বাংলাদেশ - সংকটে সংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম

বাংলাদেশ - সংকটে সংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম
গ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

বাংলাদেশে ‘সংবাদমাধ্যম’র সংকটে আছে এমন প্রশ্নের দু’ধরণের জবাব মিলে। একটি সরকারি জবাব আরেকটি জনগণের জবাব। দুটি উত্তরের অবস্থান মুখোমুখি। সরকারের পক্ষ থেকে সব সময়ই দাবি করা হয় বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। আর সংবাদকর্মী, সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং জনগণের বক্তব্য হচ্ছে বাংলাদেশে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা হুমকির সম্মুখীন এবং সংবাদমাধ্যম সংকটে রয়েছে।

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের সংকট দু’ধরণের। একটি হচ্ছে, স্ব-সৃষ্ট অন্যটি আরোপিত। বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্ব-সৃষ্ট সংকটগুলোর অন্যতম হচ্ছে, সাংবাদিকতার নৈতিকতা হারিয়ে ফেলা, বিভক্ত হওয়া, পেশাদারিত্বের অভাব ও ‘অতি-পেশাদারিত্ব’ দেখানো, সংবাদ প্রকাশে পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। যার ফলে সংবাদমাধ্যমগুলো জন-আস্থার জায়গা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। এছাড়াও অধুনা কয়েকটি নতুন টার্ম ‘সংবাদ উপস্থাপনার’ ক্ষেত্রে এসেছে। যেমন ‘সত্য’ বদলে ‘বিকল্প সত্য’ উপস্থাপন করা। প্রতিষ্ঠিত বা প্রমাণিত সত্যের বিপরীতে ‘মিথ নির্ভর সত্য’ উপস্থাপন করা। মোটামুটি উপরোক্ত কারণগুলোর জন্য সংবাদমাধ্যম সমাজে যে ভূমিকা রাখার কথা সেটা রাখতে পারছে না বরং উল্টোটা করছে। একটা দেশে গণতন্ত্র যখন সংকটে পরে এবং মাঠে বিরোধী দল শূন্য হওয়ার ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের কাজগুলোর সমালোচনা হয় না; জনগণের দাবিগুলো সরকারের কাছে পৌঁছে দিতে প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা থাকে না তখন সংবাদমাধ্যম স্বাধীনভাবে জনমত প্রকাশ করে জনগণের কথাগুলো তুলে ধরে, রাষ্ট্র পরিচালনার ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়া এবং জনগণের চাওয়া সরকারের কাছে পৌঁছে দেয়ার ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধরতে রাখতে চেষ্টা ভূমিকা নেয়া উচিত। কিন্তু সংবাদমাধ্যম যখন এই ভূমিকা পালন না করে বরং উল্টোটা করে তখন গণতন্ত্রের দশা আর নাজুক হয় এবং জনগণ সাংবাদমাধ্যমের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে।

