধিকাংশেই খাদ্যশস্য উৎপাদনে ঘাটতি ছিল। তাই কেন্দ্রীয় সরকারকে উদ্বৃত্ত রাজ্যগুলি থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করতে হয়েছিল ঘাটতি রাজ্যগুলির মধ্যে বিতরণ করার জন্য। সেই সময়ে, উদ্বৃত্ত ফসল উৎপাদনকারী রাজ্যগুলির কৃষকরা ক্রয়কে কর হিসাবে দেখেছিল কারণ ঘাটতি রাজ্যগুলিতে উচ্চ মূল্যে তাদের উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য বিক্রি করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল।

দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের কাজের মতো অনেকগুলি উদ্যোগ বন্যাকে বেঁধে ফেলে সেচের কাজে নদীগুলোকে ব্যবহার করে। এই কেন্দ্রীয় ভাবনা কৃষি পণ্য উৎপাদনে সহায়ক হয়। খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রহের বিকেন্দ্রীকরণও তখন অবশ্য করা হয়েছিল। রাজ্যের নিজস্ব প্রয়োজন মেটাতে রাজ্য সরকারগুলিকে শস্য সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এতে খাদ্যশস্য বিতরণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, কেরালা সম্পূর্ণরূপে একটি ঘাটতি রাজ্য ছিল এবং সেখানে একটি সুষম বন্টন নীতি গ্রহণ করতে হয়েছিল যা সর্বজনীন প্রকৃতির ছিল।

কেরালার মতো বেশ কিছু রাজ্য সেই সময় জোরালো পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (পিডিএস) নীতি গ্রহণ করে। পশ্চিমবঙ্গকেও সেই তালিকায় আনা যায়। সাতের দশকের শেষ দিক থেকে এই গণবন্টন ব্যবস্থার সঙ্গে বাড়তি গুরুত্ব দিয়ে ভূমি সংস্কার নীতিকে কার্যকরী করা হয়, যা ত্রিস্তরীয় স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে ছয়ের দশকের বিভীষিকাময় বাঙালি জীবনের ছবিকে দ্রুত পাল্টে দেয়।

আটের দশকে সেই সুফল বাংলার মাটিতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করে। বাংলার মতো অন্ধ্রপ্রদেশেও খাদ্যশস্য বন্টন সংক্রান্ত একটি আকর্ষণীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮০র প্রথম দিকে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার একটি উচ্চ ভর্তুকিযুক্ত চাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল যার অধীনে দরিদ্র পরিবারগুলিকে ব্যক্তি পিছু প্রতি মাসে ৫ কেজি করে (২৫ কিলোগ্রামের সর্বোচ্চ সীমা সাপেক্ষে) দু’টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া হয়েছিল। পিডিএসকে স্ট্রীমলাইন করার জন্য বিভিন্ন নীতিমূলক ব্যবস্থার বাস্তবায়ন তখন রাজ্যগুলিতে গ্রহণ করা হয়েছিল। তুলনামূলকভাবে উচ্চতর ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে উপজাতীয় ও পাহাড়ি এলাকার মানুষের কাছে খাদ্যশস্যকে সহজলভ্য করার জন্য ১৯৯২ সালে গণবন্টন ব্যবস্থায় নানা সংস্কারমূলক নীতি গ্রহণ করা হয়। এতে গরীবি কমে, কিন্তু নির্মূল হয় না।

ভারতীয় সমাজে অপুষ্টি, অনাহার থেকে যায়। সুষম আহারের নীতিকে বিদ্যালয়ের আঙিনায় নিয়ে আসার চেষ্টা হয়। প্রবীণ মানুষদের কথা ভেবে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নিঃস্বদের বিনামূল্যে ১০ কেজি খাদ্যশস্য বিতরণ করার জন্য ২০০১ সালে অন্নপূর্ণা প্রকল্প চালু করা হয়। ২০১৩ সালে পার্লামেন্টে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা আইন (এনএফএসএ) পাস হয়, যা এই এনটাইটেলমেন্টকে বৈধতা দিয়ে প্রসারিত করে। পিডিএসকে আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রে ছত্তিশগড়ের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করার মতো। রেশন কার্ডকে স্মার্ট কার্ড বানিয়ে রাজ্য সরকার রেশন কার্ডধারীর সঙ্গে ন্যায্য মূল্যের দোকানকে (এফপিএস) ডিলিঙ্ক করে দেয়। পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে এই ধরনের একটি প্রকল্প চালু করায় নানা সুবিধা-অসুবিধা নতুন করে লক্ষ্য করা যায়, তা কাটানোর চেষ্টাও হয় যখন গণবন্টন ব্যবস্থাটাকেই সঙ্কুচিত করা হতে থাকে।

