নতুনতর তাৎপর্যে মে দিবস ২০২০

নতুনতর তাৎপর্যে মে দিবস ২০২০
গ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন

এবারের মে দিবস পালিত হচ্ছে অদ্ভুত এবং অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের বিশ্বব্যাপী অতিমারী ‘সামাজিক দুরত্ব’ বিধির ঠেলায় আমাদের প্রায় সকলকেই ঘরবন্দী করে ফেলেছে প্রায় ছ’সপ্তাহ ধরে। মানব সভ্যতা কখনও এরকম পরিস্থিতি দেখেনি। এমনকি বিগত শতাব্দীর দুই ভয়ঙ্কর বিশ্বযুদ্ধের সময়েও নয়। এই লেখার সময় পর্যন্ত তেত্রিশ লক্ষ মানুষ করোনা পজিটিভ। বিশ্বে প্রায় দু’লক্ষ তিরিশ হাজারের কাছাকাছি মানুষ ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন। দেড় মাস-দু’মাস লকডাউন চলছে বিশ্বের প্রায় সব দেশে।

কলকারখানা অফিস কাছারি পরিবহণ সব পুরোপুরি বন্ধ। বিশ্বের সর্বত্র কোটি কোটি মানুষ ঘরবন্দী। ঘরবন্দী থাকাই এখনও পর্যন্ত করোনার সম্প্রসারণ ঠেকানোর দাওয়াই। সবচেয়ে বড় কথা এই ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখনও পর্যন্ত নেই, তাই ঠিক কবে দুনিয়ায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরবে এবং তার আগে আরও কত মূল্য দিতে হবে কেউ জানেনা। দিশে হারা অবস্থায়। গত তিন দশকের ওপর সযত্নে সাজানো বিশ্বায়নের অজেয় সামর্থ্য নিয়ে দম্ভ অন্তত এই মুহূর্তে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছ।

কোন সন্দেহ নেই করোনা জাত ধর্মের ফারাক বোঝে না। বড় লোক গরীব লোক বোঝে না। করোনায় বিশ্ববাসী একযোগে এক অভিন্ন অনিশ্চয়তায়। কিন্তু, এটা আপাত সত্য। ঘরবন্দী অবস্থাতেও অন্তত তিনটি বিষয় সবারই বোধগম্য হয়েছে। এক, বোধ হয় এভাবে প্রথম আমরা বুঝলাম, এবিশ্ব সত্যিই অপরিহার্যভাবে পরস্পর নির্ভর। দুই, অতিমারী মোকাবিলা সার্বজনীন অংশগ্রহণ ছাড়া অসম্পূর্ণ। তিন, মারণ ভাইরাস সামাজিক আর্থিক ভেদাভেদ না জানলেও, বৈষম্য রয়েছেই, শুধু তাই নয়, বাড়ছে। আর এই বৈষম্যের কারনেই করোনার হাত থেকে বাঁচার প্রচেষ্টায় সমভাবে নিয়োজিত হবার সামর্থ্য নেই এক বিরাট অংশের মানুষ । বৈষম্য ভরা মানব সমাজে অতিমারী মোকাবিলাকে সার্বজনীন করে তোলার ক্ষেত্রে সেটাই অকাট্য প্রতিবন্ধক।

বিশ্বায়ন পর্বে বোধ হয় এই প্রথম বহুস্তরীয় বৈষম্যগুলি আগেকার যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি প্রকট। সংক্রমণ মোকাবিলায় লকডাউনের জেরে সংকট কোথায় পৌঁছবে তার সঠিক হিসেব এখনও কষা যাচ্ছে না। তবে কোন সন্দেহ নেই অভূতপূর্ব একগুচ্ছ সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ সামনের দিনগুলিতে অপেক্ষা করছে।

এমনিতেই বিশ্ব পুঁজিবাদী অর্থনীতির দুর্ভোগের শেষ নেই। ২০০৮ সালে শুরু হওয়া হওয়া অর্থনৈতিক মন্দা থেকে মুক্তি ছাড়ুন, সুরাহাই যখন দূর অস্ত, তখনই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এলো করোনা। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড বলছে, ১৯৩০-এর মহামন্দার পর এবারকার সঙ্কটই তীব্রতম। সঙ্কট এতটাই যে করোনা অতিমারী অনেকটা ছড়িয়ে পড়ার পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইতালি, জার্মানি,ফ্রান্সসহ উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলিও লকডাউন নিয়ে গড়িমসি করেছে। জনকল্যাণমূলক ভূমিকা থেকে রাষ্ট্রের পশ্চাদপসরণ, শিক্ষা স্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রের বেসরকারীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরন করোনা অতিমারীর মোকাবিলায় কীরকম দুরবস্থা ডেকে আনতে পারে তা সবাই আমরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় দেখছি।

বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক হিসেব, করোনার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাতে পারে। চলতি বছরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বৃদ্ধিহার ২.৫ শতাংশ থেকে ২. ৩ শতাংশে নেমে আসবে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার পর সর্বনিম্ন বৃদ্ধিহার।

এর নিটফল কী? আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও-র হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে লাগাতার লকডাউনের দরুণ জীবিকা হারাতে পারেন প্রায় ১৬০ কোটি কর্মক্ষম মানুষ-- বিশ্বের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। করোনা প্রাদুর্ভাবের এক মাসের মধ্যেই বিশ্বে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকের আয় কমেছে ৬০ শতাংশের মতো। পরিষ্কার যে, আঘাতটা আসছে আর্থিক ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও-র সাম্প্রতিকতম সমীক্ষা ভয়ঙ্কর এক ভবিষ্যতের কথা বলছে। জনসংখ্যার বিভিন্ন অংশ যেমন মহিলা, তরুণ-তরুণী, বয়স্ক শ্রমিক, অভিবাসী ও চাকরিজীবী ব্যক্তিরা অতিমারীর কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা এমনিতেই কম। এখন আরও কমবে।বিকল্প আয়ের ন্যূনতম ব্যবস্থা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর টেকার কোনো উপায় থাকবে না বলে মনে করে আইএলও। এজন্য জরুরীভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট এবং নমনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার বলে আইএলও মনে করে।

করোনা-গ্রাসে ভারতীয় অর্থনীতিও বেনজির মন্দার মুখে। চলতি আর্থিক বছরে ভারতীয় অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার শূন্যেরও নীচে চলে যেতে পারে বলেও অনেকের আশঙ্কা। করোনার আগেই ভারতে বেকারত্বের হার বিগত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হয়েছিল। করোনার পর পরিস্থিতি যে আরও শোচনীয় হবে তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হবার দরকার নেই। করোনা অতিমারী এমন সময়ে ঘটলো যখন ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার এমনিতেই তলানিতে।

সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিশ্বব্যাঙ্ক বলছে, করোনা সংক্রমণের দরুণ ভারতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে বর্তমান আর্থিক বছরে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার নেমে পৌঁছে যাবে তিন দশক আগের সময়ে।বর্তমান আর্থিক বছরে (২০২০-২১) অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির (জিডিপি) হার বেশি হলে ১.৫শতাংশ থেকে ২.৮ শতাংশের মধ্যেই থাকবে।বর্তমান বেহাল অবস্থায় ভারতীয় অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস-এর মতে, চলতি আর্থিক বছরে জিডিপি-র হার ০.৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে। দেশের অগ্রণী বণিকসভা সিআইআই-র হিসেব, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ভারতীয় অর্থনীতি এমনকি ০.৯ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে, অর্থাৎ শূন্যেরও নিচে; এবং সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতে বৃদ্ধির হার হতে পারে ১.৫ শতাংশ।

করোনা সংক্রমণ রোধে লকডাউনের ফলেসারা দেশে কলকারখানা, যানবাহন, বিমান, রেল চলাচল, ব্যবসা বাণিজ্য সবকিছু বন্ধ। বন্ধ পণ্য চলাচল। ফলে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে চাহিদা জোগান দুটি ক্ষেত্রই বিপর্যস্ত। বিশ্বের বাজারেও ভারতের পণ্যের চাহিদা কমেছে। করোনা বিপর্যয়ের পর বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারত থেকে সরে পড়েছে। সংবাদ মাধ্যমের হিসেব, শুধু এপ্রিলের এক সপ্তাহে ৯হাজার ১৩০কোটি টাকা মূল্যের বিনিয়োগ সরিয়ে নিয়ে গেছে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। মার্চে সরেছে ১.১লক্ষ কোটি টাকা। বিদেশি পুঁজি এভাবে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাওয়ার পরিণতি সবাই বোঝেন। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উপযুক্ত আর্থিক পরিকল্পনা ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিত সামলানোয় লকডাউন জারি করা ছাড়া কোনো সুচিন্তিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কী মোদী সরকার, কি পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার মূলত আত্মপ্রচারমূলক বিজ্ঞাপনের ওপরই ভরসা করছে।