সাংবাদিকতার নৈতিকতা হারিয়ে ফেলার বিষয়টি বাংলাদেশে প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর ফলে গোটা ব্যবস্থাতেই বিশৃঙ্খল অনৈতিকতার চর্চা শুরু হয়েছে। সংবাদ পরিবেশনে আবেগ মুক্ত না হওয়ার ফলে অনেক সময় ব্যক্তির আদর্শ সংবাদে প্রভাব সৃষ্টি করে বস্তুনিষ্ঠতা নষ্ট করছে। সংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম সেখানে সাংবাদিকতার নৈতিকতা না মেনে বরং দলীয় প্রচারক ও প্রচারপত্রের ভূমিকা নিচ্ছে। জনগণ যখন বিষয়টি ধরতে পারছে যে সংবাদমাধ্যম তাদের কথা না বলে বরং তারা যেটাকে চাচ্ছে না সেটারই সাফাই গাইছে তখন তারা সংবাদমাধ্যমের বিকল্প চিন্তা করছে। যেমন বেশ কয়েক বছর থেকে সাধারণ মানুষ তথ্য জানার জন্য বা দেশের সার্বিক খোঁজ খবর নেয়ার জন্য সংবাদপত্র কিনে পড়া বা টেলিভিশনের সামনে বসার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য সাইটে বেশি নজর রাখছে। কারণ তাদের বিশ্বাস সংবাদমাধ্যম একটা ঘটনাকে যেভাবে বিভিন্ন আঙ্গিকে সাজিয়ে সময় নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে তার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মূল ঘটনা দ্রুত ও অবিকল দেখতে পারবে। বেশ কিছু আলোচিত ঘটনার দিকে দৃষ্টি দিলেই এটি স্পষ্ট হয়। সারাদেশে চলমান ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন দানাবাঁধে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের এক গৃহবধূকে স্থানীয় যুবলীগ নেতা কর্তৃক উলঙ্গ করে অকথ্য নির্যাতন এবং সে দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। নিপীড়ক ওই ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে মাস যাবত অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিল কিন্তু সাড়া না পেয়ে সেই যুবলীগ নেতা যখন ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেয় এবং সেটা সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পরে, সারাদেশে প্রতিবাদ শুরু হয় তখন স্থানীয় সংবাদকর্মীরা সেই খবর প্রকাশ করে। সাধারণ মানুষ নারী নির্যাতনের এই ঘটনা প্রথমে সংবাদমাধ্যম মারফত জানতে পারেনি তারা জেনেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ফেইসবুক থেকে। বরং সংবাদমাধ্যমগুলোও এই ঘটনা ফেইসবুক মারফত জানার পর সংবাদ প্রকাশ করেছে। ততদিনে ঘটনার ৩২ দিন পাড় হয়ে গেছে।[১] এই ঘটনায় স্পষ্ট হচ্ছে যে, সংবাদের খোঁজ করতে মফস্বল সাংবাদিকতা ব্যর্থ হয়েছে।

একইভাবে ২০১৮ সালে দেশের বড় দুটি ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। সেখানেও সংবাদমাধ্যমগুলো সঠিক তথ্য প্রকাশ করে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশে ছাত্র সমাজের বৃহৎ অংশের কাছে মূলধারার সংবাদমাধ্যম আস্থা হারিয়েছে। সেই আন্দোলনগুলোকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারাদেশের ছাত্রদের মধ্যে যে গ্রুপ তৈরি করা হয়েছিল সেই গ্রুপ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আস্থার জায়গা দখল করেছে। অথচ যে কোন ঘটনা বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জানার জন্য সংবাদমাধ্যমই হওয়ার কথা ছিল মূল আস্থার জায়গা। কিন্তু সেটা এখন অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে সেই আন্দোলন সংগঠিত শুরু হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। যখন আন্দোলনের সাথে একাত্ব হয়ে সারাদেশের কিশোর ছাত্ররা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ রাস্তায় নেমে আসতে শুরু করে তখন সংবাদমাধ্যমগুলো ফলাও করে খবর প্রকাশ করতে থাকে। সে ক্ষেত্রেও অনেক বিভ্রান্তিকর খবর প্রকাশ করে; অনেক তথ্য চেপে যায়। যেমন ঢাকার কয়েক জাগায় আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলার খবর প্রথম সারির অনেক সংবাদমাধ্যম চেপে যায়। পরে যখন সেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পরে তখন তারা সে ঘটনা নিয়ে অল্প-বিস্তর খবর প্রকাশ করে। যার ফলে জনমনে এবং কিশোর ছাত্রদের মনে সংবাদমাধ্যম নিয়ে নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হয়। তখন তারা সংবাদমাধ্যমের বিকল্প হিসেবে ফেইসবুক ও ইউটিউবকে বেছে নেয়। সংবাদমাধ্যমগুলো যখন ওই ঘটনার খবর আর এড়াতে পারছিল না তখনই ফলাও করে প্রচার করতে শুরু করে। এর আগে ২০১৮ সালের শুরু থেকে সারাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে কোটাপথা সংস্কারের দাবিতে বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তুলে। সরকারের নানা দমন-পীড়ন সত্ত্বেও বৃহৎ আন্দোলনের কারণে সরকার কোটাপ্রথায় সংস্কার আনতে বাধ্য হয়। সেই আন্দোলনের খবরও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রথম দিকে বেশি প্রচারিত হয়নি। ফেইসবুকই ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সারাদেশে সংগঠিত করার অন্যতম মাধ্যম। এমনকি দেশের প্রথম সারির কয়েকটি পত্রিকা এবং টেলিভিশন চ্যানেল আন্দোলন নিয়ে বিভ্রান্ত তথ্য দেয়। আন্দোলন নিয়ে ভুল খবর প্রচার করে আন্দোলন বাঞ্চালের চেষ্টা করে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী ও আন্দোলন নিয়ে ভূয়া খবর প্রকাশের পরে ছাত্রদের ও সাধারণ মানুষের তীব্র সমালোচনার মুখে একটি প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক পত্রিকা তাদের প্রকাশিত সংবাদ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। সেই পত্রিকাটির একটি গৌরবোজ্জ্বল অতীত রয়েছে। কিন্তু তারা কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে ভূয়া খবর প্রকাশ করেছিল কেবলই দলবাজি চিন্তা থেকে। এভাবেই জনগণের বদলে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো সাংবাদিকতার নৈতিকতাহীন হয়ে জন-আস্থা হারিয়েছে।

