UP-তে ১৫২ BJP MLA-র সন্তান সংখ্যা ৩ বা তার বেশি, সংসদে ৯৬ জনের - জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নীতি ও রাজনীতি

অর্থনীতি বলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অর্থ হল তা কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়ন দৃঢ় হয়। যদিও অর্থনীতি যাই বলুক রাজনীতি বোধহয় সেই একই কথা বলেনা।
UP-তে ১৫২ BJP MLA-র সন্তান সংখ্যা ৩ বা তার বেশি, সংসদে ৯৬ জনের - জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নীতি ও রাজনীতি
গ্রাফিক্স- নিজস্ব

সম্প্রতি দেশের দুই রাজ্য উত্তরপ্রদেশ এবং আসাম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নীতি নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছে। এই দুই রাজ্যের প্রস্তাবে সায় দিয়ে কর্ণাটক, বিহার সহ একাধিক রাজ্য এইধরণের প্রস্তাবের পক্ষে। যদিও বিহারে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নীতি প্রসঙ্গে এনডিএ শরিক জেডিইউ-এর সঙ্গে বিজেপির বেশ কিছুটা বিবাদ বেধেছে। মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার বনাম পঞ্চায়েত মন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী প্রকাশ্যেই এই নীতির বিপক্ষে ও পক্ষে মতপ্রকাশ করেছেন। যদিও বিষয়টা এরকম নয় যে এই আলোচনা এখনই শুরু হয়েছে। বরং এই আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিলো আজ থেকে প্রায় দু'বছর আগে। ডিজিটাল মিডিয়ায় যাঁদের ঘুরে বেড়ানোর অভ্যেস আছে তাঁরা একটু খেয়াল করলে দেখতে পাবেন - বেশ কিছু ছোটো ছোটো ওয়েবসাইট আছে, যেখানে বেশ কিছুদিন ধরে 'ইন্ডিয়া ওয়ান্টস পপুলেশন কন্ট্রোল ল' গোছের প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। অতএব এই সিদ্ধান্ত যে হঠাৎ করে নেওয়া হয়েছে এমনটা মোটেই নয়।

প্রধানমন্ত্রীর আসনে দ্বিতীয়বার আসীন হবার পর ২০১৯ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে নরেন্দ্র মোদী দেশের জনসংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি দেশের দায়িত্বশীল নাগরিকদের কাছে তাঁদের পরিবার ছোটো রাখবার আবেদন জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের বক্তব্য অনুসারে – এর ফলে তিনি যে শুধু তাঁর পরিবারের কল্যাণ করবেন তাই নয়, একই সঙ্গে জাতিরও উপকার করবেন। দেশপ্রেম দেখাবেন।

যদিও সংসদ সদস্যদের পরিসংখ্যান সামনে আনলে বিষয়টা বেশ কিছুটা গোলমেলে হয়ে যেতে বাধ্য। তথ্য বলছে, ওই সময় লোকসভা সদস্যদের ১৪৯ জনের ৩টি অথবা তার বেশি সন্তান। যার মধ্যে বিজেপি সাংসদের সংখ্যা ৯৬। একটু অন্যভাবে দেখলে, সংসদে মোট বিজেপি সদস্যদের এক তৃতীয়াংশ (৩১.৬৮%)-এর দুটির বেশি সন্তান।

আরও একটু খুলে বললে, ১২ জন সাংসদের ৫টি করে সন্তান, ২১ জন বিজেপি সাংসদের ৪টি করে সন্তান। এছাড়াও সেই সময় বিজেপির জোটসঙ্গী আপনা দলের পাকৌরি লালের এবং এআইইউডিইউএফ-এর বদরুদ্দিন আজমল-এর ৭টি করে সন্তান ছিলো। এই সমস্ত তথ্যই লোকসভার ওয়েবসাইটে আছে। যদিও বেশ কিছু সাংসদ নিজেদের বিবাহিত বলে জানালেও তাঁরা তাঁদের সন্তান সংখ্যা জানাননি এবং ১৯০ জন সাংসদ এই সম্পর্কিত কোনো তথ্য দেননি। ২৫ জন মুসলিম সাংসদদের মধ্যে ৯ জনের ৩ বা তার বেশি সন্তান।