লকডাউন শুরু হবার পরই আমরা দেখলাম অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিশেষত পরিযায়ী শ্রমিকদের অবর্ণনীয় দুরবস্থা কীরকম প্রকট হয়ে উঠল। হাজার হাজার মানুষ শত সত কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে চাইছেন কত দুরবস্থা থাকলে! অথচ, কেরালার এল ডি এফ সরকার বাদ দিলে অসংগটিত ক্ষেত্রের বা পরিযায়ী শ্রমিকদের বিষয়ে কেন্দ্রের মোদী সরকার বা অন্যান্য রাজ্য সরকারগুলির উদাসীনতা ও অমানবিক আচরণ কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাদের সমাজকে। পরিযায়ী শ্রমিকরা কেন রাস্তায়? মোদী সরকার আদালতে বলেছে, ‘ফেক’ নিউজে ভুল বুঝে, বিভ্রান্ত হয়ে। বুঝুন অবস্থা! পরিযায়ী শ্রমিকদের আর্থিক সমস্যা বা কাজের সমস্যার স্বীকৃতি পর্যন্ত মেলে না! শ্রমজীবী জনগণের মধ্যেও সবচেয়ে সুযোগ বঞ্চিত অংশ সম্পর্কে এই যদি হয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে সংকট মোচনের জন্য সেই সরকারের কর্মসূচী কী হতে পারে!

বাস্তবিক পক্ষে করোনাজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে। তৈরি করে দিতে হবে কাজের সুযোগ। কর্মচ্যুত, কর্মহীন দরিদ্র মানুষের হাতে অর্থের যোগান, খাদ্যের যোগান, বিকল্প কর্মসংস্থানের ন্যূনতম ব্যবস্থা। কেরালাব রাজ্য সরকার যেখানে ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যেখানে কেন্দ্রীয় মার্চ মাসের শেষ দিকে মাত্র এক কোটি সত্তর লক্ষ টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে গোটা দেশের জন্য। বলা বাহুল্য, প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই কম।

সরকারের হাতে টাকা নেই তা নয়। দিন কয়েক আগে তথ্যের অধিকার আইনে জানা গেছে, মোদী সরকার ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কালে দেশের শীর্ষ ৫০ জন ঋণখেলাপীকে ৬৮ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা ঋণ মকুব করে দিয়েছে। সংবাদ মাধ্যমের খবর, করোনা মোকাবিলায় বিশ্ব ব্যাংক থেকে ভারত যত টাকা ঋণ নিয়েছে, ঋণখেলাপিদের এই ঋণ মাফের পরিমাণ তার নাকি আট গুণ বেশি।

একশো দিনের কাজের প্রকাল্পে বরাদ্দ টাকা বাড়াতে বললে অজস্র ওজর, কিন্তু দেশত্যাগি ও অভিযুক্ত হিরে ব্যবসায়ী মেহুল চোকসির ঋণ মাফ করা হয়েছে ৫ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা! ‘যোগগুরু’ রামদেব এবং তাঁর 'বিজনেস পার্টনার' আচার্য বালাকৃষ্ণর সংস্থা রুচি সোয়া ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ২ হাজার ২১২ কোটি টাকা দেনা মকুব করা হয়েছে। আরেক হিরে ব্যবসায়ী গুজরাটের যতীন মেহেতারও প্রায় ৪ হাজার ৭৬ কোটি টাকা মকুব করে দিয়েছে দেশের শীর্ষ ব্যাংক। বাদ যাননি, কিংফিশার মালিক বিজয় মালিয়াও। তাঁরও ১৯৪৩ কোটি টাকার ঋণ মকুব করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় সরকার চলতি বাজেটেই কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ কোটি টাকা করছাড় দিয়েছে। ফলে সরকারের হাতে টাকার সংস্থান নেই তা নয়। বিদেশ থেকে কালো টাকা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতির কী হলো সে প্রশ্ন এখন নয় মুলতুবিই থাক।

