ভোটের মুখে রাম নাম

ভোটের মুখে রাম নাম
ফাইল ছবি সংগৃহীত

১৯৯২। ডিসেম্বর ৬। কয়েকদিন আগে থেকেই দলে দলে লোক জমা হতে শুরু করেছে অযোধ্যার চারপাশে। যাদের পোশাকি নাম ‘কর সেবক’।

৬ ডিসেম্বর অযোধ্যায় ‘রাম লালা’র পুজো হবে। অন্তত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা বিজেপির পক্ষ থেকে সেরকমই বলা হয়েছিলো। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী ‘মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না’ এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় শুরু হয়েছিলো ধর্মের বকলমে রাজনৈতিক সমাবেশ। তারপর বাকীটুকু – রক্তাক্ত ইতিহাস। শত সহস্র বছরের ঐতিহ্য ভাঙ্গার ইতিহাস। সংস্কৃতি ধ্বংসের ইতিহাস। ভারতীয় বিশ্বাসের মূলে আঘাত করার ইতিহাস। কিছু মানুষের, কিছু রাজনৈতিক নেতার জান্তব উল্লাসের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাওয়া লাখো মানুষের কান্নার ইতিহাস।

বিবাদের শুরু ১৮৫৩তে। মাঝেমধ্যে কিছু বিবাদ লেগে থাকলেও বড়সড় বিবাদ বাঁধে ১৯৪৯-এ। যে বছরের ২২ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে মসজিদের ভেতর রামের মূর্তি রেখে আসা হয়। এরপরই ওই এলাকাকে বিতর্কিত ঘোষণা করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে।

এরপর ১৯৮৯। মাঝখানে অনেকটাই সময় চলে গেলেও বিতর্কিত জায়গার ওপর থেকে দাবি ছেড়ে দেয়নি বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। বরং তলে তলে নিজেদের সংগঠিত করেছে বড়সড় আঘাতের জন্য। ১৯৮৯ সালে বিতর্কিত জায়গাতেই রাম মন্দিরের শিলান্যাস করা হয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের তরফে। এরপর ১৯৯০ তে দেশজুড়ে রাম রথ নিয়ে বিজেপি নেতা এল কে আদবানীর প্রচার। আদবানীর রথের চাকার ঘর্ষণে দাঙ্গার রক্তে লাল হয়ে যায় ভারতের বিস্তীর্ণ প্রান্তর। অবশেষে বিহারে রথ থামান তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব।

এরপরই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৯২। ৬ ডিসেম্বর। দেশের একাধিক বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ প্রমাদ গুনেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু থেকে শুরু করে একাধিক রাজনীতিবিদ দৌত্য করেছেন, বিজেপির সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন, কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সরকারকে সাবধান করেছেন। যদিও কড়া পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়াও ঐতিহাসিক সৌধটিকে রক্ষা করা যায়নি। দেশকে রক্ষা করা যায়নি বাবরি ধ্বংস হওয়ার পরবর্তী ‘আফটার এফেক্টস’ এর হাত থেকেও। দাঙ্গায় মৃতের সংখ্যার পুনরুল্লেখ নাই বা করলাম। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর মত – ধর্মস্থান ভাঙতে এলে গুলি করার মত কড়া প্রশাসনিক নির্দেশ তো আর কোথাও জারি হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। প্রতিবাদ শোনা যায়নি তখন তাঁর মুখেও।

ঘটনার ১০ দিন পরে গঠিত হয় লিবেরহান কমিশন। যে কমিশন ১৬ বছর ধরে ৩৯৯ বার বসার পর ২০০৯ সালের ৩০ জুন ১০২৯ পাতার রিপোর্ট জমা দেয়। যাতে খুব স্পষ্ট করে বলা হয়েছিলো ‘এই ঘটনা তাৎক্ষনিক বা অপরিকল্পিত নয়।’ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছিলো ৬৮জন বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। যাদের মধ্যে ছিলেন এল কে আদবানী, মুরলী মনোহর যোশী, উমা ভারতী, অশোক সিঙ্ঘল প্রমুখ।

এতো গেল বাবরি ধ্বংসের কথা। ইতিহাস গুঁড়িয়ে দেবার কথা। ইতিহাসের নামে পুরাণ গেলানোর অপচেষ্টার কথা। আজ যে অসহিষ্ণুতার আবহে আতঙ্কিত কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, গুজরাট থেকে মণিপুর – তার বীজ তো লুকিয়ে আছে ৬ ডিসেম্বরেই।

লক্ষণীয়ভাবে, ১৯৯২ এর পর থেকে দেশের বুকে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে তার সবকটার আগেই একবার করে মাথা চাড়া দিয়েছে রামমন্দির বিতর্ক। অবশ্য মাথা চাড়া দিয়েছে বলার থেকে মাথা চাড়া দেওয়ানো হয়েছে বলাই ভালো। এর স্পষ্ট উদাহরণ অবশ্যই ২০০২ এর গুজরাট নির্বাচন। যে নির্বাচনের আগে প্রায় কোণঠাসা অবস্থায় থাকা বিজেপি গুজরাটে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলো (!) বাবরি ধ্বংসের ১০ বছর পূর্তিকে কেন্দ্র করে করসেবার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই। ২০১৪-র লোকসভা ভোটের আগেও একই ছবি। ১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০৪, ২০০৯ – প্রত্যেকবারই একই ঘটনা।

প্রতিবার নির্বাচন আসে। আর ভোটের মুখে একবার করে রাম নাম জপে নেওয়া হয় বিজেপির পক্ষ থেকে। নোটবাতিল, জিএসটি, লক্ষ কোটি টাকা কর্পোরেটদের ঋণ মকুব, অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধি, দেশের শ্রমিক কৃষকের দুর্বিষহ অবস্থা, ক্রমশ অন্ধকারের আড়ালে ডুবে যাওয়া ভারতীয় জনসাধারণের একটা বড়ো অংশের দুরবস্থা আড়াল করতে হিন্দুত্ববাদে সুড়সুড়ি দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী টপকাবার এত বড়ো সুযোগ কেই বা হাতছাড়া করে। রুটির লড়াই, রুজির লড়াই ভোলাতে ‘রাম’ই তাই একমাত্র ত্রাতা।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in