লালগড়ে ১৫ দিনে ৭ শবরের মৃত্যু এবং কিছু প্রশ্ন

লালগড়ে ১৫ দিনে ৭ শবরের মৃত্যু এবং কিছু প্রশ্ন
ছবি প্রতীকী সংগৃহীত

উবু, দশ, কুড়ি, নাড়ি ভুঁড়ি, চিংড়ি মাছের চচ্চড়ি – ছোটোবেলায় যে কোনও খেলায় দল পাকানোর আগে এভাবে গোণেননি এমন মধ্যবয়স্ক বাঙালি পাওয়া দুষ্কর। যদিও এখন আর ওই ‘উবু দশ কুড়ি’ গোণার জন্য শিশু খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল, কিন্তু ‘চিংড়ি মাছের চচ্চড়ি’টা বেশ আছে। তার থেকেও বেশি আছে – ‘কে কত আনা নেবে বলে দাওনা’র লড়াই। যতই উঁচু বাড়িটার একদম শেষ তলা থেকে পঁচাত্তর আর পঁচিশের ফর্মুলা বলে দেওয়া হোক, নিজের ভাগটুকু বুঝে নিতে সকলেই সজাগ, তৎপর।

আর এই ভাগাভাগির লড়াইয়ের মাঝখান দিয়েই ঘটে যায় কত কিছু। তা সে দাড়িভিট হোক বা লালগড়। কুম্ভকর্ণের ঘুম যেহেতু বিশেষ বিশেষ ঘটনাক্রমে ভাঙ্গে তাই অনেক ক্ষেত্রেই ইস্যুগুলোও পাঁকাল মাছের মত ঘুম ভেঙ্গে আড়মোড়া দেবার আগেই হাত ফসকে বেরিয়ে যায়।

এবার একটু পিছনের দিকে এগিয়ে যাওয়া যাক। ফ্ল্যাশব্যাক ১ – জুন ২৮, ২০০৪ – India Today পত্রিকা লিখেছিলো – “Twenty-seven years after the Left Front came to power in West Bengal and 26 years after Operation Barga was officially launched to allocate land to the landless, people are still dying of starvation and acute poverty still stalks the countryside.” যার সরল বঙ্গানুবাদ করলে দাঁড়ায় – পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ২৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পরেও এবং সরকারি ভাবে অপারেশান বর্গা করে জমিহীনদের জমি তুলে দেবার ২৬ বছর পরও মানুষ এখনও অভুক্ত অবস্থায় মারা যাচ্ছে।

ফ্ল্যাশব্যাক ২ – জুলাই ৬, ২০০৪ – টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় লেখা হয়েছিলো – Even after 27 years of Left rule, one-fourth of the people of West Bengal do not have enough to eat, getting less than the minimum daily requirement of 2,500 calories, the state government admitted in the floor of the assembly on Tuesday. যার অর্থ – বামেরা ২৭ বছর রাজত্ব করবার পরেও পশ্চিমবঙ্গের এক চতুর্থাংশ মানুষের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য নেই, যারা দৈনিক প্রয়োজনের ২৫০০ ক্যালরির চেয়েও কম খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। রাজ্য সরকার মঙ্গলবার বিধানসভায় এই কথা স্বীকার করেছে। (যদিও তদানীন্তন ত্রাণমন্ত্রী হাফিজ আলম সৈরানী বিধানসভায় যা বলেছিলেন তার অর্থ এটা নয়। সে অন্য প্রসঙ্গ...)