অতি সম্প্রতি, ভারত সরকার ‘ওয়ান নেশন ওয়ান রেশন কার্ড’ নামে একটি প্রকল্প চালু করেছে। এটি অভিবাসী বা পরিযায়ী শ্রমিকদের তাদের কর্মস্থলের কাছাকাছি কোন ন্যায্য মূল্যের দোকান (এফপিএস) থেকে রেশন কিনতে সক্ষম করে তোলে। লকডাউন, করোনা মহামারীর পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০২১র আগস্ট মাসে এটি ৩৪টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে চালু হয়। স্কিমটির উদ্দেশ্য ভালো কিন্তু এর বাস্তবায়নে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যা সমাধান করা দরকার। এই সমস্যাগুলি অঞ্চলগত বিভিন্নতার কারণে দেখা দেয়:

• আইটেম যা ন্যায্য মূল্যের দোকান (এফপিএস)-এর মাধ্যমে প্রদান করা হয় তাতে পার্থক্য থাকা;

• রেশনের স্কেল রাজ্যভেদে পরিবর্তিত হওয়া;

• রাজ্য বিচারে ন্যায্য মূল্যের দোকান (এফপিএস)-এর মাধ্যমে বিতরণ করা আইটেমের দাম ভিন্ন থাকা।

শুধু গণবন্টন ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদী ও টেঁকসই বা ধারণশীল উন্নয়নের নিক্তিতে বাঁধলেই আমরা সকল মানুষের আহার নিশ্চিত করতে পারবো না। সামর্থ্যের মাপকাঠিতে সকল মানুষকে স্বাধীনতা ভোগের সুযোগও দিতে পারবো না। কিন্তু সেটা পেতে চাইলে ফসল উৎপাদনেও আমাদের কৃষকবন্ধু হতে হবে। কৃষি পরিবেশের অনুকূলে আমাদের ধারণশীলতাকে প্রবাহিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে শ্রীলঙ্কা সম্প্রতি প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ছাড়াই রাসায়নিক সার থেকে জৈব সারের দিকে সরে যায়। ফলস্বরূপ, জৈব সারের ঘাটতি এবং তা থেকে দেশটিকে তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।

“ন্যাশানাল এগ্রিকালচার পলিসি” ঘোষিত হয় ২০০০ সালে। ২০০২ সালে ঘোষিত হয় “লং টার্ম গ্রেইন পলিসি”, এবং ২০০৬ সালে “ন্যাশানাল কমিশন অন ফার্মার্স”। কৃষিক্ষেত্রে জৈবপ্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত ভাবনায় বায়োটেক রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার হস্তক্ষেপের পর থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কর্পোরেট পুঁজি যেভাবে আমাদের দেশেও কৃষিক্ষেত্র দখল করতে নেমেছে তাতে পরিবেশবান্ধব প্রতিটি পদক্ষেপ আজ ভুলুন্ঠিত হচ্ছে। কৃষক বোঝে যে কেন্দ্রের আনা তিনটি কৃষি বিল তার সন্তানের মঙ্গলময় ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে না, কর্পোরেটের পেট ভরায়। চুক্তি চাষ কৃষককে নিরন্ন রাখার এক বৃহৎ চক্রান্ত।

স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্ণতায় আমাদের দেশ যখন একটি খাদ্য-উদ্বৃত্ত রাষ্ট্রের দীপ্ত ঘোষণায় আইটুইউটু-এর সদস্য হচ্ছে, দেখতে হবে সেটা যেন দ্রুত একটা খাদ্য-ঘাটতির দেশে রূপান্তরিত হয়ে না যায়।

অমৃত মহোৎসবেও লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়

খাদ্য নিরাপত্তার দাবিটা দেশের ভেতর থেকেই উঠেছিল। আট শব্দের স্লোগানটা বিপুল জনপ্রিয় ছিল। পূর্ণ স্বাধীনতা লাভে খাদ্য-ঘাটতির দুর্যোগ কাটিয়ে তোলাটাই তখন আশু কর্তব্য বিবেচিত হয়েছিল। সেটা না হলে সেই স্বাধীনতা অপূর্ণ থাকে। ক্ষুধার রাজ্যে ক্ষুধা নিবারণ করাটাই তো স্বাধীনতার পদচিহ্ন। সক্ষমতার পরিচায়ক। খিদের জ্বালা নিয়ে থাকা অভ্যাসে স্বাধীনতার উপলব্ধি একটা প্রহসন। দেশের লজ্জা। ধীরে ধীরে সেটা কাটানো সম্ভব হয়েছে। শস্য উৎপাদনে ঘাটতি কাটিয়ে উঠে দেশ খাদ্যে স্বয়ম্ভর হয়েছে।

স্বাধীনতার ৭৫ বছরে, আজাদির অমৃত মহোৎসবে শামিল আপামর ভারতবাসীর দুই-তৃতীয়াংশ তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষির উপর নির্ভরশীল, এই সত্যটি নিজেই ভারতীয় কৃষিতে দুর্দশা ও সংকটের একটা লক্ষণ। উদারীকরণের রাজনৈতিক-অর্থনীতি ভারতীয় সমাজ কাঠামোর রূপান্তরকে প্রগতির পথে বয়ে নিতে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। কৃষিতে দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে, অর্ধেকেরও বেশি কৃষি পরিবার আজও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। গ্রামীণ অবকাঠামোতে জনসাধারণের বিনিয়োগের অংশ খুব কম হওয়ার কারণে ভারতীয় কৃষি ঐতিহাসিকভাবে সঙ্কট থেকে কোন দিনই খুব দূরে থাকে না।

