বাংলাদেশে মোদির আগমনে লাভবান আওয়ামী লীগ, হেফাজত ও বিজেপি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের কোনো উপকার হয়নি। উপকার হয়নি ভারতে জনগণের সাথে বাংলাদেশের জনগণের সম্পর্কেরও।
বাংলাদেশে মোদির আগমনে লাভবান আওয়ামী লীগ, হেফাজত ও বিজেপি
বাংলাদেশে বিক্ষোভছবি জি কে সাদিকের সৌজন্যে

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের কোনো উপকার হয়নি। উপকার হয়নি ভারতে জনগণের সাথে বাংলাদেশের জনগণের সম্পর্কেরও। মোদির সফর বাংলাদেশের জন্য নানামাত্রিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই ক্ষতির মধ্যে লাভবান হয়েছে মোদির ‘উগ্র-হিন্দুত্ববাদী’ রাজনীতির, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের এবং হেফাজতে ইসলামের।

নরেন্দ্র মোদির আগমনের বিরুদ্ধে গত ১৫ মার্চ থেকে বাংলাদেশে আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূলত বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন ইসলামপন্থী দলগুলোও প্রতিবাদ শুরু করে। এই আন্দোলনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ নেয়নি। এক পর্যায়ে ইসলামপন্থী দলগুলোও মোদি বিরোধী আন্দোলন বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এটি রাজনৈতিক দল নয়। তবে রাজনীতির মাঠে নীতি নির্ধারণী কাজে তাদের ভূমিকা মূল দলগুলোর চাইতেও বেশি। হেফাজতে ইসলাম মোদি বিরোধী আন্দোলন করলেও এক পর্যায়ে তারা সাংগঠনিকভাবে সংবাদ বিবৃতি দিয়ে আন্দোলন থেকে সরে যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ চলমান ছিল। সাধারণ মানুষের আন্দোলনের মূল ফোর্স ছিল বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ মোদি বিরোধী আন্দোলন করে আসছিল।

মোদি বিরোধী আন্দোলনের সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ ছিল স্বতঃস্ফুর্ত। তাদের বৃহৎ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না। মোদি বিরোধী আন্দোলনের মূল কারণ ছিল, গুজরাট হত্যাকাণ্ড, নাগরিকত্ব আইনের নামে ভারতে লাখ লাখ মানুষকে রাষ্ট্রপরিচয়হীন করা এবং এটাকে পুঁজি করে বাঙালি ও বাংলাদেশ বিদ্বেষের রাজনীতির প্রতিবাদ, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও গত বছর দিল্লি কিলিং, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত হত্যা, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভারতীয় ঋণের মাধ্যমে সরাসরি রাষ্ট্রীয় হস্তাক্ষেপ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তাক্ষেপের বিষয়গুলোও আন্দোলনের অন্যতম কারণ। মোদি বিরোধী আন্দোলনকারীদের বৃহৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য না থাকলেও মোদির আগমন ঘিরে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও মোদির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের বিষয়টি স্পষ্ট। এনিয়ে পরে আলোচনা করছি। তার আগে বর্তমানে আন্দোলনের পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে সেটা নিয়ে আলোচনা করা দরকার।

মোদি বিরোধী আন্দোলনের ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো সারা দেশে ও ঢাকায় পুলিশ, ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা শুরু হয়। এই হামলার সহিংসতাও ছিল লক্ষণীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস প্রকাশে মিডিয়ার সামনে আন্দোলনকারীদের কলিজা ছিঁড়ে নেয়া হুমকি দেয়। তার পরের দিন থেকে উন্মত্ত হামলা শুরু হয়। এপর্যন্ত বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ে অন্তত ৫০ জন নেতাকর্মী গুরুত্বর আহত হয়েছে। গত ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকার শাহবাগে মশাল মিছিলে ছাত্রলীগ দু’দিক থেকে হামলা চালায়।