শুধু সুরাহায় ব্যর্থতা নয়, মহাসংকট সামলানোর কাজ যে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ঘাড় ভেঙেই করার চেষ্টা হবে এমন আশঙ্কাও অমূলক নয়। ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে, কাজের সময় দিনে বারো ঘন্টা করার জন্য তদ্বির করছে সরকারী বেসরকারী মহলের একাংশ। মহার্ঘভাতা ইতিমধ্যেই স্থগিত করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। গত মার্চ মাসে ৪ শতাংশ ডিএ বা মহার্ঘ্য ভাতা বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেছিল কেন্দ্র। সরকারি কর্মচারীদের ডিএ বা মহার্ঘ্য ভাতা ১৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১ শতাংশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেসব স্থগিত করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। এই সিদ্ধান্ত ৪৯.২৬ লাখ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী ও ৬১.১৭ লাখ পেনশনভোগীর উপর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। মূর্তি বানানো বা বুলেট ট্রেন কিংবা সরকারী ব্যয়ে বিজ্ঞাপনের মতো অজস্র অপ্রয়োজনীয় খরচ বাদ না দিয়ে মধ্যবিত্ত কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের ওপর আঘাত আনছে সরকার। মধ্যবিত্তদের সুরাহা না দিয়ে দরিদ্রতমদের জন্যও যে সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বরাদ্দ করছে এমন নয়।

করোনার জেরে সংকট বেড়েছে পশ্চিমবঙ্গেও। করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অনাবশ্যক গোপনীয়তা সমস্যা বাড়িয়েছে। উপযুক্ত চিকিৎসা-পরিকাঠামোর সমস্যা আরও প্রকট হয়েচে। করোনার আগাম পরীক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে ভারত এমনিতেই পিছিয়ে। পশ্চিমবঙ্গ আবার দেশের মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলির মধ্যে। ফলে লকডাউন উঠার পরও নিশ্চিন্তে থাকা শক্ত। একগুচ্ছ আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে রয়েছে বিপর্যস্ত অর্থনীতি। রাজ্য কর্মসংস্থানের হাল এমনিতেই শোচনীয়। তৃণমূল সরকারের আমলে শিল্পে আমরা পিছিয়েই চলেছি। দেশের অন্যান্য তুলনীয় রাজ্যগুলির সাপেক্ষে। করোনার ফলে গোটা দেশে বিনিয়োগ যখন বিপর্যস্ত তখন পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা আগের তুলনায় আরও খারাপ হবারই আশঙ্কা। পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশের সব প্রান্তে যায়। করোনার জেরে তাদের একটা অংশ যদি রাজ্যে থেকে যেতে বাধ্য হন তাহলে অবস্থা কী হবে ভাবুন! কর্মসংস্থানের সুযোগ যত কমবে ততই কর্মরতদের চাকুরির শর্ত ও মজুরি আরও বিপন্ন হবে।

সেইসঙ্গে তৃণমূল রাজত্বে গণতান্ত্রিক অধিকার ও রীতিনীতির ওপর ক্রমাগত আক্রমণ। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা কার্যত অবলুপ্ত হবার পথে। এত বড় সংকট সামাল দেবার জন্য সংসদীয় গণতন্ত্রে ন্যূনতম কিছু সহনশীল আচরণ মানতে হয় শাসক দলকে। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে তা বিলুপ্তপ্রায়।

নজিরবিহীন এই বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে শ্রমজীবী মানুষের ওপর আরও আক্রমণ আসবে। মধ্যবিত্ত কর্মচারী, শিক্ষক, পেশাজীবী অন্যন্য অংশের ওপরও বাড়তি বোঝা চাপানোর চেষ্টা চলবে।

দেশজুড়ে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তির ভূমিকা , বামপন্থীদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সব সংকটের মধ্যেই নতুন সম্ভাবনার বীজ সুপ্ত থাকে।

এবারের মে দিবস পালিত হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন নয়া উদারবাদী দক্ষিণপন্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ব্যর্থতাকে করোনা সংকট একেবারে নগ্ন করে দিয়েছে। একটি সার্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ছাড়া গোটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটাকেই ধরে রাখা যাচ্ছে না এটা এখন দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। নয়া উদারবাদী রাষ্ট্র কি সেই দায় নেবে? চাই ব্যাপক গণসমাবেশ। ন্যূনতম মজুরির, কর্মসংস্থানের ও ক্ষুধা নিবৃত্তির ব্যবস্থা ছাড়া উৎপাদন প্রক্রিয়ার কী পরিণতি হবে? কীভাবে সম্ভব হবে সম্পদের এই বিপুল ঘাটতি পূরণ? সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে?

কত নতুন বিষয় নতুনতর তাৎপর্যে এবারের মে দিবসে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নতুনতরভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে মে দিবস।

(এটি পিপলস রিপোর্টারের এক্সক্লুসিভ কপি।)

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in