সংকটে থাকে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা। গ্রামীণ চাহিদা আজ স্থায়ীভাবে বিপর্যস্ত; গ্রামীণ এলাকায় ক্রয়ক্ষমতারও তেমন কোনো বৃদ্ধি নেই। ভারতে গ্রামীণ বৈষম্য বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। কৃষির এই দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে শিল্প প্রবৃদ্ধিতেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সহজ সত্যটি হল যে গত শতাব্দীর আটের দশকে ভারতের কৃষি বৃদ্ধির হার গত ৩০ বছরের নয়া-উদারবাদী নীতিতে কৃষি বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি ছিল। এই সূচক তুলনা যুক্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, কারণ যে সংস্কারগুলি কৃষিতে ঘটানো হয়েছে তা যে-কোনো প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এখন কৃষি-ঋণ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের থেকে ধনী চাষি এবং কর্পোরেট মার্কা কৃষি-ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের দিকে সরানো হচ্ছে। শুধু তাই নয়, খাদ্য দ্রব্যের ওপর জিএসটি চালু করা, চাষিকে চুক্তি চাষে বাধ্য করা, খাদ্য বন্টন ব্যবস্থাকে ক্রমশ দুর্বল করে তোলাটা যখন সরকারের কাজ হয়ে দাঁড়ায়, তখন দুর্যোগ যে আসন্ন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন তো শুনি কুড়ি টাকা দিয়ে একটা জাতীয় পতাকা না কিনলে কোন রেশন মিলবে না বলে ফতোয়া জারি করেছে হরিয়ানার ডাবল-ইঞ্জিনের সরকার।

নিশ্চিতভাবেই ভারতীয় সংবিধানের অধীনে কৃষি একটি রাজ্যের বিষয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এখন নির্বাচিত রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে পরামর্শ না করেই এই অধ্যাদেশগুলিকে অনুমোদন করেছে। এটা আমাদের সংবিধানের চরম লঙ্ঘন। এমনকি যদি সংসদ এটিকে বিবেচনা করে আইন প্রণয়ন করেও, তবুও এটি অবশ্যই রাজ্য আইনসভাগুলির অনুমোদন সাপেক্ষে হতে হয়, এবং কেন্দ্রের দ্বারা একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। প্রচলিত ইলেকট্রনিক ট্রেডিংয়ের লাইসেন্সগুলি সমস্ত কৃষি পণ্যে অনুমানমূলক ফরওয়ার্ড ট্রেডিংয়ের পথ প্রশস্ত করে। এগুলি ভারতের কৃষি পণ্য বাজারে অবাধ অ্যাক্সেস করার জন্য বড় বহুজাতিক কৃষি ব্যবসা এবং দেশীয় কর্পোরেটদের প্রবেশের পথ খুলে দেয়।

দুর্নীতির রাজনীতিকরণ সংকট বাড়াতে সাহায্য করে। স্বজনতোষী পুঁজিবাদীদের হাতে দেশের খাদ্য শস্যের ভাণ্ডারটাকে এইভাবে তুলে দেওয়া, পুনরায় ভুখা পেটকে অনিবার্য করে। বুল্ডোজারের সরকার অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের যে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলি গ্রহণ করেছে সেটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণ এবং প্রাপ্যতা সংক্রান্ত সমস্ত প্রবিধানকে সরিয়ে দেয়। এই প্রস্তাবগুলি মধ্যস্বত্বভোগী এবং ব্যবসায়ীদের দ্বারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে বিরূপভাবে প্রভাবিত করার কারণে কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টির পথকেও প্রশস্ত করে।

দেশের স্বার্থে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। না হলে স্বাধীনতা লাভ করেও সেটা হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হতে পারে। খোলা চোখে জনকল্যাণে অংশ নিয়ে দেখতে হবে যেন এই “আজাদি কা অমৃত মহোৎসব” পরাধীনতার অশুভ ক্ষণ হয়ে না দাঁড়ায়। পতপত করে স্বাধীনতার পতাকা ওড়ানোর জন্য ছাদটা যেন সকলের মাথার ওপর থাকে।

শৈশবে দুর্বল পুষ্টি আজীবন কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মহামারীর কারণে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ এই বছর চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকি সীমায় রয়েছে, তবে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আরও খারাপ হবে, কারণ ইতিমধ্যেই, বিশ্বজুড়ে প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজন (পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে) তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধিতে বাধাগ্রস্ত হয়। দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেলে আরও লক্ষাধিক শিশু একই পরিণতি ভোগ করতে পারে। আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার, কারণ আমরা যা দেখেছি তার চেয়ে এটি একটি খুব ভিন্ন খাদ্য সংকট।

- লেখক ফরাক্কা এসএনএইচ কলেজের সমাজবিদ্যার অধ্যাপক, মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in