সাংবাদিকদের মধ্যে মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক বিভেদ সংবাদমাধ্যমের সংকটের অন্যতম একটি কারণ। স্বৈর-শাসক এরশাদের পতনের পর ১৯৯২ সালে হীন রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) বিএনপি-জামায়াতপন্থী ও আওয়ামীপন্থী সাংবাদিক পরিচয়ে বিভক্তি ঘটে। অথচ এরশাসের স্বৈর-শাসনের কবল থেকে গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করেছিল। এই বিভাজনে লাভবান হয়েছে বিএনপি-জামায়াতপন্থী ও আওয়ামীপন্থী কতিপয় সাংবাদিক নেতা; ক্ষতি হয়েছে গোটা সংবাদমাধ্যম। সাংবাদিকদের এই বিভেদ জাতীয় পর্যায়ে যেমন রয়েছে তেমনি মফস্বলেও রয়েছে। এমনও সাংবাদিক সংগঠন রয়েছে যারা সরাসরি একজন ব্যক্তির নামে বা একটি দলের নামে কিম্বা সরাসরি সেই দলের মতাদর্শ নিয়ে তৈরি হয়েছে। একপক্ষের সাংবাদিক অন্যপক্ষের নিউজের কাউন্টার দিয়ে নিজ দল বা তার মতাদর্শের পক্ষে সাফাই গেয়ে সংবাদ প্রকাশ করছেন। এখানে মূল ঘটনা কতটা অবিকৃতভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে সে বিষয় খুবই তুচ্ছ হয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষ যখন বিকল্প মাধ্যম তথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে মূল ঘটনা জানতে পারছে তখন গোটা সাংবাদিক সমাজ এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিই আস্থা হারিয়ে বীতশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। যখন একপক্ষের সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম যখন অন্যপক্ষের সাথে মিলছে না এবং তাদের মধ্যে বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে তখন ঐক্যের শক্তি আর থাকছে না। ফলে কোন সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম যখন সাহস করে বস্তুনিষ্ঠতাসহ ঘটনা তুলে আনতে চেষ্টা করছে তখন একা হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার চাপ সামলাতে না পেরে বাধ্য হয়ে নতিস্বীকার করছে। ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে ও সংবাদমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ নিয়ে ভয় কাজ করে। একা হয়ে ক্ষমতার চাপে পৃষ্ট হওয়ার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার ফটো সাংবাদিক কাজল। গত প্রায় চার মাস ধরে কারাগারে বন্দী আছেন। যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়াকে জড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি করায় গত ৯ মার্চ রাজধানীর শেরে বাংলা নগর থানায় কাজলসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন মাগুরা ১ আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শেখর। এরপর গত ১০ ও ১১ মার্চ রাজধানীর হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আরও দু’টি মামলা হয়।[২] আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাসে রাতে নিজ বাসায় খুনও হওয়া সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি। এপর্যন্ত ৭৪ বার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার তারিখ পিছিয়েছে।[৩] সাংবাদিকরা এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি।