ফ্ল্যাশব্যাক ৩ - ১১ আগস্ট, ২০১২ – দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে লেখা হল - While starvation deaths may not have occurred here for eight years now, villagers of Amlasole say people here die early due to malnutrition and addiction to cheap liquor. অর্থাৎ - গত আট বছরে এখানে অনাহারে কেউ মারা যায়নি, আমলাশোলে মানুষ মূলত মারা যান অপুষ্টিতে এবং সস্তার মদে আসক্তির কারণে।

ওই একই নিবন্ধে আমলাশোলের নন্দকিশোর মুন্ডার বয়ানে লেখা হয়েছিলো – ‘মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন জঙ্গলমহল থেকে ৫০০০ যুবককে এন ভি এফ, হোম গার্ড, পুলিশে নিযুক্ত করা হবে। যদিও এখনও পর্যন্ত এই গ্রামের একজনকেও কোথাও নিয়োগ করা হয়নি।’

এতক্ষণে হয়তো সকলেই বুঝে গেছেন যে আমলাশোল নিয়ে কোনও একটা আলোচনা ফাঁদা হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ আবার আমলাশোল কেন? বাংলার মানুষের দিন তো বেশ রসেবসেই কাটছে। উৎসবমুখর বাঙালির এক সময় আমলাশোল নিয়ে ভাববার মত অঢেল সময় থাকলেও আজ উৎসবের বাহুল্যে ‘শ্রাদ্ধ’ করবার মত সময় বেঁচে নেই মোটেও। তাই আমলাশোলের অসহায়, অভুক্ত মানুষের কথা ভেবে পথ হাঁটা, প্রতিবাদে মুখর মুখগুলো বেবাক গা ভাসিয়ে দিয়েছেন উৎসবের গড্ডলিকা স্রোতে। নিঃশ্বাস ফেলার আগেই পঙ্গপালের ঝাঁকের মত এক উৎসব শেষ হতে না হতেই আরেক উৎসব, তারপর আরেক, তারপর আরও একটা...

এতটা ‘শিবের গীত’ গাইবার কারণ মঙ্গলবার ১৩ নভেম্বর ২০১৮ তে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটা খবর। যাতে লেখা হয়েছে – “উৎসবের রেশ কাটিয়ে সরকারি অফিস চালু হতেই সামনে এল মৃত্যুসংবাদ। এক-দু’জন নয়। গত ১৫ দিনে একই গ্রামের শবর সম্প্রদায়ের সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে এক জন মহিলা।

ঘটনাস্থল ঝাড়গ্রাম জেলার লালগড় ব্লকের পূর্ণাপাণি গ্রাম সংসদের জঙ্গলখাস গ্রাম। জেলা সদর থেকে দূরত্ব মেরেকেটে ২৪ কিলোমিটার।”

এঁরা কীভাবে মারা গেছেন তা বলতে গিয়ে বলা হয়েছে – এঁরা সকলেই অসুস্থ ছিলেন। এরপর ‘অপরাধপ্রবণ জাতি’র তকমা লাগিয়ে দেওয়া শবরদের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন নিয়েও বেশ কিছু স্তবক। যদিও স্বর্গত মহাশ্বেতা দেবী এঁদের নিয়ে বেশ কিছু কাজ করে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন এঁরা মোটেও অপরাধপ্রবণ নন। সে কথাও নাহয় বাদই দেওয়া গেল...

অতএব, হাতে রইলো...। না, পেনসিলও কবেই যেন আম আদমির হাতছাড়া হয়ে গেছে। কারণ, লিখতে গেলেও...। আসলে, মোদ্দা কথা হল - ঘটনা নয়। ঘটনাকে কীভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে পরিবেশন করা হবে সেটা। কারণ পরিবেশন করার স্টাইলেই মানুষ দেখবেন, ভাববেন এবং খাবেন। তাই আমলাশোল আর লালগড় – মৃত্যু দু’জায়গাতেই হলেও, একই কারণে হলেও – কোথাও কলম সরে, কোথাও সরে না। কোথাও মিছিল হয়, কোথাও হয় না। আর নিরন্ন প্রান্তিক মানুষগুলো শুধুমাত্র রাজনীতির উপকরণ হয়েই দিন গুজরান করে যান। ‘আচ্ছে দিন’ বা ‘মা মাটি মানুষ’-এর সরকার তাঁদের জীবনে কখনোই কোনও পরিবর্তন আনতে পারে না।

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in