শিক্ষায় পূর্ণগ্রাস, তাই সুপরিকল্পিত ‘অনিলায়ন’-র ঢাল !

শিক্ষায় পূর্ণগ্রাস, তাই সুপরিকল্পিত ‘অনিলায়ন’-র ঢাল !
ফাইল ছবি সংগৃহীত

বাংলার শিক্ষায় পূর্ণগ্রাস সম্পন্ন হয়েছে। কলেজে ভর্তি হতে গেলে মেধা এখন আর একমাত্র বিষয় নয় ‘এগিয়ে বাংলা’য়। কাগজে কাগজে ছাপা হচ্ছে ভর্তি হবার জন্য তোলার পরিমাণ। ছাত্রীকে এই তোলা দিতে গিয়ে মায়ের কানের দুল বেচতে হচ্ছে অথবা মেধাতালিকায় নাম থাকাসত্বেও ভর্তির সুযোগ না পেয়ে আত্মঘাতী হচ্ছে ছাত্র সংবাদমাধ্যমের মারফতে এসব আমাদের আর অজানা নয়। সংবাদমাধ্যম আরও জানিয়েছে কলেজের গেটে ‘উন্নয়ন’-র প্রতিনিধি দুকান কাটা ছাত্রনেতা প্রকাশ্যে বলছে শুধু নম্বরে এখন আর ভর্তি হয়না। এবার পঞ্চায়েত ভোটে বাংলা দেখেছে কীভাবে বিরোধীদের মনোনয়ন দাখিল পর্যন্ত না করতে দিতে কীভাবে রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে উন্নয়ন দাঁড়িয়ে ছিল। এখন কলেজের গেটেও উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে। মেধার ভিত্তিতে ভর্তির স্বপ্ন সাকার করতে লড়তে হচ্ছে এমন উন্নয়নের সঙ্গেই। তারই মধ্যে রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ভর্তি কীভাবে হবে তা নিয়ে সরকারের অযাচিত নাকগলানো এবং তাকে বৈধতা দিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আদেখলা পদলেহন সেই বিশ্ববিদ্যালয়েও সঙ্কট ডেকে এনেছে। সরকারের এই স্বাধিকার ভাঙা নাকগলানো যখন সমাজে ধিক্কৃত তখন আবার কিছু সংবাদমাধ্যম সামনে আনল ‘অনিলায়ন’-র গল্প।

২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী ইস্তাহারে ‘দলতন্ত্র’র অভিযোগে বিদ্ধ করা হয়েছিলো ‘সিপিএম’-কে। যদিও এর আগে থেকেই বিশেষ বিশেষ কিছু শব্দবন্ধ রাজ্যের তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছিলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কুৎসামূলক প্রচারে। ঠিক এভাবেই বাংলার মানুষকে পরিচিত করানো হয়েছিলো ‘অনিলায়ন’ শব্দের সঙ্গে। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ‘হেট ক্যাম্পেন’ সংগঠিত করে মানুষের মগজধোলাই। শিক্ষাক্ষেত্রে বিগত বাম সরকারের অবদান আড়াল করতে ‘অনিলায়ন’ জাতীয় শব্দবন্ধ তৈরি করে ঘোলা জলে মাছ ধরার যে প্রচেষ্টা বাম সরকারের পতনের প্রায় ১০-১২ বছর আগে শুরু হয়েছিলো আজও ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে’। দেখা যাক ঠিক কোন কোন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ছিলো এই নেতিবাচক প্রচার।

সাড়ে তিন দশকের বাম জমানায় রাজ্যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিলো ১৪টা। নতুন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ৭৮টা, মেডিক্যাল কলেজ ১২টা। ডিগ্রি, বিএড, ল এবং আর্ট কলেজ মিলিয়ে আরও ৩৬৪টা নতুন কলেজ। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার জন্য তৈরি করা হয়েছিলো স্কুল ও কলেজ সার্ভিস কমিশন। ইউজিসি-র বিচারে কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (রাজ্য সরকারের সহায়তাপুষ্ট দুটি বিশ্ববিদ্যালয়) Potential for Excellence শিরোপা অর্জন করে এই পর্বেই। এছাড়াও রাজ্যের বহু কলেজ পাঁচ তারা শিরোপা অর্জন করে। স্কুল-কলেজ –বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের বেতনের দায়ভার এবং অধ্যাপকদের জাতীয় মানদণ্ডে নির্ধারিত বেতনক্রম নিশ্চিত করাও একই সময়ে। শিক্ষা পরিচালনায় আমূল বিকেন্দ্রীকরণ এনে দিয়েছিলো একরাশ সাফল্য। নিশ্চিত হয়েছিল মেধার ভিত্তিতে ভর্তির অধিকার। আর এই সাফল্যকে আড়াল করতেই উদ্ভব হয়েছিলো ‘অনিলায়ন’ ‘দলতন্ত্র’ গোছের কিছু শব্দের।