এর আগে ২৪ মার্চে সারাদেশে অনেক স্থানে এমন ঘটনা ঘটে। যার ফলে আন্দোলনের শুরু থেকেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়। এই আন্দোলনের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গত ২৬ মার্চে। ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমে জুমার নামাজ শেষে মুসল্লিরা মোদি বিরোধী শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করলে সেখানে পুলিশ, ছাত্রলীগ-যুবলীগ যৌথভাবে তাদের উপর নির্মম হামলা চালায়। একই ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামে হাটহাজারীতে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা হচ্ছে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা। ২৬ মার্চ সেখানেও মাদ্রাসা ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল বের করলে এক পর্যায়ে পুলিশের সাথে সহিংসতায় জড়িয়ে যায় এবং সেখানে পুলিশের গুলিতে ৫ জন ছাত্র নিহত হয়। একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, মোদি বিরোধী আন্দোলন থেকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ সংবাদ সম্মেলন করে সরে গিয়েছিল। সারাদেশের মাদ্রাসা ছাত্রদের ও বাইতুল মোকাররমে মুসল্লিদের যে প্রতিবাদ সেটা ছিল নেতৃত্বহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত। চট্টগ্রামের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয় সহিংস আন্দোলন। এই ধারাবাহিকতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় মাদ্রাসা ছাত্ররা রেল স্টেশনে হামলা করে, থানায় হামলা করে এবং ঢাকার সাথে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। সেখানেও পুলিশের গুলিতে একজন ছাত্র নিহত হয়।

২৬ মার্চের হতাহতে প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলাম ২৭ মার্চ সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল করে। সেখানেও সহিংসতা হয় পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সাথে। ২৮ মার্চ ছিল সারাদেশে হরতাল। হরতালের সমর্থনে হেফাজত কর্মীরা, মাদ্রাসার ছাত্ররা এবং সাধারণ মানুষের বড় একটা অংশ রাস্তায় নেমে আসে। শুরু হয় সহিংসতা। যার ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় উস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ’র বাড়িতে আগুন দেয়। তবে এই আগুন কে দিয়েছে সেটা এখনও প্রমাণিত হয়নি। প্রাথমিকভাবে এই দায় আন্দোলনকারীদের উপর দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও পৌরসভায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। জেলা প্রেসক্লাবেও হামলা হয়েছে। সাংবাদিকদের উপরেও হামলা হচ্ছে। এসব হামলার মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। সে বিষয়ে অন্য লেখায় আলাপ দেয়া যাবে। আপাতত আপডেট জেনে রাখাই ভালো। সব শেষ খবর হচ্ছে ২৮ মার্চের পর আবারও হেফাজতে ইসলাম সারাদেশে হরতাল ঘোষণা করেছে। প্রতিবাদ যে সহিংস আকার ধারণ করেছে তাতে পরিস্থিতি খুবই ভয়ঙ্কর। এই প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নিবে সে হিসাব করাও মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশের মানুষের এমন প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও মোদিকে কেন আনতে হলো, কিম্বা মোদিই বা কেন আসলেন সেই হিসাব বুঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার আগমনে বাংলাদেশের ও দেশের মানুষের কোনো উপকার হয়নি। এমনকি ভারতীয় জনগণেরও কোনো উপকার হয়নি। মূল উপকার ভোগী হচ্ছে যৌথভাবে হেফাজতে ইসলাম ও তাদের সমমনা ইসলামপন্থী দলগুলো এবং বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ; মোদি তথা ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। এই তিনটি গ্রুপ কীভাবে উপকার ভোগী হয়েছে সেটাই এখন তুলে ধরতে চেষ্টা করবো।