সংবাদমাধ্যমের এই বিভেদ এবং সংবাদকর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার সুযোগ নিচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। কারোনাকালে সারাদেশে অসংখ্য সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। ঠিক কত জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। এমনকি সাংবাদিক ইউনিয়নের কাছেও সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কর্মরত বৈশ্বিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) ২৩ জুলাইয়ের হিসাব বলছে, বাংলাদেশে ১০ মার্চ থেকে ২১ মে করোনা সংক্রমণের প্রথম ৭০ দিনে সারাদেশে অন্তত ২২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা ও হামলা হয়েছে।[৪] সারাদেশে কতজন সাংবাদিক গ্রেফতার, নির্যাতন হয়েছেন, কতজন জেলে আছেন, কতজন জামিন পেয়েছেন তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। দেশে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে নির্বিচারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নির্বিচারে প্রয়োগ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিক্যাল নাইনটিনের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে সারাদেশে সাংবাদিকসহ অনেকের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হওয়া ৭১টি মামলা করা হয়েছে। ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ার পর এই আইনে ৬৩টি মামলা হয়।[৫] চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সারাদেশে এই আইনে ৪৩টি মামলা হয়েছে এবং গ্রেফতার হয়েছে ৫২ জন। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। গত তিন মাসে ১৪ জন সাংবাদিকের নামে মামলা হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে গুজব রোধের নামে ও ডিজিটাল মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তৈরি করা হয়েছিল। এই আইন যে সাংবাদিকদের টার্গেট করে এবং সরকারের সমালোচনা বন্ধ করতে প্রচলন করা হয়েছে সেটা নিয়ে শুরু থেকেই সাংবাদিকদের ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে উদ্বেগের কথা জানালো হলেও সরকারের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের হয়রানি করা হবে না বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছে। কিন্তু দিন শেষে এই আইনের মূল শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরাই। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে এই আইনে নিপীড়নের শিকার সাংবাদিকদের পাশে মিডিয়া হাউসগুলোও দাঁড়ায়নি। যখন একজন সাংবাদিক বস্তুনিষ্ঠ খবর প্রকাশের দায়ে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন এবং তার পাশে দাঁড়নোর মতো কাউকে পাননি এমনকি মিড়িয়া হাউসও পাশে দাঁড়ায়নি তখন অন্য আরেকজন সাংবাদিকের পক্ষেও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করার সাহস করা কঠিন। ফলে সংবাদের মূল উৎস মফস্বল থেকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ আসছে না। যখন বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ থাকছে না তখন জনগণের আস্থাও আর থাকছে এবং সংবাদমাধ্যম ক্রমে গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতিকে আরও প্রভাবিত করছে। এমন পরিস্থিতে যেমন সাংবাদিকতার নৈতিকতা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না তেমনি সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্বও ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে সাংবাদিকদের মধ্যে নানা বিভক্তি এবং অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্যের ফলে খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে ভিন্নমতে বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করছে। এর ফলে একদিকে যেমন সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা থাকছে না তেমনি সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য না থাকায় সহজেই তাদের এই বিভাজনের সুযোগ নিয়ে ক্ষোদ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই সাংবাদিকদের ব্যবহার করা হচ্ছে। আর সংবাদকর্মীরাও ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য বৃহৎ স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে বিভাজনের ফাঁদে পা দিচ্ছেন।