‘৩৪ বছর’, ‘দলতন্ত্র’, ‘অনিলায়ন’-এর কুপ্রভাব(!) পেরিয়ে অবশেষে নাকি এসেছে মানুষের কাঙ্ক্ষিত (!) পরিবর্তন!!! কিন্তু তারপর? নিখুঁত ফ্ল্যাশব্যাকে প্রত্যক্ষ করা গেলো সত্তরের দশকের গণটোকাটুকি। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে প্রতিদিন শিক্ষক নিগ্রহ মনে করিয়ে দিলো অধ্যাপক গোপাল সেন, সত্যেন চক্রবর্তীদের কথা। রাজ্যের মন্ত্রী মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষকে প্রহার করছেন, প্রাক্তন বিধায়ক কলেজের মধ্যে অধ্যাপকের মুখে জলের জগ ছুঁড়ে মারছেন, কিংবা শাসকদলের কাউন্সিলরের নেতৃত্বে যাদবপুর বিদ্যাপীঠের শিক্ষককে বেদম প্রহার করা হচ্ছে – এমনটাই বোধহয় কাঙ্ক্ষিত ছিলো? কলেজে কলেজে ভর্তিপ্রক্রিয়ায় মেধাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অ্যাকাডেমিক সিন্ডিকেট তৈরি করে সংগঠিত তোলাবাজির দাপট না হয় উপরি পাওনা হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়। রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় আপাদমস্তক ‘তৃণমূলীকরণ’-র হাত ধরে এখন পূর্ণগ্রাস গ্রহণ।

শিক্ষাক্ষেত্রে ‘অনিলায়ন’ মুক্ত পরিবর্তিত বাংলা দেখলো তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভায় উপস্থিত শিক্ষাবিদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে। স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাথায় শাসকদলের শিক্ষা সেলের নেতা। স্কুল সার্ভিস কমিশনের সভাপতি পদত্যাগপত্র বিভাগীয় মন্ত্রীর কাছে না পাঠিয়ে পাঠাচ্ছেন শাসক দলের মহাসচিবের কাছে। শাসকদলের এক মন্ত্রীর ভাই পাবলিক সার্ভিস কমিশনে। আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকরী সমিতিতে শাসকদল ঘনিষ্ঠ জ্যোতিষী।

এখানেই বুঝি শেষ ভেবে নিলেন? তাহলে ভুল করছেন। রায়গঞ্জ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে কলার ধরে টানতে টানতে মারা, ইটাহার কলেজে শাসক দলের নেতার স্ত্রীকে টুকতে বাধা দিয়ে কলেজের অধ্যক্ষার আক্রান্ত হওয়া, যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষকের হেনস্থা, কিংবা ভাঙড় কলেজে অধ্যাপিকাকে শাসক দলের প্রাক্তন বিধায়কের জগ ছুঁড়ে মারার ঘটনাও এই সময়েরই। নির্বাচিত ছাত্রসংসদ শিকেয় তুলে প্রোমোটারির ধাঁচে শিক্ষাক্ষেত্রে তোলাবাজির সিন্ডিকেট তৈরি করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত পরিচালন ব্যবস্থা ধ্বংস করে জো হুজুর মনোনীত পরিচালন পদ্ধতি প্রণয়ন করা, টোকাটুকি-প্রশ্ন ফাঁসের মত ঘটনা ফেরত আসা – পিছনদিকে হাঁটার উদাহরণ অসংখ্য।

রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের দৃষ্টিভঙ্গি আসলে সবকিছু দখল করার দৃষ্টিভঙ্গি। মনে রাখতে হবে রাজ্যের অধিকাংশ মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অন্ধ বাম বিরোধিতা শেষ পর্যন্ত পর্যবসিত হয়েছিল বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর ইমেজ নির্মাণে তথা নিঃশর্ত সমর্থনে। এই দখলদারিকে ঘুরপথে বৈধতা দিতেই ‘দলতন্ত্র’ ‘অনিলায়ন’ শব্দকে মনে করিয়ে দিতে মাঝে মাঝে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনতে হয়। আর সেই অবকাশে কায়েম হয়ে যায় নিখাদ ‘তৃণমূলতন্ত্র’। এ শুধু রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকেই কুক্ষিগতই করছে না, খর্ব করছে সামগ্রিক গণতান্ত্রিক পরিসরকেও।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in