২০১৮ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে কলকাতায় বাংলাদেশ ভবন উদ্ভোধন করেন এবং নরেন্দ্র মোদির সাথে এক বৈঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালে পশ্চিমে আর পূর্বে দু’দিকেই পাকিস্তান নিয়ে ঘর করতে হবে ভারতকে। তাই ভারতের উচিত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারই যাতে ক্ষমতায় ফেরে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা।’ (আনন্দবাজার : ২৬ মে, ২০১৮) শেখ হাসিনার এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে বাংলাদেশের নির্বাচনে জয়ী হতে এবং ক্ষমতায় থাকতে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য তিনি সরাসরি ভারতে সহযোগিতা চেয়েছেন। তবে কী ধরণের সহযোগিতা পেয়েছেন কিম্বা আদৌ সহযোগিতা পেয়েছে কি না সেটা ভিন্ন আলাপ।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে যে, শেখ হাসিনা স্পষ্টতই বলেছেন যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে। তার এই বক্তব্যের প্রক্ষিতে দেশে প্রতিবাদও হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে শেখ হাসিনার এমন বক্তব্যের বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। এটা স্রেফ মোদির পাকিস্তান বিরোধী রাজনীতির যে খেলা সেটাকে ব্যবহার করে নিজের দেশেও তার সহযোগিতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকা। তাই আওয়ামী লীগের জন্য শেখ হাসিনার দরকার ছিল তার বক্তব্যের সপক্ষে উপযুক্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। নরেন্দ্র মোদির আগমনে বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে সেটাকে এখন সেই কাজেই লাগানো হচ্ছে। গত ২৬ মার্চের প্রতিবাদ খবর নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা ‘মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে বিক্ষোভ বাংলাদেশে, পাক-পন্থীদের তাণ্ডব, নিহত ৪’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। আনন্দবাজার পত্রিকার এই সংবাদের কোনো ভিত্তি নেই। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীসহ বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো এই নিউজের প্রতিবাদ করে এবং পুলিশের গুলিতে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ করে বিচার দাবি করেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও প্রতিবাদ করেছে। এছাড়াও বুদ্ধিজীবি মহল থেকেও এর প্রতিবাদ করা হয়েছে। কারণ এই প্রতিবাদে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো আলাপ নেই। বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী মোদির আগমনের প্রতিবাদ ছিল। এই প্রতিবাদ প্রথমে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো শুরু করে। স্বাধীনতার সুর্বণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বাদে আর কেউ কোনো অনুষ্ঠান করতে পারেনি। ঢাকায় সব ধরণের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। সাধারণ মানুষ রাস্তায় বেরুতে পারেনি। গণপরিবহন বন্ধ থাকার ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগে পরেছিল সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বড় গেরিলা বাহিনী ছিল ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের। দুঃখজনক হচ্ছে, কমিউনিস্ট পার্টিকেও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে একটি র‌্যালী পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। এই হচ্ছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি।

চলমান আন্দোলনকে আওয়ামী লীগ তার সেই কাঙ্খিত উদ্দেশ্যে কাজে লাগাতে চাচ্ছে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেখাতে চাচ্ছে যে, এই দেখো দেশে মৌলবাদী শক্তি কীভাবে স্বাধীনতাকে নৎসাৎ করতে চাইছে। দেশ জঙ্গিতে ভরে গেছে। দেশ পাকিস্তান বানিয়ে ফেলতে চাইছে। এখন আওয়ামী লীগকে যে কোনভাবে হোক ক্ষমতায় রাখতে হবে। এই হলো আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য। ২০১৩ সালে ৫ মে হেফাজতের ইসলামের আন্দোলনের পর এমন কাজই করেছিল আওয়ামী লীগ। যার জন্যই দেশের মানুষের শক্ত বিরোধিতার মুখেও যে কোন উপায়ে মোদিকে আনার তাগিদ ছিল। ইতোমধ্যে সেটা আনন্দবাজার পত্রিকার রিপোর্টের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