সংবাদমাধ্যমের সংকটগুলোর অন্যতম আরেকটি কারণ হচ্ছে বিকল্প সত্য উপস্থাপন করা। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিকল্প সত্য উপস্থাপনের বিষয়টি স্পষ্ট হবে। যেমন ২০১৯ সালের বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ চার ধাপ এগিয়েছে উল্লেখ করে ২০১৯ সালের ৯ জানুয়ারি বাংলাদেশে তাবৎ প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো সংবাদ প্রকাশ করে।[৬] কিন্তু বাংলাদেশ যে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে গণতান্ত্রিক দেশের তালিকাতেই নেই এই সংবাদ সবকয়টা পত্রিকা, টেলিভিশন এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো চেপে যায়। যখন ১০ জানুয়ারি বিবিসি ‘ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্সের গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় নেই বাংলাদেশ’[৭] শিরোনামে খবর প্রকাশ করে এবং সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরে তখন ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোও এই খবর প্রকাশ করে। বাংলাদেশ যেখানে গণতান্ত্রিক দেশের তালিকাতেই নেই সেখানে গণতন্ত্র সূচকে উন্নতি করেছে মর্মে সংবাদ প্রকাশের হেতু হচ্ছে ২০১৭ সালে ১৬৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৫.৪৩ পয়েন্ট পেয়ে ৯২তম ছিল। ২০১৮ সালে ১৬৭ দেশের মধ্যে ৫.৫৭ পয়েন্ট পেয়ে ৮৮তম অবস্থান লাভ করে। ব্রিটেনের দ্য ইকনোমিস্ট পত্রিকার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে ৫ থেকে ৬ পয়েন্ট প্রাপ্ত দেশগুলো হাইব্রিজ রেজিম ভুক্ত দেশ। যে দেশগুলোয় গণতান্ত্রিক শাসন নেই। বাংলাদেশ চাপর ধাপ উন্নিত কয়েছে কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় তার স্থান নেই এই সংবাদ চেপে গিয়ে চার ধাপ উন্নতির সংবাদ দেয়ার মানে হচ্ছে বর্তমান একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় দেশের তথাকথিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জোয়ারের সাথে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিরও উন্নতি হচ্ছে তাই ক্ষমতাসীন শাসক দলই উৎকৃষ্ট এই বার্তা পৌঁছানো। অথচ সংবাদমাধ্যমের দায় ছিল প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো খুব সুকৌশলে সেই তথ্য চেপে যায়। একই ঘটনা ২০২০ সালের বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকের সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও করেছে। এবারও গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশ ৮ ধাপ এগিয়েছে মর্মে সব কয়টা প্রিন্ট, ইলেকট্রিনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।[৮] কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে এবারও বাংলাদেশ হাইব্রিড রেজিম ভুক্ত দেশের তালিকাতেই রয়েছে। অনুসন্ধানী পাঠক ইচ্ছে করলেই ইন্টারনেটে সার্চ করে দ্য ইকনোমিস্ট পত্রিকা থেকে বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা দেখে আসতে পারেন।[৯] এভাবে প্রায় অধিকাংশ বৈশ্বিক জরিপ নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো বিকল্প সত্য উপস্থাপন করে। যার ফলে তারা নিজেরাই জন-আস্থা হারানোর কাজটি করছে। এই সাথে দেশে যে গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি বিরাজ করছে সেটাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে। আর এই সংকটের অন্যতম বলির শিকার সংবাদমাধ্যমগুলো।

