নোটবাতিল – দেশবাসী কী পেল?

নোটবাতিল – দেশবাসী কী পেল?
ছবি প্রতীকী

নোটবাতিল করে দেশ কতটা এগোলো? নোটবাতিলের বর্ষপূর্তিতে রাজনৈতিক চাপানউতোরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে এর সাফল্য এবং ব্যর্থতা নিয়ে।

যুযুধান রাজনৈতিক শক্তিও কোমর কষে ময়দানে নেমে পড়েছে। একদিকে যখন এনডিএ শিবির থেকে এর সাফল্য প্রচার করা হচ্ছে তখন অন্যদিকে নোটবাতিলের জেরে দেশের অর্থনীতিতে জোর ধাক্কা লাগার কথা বলছেন বিরোধীরা।

৮ নভেম্বর ২০১৬ রাতে যখন আচমকাই দেশের প্রধানমন্ত্রী ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের কথা ঘোষণা করেছিলেন থমকে গেছিলো গোটা দেশ। নোট বাতিলের কারণ বলতে গিয়ে সেদিন প্রধানমন্ত্রী যা যা বলেছিলেন, আজ ঠিক একবছর পর দেশে সেগুলো আর নেই একথা বোধহয় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন না। সেদিন তিনি বলেছিলেন জাল টাকা বন্ধ করা, কালো টাকা ধ্বংসের কথা, সন্ত্রাসবাদীদের ফান্ডিং বন্ধ করার কথা প্রভৃতি। অবশ্য তারপর থেকে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী তাঁর বয়ান বদল করেছেন। কখনও তাঁকে জ্বালিয়ে দেবার কথাও বলেছেন। কখনও সাত দিন, কখনও তিরিশ দিন, কখনও বা পঞ্চাশ দিন সময় চেয়েছেন দেশবাসীর কাছে। যার সবটাই সম্ভবত ফলাফলের আগাম অনুমান না থাকার কারণে।

যদিও বিগত ১ বছরে নোট বাতিলের পর দেশ থেকে প্রচুর কালো টাকা উদ্ধার হয়েছে এধরণের দাবি রিজার্ভ ব্যাঙ্কও করে উঠতে পারেনি। আর সন্ত্রাসবাদীদের কোমর ভেঙ্গে দেবার যে কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন তার যে কোনও বাস্তব ভিত্তি নেই তা সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনাই প্রমাণ করে।

নোট বাতিলের পর গত জুলাই, ২০১৭ আর বি আই যে হিসেব দিয়েছিলো তাতে দেখা গেছে ৩০ জুন ২০১৭ পর্যন্ত ১৫.২৮ ট্রিলিয়ন নোট ব্যাঙ্কে জমা পড়েছে। নোট বাতিলের আগে দেশে ১৫.৪৪ ট্রিলিয়ন নোট ছিলো। অর্থাৎ যে পরিমাণ নোট দেশে ছিলো তার প্রায় সবটাই ব্যাঙ্কের ঘরে ফিরে এসেছে। তাহলে কোথায় গেল বহু ঘোষিত কালো টাকার গল্প?

আর বি আই-এর তথ্য থেকেই জানা যায়, এপ্রিল ২০১৬ থেকে মার্চ ২০১৭ সময়কালে জাল নোট উদ্ধার হয়েছে ৫,৭৩,৮৯১টি। একইভাবে পূর্ববর্তী বছরে নোটবাতিল ছাড়াই দেশে ৪,০৪,৭৯৪ টি জাল নোট উদ্ধার হয়েছিলো। অতএব নোটবাতিল করে খুব বেশী জাল টাকা উদ্ধার করা হয়েছে সে যুক্তিও ধোপে টেকে না।

এক্ষেত্রে সবথেকে হাস্যকর বিষয় হল, ২০১৬র ১৬ ডিসেম্বর লোকসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি জানিয়েছিলেন, আয়কর দপ্তরের হিসেব অনুসারে দেশের মানুষের কালো টাকার মাত্র ৫ শতাংশ নোট আকারে আছে।

তাহলে নোট বাতিল কার স্বার্থে? অন্য কোনও রাজনৈতিক দল নয়। বিজেপির শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় মজদুর সংঘ নোট বাতিল পরবর্তী সময়ে জানিয়েছে – শুধুমাত্র নোট বাতিলের জেরে অসংগঠিত ক্ষেত্রে ২,৫০,০০০ ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। খারাপ প্রভাব পড়েছে রিয়েল এস্টেটে। বহু শ্রমিককে কাজ হারাতে হয়েছে। একইভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে কৃষিক্ষেত্র।

অমর্ত্য সেন থেকে শুরু করে দেশ বিদেশের তাবড় অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছিলেন, নোট বাতিলের ফলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁরা আরও বলেছিলেন নোট বাতিলে নগদের জোগানে ঘাটতি হলে কমবে অর্থনীতির বৃদ্ধির হার। সে সময় তাদের কথার গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যদিও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে তাদের আশংকাই সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। সাফল্য আর ব্যর্থতার দাঁড়িপাল্লায় ফেলে বিচার করতে গেলে সত্যিই প্রশ্ন জাগে একরাশ হয়রানি এবং ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ছাড়া নোটবাতিলে দেশবাসী আদৌ কী কিছু পেলো?

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in