অন্যদিকে হেফাজতে ইসলাম কীভাবে উপকার ভোগী হয়েছে সেটাও দেখা দরকার। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ ও হেফাজতের মধ্যে অলিখিত চুক্তি হয়ে যায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার পর হেফাজত আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানায়। হেফাজত নেতাদের সাথে আওয়ামী লীগের সখ্যতা এখন দেশের সবার জানা। হেফাজত শীর্ষ নেতা জুনায়েদ বাবুনগরী ‘আগামী ১’শ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকুক’ বলেও বক্তব্য দিয়েছেন। ২০১৭ সালে কওমী সনদের ‘ইচ্ছে মাফিক স্বীকৃতি’ দেয়ার কাজ হচ্ছে তার বড় প্রমাণ। বলতে গেলে এখন আওয়ামী লীগ হেফাজতের কোনো দাবিকেই এড়িয়ে যাচ্ছে না। বর্তমান আন্দোলনের ফলে হেফাজত তাদের শক্তি আবারও প্রদর্শন করতে পারছে আর এই শক্তির বিনিময়ে তারাও আওয়ামী লীগের কাছ থেকে আরও বাড়তি সুবিধা ভাগিয়ে নিতে পারবে এবং আওয়ামী লীগও তাদেরকে বিভিন্ন সুবিধা দিবে। যার ফলে হেফাজতে ইসলাম এই আন্দোলন থেকে সরে আসবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ মৌলবাদী রাজনীতির যে উপকার ভোগী হওয়ার চেষ্টা করছে সেটা হবে। একই সাথে পাকিপন্থী রাজনীতির যে ধুয়ো তুলা হয়েছে সেটারও বাস্তব ভিত্তি দেখাতে পারছে। এতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির। কারণ বাম গণতান্ত্রিক জোট যে বিকল্প শক্তির উত্থানের রাজনীতি শুরু করেছিল সেটাকে ইসলামপন্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে বামপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষতি করতে সমর্থ হবে।

আওয়ামী লীগ আরও যেভাবে উপকার পাবে সেটা হচ্ছে বর্তমানে বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে শক্ত আন্দোলন চলছিল। সিলেটের শাল্লায় স্থানীয় যুবলীগ নেতার নেতৃত্বে হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগ ছিল চাপে। এছাড়াও দ্রব্যমূল্যে দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। যেই আন্দোলনের নেতৃত্ব থাকতো বামপন্থী দলগুলো হাতে। এসব আন্দোলন এখন শুরু করার মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে নাই। যার ফলে আওয়ামী লীগ অনেকটাই নিরাপদ বোধ করছে।

নরেন্দ্র মোদি কীভাবে এই আন্দোলন থেকে হলো এই আলাপটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের রাজনীতিতে ‘পাকিপন্থী’ ট্যাগ ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটছে বিজেপি। অরুন্ধতী রায় সহ অনেক প্রগতিশীল লেখক ও অ্যাক্টিভিস্টদের বিজেপি বিরোধী অ্যাক্টিভিজম করার জন্য পাকিস্তানের এজেন্ট বলে ট্যাগ দেয়া হয়। নরেন্দ্র মোদি আসামে এনআরসির মাধ্যমে বাঙালি ও বাংলাদেশ বিদ্বেষী যে রাজনীতি শুরু করেছে সেটা বাংলাদেশে চলমান মোদি বিরোধী আন্দোলনের ফলে আরও পোক্ত হবে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে চলছে বিধানসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনে মাতোয়ারা সম্প্রদায় বড় ভোট ব্যাংক। বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ ও খুলনা জেলায় এই জনগোষ্ঠী মানুষের আদিবাস। মোদি তার বাংলাদেশ সফরে এই দুই জাগায় মাতোয়ারা সম্প্রদায়ের সাথে দেখা করেন। যার ফলে তারা খুব সহজেই মোদির দিকে সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে। এর প্রভাবে ওপারে এই সম্প্রদায়ের লোকজনও বিজেপির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে। যা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের নেতৃত্বে বিজেপিকে ঠেকানোর যে শক্তিশালী জোট হয়েছে সেটারও ক্ষতি হতে পারে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে মোদির আগমনে ফজিলত হচ্ছে এই। ক্ষতি বাংলাদেশের, ভারত ও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের, বামপন্থী রাজনীতির। লাভবান হেফাজত, আওয়ামী লীগ ও মোদি তথা বিজেপি।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

Related Stories

No stories found.