একটি দেশে সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে ভূমিকা পালন করতে পারবে সেটা নির্ভর করে রাষ্ট্র তাকে কতটা স্বাধীন হতে দিচ্ছে সেটার উপর। কারণ শ্রেণি-বিভক্ত আধুনিক বুর্জোয়া রাষ্ট্রগুলোয় রাষ্ট্র হচ্ছে সুপ্রিম। রাষ্ট্রের এই সুপ্রিমিসি রক্ষা করে সরকার। তাই সরকার ইচ্ছে করলে রাষ্ট্রের সুপ্রিমিসি রক্ষার নামে যে কোন কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ এর ১ অনুচ্ছেদে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চয়তাদান’ করার পর উক্ত ধারা ২ অনুচ্ছেদে ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনের প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে’ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা হ্রাস করা হয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদের ২(খ) ধারায় ‘সংবাদক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল’ মর্মে অনুচ্ছেদ থাকলেও রাষ্ট্রের সুপ্রিমিসির দোহায়ে সেটার নিয়ন্ত্রিত করার জন্যও পথ খোলা রয়েছে। তাই একটি দেশে সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীনতা পাবে সেটা সম্পূর্ণই নির্ভর করে রাষ্ট্র ও সরকার কতটা স্বাধীনতা দিচ্ছে সেটার উপর। এজন্য সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশেও সব সময়ই ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’, জনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখার নামে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তাপেক্ষ করা হয়। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ, সেন্সর করা, সাংবাদিকদের নামে মামলা দেয়া, বিজ্ঞাপন কমিয়ে দিয়ে সংবাদমাধ্যমের আর্থিক ভিত্তি নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। এত সব চাপের মুখে সংবাদমাধ্যমগুলো ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ করছে। সরকারের পক্ষ থেকে চাপ, নিপীড়ন তো আছেই তার উপর বড় খগড় হচ্ছে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়া। বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়া একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে, ২০১৫ সালের ১৬ আগস্ট দেশের জনপ্রিয় দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ‘রাঙামাটির বাঘাইছড়ি: সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে পাঁচ আদিবাসী নিহত’ খবর প্রকাশের পর ১৬ আগস্ট থেকে দৈনিক প্রথম আলো ও একই গ্রুপের পত্রিকা ডেইলি স্টারের বিজ্ঞাপনে ধ্বংস নামে।[১০] র‌্যায়ান্স আর্কাইভস লিমিটেড’র হিসাবে দেখা যায়, জুলাই (২০১৫) মাসে প্রথম আলো একদিনে গ্রামীণ ফোন, রবি, বাংলালিংক, এয়ারটেল, টেলিটক, প্যাসিফিক টেলিকম এবং ইউনিলিভার থেকে বিজ্ঞাপন পেয়েছে ৬ কোটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৭০০ টাকা। সেটা সেপ্টেম্বরে ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকার নেমে আসে। উক্ত সময়ের মধ্যে এয়ারটেল, টেলিটক ও প্যাসিফিক টেলিকম কোনো বিজ্ঞাপন দেয়নি। একই অবস্থা দেয়া যায় ডেইলি স্টারের ক্ষেত্রে। জুলাই মাসে তাদের বিজ্ঞান ছিল ১ কোটি ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার ১০০ টাকা। সেপ্টেম্বরে তা ৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকায় নেমে আসে। তখন প্রথম আলোর মোট বিজ্ঞাপন বাবদ আয় ২৫ ভাগ আর ডেইলি স্টারের ২৫ ভাগ কমে যায়। বিজ্ঞাপনদাতা বিভিন্ন কোম্পানি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি ‘কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বিজ্ঞাপন বন্ধ’ করে দিতে হচ্ছে।[১১] কোন সে কর্তৃপক্ষ? এর জবাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকদের উত্তর কেবল নামহীন ‘কর্তৃপক্ষের’ কথাই উদ্ধৃত করতে হচ্ছে।

একদিকে আইন করে সংবাদমাধ্যমে কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে অন্যদিকে সরকারের সমালোচনা করে খবর প্রকাশ করা হলে বিজ্ঞাপন কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর বাইরে রয়েছে লাইসেন্স বাতিলের হুমকি। ২০১৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাসে ডেইলি স্টার হিযবুত তাহ্রীরের একটি পোস্টার প্রকাশ করে। এর জেরে ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বলেন, ‘হিযবুত তাহ্রীরের পোস্টার ছাপিয়ে যারা তাদের মদদ দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’[১২] প্রধানমন্ত্রীর এধরণের বক্তব্যকে সংবাদমাধ্যমের তথ্য জানানোর অধিকারের লঙ্ঘন বলে বিবৃতি দেয় সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টারস উইদাউট বর্ডারস। সংবাদমাধ্যমের প্রতি ক্ষমতাসীনদের এরকম অনেক হুমিকই রয়েছে। বিরোধী মতের হওয়ায় ২০১৩ সালের মে মাসে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা, দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া।[১৩] ২০১৮ সালের ২ জুন ২২ ঘণ্টার জন্য ডেইলি স্টারের ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেয়া হয় এবং একই বছরের ১৮ জুন জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টাল বিডিনিউজ ২৪ এর ওয়েবসাইট কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়।[১৪] যার ফলে কোটি টাকা বিনিয়োগ করে মিডিয়া হাউস বন্ধ হয়ে যাওয়া ভয়েও সাংবাদমাধ্যমগুলো সেলফ সেন্সর চর্চা করছে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্র ব্যহত হচ্ছে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্রমে সংকোচিত হচ্ছে।