এবার আসা যাক উত্তরপ্রদেশে। কারণ এই রাজ্যই প্রথম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে খসড়া নীতি প্রকাশ করেছে। গত রবিবার বিজেপি শাসিত এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ উত্তরপ্রদেশ পপুলেশন (কন্ট্রোল, স্টেবিলাইজেশন অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার) বিল, ২০২১-এর খসড়ার ঘোষণা করেছেন। প্রস্তাবিত এই বিল কতটা মেরুকরণের লক্ষ্যে আর কতটা আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে তা সময় বলবে। তবে উত্তরপ্রদেশ প্রসঙ্গে তথ্য এবং পরিসংখ্যান যা বলছে তা অনেকটা এরকম।

টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার ৩৯৭ জন বিধায়কের তথ্য ওয়েবসাইটে আছে। যার মধ্যে বিজেপির বিধায়কের সংখ্যা ৩০৪ এবং এর মধ্যে ১৫২ জন বিজেপি বিধায়কের সন্তান সংখ্যা ৩ অথবা তার বেশি। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার বিজেপি বিধায়কদের মধ্যে ১জন বিধায়কের ৮টি সন্তান আছে। ১ জনের ৭টি সন্তান আছে। ৮ জন বিধায়কের ৬টি করে, ১৫ জন বিধায়কের ৫টি করে, ৪৪ জন বিধায়কের ৪টি করে, ৮৩ জন বিধায়কের ৩টি করে সন্তান আছে। এছাড়া ১০৩ জন বিধায়কের ২টি করে সন্তান এবং ৩৪ জনের ১টি করে সন্তান।

অর্থনীতি বলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অর্থ হল তা কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এবং তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়ন দৃঢ় হয়। যদিও অর্থনীতি যাই বলুক রাজনীতি বোধহয় সেই একই কথা বলেনা। বিষয়টা এরকম নয় যে উত্তরপ্রদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুব বেশি। বরং দেশের সেনসাস-এর তথ্য এর উলটো কথাই বলে। ১৯৯১ থেকে ২০০১ – এই সময়কালে উত্তরপ্রদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিলো ২.৩৩ শতাংশ। যা ২০০১ থেকে ২০১১-এই সময়কালে কমে হয়েছে ১.৮৫ শতাংশ। রাজ্যে হিন্দু জনসংখ্যা ৭৯.৭ শতাংশ এবং মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৯.৩ শতাংশ। বাকী অংশে আছে শিখ, খৃষ্টান, জৈন, বৌদ্ধ, অন্যান্য এবং কোনো ধর্মে বিশ্বাস করেন না এরকম মানুষ। সুতরাং জনসংখ্যা খুব বেড়ে যাচ্ছে বলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ জরুরি এই যুক্তি ধোপে টেকে না।

এই প্রসঙ্গে একবার জরুরি অবস্থার সময় ফিরে যাওয়া যেতে পারে। ১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থার সময় সঞ্জয় গান্ধীর বহু আলোচিত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নীতি নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। সেইসময় যেভাবে বেশ কিছু গরীব মানুষকে জোর করে এই পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছিলো তা আজও বিভিন্ন আলোচনায় ফিরে ফিরে আসে। তথ্য অনুসারে মাত্র ১ বছরের মধ্যে প্রায় ৬২ লক্ষ পুরুষের অপারেশান করানো হয়েছিলো। এই অপারেশান করতে গিয়ে ২০০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ঠিক এভাবেই হিটলারের সময়েও অপারেশান করানো হয়। সাংবাদিক মারা হিস্টেনডাল জানিয়েছিলেন ভারতে ওই অপারেশানের সংখ্যা নাজিদের তুলনায় ১৫ গুণ বেশি ছিলো।

নীতিশ কুমার যে কথাটা বলতে চেয়েছেন তা হল – দেশে বা দেশের কোনো রাজ্যে এই ধরণের পরিকল্পনা কার্যকরী হবেনা। এর বদলে মহিলাদের আরও বেশি শিক্ষিত করে তুললে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অনেক সহজ হবে। যদিও নীতিশ কুমারের এই কথা জোটসঙ্গী বিজেপির পছন্দ হয়নি বলাই বাহুল্য। কারণ আমরা জ্ঞানে হোক বা অজ্ঞানে, জেনে বা না জেনে বিশ্বাস করি – দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য কোনো এক বিশেষ সম্প্রদায়ই দায়ী। দেশের যাবতীয় সমস্যা থেকে নজর ঘুরিয়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিষয় সামনে নিয়ে আসার পেছনের রাজনীতিটা বোধহয় লুকিয়ে আছে সেখানেই।

GOOGLE NEWS-এ আমাদের ফলো করুন

No stories found.
People's Reporter
www.peoplesreporter.in