সংবাদমাধ্যমের উপর এমন চাপের ফলে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদিকতা পথরুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে ফেইসবুক এবং ইউটিউবকে সংবাদ প্রকাশের কাজে লাগাচ্ছে অনেক সাংবাদিকরা। যেটাকে অধুনা ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ও বলা হচ্ছে। উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংবাদমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের অভাবে জনগণ সঠিক তথ্য জানতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে সরকার ইউটিউবে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করতেও উদ্যোগ নিচ্ছে। গত ১৫ আগস্ট তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ জানিয়েছে আইপি টেলিভিশনগুলো এবং ইউটিউব চ্যানেলগুলো কোনো ধরণের খবর প্রচার করতে পারবে না কেবল বিনোদন অনুষ্ঠান প্রচার করবে।[১৫] সংবাদমাধ্যমের উপর এতো কড়াকড়ি আইন প্রয়োগ এবং শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেও তথ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, ‘যুক্তরাজ্যের চেয়েও বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বেশি।’[১৬] সরকার সংবাদমাধ্যমের উপর এরূপ কড়াকড়ি আরোপের পর এবার ফেইসবুকে কে কী লেখবে সে নিয়েও ইতোমধ্যে সরকার বিধি-নিষেধ সম্বলিত বেশ কিছু বিধি-নিষেধ জারি করেছে।[১৯]

এছাড়াও রয়েছে সংবাদমাধ্যম বয়কট করার মতো ঘটনা। সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি টেলিভিশন চ্যানেল বর্জনের ডাক দিয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা এবং ডাকসু’র (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ) সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরু। এর ফলে ফেইসবুকে এবং ইউটিউবে ওই টেলিভিশন চ্যানেলেও লাইক ও সাবসক্রাইবে ব্যাপক ধ্বস নামে। সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারদলীয় সাংসদ শামীম ওসমান অত্যন্ত কড়া ভাষায় ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর বিরুদ্ধে সমালোচনা ও বয়কটের আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়ও প্রথম আলো বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন।[১৮] যখন জনপ্রিয় ব্যক্তি, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কেউ এভাবে প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যম বয়কটের ডাক দেন তখন সেই সংবাদমাধ্যমগুলো অস্তিত্বের সংকটে পরতে বাধ্য। আর বাধ্য হয়েই নিজেদের উপর সেন্স আরোপ করছে।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর সংকট একদিনে সৃষ্টি হয়নি এবং এ থেকে বের হয়ে আসার পথও সহজ নয়। এর জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর কর্তৃপক্ষকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় দেশে যে গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি বিরাজ করছে সে মূহুর্তে সংবাদমাধ্যমগুলোও যদি চুপসে যায় তখন সংকট আরও ঘনীভূত হবে। চুপ থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই।

তথ্যসূত্র :

  1. https://parstoday.com/bn/news/bangladesh-i83632

  2. https://www.banglanews24.com/law-court/news/bd/803200.details

  3. https://www.banglatribune.com/others/news/641203/

  4. দৈনিক প্রথম আলো, ১৫ অক্টোবর ২০২০

  5. https://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2020/06/17/923786

  6. https://epaper.jugantor.com/2019/01/10/ (†kl c„ôv)

  7. https://www.bbc.com/bengali/news-46819571

  8. https://www.thedailystar.net/frontpage/democracy-index-2019-bangladesh-moves-eight-notches-up-1857775

  9. https://www.economist.com/graphic-detail/2020/01/22/global-democracy-has-another-bad-year

  10. https://www.dw.com/bn/%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%A3%E0%A7%8D%E0%A6%A0%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%A8/a-18777382

  11. প্রগুক্ত

  12. https://www.prothomalo.com/bangladesh/%E0%A6%A1%E0%A7%87%E0%A6%87%E0%A6%B2%E0%A6%BF-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%AC%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%BE-%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%93%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%A8%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%BE%E0%A6%A7

  13. https://www.dw.com/bn/%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6-%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%95-%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%AB%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0/a-5641241

  14. ‘সংবাদমাধ্যম, রাষ্ট্র ও রাজনীতি’ আবু সাঈদ খান, ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত, অষ্টাদশ বর্ষ জানুয়ারি-মার্চ সংখ্যা, ২০২০, পৃ. ১৬০।

  15. https://www.banglanews24.com/national/news/bd/817949.details

  16. https://www.bbc.com/bengali/news-48864319

  17. https://www.peoplesreporter.in/special-report/8804

  18. https://www.manobkantha.com.bd/column/402390/

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in